বর্ষাবাস বৌদ্ধদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার বা অনুষ্ঠান। ভগবান বুদ্ধ তাঁর সংঘ প্রতিষ্ঠার পর সুষ্ঠুভাবে সেই সংঘ পরিচালনার নিমিত্তে বিভিন্ন নিয়ম-কানুন প্রবর্তন করেন। বর্ষাবাস বুদ্ধ প্রবর্তিত বিধি-বিধানেরই অংশ। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস ভিক্ষুরা বর্ষাবাসব্রত পালন করেন। এ সময় তাঁরা বিহারে অবস্থান করে ধর্মালোচনা, ধর্মশ্রবণ, ধর্ম-বিনয় ও ধ্যান-সমাধি চর্চা এবং অধ্যয়ন করে সময় অতিবাহিত করার চেষ্টা করেন। বর্ষাকালে বিহারে বাস করে এই ব্রত বা অধিষ্ঠান পালন করা হয় বলে এটিকে বর্ষাবাসব্রত বলে। বর্ষাবাসব্রত পালনের মাধ্যমে ভিক্ষুদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হয়।
বর্ষাবাসব্রতের পটভূমি
ভিক্ষুসংঘ গঠন করার পর বুদ্ধ সর্বপ্রাণির কল্যাণের জন্য তাঁর ধর্মবাণী দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে ভিক্ষুদের নির্দেশ দেন। বুদ্ধের নির্দেশে ভিক্ষুগণ পায়ে হেঁটে পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে বিভিন্ন লোকালয়ে গিয়ে ধর্ম প্রচার ও দেশনা করতেন। কিন্তু বর্ষাকালে ভিক্ষুরা বিভিন্ন রকম অসুবিধা ভোগ করতেন। তাঁরা কর্দমাক্ত পথে যাতায়াতের সময় প্রচুর কষ্ট ভোগ করতেন। পোকা-মাকড় এবং সাপের দংশনে অনেকের প্রাণ সংহার হতো। ঝড়-বৃষ্টিতে ভেজার কারণে নানারকম রোগ হতো। ভেজা কাপড় পরে থাকতে হতো। কারণ তখনো দায়ক-দায়িকাদের নিকট থেকে চীবর গ্রহণের নিয়ম প্রচলন হয়নি। ফলে ভিক্ষুসংঘ নানারকম জটিল রোগে আক্রান্ত হতেন। তা ছাড়া বর্ষাকালে ভিক্ষুদের যাতায়াতে অনিচ্ছাকৃতভাবে অনেক সবুজ তৃণ এবং ক্ষুদ্র প্রাণী ভিক্ষুদের পদদলিত হতো। বুদ্ধ রাজগৃহের বেণুবন বিহারে অবস্থানকালে এসব বিষয় জ্ঞাত হন। তখন তিনি বর্ষা ঋতুর তিন মাস অর্থাৎ আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথি থেকে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথি পর্যন্ত বিহারে বসবাস করে ধর্মালোচনা, ধর্ম শ্রবণ, ধ্যান-সমাধি এবং বিদ্যাচর্চা করে অতিবাহিত করার জন্য ভিক্ষুদের নির্দেশ দেন। তখন থেকে বর্ষাবাস উদ্যাপন শুরু হয়। বর্ষাবাসব্রতকালে ভিক্ষুসংঘ কায়িক, বাচনিক এবং মানসিক পরিশুদ্ধিতা অর্জন করেন। তাই বর্ষাবাসব্রতকে আত্মশুদ্ধির অধিষ্ঠান বলা হয়।
বুদ্ধ বলেছেন, যে স্থানে উপযুক্ত দায়ক-দায়িকা থাকেন এবং যে স্থান ধ্যান-সাধনার অন্তরায় নয় সেখানে ভিক্ষুদের বর্ষাবাসব্রত পালন করা উচিত। বুদ্ধের সময়কালে প্রাচীন ভারতের উরুবেলা, রাজগৃহ, নালন্দা, পাটলিপুত্র, শ্রাবস্তী, সাকেত, পাবা প্রভৃতি বর্ষাবাসব্রতের জন্য উপযুক্ত স্থান ছিল।
বর্ষাবাসব্রতের বিধান
তিন মাস যে কোনো একটি বিহারে অবস্থান করে ভিক্ষুদের এই বর্ষাবাসব্রত উদ্যাপন করতে হয়। তখন তাঁরা অধ্যয়ন, ধ্যান-সাধনা ও ধর্মচর্চা করে দিন অতিবাহিত করেন। কোনো জরুরি কাজে নিজ বিহার থেকে অন্য জায়গায় যেতে হলে সন্ধ্যার আগেই বর্ষাবাস উদ্যাপনকারী ভিক্ষুকে নিজ বিহারে ফিরে আসতে হয়। তবে কিছু কারণে বর্ষাবাসের সময় নিজ বিহার ছাড়াও অন্যত্র রাত্রি যাপন করা যায়।
কারণগুলো হলো:
১. অসুস্থ ভিক্ষু-ভিক্ষুণী, শ্রমণ এবং রুগ্ম দায়ক-দায়িকা দেখার জন্য।
২. বুদ্ধশাসনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীকে উপদেশ দেবার জন্য।
