বৌদ্ধধর্মে দানের বহু কাহিনি প্রচলিত আছে। সিদ্ধার্থরূপে জন্মগ্রহণের আগে তিনি আরও ৫৪৯ বার জন্মগ্রহণ করেন। বুদ্ধ হতে গেলে দশ পারমী পূর্ণ করতে হয়। তারমধ্যে দান পারমীর স্থান প্রথম। জন্ম-জন্মান্তরে তিনি অসংখ্য দান করে দান পারমী পূর্ণ করেন। একবার বোধিসত্ত্ব শিবি রাজা রূপে জন্মগ্রহণ করেন। দাতা হিসেবে তাঁর খুব সুখ্যাতি ছিল। দানশীলতা পরীক্ষা করার জন্য দেবরাজ ইন্দ্র অন্ধ ব্রাহ্মণের বেশ ধারণ করে এসে শিবি রাজাকে বললেন, 'মহারাজ! আপনার দানশীলতার কীর্তি সর্বত্র প্রসারিত। আমি অন্ধ। আপনার দুটি চোখ আছে। আমাকে আপনার একটি চোখ দান করুন।' অন্ধের প্রতি করুণাবশত রাজা চোখ দান করার সিদ্ধান্ত নেন। চোখ দানের কথা শুনে রাজার সকল প্রিয়পাত্র, নগরবাসী এবং অন্তঃপুরবাসী সমবেত হয়ে রাজাকে চোখ দান করতে বারবার নিষেধ করতে থাকেন। সকলের নিষেধ ও বাধা সত্ত্বেও রাজা অন্ধ ব্রাহ্মণকে তাঁর চোখ দান করার সিদ্ধান্তে সংকল্পবদ্ধ থাকেন। তিনি রাজবৈদ্য সীবককে ডেকে একটি চোখ তোলার নির্দেশ দিলেন। সীবক রাজাকে বললেন, 'চোখ দান বড় কঠিন কাজ। মহারাজ! পুনরায় বিবেচনা করুন।' রাজা তাঁর সিদ্ধান্তে অটল রইলেন এবং সীবককে ডান চোখ তোলার আদেশ দিলেন। সীবক চোখটি তুলে রাজার হাতে দিলেন। রাজা তা অন্ধ ব্রাহ্মণকে দান করলেন। অন্ধ ব্রাহ্মণ চোখটি নিজের অক্ষিকোটরে স্থাপন করলেন। তখন চোখটি নীল পদ্মের মতো শোভা পেতে লাগল। রাজা বাম চোখ দিয়ে ঐ দৃশ্য দেখে ভাবলেন, 'আহা! আমার চোখ দান সার্থক হলো।' তিনি পরম প্রীতি লাভ করলেন এবং অপর চোখটিও ব্রাহ্মণকে দান করলেন। কিছুদিন প্রাসাদে অবস্থান করার পর তিনি ভাবলেন, যে অন্ধ তার রাজ্যের কী প্রয়োজন? অতঃপর তিনি অমাত্যদের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে শ্রামণ্যধর্ম পালনের জন্য উদ্যানে চলে গেলেন। একদিন উদ্যানে বসে তিনি নিজের দানের কথা ভাবতে লাগলেন। অমনি ইন্দ্রের আসন উত্তপ্ত হলো। দেবরাজ ইন্দ্র এর কারণ বুঝতে পেরে মহারাজকে বর দিলেন। তখন তিনি পুনরায় দৃষ্টি ফিরে পেলেন। তখন রাজা বললেন:
অগ্রে দান করে কর ভোজন
ভোগ কর, যথা শক্তি করে আগে দান।
পাইবে প্রশংসা হেথা, স্বর্গে পাবে স্থান।
কাহিনি: দুই
গৌতম বুদ্ধের সময়ে শ্রাবস্তী নগরে সুদত্ত নামে একজন শ্রেষ্ঠী ছিলেন। তিনি অত্যন্ত দানশীল ছিলেন। কোনো অনাথ, ভিখারি তাঁর গৃহ থেকে খালি হাতে ফিরে যেতেন না। এজন্যে তিনি অনাথপিণ্ডিক নামে খ্যাত হন।
