দান গাইড ও নোট (চতুর্থ অধ্যায়)

সপ্তম শ্রেণি — মাধ্যমিক - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা | NCTB BOOK
524

'দান' একটি মহৎ গুণ। মানুষ যে সকল উত্তম ও কল্যাণকর কাজ করে, দান তার মধ্যে অন্যতম। বৌদ্ধধর্মে 'দান' অনন্য স্থান অধিকার করে আছে। দান, শীল ও ভাবনা- এ তিন প্রকার কুশল কর্মের মধ্যেই বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠিত। পূর্ববর্তী শ্রেণিতে আমরা দান, দানের বৈশিষ্ট্য বা বিবেচ্য বিষয়, দানীয় বস্তু ও দানের সুফল সম্পর্কে জেনেছি। এ অধ্যায়ে আমরা বৌদ্ধধর্মীয় দান অনুষ্ঠান, দান কাহিনি ও দানানুষ্ঠানের গুরুত্ব সম্পর্কে পড়ব।

এ অধ্যায় শেষে আমরা -

  • বৌদ্ধধর্মীয় বিভিন্ন দানানুষ্ঠানের বর্ণনা দিতে পারব।
  • বিভিন্ন দান কাহিনি বর্ণনা করতে পারব।
  • দানানুষ্ঠানের সামাজিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে পারব।
Content added By

# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

অনুচ্ছেদটি পড় এবং প্রশ্নের উত্তর দাও

দুলাল তার বন্ধুর সাথে বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন কুশলকর্ম নিয়ে আলোচনা করে। এছাড়া সে তাকে দান অনুষ্ঠান পালন সম্পর্কে অবহিত করে। কারণ দান অনুষ্ঠান বৌদ্ধদের অন্যতম ধর্মীয় অনুষ্ঠান।

সামাজিক অনুষ্ঠান
রাজনৈতিক অনুষ্ঠান
ধর্মীয় অনুষ্ঠান
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

দানানুষ্ঠান পরিচিতি (পাঠ ১)

194

বৌদ্ধরা বিভিন্ন ধর্মীয় দান অনুষ্ঠান পালন করেন। যেমন: সংঘদান, অষ্ট পরিষ্কার দান, কঠিন চীবরদান ইত্যাদি। এসব দান অনুষ্ঠানে মূলত ভিক্ষুসংঘকে দান করা হয়। অনুষ্ঠানে অনেক লোক সমবেত হয়ে দানকার্য সম্পাদন করে। লোভ-দ্বেষ-মোহ ক্ষয়, পুণ্য অর্জন এবং নির্বাণ লাভের উদ্দেশ্যে বৌদ্ধরা দান করে। পরলোকগত জ্ঞাতিদের সদ্গতি কামনায়ও দান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

উল্লেখিত দানানুষ্ঠানের মধ্যে সংঘদান ও অষ্টপরিষ্কার দান যেকোনো সময় করা যায়। এজন্যে নির্ধারিত কোনো দিন নেই। দাতা প্রয়োজন অনুসারে সাধ্যমতো যেকোনো সময়ে সংঘদান ও অষ্টপরিষ্কার দান করতে পারেন। কঠিন চীবরদান শুধুমাত্র প্রতিবছর বর্ষাবাস শেষে প্রবারণা পূর্ণিমার পরদিন হতে এক মাস পর্যন্ত প্রতিদিন বিভিন্ন বিহারে উদ্যাপিত হয়। এ অধ্যায়ে আমরা সংঘদান সম্পর্কে পাঠ করব।

অনুশীলনমূলক কাজ
বৌদ্ধদের দানের উদ্দেশ্য কী?

Content added By

সংঘদান (পাঠ ২)

257

বৌদ্ধদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানসমূহের মধ্যে সংঘদান অন্যতম। ভিক্ষুসংঘকে উদ্দেশ্য করে যে দান প্রদান করা হয় তাকে সংঘদান বলা হয়। বৌদ্ধরা বিশ্বাস করে যে, একজন ভিক্ষুকে দান করার চেয়ে সংঘকে দান করা খুবই ফলদায়ক।

