শ্রেষ্ঠী অনাথপিণ্ডিক (পাঠ ৪)

চরিতমালা - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

410

বুদ্ধের জীবিতকালে ভিক্ষু ছাড়াও অনেক গৃহী বুদ্ধের একনিষ্ঠ সেবক ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনাথপিণ্ডিক ছিলেন অগ্রগণ্য। সে সময়ে শ্রাবস্তীতে সুমন নামে এক শ্রেষ্ঠী বাস করতেন। সুদত্ত নামে তাঁর এক পুত্র ছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর সুদত্ত উত্তরাধিকার সূত্রে পিতার বিশাল ধনসম্পদের অধিকারী হন। এরকম ধনবানদের শ্রেষ্ঠী বলা হয়। সুদত্ত শ্রেষ্ঠী অত্যন্ত দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। গরিব ও দুঃখীদের তিনি মুক্ত হস্তে দান করতেন। কোনো অসহায় মানুষ তাঁর বাড়ি থেকে শূন্য হাতে ফিরে যেত না। বিশেষত তিনি অনাথদের পিন্ড দান করতেন। পিন্ড হলো আহার বা খাদ্যদ্রব্য। অনাথদের অকাতরে পিন্ড দান করতেন বলেই সকলের কাছে তিনি 'অনাথপিণ্ডিক' নামে পরিচিত হন।

এক সময় বুদ্ধ রাজগৃহের জেতবনে অবস্থান করছিলেন। সে সময় অনাথপিণ্ডিক ব্যবসার কাজে রাজগৃহে আসেন। সেখানে এক শ্রেষ্ঠী বন্ধুর বাড়িতে তিনি অতিথি হন। আগেও অনাথপিণ্ডিক কয়েকবার বন্ধুর বাড়িতে অতিথি হয়েছিলেন। তখন তিনি অনেক আদর যত্ন লাভ করেছিলেন। কিন্তু সেদিন তাঁকে আগের মতো সমাদর করতে কেউ এগিয়ে এলো না। তাঁর বন্ধুও ছিলেন খুব ব্যস্ত। তিনি বন্ধুর নিকট ব্যস্ততার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। বন্ধু তাঁকে বললেন, আমি বুদ্ধকে নিমন্ত্রণ করেছি। বুদ্ধ তাঁর শিষ্যসহ আমার বাড়িতে আসবেন। তাঁকে সেবা-যত্ন ও আপ্যায়ন করার জন্য আমরা সবাই ব্যস্ত।

বুদ্ধের আগমনের কথা শুনেই অনাথপিণ্ডিকের মন আনন্দে ভরে উঠল। তিনি আর কিছুই বললেন না। সে রাতে ভালো করে ঘুমাতেও পারলেন না। খুব ভোরে উঠে তিনি জেতবনে বুদ্ধের কাছে গেলেন। বুদ্ধ তখন চংক্রমণ করছিলেন। শ্রেষ্ঠী বুদ্ধকে বন্দনা করে এক পাশে বসলেন। বুদ্ধ তাঁর মনের অবস্থা জেনে তাঁকে ধর্মদেশনা করলেন। বুদ্ধের ধর্মদেশনা শুনে অনাথপিণ্ডিক সেখানেই স্রোতাপত্তি ফল লাভকরলেন। স্রোতাপত্তি হল নির্বাণ লাভের প্রথম ধাপ। মনের একাগ্রতা সাধনের মাধ্যমে এটি অর্জিত হয়। ফেরার সময় অনাথপিণ্ডিক বুদ্ধকে শ্রাবস্তীতে বর্ষাবাস যাপনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। বুদ্ধ তাঁর আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন।

অনাথপিণ্ডিক শ্রাবস্তীতে ফিরে গিয়ে 'কী করলে বুদ্ধ খুশি হবেন' এ বিষয়ে ভাবতে লাগলেন। শ্রাবস্তীতে রাজকুমার জেত-এর মনোরম একটি উদ্যান ছিল। তাঁকে অনেক অনুরোধ করে আঠার কোটি স্বর্ণমদ্রা দিয়ে সেই উদ্যান ক্রয় করলেন। সেখানে নির্মাণ করলেন মনোরম মহাবিহার। এই বিহারের মাঝখানে বুদ্ধের জন্য নির্মিত হয় 'মূলগন্ধকুটি বিহার'। এর চারদিকে নির্মিত হয় আটজন স্থবিরের জন্য পৃথক ভবন। এ ছাড়া সেখানে নির্মিত হল চংক্রমণশালা, ভিক্ষুদের জন্য আশ্রম, দিঘি প্রভৃতি। রাজগৃহ থেকে শ্রাবস্তীর দূরত্ব প্রায় নব্বই মাইল। তিনি বুদ্ধের যাতায়াতের সুবিধার জন্য প্রতি দুই মাইল অন্তর মোট পঁয়তাল্লিশটি বিশ্রামাগার নির্মাণ করালেন। এসব নির্মাণে খরচ হয় আঠার কোটি স্বর্ণমুদ্রা।

তিন মাস ধরে চলে বিহারে দান অনুষ্ঠানের উৎসব। এ অনুষ্ঠানেও খরচ হয় আরও আঠার কোটি স্বর্ণমুদ্রা। রাজকুমার জেত-এর নাম অনুসারে এই জায়গার নাম রাখা হয় জেতবন। বিহারের নাম রাখা হয় 'অনাথপিণ্ডিকের' আরাম। অনাথপিন্ডিক অত্যন্ত বুদ্ধ ভক্ত ছিলেন। প্রতিদিন তিনবেলা তিনি সেই বিহারে যেতেন। বুদ্ধকে পূজা বন্দনা করতেন। বুদ্ধের ধর্মদেশনা শুনতেন। অনাথপিণ্ডিকের বাড়িতে প্রতিদিন পাঁচশত ভিক্ষুর জন্য খাদ্য প্রস্তুত থাকত। বুদ্ধ উনিশবার অনাথপিণ্ডিকের আরামে বর্ষাবাস যাপন করেছিলেন। বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারে অনাথপিণ্ডিকের অবদান শ্রদ্ধাচিত্তে স্মরণযোগ্য।

দান কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ অনাথপিণ্ডিক বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। এখন ও বিশ্ব বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করে। তাঁর প্রশংসা করে। তাঁর দান কর্মে উদ্বুদ্ধ হয়ে দান ও সেবায় ব্রতী হতে চেষ্টা করে।

অনাথপিন্ডিকের জীবনী পাঠে বোঝা যায় যে, দান মানুষকে মহৎ করে। দানের মাধ্যমে পুণ্য, যশ-খ্যাতি, শ্রদ্ধা ও প্রশংসা লাভ হয়।

অনুশীলনমূলক কাজ
তোমার এলাকায় ধনী ব্যক্তিদের দানে নির্মিত প্রতিষ্ঠান বা মঙ্গলজনক কর্মসমূহের একটি তালিকা প্রস্তুত কর।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...