১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে এদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাও প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেন। যে স্বাধীনতা যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে সে আন্দোলনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অবদানও কম নয়। তারাও ছোট ছোট শহরে মাতৃভাষার অধিকারের দাবিতে সমাবেশ ও মিছিল করেছে।
১৯৫২ সালে বাঙালিদের ভাষা আন্দোলনের সময় বীরকুমার তঞ্চঙ্গা দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়া শিলক উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। এ সময় তিনি অন্যান্য ছাত্র নেতৃবৃন্দের সাথে ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। একুশে ফেব্রুয়ারি বিদ্যালয়ের ছাত্রদের সংগঠিত করে 'রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই' এই শ্লোগান দিয়ে রাস্তায় মিছিল করেন। ১৯৫২ সালে ঐতিহাসিক রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনে স্কুল কলেজে অধ্যয়নরত মণিপুরী ছাত্রছাত্রীরা ভাষার দাবিতে মিছিল ও শ্লোগানে অংশগ্রহণ করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মণিপুরী যুব-ছাত্ররা দেশ মাতৃকার স্বাধীনতার জন্য সক্রিয় অংশ নিয়েছিল।
১৯৭১- এর স্বাধীনতা যুদ্ধে এদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীরাও প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ করে। স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনেক মুক্তিযোদ্ধা দেশকে হানাদার মুক্ত করতে জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। সেসময় অধিকাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শরণার্থী হয়ে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, সম্পদ লুঠ থেকে শুরু করে নারী-শিশু-বৃদ্ধদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অবদান এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো-
মুক্তিযুদ্ধে সাঁওতাল: ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে সাঁওতালসহ উত্তরবঙ্গের অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। সাঁওতাল বিদ্রোহের চেতনায় তারা লড়েছে প্রতিটি মুক্তির সংগ্রামে। দেশকে পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাঁওতালরা রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর প্রভৃতি অঞ্চলে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মরণপণ যুদ্ধ করেছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখার জন্য বিভিন্ন খেতাবে ভূষিত হয়েছেন। সাঁওতাল নারীরাও সেদিন পুরুষের পাশাপাশি যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছে।
মুক্তিযুদ্ধে ওরাঁও: মুক্তিযুদ্ধের সূচনা লগ্ন থেকেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ওরাঁও সম্প্রদায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল ও নিয়ামতপুর এলাকায় শত শত ওরাঁও যুবক মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে। এঁদের মধ্যে নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার টুকিয়াপাড়ার কাশিনাথ টপ্প, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার মোকিম ওরাঁও, গণেশ ওরাঁও অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শহিদ হন চাঁপাইনবাবগঞ্জের বেলপুরের শ্রীচরণ ওরাঁওসহ অনেকে। অন্যদিকে ওরাঁওরা রংপুর-দিনাজপুর অঞ্চলে কখনো পৃথক কখনো বা বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে মিলেমিশে যুদ্ধ করেছে। রংপুরের বলদি পুকুর ও আশপাশের এলাকা থেকে তারা মুক্তিযোদ্ধা বুদু ওরাঁওয়ের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়ে তীর-ধনুক নিয়ে রংপুর সেনানিবাস আক্রমণ করে। যুদ্ধে অনেক ওরাঁও মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন।
মুক্তিযুদ্ধে চাকমা: পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের সাথে ছয় দফা দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলও আন্দোলিত হয়েছিল। সে সময় অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো চাকমা ছাত্র-যুব সমাজ এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসাবে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো পার্বত্য চট্টগ্রামেও দোকানপাট, রাস্তা-ঘাট অচল করে দিয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমারাও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করে। সেসময় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি চাকমা তরুণ-যুবকদেরকেও উদ্বুদ্ধ করেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য। ১৯৭০ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কোকনদাক্ষ রায়ও (রাজা ত্রিদিব রায়ের চাচা) মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে গিয়েছিলেন। এ সময় কয়েকশ চাকমাসহ অন্যান্য জাতির ছাত্র-যুবকও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ত্রিপুরা রাজ্যে গিয়েছিল। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এ চাকমাসহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর যারা ছিল, তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে রমণী রঞ্জন চাকমা রামগড় সেক্টরে পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে যুদ্ধে শহিদ হন। সিপাহি মেহরঞ্জন চাকমা বগুড়া সেক্টরে নিখোঁজ হন। তখন পূর্ব পাকিস্তান পুলিশ বাহিনীতে চাকরিরত এবং সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীর মধ্যে অন্যতম বিমলেশ্বর দেওয়ান ও ত্রিপুরা কান্ত চাকমাসহ ২০/২২ জন ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এদের মধ্যে কৃপাসুখ চাকমা ও আনন্দ বাঁশি চাকমা অন্যতম।
মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মতো ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীরও ছিল বলিষ্ঠ ভূমিকা। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষত বর্তমান খাগড়াছড়ি জেলায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে যে যুদ্ধ হয় সে যুদ্ধে কোম্পানি কমান্ডার হিসাবে নেতৃত্ব দেন হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরা। কোম্পানী কমান্ডার হেমদা রঞ্জন ত্রিপুরা এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে ১৯৭১ সালের ১৩ আগস্ট তৎকালীন মহকুমা সদর রামগড়ের পাকিস্তানি বাহিনীর সদর দপ্তরে আক্রমণ করেন। তারা আবার ১০ সেপ্টেম্বর মানিকছড়ি উপজেলায় পাকিস্তানি বাহিনীর উপর আরেকটি গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করেন। হেমদারঞ্জন ত্রিপুরা এই মানিকছড়ি এলাকায় বেশ কয়েকবার পাকিস্তানি বাহিনীর উপর অভিযান চালান এবং একজন ক্যাপ্টেনসহ ১৩ জন পাকিস্তানি হানাদার সদস্যকে হত্যা করেন। মুক্তিযুদ্ধে রঞ্জিত ত্রিপুরা, রণবিক্রম ত্রিপুরাসহ ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর আরও অনেক লোক অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও বরেন ত্রিপুরা ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থান করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধে তঞ্চঙ্গা: ১৯৭১ সালে কালামন তঞ্চঙ্গা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে বান্দরবানে শহিদ হন। বাংলাদেশে স্বাধীনতাযুদ্ধ আরম্ভ হলে, পাকিস্তানি সৈন্য ও পাকিস্তানি পাঠানদের অত্যাচারে লক্ষ লক্ষ বাঙালি দেশ ত্যাগ করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। বহু নর-নারী ভারতের পূর্বাঞ্চল মিজোরাম রাজ্যে আশ্রয় লাভের লক্ষ্যে রাজস্থলি বান্দরবান, রাইংখ্যং বনাঞ্চল অতিক্রম করে। তঞ্চঙ্গারা এসব অসহায় শরণার্থীদের খাদ্য-দ্রব্য ও আশ্রয় দেন এবং তাদের পথ প্রদর্শন করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে সহায়তা করে। উল্লেখ্য যে বান্দরবানের একজন প্রাক্তন ইউপি চেয়ারম্যান অনিল তঞ্চঙ্গা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে মারমা: কক্সবাজার জেলার মহেশখালি উপজেলার বাসিন্দা সিংহাই মাং, আবিও, মংছিয়েন ও আক্যমং প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এদের মধ্যে মংছিয়েন শহিদ হন। কক্সবাজার ও পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধ করে ৮ ডিসেম্বর শহিদ হন। তাঁকে মহেশখালি দ্বীপেই সমাহিত করা হয়। ১৯৭১ সালে তাঁর বয়স ছিল ২১ বছর।
মুক্তিযুদ্ধে মণিপুরী: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মণিপুরী জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর মণিপুরী সমাজে আওয়ামী লীগের সমর্থক কর্মী-নেতারা দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কী করণীয় সে বিষয়ে দলের উর্ধ্বতন নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলে। তাছাড়া তৎকালীন মৌলভীবাজার মহকুমার (বর্তমানে জেলা) কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, বড়লেখা, কুলাউড়া, সিলেট জেলার কোম্পানীগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, হবিগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) চুনারুঘাট প্রভৃতি মণিপুরী অধ্যুষিত এলাকায় মণিপুরীরা রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে শত্রুদের প্রতিরোধ করে এবং শরণার্থীদের নিরাপদে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে যেতে সহায়তা করে।
ভানুবিল মণিপুরী গ্রামের সরকারি চাকুরে কৃষ্ণকুমার সিংহ বিয়ানীবাজার সীমান্ত পার হয়ে ভারত গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। শ্রীমঙ্গল কলেজের বিএ ক্লাসের ছাত্র তিলকপুর গ্রামের সতীশচন্দ্র সিংহ শ্রীমঙ্গল শহরে পাকিস্তানিদের আস্তানা তৈরির পরদিনই ত্রিপুরায় পৌঁছে মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করেন। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নীলকান্ত সিংহ মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করেন এবং হাকালুকি হাওরে পাকিস্তানি সৈন্যের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে সাহসী ভূমিকা রাখেন। গিরীন্দ্র সিংহ মুক্তিবাহিনীর গাইড হিসাবে কাজ করতে গিয়ে ধরা পড়েন এবং শহিদ হন। রবীন্দ্রকুমার সিংহ, এম সি কলেজের গণিত অনার্সের ছাত্র ছিলেন। তিনিও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এরকম অনেক মণিপুরী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। শরণার্থী শিবিরে মণিপুরী গানের শিল্পীরা মুক্তিযোদ্ধাদের গান গেয়ে উদ্দীপ্ত করেছেন, এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সাধন সিংহ, অনিতা রানি প্রমুখ।
মুক্তিযুদ্ধে খাসি: মুক্তিযুদ্ধে খাসিদের অবদান নিয়ে তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। লোকমুখে জানা যায় যে, খাসিরা সীমান্ত থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের রসদ ও খবরা-খবর আদান প্রদানে সাহায্য সহযোগিতা করত। তবে ইয়নিস খাসির মতো কেউ কেউ প্রত্যক্ষভাবেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম সেরা নারী যোদ্ধাদের মধ্যে কাকন বিবি ছিলেন খাসি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। তার প্রকৃত নাম কাকেউ নিয়তা।
| অনুশীলন | |
| কাজ- ১: | ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাঁওতালরা কোথায় কোথায় যুদ্ধ করেছিল? |
| কাজ-২: | মণিপুরী শিল্পীদের মধ্যে শরণার্থী শিবিরে গান গেয়ে উদ্দীপ্ত করেছেন কে কে? |
| কাজ- ৩: | রংপুর সেনানিবাস কারা আক্রমণ করেছিল? কে নেতৃত্ব দিয়েছিল? |
Read more