বাংলাদেশে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। এক্ষেত্রে দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অবদানও কম নয়। সরকারি কার্যক্রমে অংশগ্রহণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের উদ্যোগে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের নানা কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে।
এদেশের বনে বসবাসরত অধিবাসীদের অধিকাংশই মূলত হচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। হাওর, বাওর কিংবা অন্যান্য জলাভূমি অঞ্চলেও তাদের বসবাস রয়েছে। এসব অঞ্চলে বসবাসকারী নৃগোষ্ঠীর জীবন জীবিকার মূল অবলম্বন হলো স্থানীয় প্রাকৃতিক বন ও জলাভূমি থেকে আহরিত কাঠ, বাঁশ, মৎস্য ইত্যাদি প্রাকৃতিক সম্পদ। এসব প্রাকৃতিক ভূমি বা বনাঞ্চল থেকে তারা যেমন সম্পদ আহরণ করে, তেমনিভাবে ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য সেসব সম্পদ বা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য নানা পদ্ধতিও ব্যবহার করে।
সামাজিক মালিকানার বন কিংবা অন্যান্য বন থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো নানা প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করলেও তাদের প্রথাগত কিছু রীতিনীতি, মূল্যবোধ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আচরণ, সামাজিক বিধিনিষেধ ইত্যাদি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের কাছে বন অত্যন্ত পবিত্র। সে কারণে নির্বিচারে বন ও প্রকৃতির সবকিছু আহরণ না করে সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে সেগুলো সংগ্রহ করে। উদাহরণস্বরূপ, সুন্দরবনের আদি জনগোষ্ঠী মুন্ডা, বাওয়ালি, মাওয়ালি প্রভৃতির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাদের প্রথাগত নিয়ম হলো কাঠ সংগ্রহের সময় ঘন বন থেকে শুধু বয়স্ক গাছ কাটা যাবে, কচি বা ছোট গাছ কাটা যাবে না। কিছু কিছু গাছ একেবারেই কাটা যাবে না, কারণ সেগুলো পবিত্র এবং কাটলে মহাপাপ ও সমূহ বিপদ ঘটতে পারে বলে তারা বিশ্বাস করে। তেমনিভাবে শিকার, মধু বা মৎস্য সংগ্রহের সময়ও অনুরূপ নিয়ম মেনে চলতে হয় যেমন, মৌমাছিকে না মেরে মধু সংগ্রহ করতে হবে এবং ছোট বড় সব মাছকে নির্বিচারে আহরণ করা যাবে না। শিকারের সময় গর্ভবতী হরিণ বা অন্যান্য প্রাণী, ডিমওয়ালা মাছ, পাখি প্রভৃতি হত্যা একেবারেই নিষিদ্ধ। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলে এমন কিছু বন আছে, যেগুলোকে অত্যন্ত পবিত্র বলে গণ্য করা হয়। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ প্রভৃতি অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য নিজেদের এসব প্রথা ও রীতিনীতি যুগ যুগ ধরে পালন করে আসছে। এসব অঞ্চলের চাকমা, ত্রিপুরা, মান্দি, মণিপুরী, হাজং, বানাই, রাজবংশী, কোচ, হদি, ডালুসহ বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সমাজে এমন কিছু প্রথা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, সামাজিক বিধিনিষেধ, ঐতিহ্য, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক আচরণ ও চাষাবাদ পদ্ধতি চালু আছে যেগুলো সম্পূর্ণ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সাথে সম্পর্কিত। যেমন- অনেক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীকে তারা প্রথাগত নিয়ম মেনে সংরক্ষণ করে। কারণ সেগুলো না থাকলে গৃহনির্মাণ থেকে শুরু করে ঔষধপত্র তৈরি, কাপড়ের রং, সূতা ও আসবাবপত্র তৈরি, ধর্মীয় উপাসনা, পরিবেশের সৌন্দর্য বর্ধন, বিষাক্ত পোকামাকড়ের উপদ্রব থেকে বাড়িঘর রক্ষা, কিংবা নানা আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পূর্বপুরুষদের আশীর্বাদ ও সান্নিধ্য লাভ করা যাবে না। বন ও প্রকৃতির এসব উপকরণের সাথে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবন জীবিকা এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িত যে তারা নিজেদেরকে প্রকৃতির সাথে অবিচ্ছেদ্য মনে করে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে হলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে অবশ্যই যথাযথ গুরুত্বের সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে।
| অনুশীলন | |
| কাজ- ১: | ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি কীভাবে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে বর্ণনা করো। |
| কাজ- ২: | ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব মূল্যবোধ কীভাবে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সহায়ক? ব্যাখ্যা করো। |
Read more