সংঘদান

'চুল্লবর্গ' নামক গ্রন্থে ভিক্ষুসংঘকে দান প্রদানের অন্যতম পুণ্যক্ষেত্র হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। যেকোনো সময় এ দানানুষ্ঠান আয়োজন করা যায়। ভিক্ষু, উপাসক, উপাসিকা যে কেউ একক বা সমবেতভাবে বিহারে বা নিজ গৃহে সংঘদান অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারেন। সাধারণত উপাসক-উপাসিকাগণ নিজগৃহেই সংঘদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। বৌদ্ধরা যেকোনো শুভ কাজ আরম্ভ করার আগে সংঘদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। যেমন: বিবাহ, নতুন ঘর তৈরি, ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু, বিদেশ গমন, নবজাতকের অন্নপ্রাশন, প্রব্রজ্যা গ্রহণ প্রভৃতি শুভ কর্মের পূর্বে সংঘদান করা যায়। তবে পরিবারের কেউ মৃত্যুবরণ করলে অবশ্যই সংঘদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হয়। বৌদ্ধরা বিশ্বাস করে যে, সংঘদানের ফলে মৃত ব্যক্তি সদ্‌গতি প্রাপ্ত হন। সংঘদান করতে হলে কমপক্ষে পাঁচজন ভিক্ষুর উপস্থিতি প্রয়োজন হয়। সংঘদান অনুষ্ঠানের পূর্বে ভিক্ষুসংঘকে নিমন্ত্রণ করতে হয়। সংঘদানে ভিক্ষুর সংখ্যা যত বেশি হয় তত বেশি ভালো।

সংঘদানে সাধারণত ভিক্ষুসংঘের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য দান করা হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসমূহ হলো: অন্ন, বস্ত্র, ঔষধ, সাবান, তেল, ছাতা, সুঁচ-সুতা ইত্যাদি। সাধারণত ভিক্ষুসংঘ আহার গ্রহণের পূর্বে এ দানকার্য সম্পাদন করা হয়। সংঘদানের সময় ভিক্ষুসংঘের আসনের সামনে দান সামগ্রী সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়। ভিক্ষুসংঘ পরিপাটিভাবে আসনে উপবেশন করলে দান অনুষ্ঠানের কার্যক্রম আরম্ভকরা হয়। দানকার্য পরিচালনা করার জন্য ভিক্ষুসংঘের মধ্য থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ একজন ভিক্ষুকে সভাপতি নির্বাচন করা হয়। সভাপতির অনুমতিক্রমে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম আরম্ভ করা হয়। প্রথমে ত্রিশরণসহ পঞ্চশীল প্রার্থনা করা হয়। তারপর উপস্থিত ভিক্ষুদের প্রধান বা তাঁর নির্দেশে অভিজ্ঞ একজন ভিক্ষু সংঘদান গাথা তিনবার আবৃত্তি করেন। গাথাটি নিম্নরূপ:

'ইমং ভিক্সং সপরিষ্কারং ভিক্ষু সংঘস্স দেম, পূজেম'

বাংলা অনুবাদ: এই প্রয়োজনীয় খাদ্য-দ্রব্য ভিক্ষু সংঘকে দান দিয়ে পূজা করছি।

উপস্থিত সকলে গাথাটি সমস্বরে তিনবার আবৃত্তি করেন। অতঃপর, ভিক্ষুসংঘ সমস্বরে করণীয় মৈত্রী সূত্র, মঙ্গল সূত্র প্রভৃতি পাঠ করেন। তারপর, "ইদং মে ঞাতীনং হোতু, সুখিতা হোন্তু ঞাতযো... নিববাণস পচ্চযো হোতু'তি (এ পুণ্য আমার জ্ঞাতিগণের মঙ্গলের হেতু হোক, জ্ঞাতিগণ সুখী হোক... নির্বাণ লাভের হেতু হোক)' উৎসর্গ গাথাটি তিনবার আবৃত্তি করে সংঘদানের পুণ্যফল জ্ঞাতিগণের উদ্দেশ্যে দান করতে হয়। উৎসর্গ গাথাকে পুণ্যানুমোদন গাথাও বলা হয়। উৎসর্গ গাথা আবৃত্তিকালে দাতা পরিবারের একজন জল ঢেলে পুণ্যরাশি মৃত জ্ঞাতিসহ সকল প্রাণী ও দেবতাদের উদ্দেশ্যে দান করে। বুদ্ধ সংঘদানের ফল সম্পর্কে উচ্চ প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, 'যুগে যুগে পৃথিবী, সাগর, মেরু প্রভৃতি ক্ষয় হয়ে যায়। কিন্তু শত সহস্র কল্পেও সংঘদানের ফলে অর্জিত পুণ্যরাশি শেষ হয় না।'

