বাংলায় সুবেদারি শাসন

বাংলাদেশ বিষয়াবলী - সাধারণ জ্ঞান -

6.4k

১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে বাংলার শেষ আফগান শাসক দাউদ কররানী পরাজিত হলে বাংলায় মুঘল শাসন শুরু হয়। এ সময় মুঘল শাসক ছিলেন সম্রাট আকবর। সুবাদারি ও নবাবি এ দুই পর্বে বাংলায় মুঘল শাসন অতিবাহিত হয়। বারোভূঁইয়াদের দমনের পর সমগ্র বাংলায় সুবেদারী প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময় সমগ্র বঙ্গ দেশ সুবহ-ই-বাঙ্গালাহ নামে পরিচিত হয়। মুঘল প্রদেশগুলো সুবা নামে পরিচিত ছিল। প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে বলা হতো সুবাদার।

বাংলার ইতিহাসে সুবেদারি শাসন (বা সুবাদারি শাসন) মূলত মোগল আমলের সেই সময়কালকে বোঝায়, যখন বাংলা দিল্লির মোগল সম্রাটদের অধীনে ছিল এবং তাঁদের নিযুক্ত প্রতিনিধি বা 'সুবাদার' দ্বারা শাসিত হতো। ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধের মাধ্যমে মোগলরা বাংলা জয় করলেও প্রকৃত সুবেদারি শাসন সুসংগঠিত হয় সম্রাট জাহাঙ্গীরের সময় থেকে।

১. ইসলাম খাঁ (১৬০৮–১৬১৩)

তিনি ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের নিযুক্ত অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুবাদার।

  • বারো ভূঁইয়া দমন: তিনি ১৬১০ সালে বারো ভূঁইয়াদের নেতা মুসা খাঁকে পরাজিত করে বাংলায় মোগল শাসন চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেন।

  • রাজধানী ঢাকা: ১৬১০ সালে তিনি রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন। তিনি সম্রাটের নামানুসারে ঢাকার নাম রাখেন 'জাহাঙ্গীরনগর'

  • ধোলাই খাল: ঢাকার জলবদ্ধতা নিরসন ও প্রতিরক্ষার জন্য তিনি বিখ্যাত 'ধোলাই খাল' খনন করেন।

২. শাহজাদা মোহাম্মদ সুজা (১৬৩৯–১৬৬০)

তিনি সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র ছিলেন।

  • শাসনকাল: তিনি দীর্ঘ ২১ বছর অত্যন্ত সাফল্যের সাথে বাংলা শাসন করেন।

  • স্থাপত্য: তাঁর আমলে ঢাকার বড় কাটরা এবং চুড়িহাট্টা মসজিদ নির্মিত হয়।

  • পতন: উত্তরসূরি যুদ্ধে ভাই আওরঙ্গজেবের কাছে পরাজিত হয়ে তিনি সপরিবারে আরাকানে পালিয়ে যান এবং সেখানে নির্মমভাবে নিহত হন।

৩. মীর জুমলা (১৬৬০–১৬৬৩)

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা বাংলার অত্যন্ত শক্তিশালী সুবাদার ছিলেন।

  • আসাম বিজয়: তিনি মোগল সীমানা আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত করেন।

  • মীর জুমলার কামান: তাঁর অসম অভিযানের স্মৃতি হিসেবে ঐতিহাসিক 'বিবি মরিয়ম' বা মীর জুমলার কামানটি বর্তমানে ঢাকার ওসমানী উদ্যানে সংরক্ষিত আছে।

  • মীর জুমলা গেট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বরের কাছে অবস্থিত 'ঢাকা গেট' বা মীর জুমলা গেট তাঁরই কীর্তি।

৪. শায়েস্তা খাঁ (১৬৬৪–১৬৮৮)

তিনি বাংলার ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদী এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় সুবাদার ছিলেন।

  • চট্টগ্রাম বিজয় (১৬৬৬): তিনি মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের পরাজিত করে চট্টগ্রাম জয় করেন এবং এর নাম রাখেন 'ইসলামাবাদ'

  • চালের দাম: তাঁর আমলে বাংলায় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি চরমে পৌঁছেছিল; তখন মাত্র ১ টাকায় ৮ মণ চাল পাওয়া যেত।