৩. কোনো উপাসক বা উপাসিকা সংঘের উদ্দেশ্যে বিহার নির্মাণ করলে তাতে সহযোগিতা ও উৎসর্গ অনুষ্ঠানে যোগদান করার জন্য।
৪. বর্ষাবাসব্রতধারী ভিক্ষু বা ভিক্ষুণী, শ্রমণ বা শ্রমণী অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য।
৫. কোথাও মিথ্যাদৃষ্টি বা সন্দেহ উপস্থিত হলে বা কেউ মানসিক বিকারগ্রস্ত হলে তা দূর করার জন্য।
৬. পরিবাস কর্ম, আহবান কর্ম, প্রব্রজ্যা দান প্রভৃতি অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণের জন্য।
ওপরে বর্ণিত কারণে বর্ষাবাসব্রতের সময় বাইরে অবস্থান করা গেলেও এক সপ্তাহের মধ্যে বর্ষাবাস পালনকারী ভিক্ষুকে বিহারে ফিরে আসতে হয়। তবে বন্য জন্তু, সাপ, চোর-ডাকাতের উপদ্রব, বিহারের দায়ক-দায়িকারা বিবাদগ্রস্ত এবং তর্কপ্রিয় হলে, আগুন, পানি, বন্যা, ঝড় প্রভৃতি কারণে বর্ষাবাসের স্থান ক্ষতিগ্রস্ত হলে বর্ষাবাসের স্থান পরিবর্তন করা যাবে। এতে ভিক্ষুদের বর্ষাবাসব্রত লঙ্ঘন হয় না।
বর্ষাবাসব্রতে ভিক্ষুদের করণীয়
বর্ষাবাস ভিক্ষুদের অবশ্য পালনীয় একটি কর্ম। এ সময় ভিক্ষুদের অনেক করণীয় কর্ম থাকে। তা নিম্নে তুলে ধরা হলো:
১। বর্ষাবাসব্রত পালনকালে ভিক্ষুদের শাস্ত্র অধ্যয়ন, ধ্যান-সমাধি চর্চা, ধর্মালোচনা এবং ধর্ম শ্রবণ করে বিশুদ্ধ জীবনযাপন করতে হয়।
২। বর্ষাবাসব্রতকালে প্রতি পূর্ণিমা, অমাবস্যা ও অষ্টমী তিথিতে ভিক্ষুদের পাতিমো আবৃত্তি করতে হয়।
৩। বর্ষাবাসব্রতকালে ভিক্ষুগণকে ছোট-বড় ভেদাভেদ ভুলে নিজের দোষত্রুটি স্বীকার করতে হয়। এজন্য জ্ঞাত বা অজ্ঞাতভাবে কৃত দোষের জন্য তাঁরা পরস্পরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কনিষ্ঠ ভিক্ষু বয়োজ্যেষ্ঠ ভিক্ষুর কাছে এবং বয়োজ্যেষ্ঠ ভিক্ষু কনিষ্ঠ ভিক্ষুর কাছে দোষের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। ফলে অহংকার দূরীভূত হয়। পারস্পরিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। ভক্তি, শ্রদ্ধা ও আন্তরিকতা বৃদ্ধি পায়।
৪। বিহারাঙ্গণ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হয়।

বর্ষাবাসব্রতে সীমাগৃহে ভিক্ষুগণ
বর্ষাবাসব্রতে গৃহীদের করণীয়
বর্ষাবাসব্রত ভিক্ষুদের পালনীয় কর্ম হলেও এ সময় গৃহীদেরও অনেক করণীয় রয়েছে। বর্ষাবাসব্রতধারী ভিক্ষুদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য দান করা গৃহীদের কর্তব্য। ভিক্ষুদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোকে একত্রে চতুর্থত্যয় বলা হয়। বর্ষাবাসব্রতের সময় গৃহীরা ভিক্ষুদের চতুপ্রত্যয় দান করেন। চতুপ্রত্যয় হলো: অন্ন, বস্ত্র (চীবর), বাসস্থান ও চিকিৎসা। গৃহীরা নিজ নিজ গ্রামের বিহারে বর্ষাবাস উদ্যাপনের জন্য ভিক্ষুদের আমন্ত্রণ জানান। ভিক্ষু সম্মতি জ্ঞাপন করলে নির্দিষ্ট তিথিতে বর্ষাবাসব্রত শুরু হয়।
বর্ষাবাসব্রতের সময় প্রতিটি পূর্ণিমা, অমাবস্যা ও অষ্টমী তিথিতে গৃহী বৌদ্ধরা বিহারে গিয়ে উপোসথ গ্রহণ করেন। ভিক্ষুদের কাছ থেকে ধর্মকথা শ্রবণ করেন। এ সময় ধর্মসভারও আয়োজন করা হয়। পন্ডিত ভিক্ষু এবং পণ্ডিত ব্যক্তিরা ধর্মালোচনা করেন। গৃহীরা ধর্মসভায় যোগদান করে ধর্মালোচনা শ্রবণ করেন। ধ্যান-সমাধি চর্চা করেন। প্রাণী হত্যা হতে বিরত থাকার অভ্যাস গড়ে তোলেন। কুশলকর্ম সম্পাদন করেন। এভাবে গৃহীরা বর্ষাবাসব্রতের সময় ধর্মসম্মত জীবনযাপন করে পরিশুদ্ধি লাভ করেন।
অনুশীলনমূলক কাজ |
Read more