মুক্তিযুদ্ধে কাকন বিবির বীরত্বপূর্ণ অবদান (পাঠ ৮)

আন্দোলন ও সংগ্রামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

283

দেখতে অনেকটা বাঙালির মতো হলেও কাকন বিবি ছিলেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। তাই যুদ্ধের সময় এক পাকিস্তানি মেজর তাঁকে দেখেই বলেছিলেন, 'ওকে-তো দেখে বাঙালি মনে হয় না, মনে হয় অন্য জাত'। প্রকৃতপক্ষে তিনি বাঙালি নন, খাসি নারী। এক খাসি পরিবারে জন্ম এই মহিয়সী নারীর। মুক্তিযুদ্ধে সিলেটের দোয়ারাবাজারের কাকেট নামে এক মহিলার অবদানের কথা জানা যায়, তিনি সেই কাকন বিবি। এলাকায় তিনি পরিচিত 'খাসি মুক্তিবেটি' হিসাবে। অর্থাৎ জাতিগত পরিচয়ের বাইরে মানুষ হিসাবে নিজেকে দাঁড় করিয়েছিলেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের এই উজ্জ্বল তাঁরার পরিচয় পেয়েছি আমরা অনেক পরে।

মাতৃসূত্রীয় খাসি পরিবারে জন্ম কাকনের। খাসি নাম কাকেউ নিয়তা। তিনি ১৯৪৮ সালে সুনামগঞ্জের সীমান্তের কাছে নওত্রই গ্রামে অবস্থাসম্পন্ন কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট কাকেউ। মাতৃগর্ভে তিনি হারান বাবাকে। আর দেড় বছর পরে মাকে হারিয়ে তাঁর আশ্রয় হয় নানীর কাছে। নানীর কাছ থেকে চলে আসেন বড় বোনের আশ্রয়ে। শৈশবে পিতা-মাতাকে হারিয়েছিলেন এবং সকলের ছোট বলেই ভাইবোনদের আদরটা তিনি বেশি পেয়েছেন। পরিবারে কোনো অভাব অনটন ছিল না। তাঁর বড় বোন কাপল নিয়তা আনসার বাহিনীতে কর্মরত এক মুসলমান কমান্ডারকে বিয়ে করেন। তিনি বড় বোনের সঙ্গেই কাতলবাড়ি থাকতে শুরু করেন। সেখানেই শৈশব এবং কৈশোরের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন। হঠাৎ করেই বড় বোনের উৎসাহে ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলিম হয়ে যান। তাঁর নতুন নাম হয় 'নুরজাহান'। এরপর আবার ফিরে আসেন সুনামগঞ্জে। বিয়ে করেন বাংলাবাজারের ছেলে শহীদউদ্দিনকে। পরপর কয়েকটি সন্তান মারা যাবার পর আরেকটি সন্তান পেটে থাকা অবস্থায় তাঁকে তালাক দেয় শহীদউদ্দিন। পরবর্তীকালে বোনের স্বামীর উদ্যোগে কাকন বিবি বোগলা ক্যাম্পের সীমান্ত রক্ষী পাকিস্তানের বাসিন্দা আব্দুল মজিদ খানকে বিয়ে করেন। এর কিছুদিন পরই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কাকন বিবির স্বামী অন্যান্য যোদ্ধাদের সঙ্গে সিলেটের আকালিয়া ক্যাম্পে চলে গেলে কাকন বিবি বোগলা ক্যাম্পে একা হয়ে পড়েন। শুরু করেন স্বামীকে খোঁজা। খুঁজতে খুঁজতে একদিন কাকন বিবি ধরা পড়েন রাজাকারদের হাতে। রাজাকাররা তাঁকে নানাভাবে শারীরিক নির্যাতন করে। পাকিস্তানি সৈন্যরা তাঁকে টেংরা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে পাকিস্তানিরা তাঁকে মুক্তিবাহিনীর চর হিসাবে সন্দেহে করে আবারও অনেক নির্যাতন চালায়। অসহ্য শারীরিক এবং মানসিক যন্ত্রণায় কাকন বিবি ভেবেছিলেন তিনি বেঁচে থাকতে পারবেন না। ক্যাম্পের মেজর বললেন, "তুমি যদি তোমার সত্যিকারের পরিচয় বল তা হলে তুমি বেঁচে যাবে। কাকন বিবি তাকে জানান যে তার স্বামী পাকিস্তানি সৈন্য। তখন পাকিস্তানিরা তাঁর কথার সত্যতা যাচাই করে এবং তাকে মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য পরিকল্পনা করে। কাকন বিবি প্রথমে ভয়ে ভয়ে রাজি হন। তারা কাকন বিবিকে একটি কাগজ দেয় এবং বলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ধরলে যেন এই কাগজ দেখায়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা ধরলে যেন কাগজের কথা না বলে। পাকিস্তান সেনাক্যাম্পে যাতায়াতের সুবাদে কাকন বিবি বাঙালি নারীদের উপর নির্যাতনের ভয়াবহতা দেখেন। তিনি মুক্তিবাহিনীর কাছে এসে সব খুলে বলেন এবং পাকিস্তানিদের সব খবর মুক্তিবাহিনীকে দেন। এভাবেই তিনি গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা শুরু করেন। তিনি পাকিস্তানিদের গোলাবারুদ লুকিয়ে বের করে এনে নিজে নৌকা চালিয়ে মুক্তিবাহিনীর কাছে পৌঁছে দিতেন। মহব্বতপুর যুদ্ধ, কান্দাগাঁয়ের যুদ্ধ, বসরাই টেংরাটিলার যুদ্ধ, বেটিরগাঁও নুরপুরের যুদ্ধ, দোয়ারাবাজারের যুদ্ধ, টেবলাইয়ের যুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেন। সুনামগঞ্জে যেদিন মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর যুদ্ধ হয় সেই যুদ্ধে কাকন বিবি সর্বক্ষণই মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্প ছিল দক্ষিণদিয়ায়। জঙ্গলের মতো জায়গা সেটি। সেই ক্যাম্পের অবস্থান জেনে মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি জড়ো করেন। তারা দুভাগে বিভক্ত হয়ে শত্রু ক্যাম্প দখল করার জন্য দুদিক থেকে আক্রমণ করেন। মুক্তিযোদ্ধারা সিলেটের বারকাফন ব্রিজটি উড়িয়ে দেওয়ার সময় কাকন বিবি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। এই ব্রিজ উড়িয়ে দেওয়া ছিল যুদ্ধ-কৌশলের একটি অন্যতম দিক। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে কাকন বিবি গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। অমানবিক অত্যাচার হয় তাঁর উপর। আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এই বীরযোদ্ধা নারীর কথা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

অনুশীলন
কাজ- ১:মুক্তিযোদ্ধা কাকন বিবির প্রকৃত নাম কী?
কাজ-২:মুক্তিযুদ্ধে নারী কাকন বিবি কী ভূমিকা রেখেছিলো?
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...