ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হাজংদের রয়েছে গৌরবময় ও বীরত্বপূর্ণ আন্দোলনের ইতিহাস। বিভিন্ন সময় তারা নিজেদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার ও জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে এদেশের হাজংদের ভূমিকা ছিল খুবই উজ্জ্বল। রাজা বিদ্রোহ, হাতিখেদা আন্দোলন, কৃষক-বিদ্রোহ, টংক-আন্দোলন এমনকি দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও হাজংদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং অবদান উল্লেখযোগ্য।
হাতিখেদা আন্দোলন: হাজং সম্প্রদায় সরল জ্ঞানে জমিদারদের একসময় দেবতুল্য ভাগ্যবিধাতা রূপে বিবেচনা করত। জমিদারদের সকল কাজেই তারা সহযোগিতা করত। এ সুযোগে জমিদাররা হাজংদের বেগার খাটিয়ে বড় অংকের অর্থ আয়ের পথ সৃষ্টি করে নিত। জমিদারের নির্দেশে হাতি ধরার মতো কঠিন কাজ করার শর্তে কিছু জমি তারা লাভ করত। জীবন বাজি রেখে হাতি ধরার মতো কঠিন কাজ করে যথাযথ পারিশ্রমিক না পাওয়ায় তারা এক সময়ে এ কাজে অস্বীকৃতি জানায়। এক পর্যায়ে এভাবেই ১৮৭৩ সালে হাজংরা এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠে।
ক্রমে তারা হাতি ধরার কাজে অস্বীকৃতি জানিয়ে অন্য কাজে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠলে জমিদাররা ক্ষিপ্ত হয়ে হাজংদের উপর অত্যাচার ও নিপীড়ন চালায়। পরবর্তীকালে ১৮৯৩ সালে মনা সর্দার নামে একজন হাজং নেতার নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করা হয়। তারা আর হাতি ধরার কাজে অংশ নেবে না বলে ঘোষণা দেয়। অপরদিকে জমিদারদের অত্যাচারে পূর্ব থেকেই বিক্ষুব্ধ মান্দি চাষিরাও হাজংদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। মান্দি ও হাজংদের সম্মিলিত বিদ্রোহ যখন তীব্র হয়ে উঠতে শুরু করে, তখনই জমিদাররা হাজং নেতা মনা সর্দারকে হাতির পায়ের তলায় পিষে নির্মমভাবে হত্যা করে।
টংক আন্দোলন: টংক আন্দোলন প্রকৃতপক্ষে কৃষক আন্দোলন। ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত ছিল এ আন্দোলনের ব্যাপ্তি। টংক মানে 'ধান কড়ারি খাজনা'। টংক প্রথার শর্তানুসারে জমিতে ফসল হোক বা না হোক চুক্তি অনুযায়ী টংকের ধান জমির মালিককে দিতেই হতো। ফলে কোনো বছর যদি জমিতে ফসল না হয় বা কিংবা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল নষ্ট হয়ে যায়, তবুও কৃষককে তার নির্ধারিত খাজনা পরিশোধ করতে হতো। এতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হাজংসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য সম্প্রদায়ের প্রান্তিক কৃষক সমাজ অর্থনৈতিক দূরবস্থায় পড়ে যেত। কোনো কারণে টংকের ধান পরিশোধ করতে না পারলেই কৃষকদের উপর নেমে আসতো অত্যাচার ও নিপীড়ন।
কৃষকরা ধানের হিসাবে তাদের জমির খাজনা শোধ করত। চুক্তি অনুযায়ী ১.২৫ (সোয়া) একর জমির জন্য ১০ থেকে ১৫ মন ধান দিতে হতো যা টাকার হিসাবে দ্বিগুণেরও বেশি। এ চুক্তি গারো পাহাড় অঞ্চলে টংক প্রথা নামে পরিচিত। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার উত্তর কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ি, শ্রীবর্দী থানায় এই প্রথা প্রচলিত ছিল। বিশেষ করে সুসং জমিদারি এলাকায় এর প্রচলন ছিল ব্যাপক। অথচ ঐ সময়ে জমির খাজনা ছিল সোয়া একরে পাঁচ থেকে সাত টাকা। আর ঐ ধানের দাম ছিল প্রতি মণ সোয়া দুই টাকা মাত্র। ফলে প্রতিসোয়া একরে বাড়তি খাজনা দিতে হতো পনেরো টাকা থেকে প্রায় বিশ টাকা। এই প্রথায় শুধু জমিদারই লাভবান হতো তা নয়, মধ্যবিত্ত ও মহাজনরাও লাভবান হতো।
