প্রথাগত শাসন-ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয়-শাসন ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য (পাঠ ৩)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রাজনৈতিক জীবন - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

168

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত শাসন-ব্যবস্থাটি আসলে কী এবং কেন প্রয়োজন, সেটি ভালোভাবে জানার জন্য নিশ্চয়ই তোমাদের বেশ আগ্রহ আছে। প্রথাগত শাসন-ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীরভাবে জানার জন্য দেশের সাধারণ শাসন ব্যবস্থার সাথে এর পার্থক্যকে আমাদের বুঝতে হবে। আমরা জানি যে, আমাদের দেশে একটি সাধারণ শাসন-ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। এ শাসন ব্যবস্থায় রয়েছে একটি সংবিধান, সরকার। এ সরকার পরিচালনার জন্য রয়েছে আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। এভাবে একটি রাষ্ট্রে সরকারের বিভিন্ন ইউনিটের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের কল্যাণের জন্য পরিচালিত যাবতীয় কার্যক্রমই হচ্ছে দেশের সাধারণ শাসন-ব্যবস্থা।

অন্যদিকে, প্রথাগত শাসন-ব্যবস্থা হলো একটি সীমিত আকারের শাসন-ব্যবস্থা। কারণ, এই ব্যবস্থাটি বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠীকে ঘিরে পরিচালিত হয়, যা দেশের সাধারণ জনগণের জন্য প্রযোজ্য নয়। সাধারণত পৃথিবীর বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে এসব প্রথাগত শাসন-ব্যবস্থা চালু আছে। ইতিপূর্বে আমরা জেনেছি যে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো ঐতিহাসিকভাবে বরাবরই রাষ্ট্রের সাধারণ শাসন-ব্যবস্থার বাইরে ছিল। তাদের বসতি অঞ্চলগুলো প্রধানত দুর্গম এবং পাহাড়-পর্বত ও বনাঞ্চলের মাঝে অবস্থিত হওয়ায় সরকারের প্রত্যক্ষ শাসন বা নজরদারির বাইরে থেকে গিয়েছিল। এভাবে স্মরণাতীত কাল থেকে তারা নিজেদের রাজা বা গোষ্ঠী প্রধানের নেতৃত্ব মেনে আলাদা কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং স্বতন্ত্র জীবনধারা নিয়ে প্রকৃতির সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত জীবন যাপনে অভ্যস্ত ছিল। দেশের সাধারণ প্রশাসন বা শাসন-ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে বংশ পরম্পরায় তাদের সমাজে গড়ে উঠেছিল বিশেষ কিছু প্রথা, রীতি নীতি, অনুশাসন এবং মূল্যবোধ যেগুলো নিজ সম্প্রদায়ের সকল সদস্যের জন্য মেনে চলা বাধ্যতামূলক ছিল। নিজেদের মধ্যে যে কোনো বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য তারা গ্রাম, মৌজা, গোষ্ঠী প্রধান বা রাজার দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিত। এভাবে জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অর্থাৎ নিজেদের পারিবারিক, সামাজিক, গোত্রগত শৃঙ্খলা এবং শাসন সুসংহত রাখতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে সর্বজনগ্রাহ্য বিশেষ কিছু নিয়ম-কানুন, রীতিনীতি ও প্রথা ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। এসব রীতি-নীতি এবং নিয়ম কানুনই প্রথাগত আইন হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে। আর প্রথাগত এসব আইন কানুনের দ্বারা যখন সমাজ শাসিত হয় তখন তাকে প্রথাগত শাসন-ব্যবস্থা বলা হয়। এসব প্রথাগত আইনের সাংবিধানিক স্বীকৃতি না থাকায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত শাসন-ব্যবস্থা ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। দেশের সাধারণ শাসন-ব্যবস্থায় এবং সংবিধানে এসব প্রথাগত আইন ও রীতি নীতির প্রয়োগ বা স্বীকৃতি না থাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত শাসনের গুরুত্বও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সমাজ ও সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য ও বহুমাত্রিকতা বজায় রাখার স্বার্থে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি ও প্রথাগত শাসন পদ্ধতিগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...