সম্রাট আকবর পুরো বাংলার উপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি। বাংলার শক্তিশালী জমিদারগণ মুঘলদের বশ্যতা স্বীকার করেনি। স্বাধীনতা রক্ষার্থে তারা একজোট হয়ে মুঘল সেনাপতির বিরুদ্ধে লড়াই করতেন। বাংলার ইতিহাসে ভাটি অঞ্চলের এ জমিদারগণ বারো ভূঁইয়া নামে পরিচিত।
বাংলার ইতিহাসে 'বারো ভূঁইয়া' বলতে কোনো নির্দিষ্ট ১২ জন ব্যক্তিকে বোঝায় না, বরং ১৬শ শতাব্দীতে মোগল সম্রাট আকবরের সময় থেকে জাহাঙ্গীরের আমল পর্যন্ত বাংলার যে সকল শক্তিশালী জমিদার মোগলদের অধীনতা অস্বীকার করে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতেন, তাঁদের সমষ্টিগতভাবে 'বারো ভূঁইয়া' বলা হয়।
১. বারো ভূঁইয়া কারা?
ভূঁইয়া শব্দের অর্থ: 'ভূমি' বা জমির মালিক।
সময়কাল: ১৫৭৬ সালে মোগলরা বাংলা জয় করলেও (রাজমহলের যুদ্ধ) তারা বাংলার কেন্দ্রস্থলে আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। ১৫৭৬ থেকে ১৬১০ সাল পর্যন্ত এই জমিদাররা মোগলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
সংখ্যা: ইতিহাসে 'বারো' সংখ্যাটি একটি অনির্দিষ্ট সংখ্যা বা গোষ্ঠী বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। আসলে তাঁদের সংখ্যা ১২-এর চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
২. বারো ভূঁইয়াদের নেতা: ঈসা খাঁ
বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ছিলেন ঈসা খাঁ।
রাজধানী: তাঁর রাজধানী ছিল সোনারগাঁও।
উপাধি: তিনি 'মসনদ-ই-আলা' উপাধি ধারণ করেছিলেন।
মোগলদের সাথে সংঘর্ষ: ১৫৯৭ সালে মোগল সেনাপতি মানসিংহকে তিনি এগারোসিন্দুর নামক স্থানে পরাজিত করেছিলেন।
অঞ্চল: তাঁর জমিদারির কেন্দ্র ছিল বর্তমান কিশোরগঞ্জ ও সোনারগাঁও অঞ্চল।
৩. মুসা খাঁ ও বারো ভূঁইয়াদের পতন
ঈসা খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মুসা খাঁ বারো ভূঁইয়াদের নেতৃত্ব দেন।
পতন: মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের সুবাদার ইসলাম খাঁ ১৬১০ সালে এক বিশাল নৌবাহিনী নিয়ে মুসা খাঁকে পরাজিত করেন।
ফলাফল: মুসা খাঁর পরাজয়ের মাধ্যমেই বাংলায় বারো ভূঁইয়াদের প্রতিরোধের সমাপ্তি ঘটে এবং সমগ্র বাংলা মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে।
৪. উল্লেখযোগ্য কয়েকজন বারো ভূঁইয়া ও তাঁদের অঞ্চল
| নাম | শাসন এলাকা (অঞ্চল) |
|---|---|
| ঈসা খাঁ ও মুসা খাঁ | সোনারগাঁও ও ভাটি অঞ্চল (কিশোরগঞ্জ)। |
| প্রতাপাদিত্য | যশোর ও খুলনা। |
| চাঁদ রায় ও কেদার রায় | শ্রীপুর (বিক্রমপুর)। |
| লক্ষ্মণ মাণিক্য | ভুলুয়া (নোয়াখালী)। |
| কন্দর্প রায় ও রামচন্দ্র রায় | বাকলা (বরিশাল)। |
| উসমান খাঁ | শ্রীহট্ট (সিলেট)। |
কয়েকজন শাসক
- ঈসা খান সোনারগাঁও অঞ্চল শাসন করেন।
- কেদার রায় বিক্রমপুর শাসন করেন।
- কিঙ্কর সেন পিরোজপুর শাসন করেন।
- ওসমান খা উড়িষ্যা শাসন করেন।
- প্রতিপাদিত্য যশোর অঞ্চল শাসন করেন।
- ফজল গাজী গাজীপুর শাসন করে।
- কন্দর্প রায় বরিশাল শাসন করে।
