পৃথিবীর প্রায় প্রত্যেক জাতিরই নিজস্ব কিছু প্রবাদ প্রবচন আছে। লোকজ জ্ঞানের আধার এসব প্রবাদ-প্রবচন তারা দীর্ঘকাল ধরে বংশপরম্পরায় ব্যবহার করে আসছে। এগুলো মূলত মৌখিক সাহিত্য এবং লোক সাহিত্যের প্রধান শাখা। একটি জনগোষ্ঠীর বুদ্ধিমত্তা, অভিজ্ঞতা, চিন্তাধারা ও লোকজ্ঞানের অনেকটা পরিচয় পাওয়া যায় তার প্রবাদ-প্রবচনে। প্রবাদ-প্রবচনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তাদের অভিজ্ঞতাকে মুখে মুখে ছড়িয়ে দেয়। যা থেকে অন্যরা শিক্ষা লাভ করতে পারে। এমনকি শিক্ষিত মানুষেরও এ থেকে অনেক কিছু শেখার ও জানার আছে। এসব প্রবাদ-প্রবচন ঠিক কবে, কখন, কোথায় সৃষ্টি হয়েছিল তা নির্ণয় করা খুবই কঠিন। তবে প্রবাদ-প্রবচনের অন্যতম গুণ হচ্ছে এর সর্বজনীনতা। এর মধ্যে যেমন সাধারণ বুদ্ধির পরিচয় রয়েছে, তেমনি কৌতুক বা হাস্যরসেরও উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। প্রবাদ প্রবচনের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-
ক. হাজার বছরের অভিজ্ঞতা, পরিণত লোকজ্ঞান এবং প্রজ্ঞা।
খ. মূল্যবোধ এবং নীতিবাক্য প্রকাশিত হয়।
গ. সকলের কাছে গ্রহণীয় ও সকলের মাঝে প্রচলিত।
ঘ. সংক্ষিপ্ত পরিসরে সহজ বাক্যে বা ছড়ার মাধ্যমে প্রকাশিত।
৬. নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্য বহন করে।
চ. অলংকারিক ভাষায় প্রকাশিত হয় (উপমা, বিরোধাভাস প্রভৃতি)।
অন্যান্য জাতির মতোই বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝেও প্রচলিত রয়েছে নিজস্ব কিছু ছড়া ও প্রবাদ-প্রবচন। তবে এর অনেক কিছুই লিখিত না থাকায় সেগুলো আজ আর তেমন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এখানে দৃষ্টান্তস্বরূপ বাংলাদেশের কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কিছু প্রবাদ-প্রবচন এবং তার বাংলা মর্মার্থ উল্লেখ করা হলো:
| ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী | প্রবাদ-প্রবচন | বাংলা তর্জমা | ভাবার্থ / বাংলা প্রবাদ |
| চাক | দুঃখা আহান্নে ছুকখালুদে। | কষ্ট করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। | বাংলা ভাষাতেও অনুরূপ একটি প্রবচন চালু আছে। সেটি হলো-'কষ্ট করলে কেষ্ট মেলে'। |
| পাংখোয়া | ল এক হ্রাউ। | দলের মধ্যে একজন খারাপ হলে সকলেরই দুর্নাম হয়। | |
| মো | ভাসাই ওয়াককই পের টাই টায়া ফুল দৈ। | মরা হাতির দেহ কুলা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। | সত্য কখনো গোপন থাকে না। |
| মৈতৈ | অবিক পসি মরল মুন্না চার। | কৃপণ লোকের ধন সম্পদ ঘুন পোকায় খায়। | সম্পদের সদ্ব্যবহার না করে সেগুলোকে অযথা আঁকড়ে ধরে থাকা ঠিক নয়। কারণ এতে সম্পদ নষ্ট হয়ে যায় এবং অবশেষে কোনো কাজে আসে না। |
| বিষ্ণুপ্রিয়া | অকনেইর জতা ছিড়ইন | অদক্ষ লোক দ্বারা কাজ করালে অযথা পরিশ্রম আর বিশৃঙ্খলা হয়। | |
| হাজং | দিনুনি আশা, রাতিনি গাসা। | দিন হচ্ছে কাজের জন্য আর রাত হচ্ছে বিশ্রামের। | ভালো কাজ করার জন্য উদ্যমের প্রয়োজন, আর তা দিনেই করা উচিত। |
| খাসি | উ বাম হাতি কিত কুলাই। | হাতির মতো খাও আর ঘোড়ার মতো দৌড়াও (কাজ কর)। | পেটে না দিলে পিঠে সয় না |
| মান্দি | সংঅ প্রাপ, পাংসা, নিগামো মাংসা মাংসা, মান্দে রাসং গ্লাংঅ। | বৃক্ষের সেরা বুড়ো বট, জীবের বৃহৎ ঐরাবত। | ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষই আসল মানুষ। |
| খুমী | সিখি ডিই লেখা সেউঙা বাই। | হরিণ শিকারের আগে কলাপাতা মাটিতে বিছানো। | মরার আগে ভূত হওয়া। |
| মারমা | খরুহ্ মতইকে অমুই মুখ। | হোঁচট না খেলে কেউ মাকে ডাকে না। | বিপদে পড়লে তবে মানুষ আপন জনকে খোঁজে। |
| ত্রিপুরা | লাইয় বুসু কালাই খাই লাইসে পাগ', 'বুসুগ' লাই কালাই খাই হেই লাইসে পাগ'। | কাটা পাতার উপর কাঁটা পড়লে পাতা ছিঁড়ে যায়, আবার কাঁটার উপর পাতা পড়লেও পাতা ছিঁড়ে যায়। | সবল দুর্বলের উপর পড়লে যা হয় দুর্বল সবলের উপর পড়লেও তাই। মরার উপর খাঁড়ার ঘা |
| ওরাঁও | ঘারসে নিকেলকে কোনহ্ কামনে যারেক সময় খালি খাইল্যা দেখলে বরাত খারাপ। | ঘর থেকে বের হয়ে কোনো কাজে যাওয়ার সময় খালি কলস দেখলে যাত্রা অশুভ। | |
| সাঁওতাল | পুথি খন্ তুথিগে সরসা, ধরম্ খন্ করঙ্গে লাট গেয়া। | পড়ার চেয়ে শোনা ভালো, ধর্ম অপেক্ষা কর্ম ভালো। | |
| চাকমা | ভাত মিজাল্যা খা-দে সুখ, মানুচ মিজাল্যা চা-দে সুখ। | মিশ্র চালের ভাত খেতে মজা, আর মিশ্র বর্ণের (নানা জাতি-বর্ণের) মানুষকে দেখতে পাওয়া সুখকর। | বৈচিত্র্য না থাকলে যে কোনো জিনিস একঘেয়ে ও বিরক্তিকর মনে হয়। |
| অনুশীলন | |
| কাজ- ১: | প্রবাদ-প্রবচন কি লোকজ জ্ঞান? প্রবাদ-প্রবচনের বৈশিষ্ট্যসমূহ উল্লেখ করো। |
| কাজ- ২: | যে কোনো তিনটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রবাদ-প্রবচনের ভাবার্থ বিশ্লেষণ করো। |
Read more