আম্রপালির জন্ম হয়েছিল বৈশালীর রাজোদ্যানের একটি বড় আম গাছের নিচে। উদ্যান রক্ষক তাঁকে লালন পালন করেন। আম গাছের তলায় জন্ম বলে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল আম্রপালি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আম্রপালি অপূর্ব সুন্দরী হয়ে ওঠে। তাঁর রূপ সৌন্দর্যে আশ-পাশের রাজ্যের রাজপুত্রগণ মুগ্ধ ছিলেন। সকল রাজপুত্র যেভাবেই হোক তাঁকে বিয়ে করার সংকল্প করেন। কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না। তাঁকে বিয়ে করা রাজপুত্রদের মধ্যে মর্যাদার বিষয় হয়ে দেখা দিল। ফলে রাজপুত্রদের মধ্যে কলহের সূত্রপাত হলো। ক্রমে এই কলহ যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করল। অবশেষে কলহের অবসান ঘটানোর জন্য আম্রপালি কাউকেও বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি রাজনর্তকির জীবন বেছে নিলেন। ফলে সকল রাজপুত্রের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক সৃষ্টি হলো।
আম্রপালি ক্রমে রাজ-রাজাদের কাছ থেকে অনেক অর্থ-বিত্ত ও ভূ-সম্পত্তি লাভ করলেন। মধ্য বয়সে একদিন বুদ্ধের ধর্মদেশনা শুনে তিনি অনিত্যতা উপলব্ধি করলেন। বুঝতে পারলেন দেহ, রূপ, যৌবন সবই নশ্বর এবং ক্ষণস্থায়ী। অতঃপর ধর্মদেশনা শোনার জন্য সশিষ্য বুদ্ধকে তিনি নিমন্ত্রণ করলেন। বুদ্ধ নিমন্ত্রণ গ্রহণ করে আম্রপালির গৃহে উপস্থিত হন। আম্রপালি বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যদের শ্রদ্ধাসহকারে খাদ্যদ্রব্য দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। বুদ্ধ আম্রপালির মধ্যে বিমুক্তির লক্ষণ দেখে তাঁকে ধর্মদেশনা করেন। বুদ্ধের ধর্ম শ্রবণ করে আম্রপালি নিজের উদ্যানে বিহার নির্মাণ করে বুদ্ধ ও বুদ্ধশিষ্যদের দান করেন। এ সময় তিনি বুদ্ধের ধর্মনীতি অনুশীলনে ব্রতী হয়ে ভিক্ষুণী ধর্মে দীক্ষিত হন। দীক্ষিত হয়ে তিনি ধ্যান-সাধনায় মনোনিবেশ করেন। অনিত্যতাকে ধ্যানের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে তিনি ধ্যান সমাধির অনুশীলন শুরু করেন। ক্রমে তিনি অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেন। ফলে তিনি অতীত জীবনের ঘটনাবলি দেখতে পেতেন।
অর্ন্তদৃষ্টি লাভ করে একদিন তিনি নিজের অতীত জীবনের ঘটনা অবলোকন করছিলেন। তিনি দেখলেন যে, জন্ম-জন্মান্তরে বিভিন্ন ভালো কাজের মাধ্যমে সঞ্চিত পুণ্যরাশির ফলে তিনি শিখী বুদ্ধের সময় জন্মগ্রহণ করে ভিক্ষুণী সংঘে প্রবেশ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তখন একদিন অন্যান্য ভিক্ষুণীদের সাথে তিনি চৈত্য পূজায় যোগদান করেন। পূজা শেষে চৈত্য প্রদক্ষিণের সময় তাঁর সামনে ছিলেন একজন বয়োজ্যেষ্ঠ অর্হৎ ভিক্ষুণী। সেই ভিক্ষুণী হঠাৎ চৈত্যের অঙ্গনে থুথু ফেলেন। এটি দেখে আম্রপালি বয়োজ্যেষ্ঠ ভিক্ষুণীকে লক্ষ করে কটূক্তি করেন। এই কটূক্তি জনিত পাপের ফলে গৌতম বুদ্ধের সময় তাঁকে ঘরের বাইরে গাছের নিচে জন্মগ্রহণ করতে হয়েছে এবং তিনি সংসার জীবনযাপন করতে পারেন নি।
তিনি সর্ব বস্তুর অনিত্যতাকে ধ্যানের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে ধ্যানে রত হন। অর্হত্ব ফল লাভ করে তিনি জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খল ছিন্ন করেন এবং সকল প্রকার দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করেন। মুক্তির নির্মল আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে তিনি অনেকগুলো গাথা ভাষণ করেন। নিচে তাঁর ভাষিত গাথার সারমর্ম তুলে ধরা হলো:
'একসময় আমার এই দেহ অপূর্ব সুন্দর ও লাবণ্যময় ছিল। জরাগ্রস্ত হয়ে তা এখন প্রলেপ খসে পড়া ঘরের মতো জীর্ণ হয়ে পড়েছে। মূলত এ দেহ দুঃখের আলয়।'
আম্রপালির জীবন পাঠে আমরা দেখতে পাই, কর্মের প্রায়শ্চিত্ত সকলকেই ভোগ করতে হয়। কর্মের ফল ভোগ থেকে কেউ রেহাই পায় না। ভালো কাজের সুফল যেমন আছে তেমনি খারাপ কাজের শাস্তিও রয়েছে। তাই মানুষকে সব সময় ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কাউকে কটু কথা বলা উচিত নয়। কর্মের পরিণাম চিন্তা করে সকলের অকুশল কর্ম হতে বিরত থাকা উচিত।
অনুশীলনমূলক কাজ |
Read more