- পীতাম্বর পুঠিয়া শাসন করে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বাংলার বারো ভুঁইঞাদের একজন
রাজপুত রাজা
বাংলার শাসক
মোগল সেনাপতি
বারো ভূঁইয়াদের নেতা ছিলেন ঈসা খান। তিনি বাংলার ধানী হিসেবে সোনারগাও এর গোড়া পত্তন করেন। সম্রাট আকবরের সেনাপতিরা বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঈসা খাঁকে পরাজিত করতে ব্যর্থ হন। ঈসা খাঁর মৃত্যুর পর বারো ভূঁইয়াদের নেতা হন ঈসার পুত্র মুসা খান। তার আমলেই বাংলার বারো ভূঁইয়াদের চূড়ান্তভাবে দমন করা হয়। সুবেদার ইসলাম খান বারো ভূঁইয়ানের নেতা মুসা খানদের পরাস্ত করেন। এগারসিন্ধুর গ্রাম (কিশোরগঞ্জ) ইসা খানের নাম বিজড়িত মধ্যযুগীয় একটি দূর্গ।
বাংলার বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং বীরত্বগাথার প্রধান নায়ক ছিলেন ঈসা খাঁ। তিনি মোগল সাম্রাজ্যের প্রবল প্রতাপের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করেছিলেন।
১. পরিচয় ও উত্থান
জন্ম: ১৫২৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে। তাঁর পিতা সুলাইমান খাঁ ছিলেন একজন আফগান মুসলিম।
অঞ্চল: তাঁর জমিদারির প্রধান কেন্দ্র ছিল সোনারগাঁও এবং ভাটি অঞ্চল (কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সংলগ্ন এলাকা)।
উপাধি: তিনি 'মসনদ-ই-আলা' উপাধি ধারণ করেছিলেন।
নেতৃত্ব: তিনি বাংলার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন জমিদারদের (বারো ভূঁইয়া) ঐক্যবদ্ধ করেন এবং মোগল আক্রমণের বিরুদ্ধে এক বিশাল গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন।
২. মোগলদের সাথে সংঘর্ষ ও বীরত্ব
সম্রাট আকবর যখন রাজমহলের যুদ্ধের (১৫৭৬) মাধ্যমে বাংলা জয় করতে চান, তখন ঈসা খাঁ তাঁর পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ান।
মানসিংহের সাথে দ্বৈরথ (১৫৯৭): আকবরের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি মানসিংহ এক বিশাল নৌবাহিনী নিয়ে ঈসা খাঁকে আক্রমণ করেন। কিশোরগঞ্জের এগারোসিন্দুর নামক স্থানে যমুনা নদীর তীরে তাঁদের মধ্যে এক ঐতিহাসিক দ্বন্দ্বযুদ্ধ হয়।
মহানুভবতা: লোকগাথা অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় মানসিংহের তলোয়ার ভেঙে গেলে ঈসা খাঁ তাঁকে আক্রমণ না করে নিজের তলোয়ার দিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর এই মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে মানসিংহ তাঁকে 'বাংলার প্রকৃত রাজা' হিসেবে সম্মান জানিয়েছিলেন এবং সম্রাট আকবরের সাথে একটি সাময়িক সমঝোতা করে দেন।
৩. রাজধানী ও স্থাপত্য
সোনারগাঁও: ঈসা খাঁর রাজধানী ছিল ঐতিহাসিক সোনারগাঁও। এটি তখন মসলিন কাপড় এবং সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র ছিল।
জঙ্গলবাড়ি দুর্গ: কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে তাঁর দ্বিতীয় রাজধানী বা অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল এই জঙ্গলবাড়ি দুর্গ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
Read more