দৈনন্দিন জীবনে নৈতিকতা অনুশীলন (পাঠ ৩)

গৌতম বুদ্ধের নৈতিক শিক্ষা - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

218

মানুষ প্রতিদিন নানা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। জগতে ভালো কাজ যেমন আছে, তেমনি মন্দ কাজও আছে। ভালো কাজ মঙ্গলজনক এবং প্রশংসনীয়। ভালো কাজ শান্তি প্রতিষ্ঠা করে, অপরের মঙ্গল সাধন করে। অপরদিকে মন্দ কাজ ক্ষতিকর এবং নিন্দনীয়। মন্দ কাজ অশান্তি সৃষ্টি করে, অপরকে কষ্ট দেয়। তাই ভালো কাজগুলো নৈতিক এবং মন্দ কাজগুলো অনৈতিক কাজ হিসেবে অভিহিত। সত্যভাষণ, পরোপকার, সেবা, দান, মৈত্রীভাব পোষণ, সৎ বাণিজ্য প্রভৃতি নৈতিক কাজ। যাঁরা নৈতিক কাজ করেন তাঁদের নীতিবান বলা হয়। অপরদিকে হত্যা, অদত্ত বস্তু গ্রহণ, ব্যভিচার, মাদকদ্রব্য সেবন, মিথ্যা ও কর্কশ বাক্য ভাষণ, প্রতারণা, ক্ষতিকর ও নিষিদ্ধ দ্রব্য বাণিজ্য প্রভৃতি অনৈতিক কাজ। যারা অনৈতিক কাজ করে তাদের নীতিহীন বলা হয়।

দেশের আইনে এবং ধর্মীয় বিধি-বিধানে মন্দ কাজ পরিত্যাগ এবং ভালো কাজ সম্পাদন করার নির্দেশনা আছে। দেশের আইনে মন্দ কাজের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। যেমন: চুরি একটি মন্দ কাজ ও সামাজিক অপরাধ। দেশের আইনে চুরি করলে কারদণ্ড ও অর্থ দন্ড ভোগ করতে হয়। ধর্মগ্রন্থ মতে, মন্দ কাজ করলে মানুষকে নরক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়। মন্দ কাজ ও মন্দ ব্যক্তিকে সবাই ঘৃণা করে। মন্দ ব্যক্তি সর্বত্র নিন্দিত হয়। কিন্তু মানুষ লোভ-দ্বেষ-মোহ বশত এবং নিজের লাভ ও সুবিধার জন্য মন্দ কাজ করে। মন্দ ব্যক্তি সমাজে নানারকম বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি করে। মন্দ ব্যক্তি বিবেকহীন। বিবেকহীন ও নীতিহীন মানুষ পশুর সমান। নৈতিকতা হচ্ছে ভালো ও মন্দ কাজের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের মানদণ্ড। নৈতিকতার অভাবের কারণেই মানুষ মন্দ কাজ করে। মন্দ কাজ পরিত্যাজ্য। তথাগত বুদ্ধ নৈতিকতা অনুশীলনে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। তাই তিনি সকল প্রকার পাপকর্ম হতে বিরত থেকে কুশলকর্ম সম্পাদন এবং নিজ চিত্ত বিশুদ্ধ করার উপদেশ দিয়েছেন।

নীতিবান মানুষ মন্দ কাজ পরিত্যাগ করে ভালো কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে দৈনন্দিন জীবনে নৈতিকতা অনুশীলন করা একান্ত প্রয়োজন। দৈনন্দিন বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে আমরা নৈতিকতা চর্চা করতে পারি। যেমন: মাতা-পিতা, শিক্ষক এবং গুরুজনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, তাঁদের আদেশ-উপদেশ মেনে চলা, অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা, সত্যভাষণ করা, নিজের কাজ নিজে করা, পরদ্রব্য না বলে বা না দিলে গ্রহণ না করা, পর দ্রব্যের প্রতি লোভ না করা, মাদকদ্রব্য সেবন না করা, সহপাঠীদের সঙ্গে সদাচরণ করা, বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা, অভাবগ্রস্তকে দান করা, আর্তপীড়িতের সেবা করা, পরোপকার করা, প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচরণ করা ও সদ্ভাব বজায় রাখা, অপরকে কষ্ট না দেওয়া, অপরের ক্ষতি হয় এমন কাজ নিজে না করা এবং অপরকে না করতে উৎসাহ প্রদান করা প্রভৃতির মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে নৈতিকতা অনুশীলন করা যায়। শ্রেণিকক্ষেও নৈতিকতা অনুশীলন করা যায়। যেমন: শিক্ষকের উপদেশমতো মনোযোগ সহকারে লেখা পড়া করা; সহপাঠীর বই, খাতা, কলম, পেন্সিল প্রভৃতি না বলে না নেওয়া; সহপাঠীকে আঘাত ও কষ্ট না দেওয়া; মিথ্যা দোষারোপ না করা, গরিব বন্ধুকে শিক্ষা উপকরণ ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করা; নিজে খারাপ কাজ না করা এবং অপরকে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা ইত্যাদি। ধর্মীয় অনুশাসন পালনের মাধ্যমে এসব নৈতিক গুণাবলি অর্জন করা যায়। পঞ্চশীল, অষ্টশীল, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ প্রভৃতি অনুশীলনের মাধ্যমে নীতিবোধ জাগ্রত হয়। বুদ্ধের সময় বৃজি বা বজ্জি বংশীয় লোকেরা অত্যন্ত নীতিপরায়ণ ছিলেন। বুদ্ধ বজ্জিদের কতকগুলো নৈতিক উপদেশ প্রদান করেছিলেন। সেই উপদেশগুলোকে সপ্ত অপরিহানীয় ধর্ম বলা হয়। উপদেশগুলো প্রদানকালে বুদ্ধ বলেছিলেন, 'যতদিন বজ্জিগণ এ সকল নৈতিক উপদেশ অনুসরণ করে জীবনযাপন ও রাজ্য পরিচালনা করবে ততদিন তাঁদের পরাজয় হবে না। উত্তরোত্তর তাঁদের সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি পাবে।' কথিত আছে যে, 'যতদিন পর্যন্ত বজ্জিগণ বুদ্ধের সেই উপদেশ পালন করেছিলেন ততদিন পর্যন্ত তাঁদের কেউ পরাজিত করতে পারেনি'। এ থেকে বোঝা যায় দৈনন্দিন জীবনে নৈতিকতা অনুশীলনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

অনুশীলনমূলক কাজ
শ্রেণিকক্ষে তুমি কীভাবে নৈতিকতা অনুশীলন করতে পার লেখ।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...