সামাজিক বিচার ব্যবস্থা (পাঠ ৮)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রাজনৈতিক জীবন - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

374

ন্যায়বিচার ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার দিক থেকে দেশের সাধারণ বিচার-ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত সামাজিক বিচার-ব্যবস্থার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য হয়তো নেই। তবে বিচার প্রক্রিয়া এবং বিচারের বিষয় ও পরিধির ক্ষেত্রে অনেক পার্থক্য রয়ে গেছে। দেশের সাধারণ দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিচার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের মাধ্যমে অনুমোদিত ও প্রবর্তিত আইনের দ্বারা সম্পন্ন হয়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের সমাজে প্রচলিত সামাজিক বিচার-আচার সম্পন্ন হয় যুগ যুগ ধরে চলে আসা এবং তাদের পূর্ব পুরুষদের কাছ থেকে বংশ পরম্পরায় প্রাপ্ত রীতি-নীতি, বিশ্বাস, মূল্যবোধ এবং অবশ্য পালনীয় নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধানের ভিত্তিতে। সাধারণ বিচার-ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য রয়েছে দেশের আইন-আদালত, প্রশাসন বা সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। আর প্রথাগত আইনে সামাজিক বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা করে থাকেন সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সমাজের বিভিন্ন স্তরে নির্ধারিত নৈতিক ও সামাজিক কর্তৃপক্ষ। যাদের দায়িত্ব হলো সমাজের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের জন্য ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা। এই পর্বে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের কিছু কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থা-সম্পর্কে আলোচনা করবো।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের নিজ নিজ প্রথাগত আইন থাকলেও সেসব আইনে কীভাবে সামাজিক বিচার-ব্যবস্থা পরিচালিত হবে তা পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশন (শাসনবিধি) ১৯০০ দ্বারা নির্ধারিত আছে। এই শাসনবিধির আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন সার্কেল প্রধান বা রাজা এবং তাঁদের নিচের স্তরে হেডম্যান ও কারবারিরা বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর নিজ নিজ প্রথাগত আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সামাজিক ন্যায়-বিচার ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করে থাকেন। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিচার-ব্যবস্থা তিনটি স্তরে বিভক্ত। যেমন কারবারির আদালত, হেডম্যানের আদালত এবং সার্কেল প্রধান বা রাজার আদালত। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রচলিত প্রথাগত শাসন-কাঠামো দেখানো হলো:

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত শাসন কাঠামো

পদবিপ্রশাসনিক এলাকা

রাজা বা রানি

হেডম্যান

কারবারি

চাকমা, বোমাং এবং মং সার্কেলের তিনজন সার্কেল প্রধান।

মৌজা প্রধান। বর্তমানে মোট ৩৯০ টি মৌজা রয়েছে।

পাড়া বা গ্রামের প্রধান।

চিত্র ৩.১: পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত শাসন কাঠামো

সামাজিক বিচার ব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তরটি হলো কারবারির আদালত। কারবারি পাড়া বা গ্রামের প্রধান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনি গোষ্ঠীপতিও। সমাজের সদস্যদের বিভিন্ন প্রকার দ্বন্দ্ব, বিরোধ, সামাজিক সমস্যা ও অপরাধ প্রথাগত আইন অনুসারে তিনি নিষ্পত্তি করে থাকেন। তাঁর রায়ে সন্তুষ্ট হতে না পারলে সংক্ষুব্ধ পক্ষ হেডম্যানের আদালতে আপিল করতে পারে। হেডম্যান হলেন মৌজার প্রধান। কয়েকটি পাড়া বা গ্রাম নিয়ে এক একটি মৌজা গঠিত হয়। হেডম্যান তার মৌজার অধিবাসীদের দ্বারা উপস্থাপিত বিরোধের সকল বিষয়ের উপর সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। তাঁর রায়ে অসন্তুষ্ট পক্ষ ন্যায়বিচার প্রাপ্তির জন্য রাজার আদালতে আপীল করতে পারে।

হেডম্যান এবং রাজা দোষী ব্যক্তিকে অর্থদণ্ড কিংবা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আটক রাখার নির্দেশ দিতে পারেন। তাঁরা অন্যায়ভাবে সংগৃহীত মালামাল বা সম্পদ ফেরত প্রদানে দোষী ব্যক্তিকে বাধ্য করতে পারেন।

অনুশীলন
কাজ- ১:দেশের সাধারণ বিচার-ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রথাগত সামাজিক বিচার-ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করো।
কাজ- ২:পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি-১৯০০ অনুযায়ী হেডম্যান এবং কারবারীর কী কী দায়িত্ব ও ক্ষমতা রয়েছে?
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...