  • স্থাপত্য: তাঁর আমলে লালবাগ কেল্লা (নির্মাণ শুরু করেন শাহজাদা আজম), বিবি পরীর মাজার, চকবাজার মসজিদ এবং সাত গম্বুজ মসজিদ নির্মিত হয়।

৫. মুর্শিদকুলি খাঁ ও সুবেদারির শেষ পর্যায় (১৭১৭–১৭২৭)

তিনি ছিলেন বাংলার শেষ শক্তিশালী সুবাদার এবং প্রথম স্বাধীন নবাব।

  • রাজধানী স্থানান্তর: তিনি ১৭১৭ সালে রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর করেন।

  • নবাবী আমল: তাঁর সময় থেকেই সুবেদারি পদটি বংশানুক্রমিক হয়ে পড়ে এবং কার্যত 'নবাবী আমল' শুরু হয়।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

মানসিংহ সম্রাট আকবরের সেনাপতি ছিলেন। তিনি বাংলা দখল নেওয়ার প্রচেষ্ঠা চালান এবং বারো ভূঁইয়াদের দমন করতে ব্যর্থ হন।

মুঘল সাম্রাজ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি এবং সম্রাট আকবরের 'নবরত্ন' সভার অন্যতম সদস্য ছিলেন রাজা মানসিংহ। বাংলার ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষভাবে জড়িত কারণ তিনি মোগল আধিপত্য বিস্তারে প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন।

১. পরিচয় ও পদমর্যাদা

  • পরিচয়: তিনি ছিলেন রাজস্থানের অম্বর (বর্তমানে জয়পুর) রাজ্যের কচ্ছবাহা বংশীয় রাজা। তাঁর ফুফু ছিলেন সম্রাট আকবরের স্ত্রী যোধাবাই (মরিয়ম-উজ-জমানি)।

  • মনসবদার: তিনি মোগল দরবারের সর্বোচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী ছিলেন। সম্রাট আকবর তাঁকে 'ফারজান্দ' (পুত্র) উপাধি দিয়েছিলেন এবং ৭০০০ মনসবদার পদে উন্নীত করেছিলেন।

২. বাংলার সুবাদার হিসেবে মানসিংহ (১৫৯৪–১৬০৬)

সম্রাট আকবর তাঁকে তিনবার বাংলার সুবাদার হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর প্রধান লক্ষ্য ছিল অবাধ্য জমিদারদের (বারো ভূঁইয়া) দমন করা।

  • রাজধানী রাজমহল: ১৫৯৫ সালে তিনি বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে রাজমহলে (বর্তমান বিহারে) স্থানান্তর করেন এবং এর নাম দেন 'আকবরনগর'

  • বারো ভূঁইয়াদের সাথে সংঘর্ষ: তিনি রাজা প্রতাপাদিত্য এবং কেদার রায়কে পরাজিত করতে সক্ষম হলেও ঈসা খাঁকে দমনে হিমশিম খেয়েছিলেন।

৩. ঈসা খাঁ ও মানসিংহের দ্বৈরথ (১৫৯৭)

বাংলার ইতিহাসে ঈসা খাঁ ও মানসিংহের লড়াই এক কিংবদন্তি হয়ে আছে।

  • এগারোসিন্দুরের যুদ্ধ: ১৫৯৭ সালে কিশোরগঞ্জের এগারোসিন্দুর নামক স্থানে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে মানসিংহের বাহিনীর সাথে ঈসা খাঁর বিশাল নৌযুদ্ধ হয়।

  • দ্বন্দ্বযুদ্ধ: লোকগাঁথা অনুযায়ী, দুই বীরের মধ্যে এক পর্যায়ে তলোয়ার নিয়ে সরাসরি দ্বন্দ্বযুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মানসিংহের তলোয়ার ভেঙে গেলে ঈসা খাঁ তাঁকে আঘাত না করে নিজের তলোয়ার এগিয়ে দেন। ঈসা খাঁর এই মহানুভবতায় মানসিংহ মুগ্ধ হন এবং সম্রাট আকবরের কাছে ঈসা খাঁর বীরত্বের প্রশংসা করেন।