অনুশীলনমূলক কাজ
সংঘদান অনুষ্ঠানের দান সামগ্রীর একটি তালিকা তৈরি কর (দলীয় কাজ)।

Content added By

দান কাহিনি (পাঠ ৩)

177

বৌদ্ধধর্মে দানের বহু কাহিনি প্রচলিত আছে। সিদ্ধার্থরূপে জন্মগ্রহণের আগে তিনি আরও ৫৪৯ বার জন্মগ্রহণ করেন। বুদ্ধ হতে গেলে দশ পারমী পূর্ণ করতে হয়। তারমধ্যে দান পারমীর স্থান প্রথম। জন্ম-জন্মান্তরে তিনি অসংখ্য দান করে দান পারমী পূর্ণ করেন। একবার বোধিসত্ত্ব শিবি রাজা রূপে জন্মগ্রহণ করেন। দাতা হিসেবে তাঁর খুব সুখ্যাতি ছিল। দানশীলতা পরীক্ষা করার জন্য দেবরাজ ইন্দ্র অন্ধ ব্রাহ্মণের বেশ ধারণ করে এসে শিবি রাজাকে বললেন, 'মহারাজ! আপনার দানশীলতার কীর্তি সর্বত্র প্রসারিত। আমি অন্ধ। আপনার দুটি চোখ আছে। আমাকে আপনার একটি চোখ দান করুন।' অন্ধের প্রতি করুণাবশত রাজা চোখ দান করার সিদ্ধান্ত নেন। চোখ দানের কথা শুনে রাজার সকল প্রিয়পাত্র, নগরবাসী এবং অন্তঃপুরবাসী সমবেত হয়ে রাজাকে চোখ দান করতে বারবার নিষেধ করতে থাকেন। সকলের নিষেধ ও বাধা সত্ত্বেও রাজা অন্ধ ব্রাহ্মণকে তাঁর চোখ দান করার সিদ্ধান্তে সংকল্পবদ্ধ থাকেন। তিনি রাজবৈদ্য সীবককে ডেকে একটি চোখ তোলার নির্দেশ দিলেন। সীবক রাজাকে বললেন, 'চোখ দান বড় কঠিন কাজ। মহারাজ! পুনরায় বিবেচনা করুন।' রাজা তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন এবং সীবককে ডান চোখ তোলার আদেশ দিলেন। সীবক চোখটি তুলে রাজার হাতে দিলেন। রাজা তা অন্ধ ব্রাহ্মণকে দান করলেন। অন্ধ ব্রাহ্মণ চোখটি নিজের অক্ষিকোটরে স্থাপন করলেন। তখন চোখটি নীল পদ্মের মতো শোভা পেতে লাগল। রাজা বাম চোখ দিয়ে ঐ দৃশ্য দেখে ভাবলেন, 'আহা! আমার চোখ দান সার্থক হলো।' তিনি পরম প্রীতি লাভ করলেন এবং অপর চোখটিও ব্রাহ্মণকে দান করলেন। কিছুদিন প্রাসাদে অবস্থান করার পর তিনি ভাবলেন, যে অন্ধ তার রাজ্যের কী প্রয়োজন? অতঃপর তিনি অমাত্যদের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে শ্রামণ্যধর্ম পালনের জন্য উদ্যানে চলে গেলেন। একদিন উদ্যানে বসে তিনি নিজের দানের কথা ভাবতে লাগলেন। অমনি ইন্দ্রের আসন উত্তপ্ত হলো। দেবরাজ ইন্দ্র এর কারণ বুঝতে পেরে মহারাজকে বর দিলেন। তখন তিনি পুনরায় দৃষ্টি ফিরে পেলেন। তখন রাজা বললেন:

অগ্রে দান করে কর ভোজন
ভোগ কর, যথা শক্তি করে আগে দান।
পাইবে প্রশংসা হেথা, স্বর্গে পাবে স্থান।

কাহিনি: দুই

গৌতম বুদ্ধের সময়ে শ্রাবস্তী নগরে সুদত্ত নামে একজন শ্রেষ্ঠী ছিলেন। তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। কোনো অনাথ, ভিখারি তাঁর গৃহ থেকে খালি হাতে ফিরে যেতেন না। এজন্যে তিনি অনাথপিণ্ডিক নামে খ্যাত হন।

