সাঁওতাল বিদ্রোহ ঘটেছিল একবার নয় বারবার। ১৭৮০-১৭৮৫ সালে তিলকা মাঝির (মুরমু) নেতৃত্বে প্রথম সাঁওতাল বিদ্রোহে ইংরেজ শাসনের ভীত কেঁপে উঠেছিল। পরে আবার ১৮৫৫, ১৮৭১, ১৮৭৪, ১৮৮০-১৮৮১ এবং ১৯৩৩ সালে জিতু ও সামুর বিদ্রোহ হয়। এ সকল বিদ্রোহের মধ্যে সবচেয়ে বেশী প্রভাব বিস্তার করেছিল ১৮৫৫-৫৬ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ।
১৮৫৫ সালে সাঁওতাল বিদ্রোহ গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশ সরকার, জমিদার ও মহাজন শ্রেণির বিরুদ্ধে। সাঁওতালরা অনেক কষ্ট ও পরিশ্রম করে দামিন-ই-কো নামে যে জনপদটি গড়ে তুলেছিল (বর্তমান ভারতে), সে জনপদ একদিন আর তাদের নিজস্ব রইল না। সে জীবনে ঢুকে গিয়েছিল ইংরেজ দারোগা, দেশি মহাজন ও লোভী ব্যবসায়ী শ্রেণি। এই অর্থলোভী গোষ্ঠী সাঁওতাল পরগনা থেকে বিপুল পরিমাণ ধান, সরিষা ও বিভিন্ন প্রকারের তৈলবীজ গরুর গাড়ি বোঝাই করে নিয়ে প্রথমে মুর্শিদাবাদ ও পরে কলকাতায় চালান দিতো। সেখান থেকে এ দ্রব্য সামগ্রী ইংল্যান্ডে রফতানি করা হতো। এ দ্রব্য সামগ্রীর জন্য ব্যবসায়ীগণ সাঁওতালদের সামান্য পরিমাণ অর্থ, লবণ, তামাক অথবা কাপড়-চোপড় দিত। এভাবে মহাজন ও ব্যবসায়ী শ্রেণির শোষণ ক্রমান্বয়ে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। সাঁওতালদের অভাবের সময়ে কিছু অর্থ বা দ্রব্য সামগ্রী প্রদান করেই মহাজন শ্রেণি সাঁওতালদের সারা জীবনের জন্য দাস হিসাবে কিনে নিত। মহাজনেরা সাঁওতালদের মধ্যে ঋণের কারবার চালু করেছিল। এ ঋণের সুদের কোনো নির্দিষ্ট হার ছিল না। একজন সাঁওতালকে তার ঋণের জন্য তার জমির ফসল, হালের বলদ, এমনকি নিজেকে এবং তার পরিবারকেও হারাতে হতো। আর সেই ঋণের দশগুণ পরিশোধ করলেও তার ঋণের বোঝা পূর্বে যা ছিল পরেও তাই থাকত। সহজ-সরল সাঁওতালগণ এসব বহিরাগত লোভী মানুষকে বিশ্বাস করে প্রতারিত হতো। তাছাড়া মহাজনদের দেওয়া ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ করার সামর্থ্যও অধিকাংশ সাঁওতালদের ছিল না। এর ফলে ঋণ গ্রহণের পরদিনই অনেক সাঁওতালকে সপরিবারে মহাজনের বাড়িতে দাসত্ব করতে যেতে হতো। তাদের এ জীবনে ঋণ আর কোনোদিনই শোধ হতো না। মৃত্যুর সময় তারা তাদের বংশধরদের জন্য রেখে যেত বিশাল ঋণের বোঝা। এই অন্যায় অত্যাচার ও নিপীড়ন থেকে মুক্তির জন্য একদিন সাঁওতালরা মহাজনদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে।
১৮৫৫ সালের ৩০শে জুন সাঁওতাল পরগনার ভগনাডিহি গ্রামে সাঁওতালরা সমাবেশ করে স্বাধীন সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠার শপথ নেয়। এই সমাবেশের নেতৃত্ব দিয়েছিল দুই সাঁওতাল সহোদর সিধু ও কানু। তারা সেদিন দাবি আদায়ের জন্য কলকাতা অভিমুখে পদযাত্রা করেছিল। ক্রমে ক্রমে কানু ও সিধু দুই ভাই সাঁওতাল জাতির মুক্তিদাতা রূপে আর্বিভূত হলেন। তারা গ্রামে জানিয়ে দিলেন তাদের বিদ্রোহের কথা, ভগবানের নির্দেশের কথা। তীর-ধনুক নিয়ে এই প্রতিবাদ পদযাত্রায় সেদিন হাজির হয় ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার সাঁওতাল। এরপর সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের যুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে গোটা সাঁওতাল এলাকায়। সাঁওতালরা ক্ষুদ্ধ হয়ে খুন করে বাঙালি মহাজন, দারোগাসহ সুদখোর ব্যবসায়ীদের। ব্রিটিশ সরকার তখন এই বিদ্রোহ দমন করতে তার সকল অস্ত্র গোলাবারুদ ও সৈন্য নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এসময় মুর্শিদাবাদ থেকে ৫০০ অশ্বারোহী, ৪০টি হাতি ও ২টি কামান পাঠানো হয়। প্রথম দিকে যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনী পরাজিত হয়ে পিছু হটে। তখন সাঁওতাল অধ্যুষিত বিস্তৃর্ণ এলাকায় সাঁওতালদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে বর্ষাকাল চলে গেলে নতুন গোলা-বারুদ ও শক্তি নিয়ে আবার আক্রমণ চালায়। সাঁওতালরা পাহাড়ে আর সরকারি সৈন্যরা সমতলে। চতুর ইংরেজ বাহিনী বুঝতে পারে পাহাড়ে কামান-বন্দুক কাজে আসবে না তাই তারা বিদ্রোহীদের সমতলে নামিয়ে আনার ফাঁদ পাতে আর সে ফাঁদে ধরা দিয়ে সাঁওতালরা নিচে নেমে এলে চারদিক থেকে একযোগে আক্রমণ চালায়। দেবতার আশীর্বাদে বন্দুকের গুলি গায়ে লাগবে না এই বিশ্বাসে সাঁওতালরা এগিয়ে এসে মারা পড়তে থাকে। শেষে যুদ্ধে সাঁওতালরা পরাজিত হয়। প্রায় বিশ হাজার সাঁওতাল মৃত্যুবরণ করে। আহত ও বন্দি হয় সাঁওতাল নেতা সিধু ও কানু। মূলত ইংরেজ সৈন্যদের রণকৌশল এবং বন্দুক-কামানের কাছে পরাজিত হয় সাঁওতালরা। এভাবেই সাঁওতালদের স্বাধীনতার স্বপ্নের মৃত্যু ঘটে।
| অনুশীলন | |
| কাজ-১: | কোন সময় প্রথম সাঁওতাল বিদ্রোহ ঘটেছিল? কে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন? |
| কাজ- ২: | ১৮৫৫ সালের ৩০শে জুন সাঁওতালরা কেন বিদ্রোহ করেছিল? এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে কারা ছিলেন? |
Read more