মহাকশ্যপ ছিলেন বুদ্ধের প্রথম মহাশ্রাবক। বহু জন্মের পুণ্যফলে একসময়ে তিনি ব্রহ্মলোকে জন্মগ্রহণ করেন। পরে গৌতম বুদ্ধের সময়ে মগধ রাজ্যের অন্তর্গত মহাতীর্থ নামক এক ব্রাহ্মণ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল কপিল ব্রাহ্মণ। তাঁর গৃহী নাম ছিল পিপ্পলী মানব। ক্রমে পিপ্পলী মানব বড় হন। বড় হয়ে বিয়ে করেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল ভদ্রা কপিলানি। তিনি ছিলেন মদ্দরাজ্যের সাগল নগরে কোশীয় গোত্রীয় ব্রাহ্মণের কন্যা। তিনি খুবই সুন্দরী ছিলেন। জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধনের প্রভাবে তাঁদের উভয়ের বিয়ে হয়। তাঁরা খুব ধার্মিক ছিলেন। সংসারধর্ম পালন করলেও তাঁরা ব্রহ্মচর্য জীবনযাপন করতেন। ব্রহ্মলোক থেকে যাঁরা পৃথিবীতে জন্ম নেন সংসারধর্মে তাঁদের আসক্তি থাকে না। পিপ্পলী মানব ও ভদ্রা কপিলানিরও তাই হলো। পিতার মৃত্যুর পর পিপ্পলী মানব ও ভদ্রা কপিলানি বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। কিন্তু ধন-সম্পদের প্রতি তাঁদের কোনো আকর্ষণ ছিল না। পিপ্পলী মানব গৃহত্যাগের সংকল্প গ্রহণ করেন। তিনি সংকল্পের কথা স্ত্রী ভদ্রা কপিলানিকে জানান। স্বামীর সংকল্পের কথা শুনে ভদ্রা কপিলানিও গৃহত্যাগের সংকল্প করেন। সমস্ত সম্পত্তি দান করে তাঁরা গৃহত্যাগের প্রস্তুতি নেন। তখন স্বামী বললেন, আমাদের একসঙ্গে গৃহত্যাগ করা উচিত হবে না। লোকে ভাববে, গৃহত্যাগ করা সত্ত্বেও স্বামী-স্ত্রী এক সঙ্গে বাস করছে। এ রকম ভাবলে লোকের পাপ হবে। তখন কপিলানি বললেন, আপনার কথাই সত্য। আমরা একপথে যাব না। আপনি ডান দিকে যান, আমি বাম দিকে যাব। এই বলে তিনি স্বামীকে তিনবার প্রদক্ষিণ করে প্রণাম করেন এবং বাম দিকে যাত্রা করেন। পিপলী মানব ডান দিকে যাত্রা করেন। ঠিক সেই মুহূর্তে পৃথিবীতে ভূমিকম্প এবং আকাশে ভয়ানক শব্দ হয়।
গৌতম বুদ্ধ তখন বেণুবনের মূলগন্ধ কুটিরে অবস্থান করছিলেন। বুদ্ধ দিব্যজ্ঞানে বুঝতে পারলেন, পরম ব্রহ্মচর্যধারী স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ ও কঠিন ত্যাগের প্রকাশ এবং গুণপ্রভাবই হঠাৎ ভূমিকম্প ও ভয়ানক শব্দ হওয়ার কারণ। তিনি আরও জানতে পারলেন তাঁরা উভয়েই বুদ্ধের উদ্দেশ্যে সংসার ত্যাগ করেছেন। তখন বুদ্ধ কাউকে কিছু না বলে কুটিরের বাইরে এলেন। হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে রাজগৃহ ও নালন্দার মধ্যবর্তী এক বিরাট বটবৃক্ষমূলে এসে পদ্মাসনে বসলেন। তখন বটবৃক্ষের চারদিক দিব্যজ্যোতিতে আলোকিত হয়ে উঠল। পিপ্পলী মানব পথ চলতে চলতে সেখানে উপস্থিত হন। দূর থেকে বুদ্ধকে দেখেই ভক্তিতে তাঁর চিত্ত আপ্লুত হয়ে ওঠে। তিনি বুদ্ধের সামনে গিয়ে বন্দনা করে বললেন: ভন্তে ভগবান, আপনিই আমার শাস্তা, আমি আপনারই শিষ্য।
বুদ্ধ তখন পিপ্পলী মানবের গুণের প্রশংসা করলেন। তারপর তাঁকে ত্রিশরণ গ্রহণ দ্বারা উপসম্পদা প্রদান করেন। ভিক্ষু হওয়ার পর তাঁর নাম রাখা হয় মহাকশ্যপ। দীক্ষার পর মহাকশ্যপকে সঙ্গে করে বুদ্ধ বেণুবনের পথে যাত্রা করেন। কিছুদূর আসার পর বুদ্ধ এক বৃক্ষের নিচে বসতে ইচ্ছা করলেন। মহাকশ্যপ তাড়াতাড়ি নিজের সঙ্ঘাটি চীবর চার ভাঁজ করে বুদ্ধকে বসতে দিলেন। বুদ্ধ বললেন: কশ্যপ, তোমার সঙ্ঘাটি চীবরখানা অতি মৃদু। মহাকশ্যপ ভাবলেন, শাস্তা যখন চীবরখানা মৃদু বলছেন, তাহলে তা পরিধান করতে তাঁর কোনো আপত্তি থাকবে না। এই কথা ভেবে কশ্যপ বললেন; ভন্তে, ভগবান, এই সঙ্ঘাটি চীবর আপনি পরিধান করুন। বুদ্ধ সেটা গ্রহণ করেন এবং বিনিময়ে তাঁকে "বুদ্ধের নিজের পরনের" কাপড় প্রদান করেন। এভাবে তাঁদের মধ্যে চীবর বিনিময় হয়। কশ্যপের চীবর বুদ্ধ এবং বুদ্ধের চীবর কশ্যপ পরিধান করলেন।