৪. স্থাপত্য ও অবদান

  • রাজমহল শহর: তিনি রাজমহলকে একটি সুরক্ষিত ও আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।

  • মন্দির নির্মাণ: তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে অনেক হিন্দু মন্দির নির্মাণ ও সংস্কার করেন, যার মধ্যে বৃন্দাবনের গোবিন্দ দেব মন্দির অন্যতম।

Content added By
Content updated By

১৬০৮ সালে ইসলাম খানকে সুবেদার হিসেবে নিয়োগ দেয় সম্রাট জাহাঙ্গীর। তিনি বারো ভূঁইয়াদের দমন করে সমগ্র বাংলায় সুবাদারি শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ১৬১০ সালে বিহারের রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকায় নিয়ে আসেন। সুবেদার ইসলাম খান ঢাকার নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। ইসলাম খান ঢাকার 'ধোলাই খাল খনন করেন। তিনি বাংলার নৌকা বাইচ উৎসবের সূচনা করেন।

বাংলার মোগল সুবাদারদের মধ্যে ইসলাম খাঁ (১৬০৮–১৬১৩ খ্রি.) ছিলেন অত্যন্ত সফল ও দূরদর্শী একজন প্রশাসক। তাঁর শাসনামলটি বাংলার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, কারণ তাঁর হাত ধরেই বাংলায় মোগলদের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ঢাকা প্রথমবার রাজধানীর মর্যাদা পায়।

১. বারো ভূঁইয়া দমন ও রাজনৈতিক বিজয়

সুবাদার ইসলাম খাঁ ছিলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের বাল্যবন্ধু। তিনি বাংলায় এসে উপলব্ধি করেন যে, বারো ভূঁইয়াদের দমন না করলে মোগল আধিপত্য স্থায়ী হবে না।

  • মুসা খাঁকে পরাজয়: ১৬১০ সালে তিনি এক বিশাল নৌবাহিনী নিয়ে বারো ভূঁইয়াদের নেতা ও ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁকে পরাজিত করেন।

  • গেরিলা যুদ্ধের অবসান: তিনি অত্যন্ত কৌশলে একের পর এক জমিদারকে পরাজিত বা বশীভূত করেন। এর মাধ্যমে বাংলায় দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও বারো ভূঁইয়াদের প্রতিরোধের অবসান ঘটে।

২. ঢাকাকে রাজধানী ঘোষণা (১৬১০)

ইসলাম খাঁর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবদান হলো ঢাকাকে বাংলার রাজধানী করা।

  • কারণ: বারো ভূঁইয়া ও মগ-পর্তুগিজ জলদস্যুদের দমন করার জন্য ঢাকা ছিল ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

  • জাহাঙ্গীরনগর: ১৬১০ সালে তিনি রাজমহল থেকে রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে এর নাম রাখেন 'জাহাঙ্গীরনগর'

৩. ধোলাই খাল ও নগর উন্নয়ন

ঢাকার প্রতিরক্ষাকে মজবুত করতে এবং পানি চলাচলের সুবিধার জন্য তিনি বিখ্যাত 'ধোলাই খাল' খনন করেন। এটি বুড়িগঙ্গা ও বালু নদীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছিল, যা রাজধানীর নিরাপত্তা ও বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৪. মগ ও পর্তুগিজ দমন

বাংলার দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে মগ (আরাকানি) এবং পর্তুগিজ জলদস্যুদের চরম উৎপাত ছিল। ইসলাম খাঁ নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করে তাদের বিরুদ্ধে সফল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং মোগল সীমানা সুরক্ষিত করেন।

একনজরে ইসলাম খাঁ:

বিষয়তথ্য
পুরো নামশেখ আলাউদ্দিন ইসলাম খাঁ।
নিযুক্তকর্তাসম্রাট জাহাঙ্গীর।
রাজধানী পরিবর্তনরাজমহল থেকে ঢাকা (১৬১০)।
প্রধান সাফল্যবারো ভূঁইয়াদের চূড়ান্ত পতন।
মৃত্যু১৬১৩ সালে তিনি ঢাকায় থাকাকালীন মৃত্যুবরণ করেন।
Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