টংক প্রথা কৃষকদের জন্য ছিল অভিশাপ। হাজংরা এই অভিশপ্ত প্রথার হাত থেকে মুক্তি পেতে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে। প্রথমে টংকের কুফল বিষয়ে গ্রামে গ্রামে বৈঠক করা হয়। পরে ঐক্যমত সৃষ্টি হলে কৃষকরা জমিদারদের টংক ধান দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এতে টংক চাষিদের ভাগ্যে অনেক দুর্ভোগ নেমে আসে। কেননা জমিদারগোষ্ঠী টংক ধান আদায়ের জন্য যথাসাধ্য শক্তি প্রয়োগ করতে থাকে। মূলত হাজং কৃষকরাই টংক উচ্ছেদের জন্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রথমে তাদের আন্দোলন করতে হয় জমিদারগোষ্ঠীর সাথে। পরে ব্রিটিশ সরকারের সাথে এবং শেষে পাকিস্তান সরকারের সাথেও এ নিয়ে সংঘর্ষ হয়। হাজংদের এ টংক ও জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন কমরেড মণি সিংহ।
টংকের অত্যাচারের যন্ত্রণা এবং মুক্তির বাসনা শুধু হাজং নয়, মুসলমানসহ সকল শ্রেণির লোকদের মধ্যে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছিল। এর হাত থেকে রক্ষার উপায় তারা খুঁজে পাচ্ছিল না। কিন্তু আন্দোলন যখন শুরু হয়েছিল তখন হাজং কৃষকরাই প্রধান ভূমিকা পালন করে। এজন্য টংক আন্দোলন হাজং আন্দোলনে পরিণত হয় এবং অত্যাচার-নির্যাতন-নিপীড়ন সব হাজংদের উপরই নেমে আসে।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরুর ঠিক আগে টংক আন্দোলন প্রথম দানা বাঁধতে শুরু করে দশাল গ্রামে। পরে সেই আন্দোলনের প্রবাহ কিছু কালের মধ্যেই তড়িৎ গতিতে হাজং অঞ্চলগুলোতে বিস্তার লাভ করে। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ারও পরিবর্তন ঘটে। প্রথম দিকে কমরেড মণি সিংহ একাই কৃষকদের মাঝে কাজ করতে থাকেন। পরে আরও কয়েকজন কর্মী এসে যোগ দেন। যেমন-ভূপেন ভট্টাচার্য, প্রমথ গুপ্ত, জলধর পাল প্রমুখ। তাছাড়া রবি নিয়োগী, পুলিন বকসী, আলতাব আলী বিভিন্ন সময়ে তাকে কাজে সহযোগিতা করেন।
এ সময় হাজং কৃষকদের মধ্যে সচেতন ও সক্রিয় সংগঠন গড়ে উঠে। ১৯৩৯ সালে কিশোরগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয় কৃষক সম্মেলন। মণি সিংহ-এর নেতৃত্বে কয়েক শত হাজং কৃষক যোগদান করে এই সম্মেলনে। পরে সুসং দুর্গাপুর হাইস্কুল মাঠে টংক প্রথা উচ্ছেদের জন্য পুনরায় আন্দোলনের প্রস্তুতি সভা করার পরেই সরকারের কড়া নজর তাদের উপর পড়ে। ১৯৪৬ সালের ১ জানুয়ারি দুর্গাপুরের বিরিশিরিতে একজন ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার রাইফেলস্ বাহিনীর সশস্ত্র ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এ সশস্ত্র বাহিনী বিভিন্ন গ্রামে হানা দিয়ে বিদ্রোহী হাজং কৃষকসহ অন্যান্য কৃষককে খুঁজতে শুরু করে। পুলিশ বহেরাতলী গ্রামে তল্লাশি চালায়। অবশেষে এ গ্রামে কাউকে না পেয়ে ক্ষিপ্ত পুলিশ বাহিনী লংকেশ্বর হাজং-এর সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী কুমুদিনী হাজংকে ধরে নিয়ে বিরিশিরি ক্যাম্পের দিকে রওয়ানা হয়। হাজং গ্রামগুলোতে সংবাদটি ছড়িয়ে পড়লে শতাধিক হাজং নারী-পুরুষ সশস্ত্র বাহিনীর পথরোধ করে। এ সময় বিপ্লবী রাশিমণি হাজং তাঁর দলবলসহ কুমুদিনী হাজংকে বাঁচাতে পুলিশ বাহিনীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুলিশ বাহিনীও নৃশংসভাবে গুলি চালায়। ফলে এক সময় রাশিমণি হাজং গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ক্ষিপ্ত হাজং পুরুষদের বল্লমের আঘাতে ঘটনাস্থলেই ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ার বাহিনীর দুজন পুলিশ নিহত হয়। অন্যরা কুমুদিনী হাজংকে ছেড়ে দৌড়ে পালিয়ে আত্মরক্ষা করে। একজন নারী হয়ে অন্য একজন নারীকে বাঁচাতে গিয়ে জীবন দিয়ে রাশিমণি হাজং হাজংদের আন্দোলনের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
Read more