একসময় তিনি পাঁচশত শকট (পশু চালিত গাড়ি) নিয়ে রাজগৃহ নগরে এক শ্রেষ্ঠী-বন্ধুর কাছে বেড়াতে গেলেন। সেখানে তিনি জানতে পারলেন জগতে ভগবান বুদ্ধ আবির্ভূত হয়েছেন। এই সংবাদ শুনে তিনি বুদ্ধকে দেখার ইচ্ছা পোষণ করেন। বুদ্ধের ধর্মবাণী শুনে অনাথপিণ্ডিক স্রোতাপত্তি ফল লাভ করেন। তিনি সশিষ্য বুদ্ধকে মহাদান দিলেন এবং শ্রাবস্তীতে যাবার জন্য নিমন্ত্রণ করলেন। রাজগৃহ হতে শ্রাবস্তী পঁয়তাল্লিশ যোজন দূরে অবস্থিত। অনাথপিণ্ডিক শ্রাবস্তীতে ফেরার পথে প্রত্যেক যোজন অন্তর একটি করে বিহার নির্মাণ করান। আঠার কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে জেতবন উদ্যান ক্রয় করেন। ঐ উদ্যানে আরও আঠার কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে জেতবন বিহার নির্মাণ করেন। ভিক্ষুসংঘসহ বুদ্ধকে তিন মাসব্যাপী আপ্যায়ন ও সেবার জন্য আরও আঠার কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করেন। প্রতিদিন তাঁর বাড়িতে পাঁচশত ভিক্ষুকে সেবা দানের ব্যবস্থা ছিল। এই সকল মহাদানের জন্য বুদ্ধ তাঁকে 'শ্রেষ্ঠ দায়ক' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।

তিনি যখন দুরবস্থায় পতিত হয়ে ছিলেন তখনও দান কথ করেন নি। বুদ্ধ একদিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'হে গৃহপতি! তোমার দান কার্য চলছে কি?' তিনি উত্তরে বলেন যে, তিনি দান করছেন, তবে তা অতি নিকৃষ্ট দান। বুদ্ধ বললেন, চিত্ত উৎকৃষ্ট হলে দান কখনো নিকৃষ্ট হয় না। দাতার চিত্তের উৎকৃষ্টতা এবং গ্রহিতার উৎকর্ষতা সব দানকেই উৎকৃষ্ট করে। দানশীলতার কারণে অনাথপিণ্ডিক বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। এখন ও মানুষ শ্রদ্ধাচিত্তে তাঁর দানের কথা স্মরণ করে। এই কাহিনি পাঠ করে আমরা বুঝতে পারি, দানে যশ খ্যাতি বৃদ্ধি পায় এবং দানের ক্ষেত্রে বিত্তের চেয়ে চিত্তের উদারতাই বেশি প্রয়োজন।

কাহিনি: তিন

একদা দাসী পূর্ণা প্রভুর গৃহে সারারাত গৃহকর্ম করার পর ভোরে খুব ক্লান্তি ও ক্ষুধা অনুভব করেছিল। তখন সে দু'খানা আধপোড়া রুটি নিয়ে কাছের পুকুর ঘাটে গিয়ে বসল। এমন সময় একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু ভিক্ষাপাত্র হাতে এগিয়ে আসছিলেন। ভিক্ষারত বৌদ্ধ ভিক্ষুকে দেখে পূর্ণার চিত্ত শ্রদ্ধায় পূর্ণ হয়ে গেল। তখন তার মনে ভিক্ষুকে কিছু দান করার ইচ্ছা জাগ্রত হলো। কিন্তু সে ছিল দরিদ্র, হাতের কাছে ঐ দুটি রুটি ছাড়া কিছুই ছিল না। পূর্ণা ভাবলেন, এ পোড়া রুটি কি ভিক্ষু গ্রহণ করবেন? এভাবে দ্বিধাগ্রস্তভাবে তিনি ভিক্ষুর কাছে এগিয়ে গেলেন। ভিক্ষুকে শ্রদ্ধা চিত্তে বন্দনা করে তার দানের ইচ্ছা প্রকাশ করে বললেন, ভন্তে! আমার কাছে শুধু দু'খানা রুটি আছে। আমি এগুলো আপনাকে দান করতে চাই। ভন্তে! আপনি কি গ্রহণ করবেন? ভন্তে পূর্ণার দানের আগ্রহ বুঝতে পেরে রুটি গ্রহণে সম্মতি প্রদান করে ভিক্ষাপাত্র এগিয়ে দিলেন। পূর্ণা আনন্দপূর্ণ চিত্তে রুটি দু'খানা ভিক্ষুকে দান করলেন। এ দানের ফলে তিনি স্রোতাপত্তি ফল অর্জন করেন। এ কাহিনি পড়েও আমরা জানতে পারি দানের ক্ষেত্রে বিত্তের চেয়ে চিত্ত সম্পদ অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