শায়েস্তা খান বাংলার সুবাদার নিযুক্ত হন ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে। আওরঙ্গজেবের মামা ছিলেন শায়েস্তা খান। চট্টগ্রাম অধিকার করে আরাকানি মগ জলদস্যুদের উৎখাত করেন। আরাকানি জলদস্যুদের হটিয়ে তিনি চট্টগ্রামের নাম রাখেন ইসলামাবাদ। শায়েস্তা খান বাংলা থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করেন। টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত শায়েস্তা খানের আমলে। তাঁর আমলের স্থাপত্যশিল্প ছোট কাটরা, লালবাগ কেল্লা, চক মসজিদ, সাত গম্বুজ মসজিদ, পরি বিবির মাজার (শায়েস্তা খানের মেয়ে), হোসেনী দালান, বুড়িগঙ্গার মসজিদ, প্রভৃতি।

বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং দীর্ঘমেয়াদী মোগল সুবাদার ছিলেন শায়েস্তা খাঁ। তিনি দুই দফায় (১৬৬৪-১৬৭৮ এবং ১৬৮০-১৬৮৮) প্রায় ২৪ বছর বাংলা শাসন করেন। তাঁর আমলকে বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং স্থাপত্য শিল্পের প্রসারের জন্য 'স্বর্ণযুগ' বলা হয়।

১. পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্ক

  • পরিচয়: তিনি ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের পত্নী মমতাজ মহলের ভাই। অর্থাৎ, সম্রাট আওরঙ্গজেবের আপন মামা

  • উপাধি: সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁকে 'আমীর-উল-উমারা' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

২. সামরিক সাফল্য: চট্টগ্রাম বিজয় (১৬৬৬)

শায়েস্তা খাঁর শাসনের সবচেয়ে বড় গৌরবময় অধ্যায় হলো চট্টগ্রাম জয়।

  • মগ ও পর্তুগিজ দমন: বাংলার দক্ষিণ উপকূলে মগ (আরাকানি) এবং পর্তুগিজ জলদস্যুদের চরম উৎপাত ছিল। শায়েস্তা খাঁ একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠন করে তাদের পরাজিত করেন।

  • ইসলামাবাদ: ১৬৬৬ সালে তিনি চট্টগ্রাম দখল করেন এবং এর নতুন নাম রাখেন 'ইসলামাবাদ'। তিনি সন্দ্বীপও মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।

৩. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: ১ টাকায় ৮ মণ চাল

শায়েস্তা খাঁর আমল সাধারণ মানুষের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে সুলভ দ্রব্যমূল্যের জন্য।

  • দ্রব্যমূল্য: তাঁর আমলে বাংলায় কৃষিতে ব্যাপক উন্নতি হয়েছিল। কথিত আছে, তখন মাত্র ১ টাকায় ৮ মণ চাল পাওয়া যেত।

  • স্মৃতিচিহ্ন: তিনি যখন ১৬৮৮ সালে চিরতরে ঢাকা ত্যাগ করেন, তখন পশ্চিম দিকের একটি তোরণ (পুরান ঢাকার চকবাজার সংলগ্ন) বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং লিখে গিয়েছিলেন— “আমার মতো সস্তায় চাল না খাওয়াতে পারলে এই দরজা কেউ খুলো না।”

৪. স্থাপত্যশৈলী ও 'শায়েস্তা খাঁ রীতি'

ঢাকাকে স্থাপত্যের নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর আমলের স্থাপত্যকলাকে 'শায়েস্তা খাঁ রীতি' বলা হয়।

  • লালবাগ কেল্লা: এই দুর্গের কাজ শাহজাদা আজম ১৬৭৮ সালে শুরু করলেও, শায়েস্তা খাঁ এর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ অংশ (যেমন: পরী বিবির মাজার) নির্মাণ করেন।

  • পরী বিবির মাজার: এটি তাঁর প্রিয় কন্যা ইরান দুখত (পরী বিবি)-এর সমাধি। এটি বাংলাদেশের একমাত্র স্থাপত্য যেখানে রাজস্থানের মাকরানা মার্বেল পাথর ব্যবহার করা হয়েছে।

  • অন্যান্য স্থাপত্য: চকবাজার শাহী মসজিদ, সাত গম্বুজ মসজিদ, ছোট কাটরা এবং হুসেনী দালান (সংস্কার)।