দীক্ষা গ্রহণের আট দিন পর মহাকশ্যপ অর্হত্ব ফল লাভ করেন। গৌতম বুদ্ধ ভিক্ষুদের ডেকে মহাকশ্যপের অশেষ গুণের প্রশংসা করলেন। বুদ্ধের ধর্ম-দর্শনে তিনি অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। তাঁর অশেষ গুণরাশির কথা বিবেচনা করে ভিক্ষুগণ তাঁকে অগ্রমহাশ্রাবক পদে অধিষ্ঠিত করেন। অন্যদিকে ভদ্রা কপিলানিও মহাপ্রজাপতি গৌতমীর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করেন।
গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণ লাভের পর তাঁর ধর্মবাণী সংগ্রহের জন্য এক মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, যা প্রথম মহাসঙ্গীতি নামে অভিহিত। মহাকশ্যপ থের সেই সঙ্গীতিতে সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হন। ধর্মবাণী সংগ্রহের জন্য তিনি পাঁচশত অর্হৎ ভিক্ষু নির্বাচন করেন। তিনি সভাপতির আসন অলংকৃত করে উপালিকে বিনয় এবং আনন্দকে ধর্ম সম্পর্কে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেন। তাঁরা যথাযথ উত্তর প্রদান করেন। তাঁদের ব্যাখ্যাকৃত ধর্ম-বিনয় উপস্থিত ভিক্ষুসংঘ অনুমোদন করেন। এভাবে মহাকশ্যপ থের'র সভাপতিত্বে প্রথম মহাসঙ্গীতিতে বুদ্ধবাণী ধর্ম-বিনয় হিসেবে সংগৃহীত হয়।
মহাকশ্যপ বুদ্ধের শ্রেষ্ঠ শিষ্যদের অন্যতম ছিলেন। তিনি মহাজ্ঞানী এবং শীলবান ভিক্ষু ছিলেন। মহাপরিনির্বাণের পর মল্লরা বুদ্ধের দেহ শশ্মানে দাহ করতে অনেক চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁদের চেষ্টা একে একে ব্যর্থ হয়ে যায়। শেষে মহাকশ্যপ থের বুদ্ধের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে বন্দনা করেন। তারপর বুদ্ধের চিতায় আপনা আপনি আগুন জ্বলে ওঠে। অর্হত্ব ফলে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তিনি ভিক্ষুদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ প্রদান করেন। কয়েকটি উপদেশ নিচে তুলে ধরা হলো।
১। ভিক্ষুগণ বহুপরিষদ পরিবেষ্টিত হয়ে বাস করবে না। কারণ পরিষদ পরিচালনায় চিত্ত বিকারগ্রস্ত হয়। বহুজনের সঙ্গ একাগ্রতা নষ্ট করে। ফলে সমাধি দুর্লভ হয়। নানাজনের নানা রুচি পূর্ণ করা দুঃখকর। এ কারণে পরিষদ পরিচালনায় বহুবিধ দোষ জ্ঞান চক্ষে দেখে তা হতে বিরত থাকবে।
২। প্রব্রজিতরা কখনো পৌরহিত্বে আত্মনিয়োগ করবে না। কারণ পৌরহিত্ব কাজে চিত্ত বিকারগ্রস্ত হয়। ভিক্ষুগণ রস ও তৃষ্ণায় অনুরক্ত হয়। ফলে মার্গফল লাভ হতে বঞ্চিত হয়।
৩। ভিক্ষুগণ বহুকাজে যোগদান করবে না। পাপীমিত্র বর্জন করবে। বস্তুগত লাভ বৃদ্ধির চেষ্টা করবে না। রসতৃষ্ণায় অভিভূত ভিক্ষু শীলবিশুদ্ধি পরিত্যাগ করে থাকে।
৪। যাঁদের লজ্জা-ভয় সর্বদা বিদ্যমান থাকে তাঁদের ব্রহ্মচর্য গুণ শ্রীবৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়। তাঁরা পুনরায় জন্মগ্রহণ করেন না।
অনুশীলনমূলক প্রশ্ন |
Read more