অনুশীলনমূলক কাজ
দানের ক্ষেত্রে বিত্ত নয়, চিত্ত সম্পদই অধিক গুরুত্বপূর্ণ- আলোচনা কর (দলীয় কাজ)।

Content added By

দানানুষ্ঠানের সামাজিক গুরুত্ব (পাঠ ৪)

171

বৌদ্ধধর্মে দানের সামাজিক গুরুত্ব অপরিসীম। দান দেওয়া মানুষের একটি মহৎ গুণ। এই গুণটি বিকশিত করার ক্ষেত্রে দানানুষ্ঠান বিরাট ভূমিকা রাখে। দানানুষ্ঠানের মাধ্যমে দানের অভ্যাস গড়ে উঠে। অহংকার, কৃপণতা, লোভ-দ্বেষ-মোহ প্রভৃতি দূর হয়। চিত্তের উদারতা বাড়ে। পরোপকারী মনোভাব সৃষ্টি হয়। অন্যের বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার প্রেরণা সৃষ্টি হয়। দয়া, নিঃস্বার্থপরতা, মৈত্রী, প্রেম প্রভৃতি মানবিক গুণের বিকাশ ঘটে। দান, শীল এবং ভাবনার অনুশীলন মানুষকে দুঃখ থেকে মুক্তি দেয়। দান পারমী পূর্ণ না করলে নির্বাণ পথে অগ্রসর হওয়া যায় না। তাই দশ পারমীর মধ্যে দান পারমীকে প্রথমে স্থান দেওয়া হয়েছে। দানানুষ্ঠান দান ও পারমী পূরণপূর্বক মানুষকে নির্বাণ পথে পরিচালিত হতে সাহায্য করে।

দান কাহিনি পড়ে আমরা জেনেছি উদার চিত্তে এবং শীলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দান করলে তা উৎকৃষ্ট দান হিসেবে বিবেচিত হয়। সৎ উপায়ে উপার্জিত অর্থ দান করলে অধিক ফল অর্জন হয়। বৌদ্ধধর্মে দাতা ও গ্রহীতা উভয়কে শীলবান হতে হয়। দানানুষ্ঠান শীলবান ও নীতিপরায়ণ হতে সাহায্য করে।

দানানুষ্ঠানে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী অংশ গ্রহণ করে। ফলে পারস্পরিক যোগাযোগ ও ভাব বিনিময় হয়। এতে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়। পরস্পরের মধ্যে সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয়। পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি, হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়। ফলে সমাজে শান্তি বিরাজ করে। দান দ্বারা সমাজে অনেক মহৎ কাজ করা যায়। যেমন: শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, অনাথালয় স্থাপন, রাস্তাঘাট, সেতু, জলাধার তৈরি ইত্যাদি। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও রক্ত দান করা যায়। এ দানের ফলে অনেক মানুষ মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পায়। দৃষ্টিহীন ব্যক্তি দৃষ্টি ফিরে পায়। ফলে বলা যায়, দানানুষ্ঠান নৈতিক ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ সাধন করে সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এজন্যে সকলের দানানুষ্ঠানের আয়োজন এবং দানানুষ্ঠানে যোগদান করা উচিত।

অনুশীলনমূলক কাজ
দানের দ্বারা তোমাদের এলাকায় কী কী ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে তার একটি তালিকা প্রস্তুত কর (দলীয় কাজ)।

Content added By

অনুশীলনী

168

শূন্যস্থান পূরণ কর

১. দান' শীল ও ভাবনা এই তিন প্রকার ____ কর্মের মধ্যেই বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠিত।

২. সংঘদান করতে হলে কমপক্ষে _____ ভিক্ষুর উপস্থিতির প্রয়োজন হয়।

৩. উৎসর্গ গাথাকে ____ গাথাও বলা হয়।

৪. একবার _____ শিবিরাজা রূপে জন্মগ্রহণ করেন।

৫. দান দেওয়া মানুষের একটি মহৎ ______ ।

সংক্ষিপ্ত-উত্তর প্রশ্ন
১. বৌদ্ধরা কেন দান করে?
২. বৌদ্ধরা কোন কোন ধর্মীয় দান অনুষ্ঠান পালন করে?
৩. সংঘদানে কী কী দান করতে পার?