একনজরে শায়েস্তা খাঁ:

বিষয়তথ্য
পুরো নামমির্জা আবু তালিব (শায়েস্তা খাঁ)
নিযুক্তকর্তাসম্রাট আওরঙ্গজেব
রাজধানীঢাকা (জাহাঙ্গীরনগর)
প্রধান সামরিক সাফল্যচট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপ বিজয়
মৃত্যু১৬৯৪ সালে আগ্রায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন
Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

কাশিম খান জুয়ানি সম্রাট শাহজাহান কর্তৃক নিয়োগকৃত প্রথম সুবেদার। পর্তুগিজদের অত্যাচারের মাত্রা চরমে পৌঁছলে সম্রাট শাহজাহানের আদেশে কাসিম খান তাদেরকে শক্ত হাতে দমন করেন।

বাংলার সুবাদারদের তালিকায় কাসেম খাঁ জুয়ানি (১৬৩২–১৬৩৫ খ্রি.) ছিলেন সম্রাট শাহজাহানের নিযুক্ত অন্যতম বিশ্বস্ত প্রশাসক। তিনি সুবাদার কাসেম খাঁ (ইসলাম খাঁর ভাই)-এর সাথে বিভ্রান্তি এড়াতে 'জুয়ানি' নামে পরিচিত। তাঁর শাসনামলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো হুগলি থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়ন

১. পর্তুগিজ দমন ও হুগলি বিজয় (১৬৩২)

কাসেম খাঁ জুয়ানির শাসনামলের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো বাংলায় পর্তুগিজদের ক্রমবর্ধমান দৌরাত্ম্য বন্ধ করা।

  • কারণ: পর্তুগিজরা হুগলিতে বাণিজ্য কুঠি স্থাপনের নামে দুর্গ তৈরি করেছিল এবং সাধারণ মানুষকে জোরপূর্বক খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করত। এছাড়াও তারা মুঘলদের রাজস্ব ফাঁকি দিত এবং মগ জলদস্যুদের সাথে হাত মিলিয়ে লুণ্ঠন চালাত।

  • অভিযান: সম্রাট শাহজাহানের নির্দেশে ১৬৩২ সালে কাসেম খাঁ জুয়ানি এক বিশাল বাহিনী নিয়ে পর্তুগিজদের প্রধান ঘাঁটি হুগলি আক্রমণ করেন।

  • ফলাফল: দীর্ঘ তিন মাস যুদ্ধের পর পর্তুগিজরা পরাজিত হয়। প্রায় ১০,০০০ পর্তুগিজ নিহত হয় এবং কয়েক হাজারকে বন্দি করে আগ্রায় পাঠানো হয়। এর ফলে বাংলায় পর্তুগিজদের একচ্ছত্র আধিপত্যের অবসান ঘটে।

২. প্রশাসনিক দক্ষতা

  • তিনি একজন অত্যন্ত কঠোর ও সুশৃঙ্খল প্রশাসক ছিলেন। তাঁর সময়ে বাংলার অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা বজায় ছিল।

  • তিনি বাংলায় মুঘল নৌবাহিনীকে (নওয়ারা) শক্তিশালী করেছিলেন যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো বিদেশি দস্যু আক্রমণ করতে না পারে।

৩. সাহিত্য ও সংস্কৃতি

  • কাসেম খাঁ জুয়ানি কেবল একজন বীর সেনাপতিই ছিলেন না, তিনি নিজেও একজন সুপণ্ডিত এবং কবি ছিলেন।

  • তিনি ফার্সি ভাষায় কাব্যচর্চা করতেন। তাঁর শাসনামলে রাজদরবারে জ্ঞানী-গুণীদের কদর ছিল।

Content added By
Content updated By

সম্রাট শাহজাহানের ২য় পুত্র শাহ সুজা ২০ বছর বাংলায় সুবাদারি করেন। তিনি ইংরেজদের বিনা শুল্কে বানিজ্য করার সুযোগ নেন। শাহজাদা সুজা ঢাকার চক বাজারে 'বড় কাটরা মসজিদ নির্মাণ করেন। সুজা তার ভ্রাতা আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন।

