পার্বত্য চট্টগ্রামে ম্রো সংস্কৃতিতে ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান (পাঠ ৯)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও মূল্যবোধ - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

186

পূর্ববর্তী পাঠে তোমরা ম্রো-দের ধর্মীয় পুরাণ সম্পর্কে জেনেছ। এবারে তাদের একটি ধর্মীয় আচার ও অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানবে। ম্রো গ্রামগুলোতে ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া, কলেরা এসব রোগ প্রায়ই মড়ক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি বছর বহু ম্রো এসব রোগে আক্রান্ত হয়। আর আরোগ্য লাভের জন্য তারা ধর্মীয় চিকিৎসা বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের উপর বেশি নির্ভর করে। সুস্বাস্থ্য এবং খাদ্য উৎপাদন তাদের জীবনে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই ম্রো-রা অন্যসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান মূলত রোগের প্রকোপ থেকে বাঁচার জন্য এবং বেশি ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে পালন করে থাকে। প্রতিবছর জুমচাষের প্রাক্কালে অর্থাৎ জুমের খেতে বীজ বপনের আগে ম্রো গ্রামগুলিতে 'কুয়া খাং' নামে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালিত হয়ে থাকে। প্রতিটি ম্রো গ্রামের সকলে মিলে তার দিনক্ষণ নির্ধারণ করে। সাধারণত মার্চ মাসে এই অনুষ্ঠানটি পালিত হয়ে থাকে।
'কুয়া' অর্থ হলো গ্রাম ও 'খাং' অর্থ হলো বন্ধ করে দেওয়া। প্রতিটি ম্রো গ্রাম পৃথক ভাবে 'কুয়া খাং' পালন করে। আর তা পালন করার মধ্যে দিয়ে ম্রো গ্রামটিতে কোনো রোগ বা অশুভ কিছুর প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে তারা বিশ্বাস করে। এই আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রথমে গ্রামের সীমানা নির্দিষ্ট করে নেওয়া হয়। তারপর গ্রামটিকে বন্ধ ঘোষণা করা হয় যেন সব রোগ ও অমঙ্গল গ্রামের সীমানার বাইরে থাকে। দুই বা তিন দিন ধরে এই 'কুয়া খাং' পালন করা হয়। গ্রামের সবাই আগ্রহ ও উদ্দীপনার সাথে এতে অংশগ্রহণ করে। এ অনুষ্ঠানে যিনি নেতৃত্ব দেন তাকে বলা হয় 'স্রা' বা 'ওয়াম্মাহ'। সাধারণত ম্রো গ্রামটির প্রধান বা কারবারি 'ওয়াম্মাহ'-র ভূমিকা পালন করেন। এছাড়াও তাঁর দুইজন সহকারী থাকে যাদের বলা হয় 'প্লাইরিয়া'।

গ্রামের প্রতিটি বাড়ি থেকে 'কুয়া খাং' পালনের জন্য কিছু মুরগি সংগ্রহ করা হয়। একটি ছাগলও জোগাড় করা হয়। এছাড়াও নিয়ম অনুসারে প্রতিটি পরিবারের পক্ষ থেকে একটি করে মুরগি প্রদান করতে হয়। যারা সামর্থ্যবান তারা একাধিক ও যার সামর্থ্য কম সে মুরগির বিনিময়ে অন্য কিছু প্রদান করে। 'কুয়া খাং' এর প্রথম দিনে মুরগিগুলোকে বধ করা হয় এবং গ্রামবাসীর জন্য ভোজের আয়োজন করা হয়। দ্বিতীয় দিনে ঝর্ণার ধারে ছাগলটিকে বধ করা হয় যেন ছাগলটির রক্ত ঝর্ণার ধারায় মিশে যায়। এই দুই দিন কোনো বহিরাগতকে গ্রামে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। গ্রাম থেকেও কেউ বাইরে যেতে পারে না। অর্থাৎ ঐ গ্রামের সাথে বাইরের কারও যোগাযোগ থাকে না। এমনকি গ্রামের কোনো বাড়ির মেয়ের যদি বিয়ের বর অন্য কোনো গ্রামের বাসিন্দা হয়ে থাকে, তাহলে 'কুয়া খাং' আচার পালনের সময় তাকেও গ্রামে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। গ্রামবাসী ছাড়া অন্য কাউকে এই সময় গ্রামে থাকতে দিলে দুর্ভোগ, দুর্যোগ, রোগের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে বলে তারা মনে করে। আচারটি পালনের শেষে 'ওয়াম্মাহ'ও তার দুই সহকারী বা 'প্লাইরিয়া'কে বিভিন্ন উপহার ও পাগড়ি দিয়ে সম্মানিত করে। বছরে একবার এই আচার পালন করার রীতি থাকলেও কোনো রোগের মড়ক লাগলে বা কারও অসুস্থতা সারিয়ে তুলতে বছরে অন্য সময়ে নানাবিধ আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়।

অনুশীলন

কাজ- ১:

'কুয়া খাং' কেন পালন করা হয়?

কাজ- ২:

কীভাবে এই অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা হয়?

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...