বর্ণনামূলক প্রশ্ন
১. কীভাবে সংঘদান করতে হয় বর্ণনা কর।
২. দাসী পূর্ণার স্রোতাপত্তিফল অর্জনের কাহিনি বর্ণনা কর।
৩. দান দ্বারা সমাজে অনেক মহৎ কাজ সাধিত হয়- ব্যাখ্যা কর।

বহুনির্বাচনি প্রশ্ন

১। দশ পারমীর মধ্যে প্রথম পারমী কোনটি?

ক) দান
খ) শীল
গ) ভাবনা
ঘ) প্রজ্ঞা

২। দান দেওয়া হয়-
i. লোভ-দ্বেষ-মোহ ক্ষয় করার জন্য
ii. নির্বাণ লাভের জন্য
iii. অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য
নিচের কোনটি সঠিক?

ক) i
খ) ii
গ) i ও ii
ঘ) ii ও iii

নিচের অনুচ্ছেদটি পড় এবং ৩ ও ৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দাও:

প্রসেনজিৎ চৌধুরী নতুন বাড়িতে প্রবেশ উপলক্ষ্যে এক দানকর্মের আয়োজন করেন। প্রাজ্ঞ ভিক্ষু সংঘদানের বিভিন্ন দিক ও ফল নিয়ে আলোচনায় বলেন-এই দানকর্ম একটি উৎকৃষ্ট ও অধিকতর বেশি পূণ্য কর্ম। সকলের উচিত এরূপ দান দেওয়া।

৩। প্রসেনজিৎ চৌধুরীর দানকর্মটি কোন দানের অন্তর্ভুক্ত?

ক) চীবর দান
খ) সংঘদান
গ) অষ্টপরিষ্কার দান
ঘ) মহাদান

৪। অনুচ্ছেদে বর্ণিত দানের ফলে প্রসেনজিৎ চৌধুরী লাভ করতে পারবেন-

ক) চিত্ত সুখ
খ) কায় সুখ
গ) নির্বাণ সুখ
ঘ) পারমী পূরণ

সৃজনশীল প্রশ্ন

১। চম্পা চাকমা ছেলের জন্ম দিন উপলক্ষ্যে বাড়িতে আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের নিমন্ত্রণ করলেন। উক্ত অনুষ্ঠানে তিনি গান বাজনারও ব্যবস্থা করলেন। এতে তার মা অসন্তুষ্ট হলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল বিহার অধ্যক্ষের অনুমতিক্রমে ভিক্ষুসংঘকে উপযুক্ত দান দেবেন। তাই চম্পা মায়ের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য সংঘকে চীবর, ভিক্ষাপাত্রসহ নানা দ্রব্য ও বিহার উন্নয়নের জন্য নগদ অর্থ দান করলেন।

ক) কত প্রকার কুশল কর্মের মধ্যে বৌদ্ধধর্ম প্রতিষ্ঠিত?
খ) দানের প্রধান উদ্দেশ্যটি ব্যাখ্যা কর।
গ) চম্পা যে দান করলেন তা কোন দানের অন্তর্ভুক্ত? ব্যাখ্যা কর।
ঘ) চম্পা চাক্কার প্রদত্ত দানের গুরুত্ব পাঠ্যপুস্তকের আলোকে বিশ্লেষণ কর।

২। অনিল চাকমা একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। তার গ্রামে এক যুবকের একটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেলে তিনি (অনিল চাকমা) উক্ত যুবকের চিকিৎসার জন্য এক লক্ষ টাকা দান করেন। পক্ষান্তরে সুনিল চাকমা ধনী হলেও তিনি ঐ যুবককে নিজের একটি কিডনি দান করেন। সুনিল চাকমার কিডনী দানের ফলে যুবকটি মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেল।

ক) সংঘদানের জন্য কতজন ভিক্ষুর প্রয়োজন?
খ) ভিক্ষুসংঘকে দান দেওয়া হয় কেন?
গ) সুনিল চাকমার দানটি কোন দানের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে ব্যাখ্যা কর।
ঘ) অনিল চাকমা ও সুনিল চাকমার দানের ফলাফল পাঠ্যপুস্তকের আলোকে তুলনামূলক বিশ্লেষণ কর।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...