বাংলার ইতিহাসে মুঘল সুবাদারদের মধ্যে অন্যতম দীর্ঘমেয়াদী এবং প্রভাবশালী শাসক ছিলেন শাহজাদা মোহাম্মদ সুজা। তিনি মুঘল সম্রাট শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র এবং মমতাজ মহলের সন্তান ছিলেন। ১৬৩৯ থেকে ১৬৬০ সাল পর্যন্ত (মাঝখানে সামান্য বিরতিসহ) প্রায় ২১ বছর তিনি বাংলার সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১. দীর্ঘমেয়াদী শাসন ও স্থিতিশীলতা

শাহ সুজার শাসনামল ছিল তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ এবং বাংলার অর্থনৈতিক উন্নতির সময়।

  • রাজধানী স্থানান্তর: সুবাদার হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে পুনরায় রাজমহলে (বর্তমান বিহার) স্থানান্তর করেন। তবে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে ঢাকায় তাঁর প্রতিনিধি থাকতেন।

  • ইউরোপীয় বণিকদের সুবিধা: তাঁর সময়ে ইংরেজ, ওলন্দাজ (ডাচ) এবং ফরাসি বণিকরা বাংলায় বাণিজ্য প্রসারের বিশেষ সুযোগ পায়। বিশেষ করে ১৬৫১ সালে তিনি ইংরেজদের মাত্র ৩০০০ টাকার বিনিময়ে বাংলায় বিনাশুল্কে বাণিজ্যের অনুমতি বা 'নিশান' প্রদান করেন।

২. স্থাপত্যশৈলী ও অবদান

শাহ সুজার শাসনামলে নির্মিত স্থাপত্যগুলো আজও ঢাকার ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে:

  • বড় কাটরা (Bara Katra): ১৬৪৪ সালে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে এটি নির্মিত হয়। এটি মূলত একটি সরাইখানা বা কাফেলা হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর বিশালতা এবং কারুকার্য মুঘল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।

  • চুড়িহাট্টা মসজিদ: পুরান ঢাকার চকবাজারে তিনি এই ঐতিহাসিক মসজিদটি নির্মাণ করেন।

  • ঈদগাহ (ধানমন্ডি): ১৬৪০ সালে তাঁর নির্দেশে ধানমন্ডিতে বিখ্যাত মুঘল ঈদগাহ নির্মিত হয়।

৩. উত্তরসূরি যুদ্ধ ও করুণ পরিণতি

শাহ সুজার জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল অত্যন্ত বিয়োগান্তক।

  • সিংহাসনের লড়াই: ১৬৫৭ সালে সম্রাট শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর চার পুত্রের (দারা শিকোহ, সুজা, আওরঙ্গজেব ও মুরাদ) মধ্যে সিংহাসন নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়।

  • খাজোয়ার যুদ্ধ (১৬৫৯): এলাহাবাদের কাছে খাজোয়ার যুদ্ধে শাহ সুজা তাঁর ভাই আওরঙ্গজেবের কাছে পরাজিত হন।

  • আরাকানে পলায়ন: পরাজয়ের পর মীর জুমলার তাড়া খেয়ে তিনি সপরিবারে বাংলার দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে আরাকানে (বর্তমান মিয়ানমার) আশ্রয় নেন। ১৬৬০ বা ১৬৬১ সালে আরাকান রাজের সাথে বিরোধের জেরে তিনি সপরিবারে সেখানে নির্মমভাবে নিহত হন।

Content added By
Content updated By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

আওরঙ্গজেবের সেনাপতি মীর জুমলা সুজাকে দমনের জন্য বাংলার রাজধানী জাহাঙ্গীরনগর পর্যন্ত এসেছিলেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁকে বাংলার সুবাদারের দায়িত্ব নেন। তিনি ঢাকা গেট (পূর্ব নাম মীর জুমলা) নির্মাণ করেন। কৃষকদের নিকট থেকে প্রথম কর আদায় করেন।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

পরিবিবি ছিলেন শায়েস্তা খানের কন্যা। পরিবিবির আসল নাম ইরান দুখত রহমত বানু। লালবাগ দুর্গের মাঝখানে বর্গাকার ভবনটিতে তার কবর।

Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

Promotion

Are you sure to start over?

Loading...