একসময় তিনি পাঁচশত শকট (পশু চালিত গাড়ি) নিয়ে রাজগৃহ নগরে এক শ্রেষ্ঠী-বন্ধুর কাছে বেড়াতে গেলেন। সেখানে তিনি জানতে পারলেন জগতে ভগবান বুদ্ধ আবির্ভূত হয়েছেন। এই সংবাদ শুনে তিনি বুদ্ধকে দেখার ইচ্ছা পোষণ করেন। বুদ্ধের ধর্মবাণী শুনে অনাথপিণ্ডিক স্রোতাপত্তি ফল লাভ করেন। তিনি সশিষ্য বুদ্ধকে মহাদান দিলেন এবং শ্রাবস্তীতে যাবার জন্য নিমন্ত্রণ করলেন। রাজগৃহ হতে শ্রাবস্তী পঁয়তাল্লিশ যোজন দূরে অবস্থিত। অনাথপিণ্ডিক শ্রাবস্তীতে ফেরার পথে প্রত্যেক যোজন অন্তর একটি করে বিহার নির্মাণ করান। আঠার কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে জেতবন উদ্যান ক্রয় করেন। ঐ উদ্যানে আরও আঠার কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করে জেতবন বিহার নির্মাণ করেন। ভিক্ষুসংঘসহ বুদ্ধকে তিন মাসব্যাপী আপ্যায়ন ও সেবার জন্য আরও আঠার কোটি স্বর্ণমুদ্রা ব্যয় করেন। প্রতিদিন তাঁর বাড়িতে পাঁচশত ভিক্ষুকে সেবা দানের ব্যবস্থা ছিল। এই সকল মহাদানের জন্য বুদ্ধ তাঁকে 'শ্রেষ্ঠ দায়ক' উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
তিনি যখন দুরবস্থায় পতিত হয়ে ছিলেন তখনও দান কথ করেন নি। বুদ্ধ একদিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, 'হে গৃহপতি! তোমার দান কার্য চলছে কি?' তিনি উত্তরে বলেন যে, তিনি দান করছেন, তবে তা অতি নিকৃষ্ট দান। বুদ্ধ বললেন, চিত্ত উৎকৃষ্ট হলে দান কখনো নিকৃষ্ট হয় না। দাতার চিত্তের উৎকৃষ্টতা এবং গ্রহিতার উৎকর্ষতা সব দানকেই উৎকৃষ্ট করে। দানশীলতার কারণে অনাথপিণ্ডিক বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। এখন ও মানুষ শ্রদ্ধাচিত্তে তাঁর দানের কথা স্মরণ করে। এই কাহিনি পাঠ করে আমরা বুঝতে পারি, দানে যশ খ্যাতি বৃদ্ধি পায় এবং দানের ক্ষেত্রে বিত্তের চেয়ে চিত্তের উদারতাই বেশি প্রয়োজন।
কাহিনি: তিন
একদা দাসী পূর্ণা প্রভুর গৃহে সারারাত গৃহকর্ম করার পর ভোরে খুব ক্লান্তি ও ক্ষুধা অনুভব করেছিল। তখন সে দু'খানা আধপোড়া রুটি নিয়ে কাছের পুকুর ঘাটে গিয়ে বসল। এমন সময় একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু ভিক্ষাপাত্র হাতে এগিয়ে আসছিলেন। ভিক্ষারত বৌদ্ধ ভিক্ষুকে দেখে পূর্ণার চিত্ত শ্রদ্ধায় পূর্ণ হয়ে গেল। তখন তার মনে ভিক্ষুকে কিছু দান করার ইচ্ছা জাগ্রত হলো। কিন্তু সে ছিল দরিদ্র, হাতের কাছে ঐ দুটি রুটি ছাড়া কিছুই ছিল না। পূর্ণা ভাবলেন, এ পোড়া রুটি কি ভিক্ষু গ্রহণ করবেন? এভাবে দ্বিধাগ্রস্তভাবে তিনি ভিক্ষুর কাছে এগিয়ে গেলেন। ভিক্ষুকে শ্রদ্ধা চিত্তে বন্দনা করে তার দানের ইচ্ছা প্রকাশ করে বললেন, ভন্তে! আমার কাছে শুধু দু'খানা রুটি আছে। আমি এগুলো আপনাকে দান করতে চাই। ভন্তে! আপনি কি গ্রহণ করবেন? ভন্তে পূর্ণার দানের আগ্রহ বুঝতে পেরে রুটি গ্রহণে সম্মতি প্রদান করে ভিক্ষাপাত্র এগিয়ে দিলেন। পূর্ণা আনন্দপূর্ণ চিত্তে রুটি দু'খানা ভিক্ষুকে দান করলেন। এ দানের ফলে তিনি স্রোতাপত্তি ফল অর্জন করেন। এ কাহিনি পড়েও আমরা জানতে পারি দানের ক্ষেত্রে বিত্তের চেয়ে চিত্ত সম্পদ অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
অনুশীলনমূলক কাজ |