কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান (পাঠ ৩)

ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

416

দান অনুষ্ঠানসমূহের মধ্যে কঠিন চীবর দান অন্যতম। প্রতিটি বৌদ্ধ দেশে এ দান কার্য যথাযোগ্য মর্যাদা সহকারে সম্পাদিত হয়। বিধিবদ্ধ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও আয়োজনের ব্যাপকতায় এটি উৎসবের আকার ধারণ করে। তাই কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানকে দানোত্তম কঠিন চীবর দানোৎসব বলা হয়। বাংলাদেশের বৌদ্ধরা প্রতিবছর ভক্তি, শ্রদ্ধা ও নির্মল আনন্দে কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান উদ্যাপন করে।

কঠিন চীবর দানের পটভূমি

একসময় ভগবান বুদ্ধ শ্রাবস্তীর জেতবনে শ্রেষ্ঠী অনাথপিন্ডিক নির্মিত বিহারে বাস করছিলেন। সে সময় পাঠেয়বাসী ত্রিশজন ভিক্ষু বুদ্ধের সাথে সাক্ষাৎ করার মনস্থ করেন। তাঁরা সবাই ছিলেন ধুতাঙ্গধারী। ধুতাঙ্গ হলো কঠিন কৃচ্ছ সাধন। বর্ষাবাসব্রত গ্রহণের আগে বুদ্ধকে দর্শন করার জন্য তাঁদের মনে বাসনা জাগ্রত হয়। মনোবাসনা পূর্ণ করার জন্য তাঁরা পাঠেয় থেকে শ্রাবস্তী অভিমুখে যাত্রা করেন। অনেক দূর গিয়ে তাঁরা বুঝতে পারলেন, বর্ষাবাসের আগে শ্রাবস্তী পৌঁছার সম্ভাবনা নেই। তাই মাঝপথে সাকেত নামক স্থানে তাঁরা বর্ষাবাসব্রত আরম্ভ করেন। সেখানে তাঁরা যথারীতি তিন মাস বর্ষাবাসব্রত সম্পন্ন করেন। তথাগতের সাক্ষাৎ লাভের জন্য তাঁরা খুব উদগ্রীব ছিলেন। তাই প্রবারণার পরদিনই তাঁরা শ্রাবস্তীতে পৌঁছালেন। বর্ষা ঋতুর বৃষ্টির ধারা তখনও শেষ হয়নি। ভেজা চীবর গায়ে ভিক্ষুরা বুদ্ধের কাছে পৌঁছলেন। বন্দনা জ্ঞাপন করে বুদ্ধের পাশে সকলেই আসন গ্রহণ করেন। বুদ্ধ তাঁদের কুশল জিজ্ঞাসা করেন। তাঁরা উত্তরে বলেন, 'আমরা বর্ষাবাস আসন্ন দেখে সাকেত নগরে অবস্থান করেছিলাম। অথচ সাকেত থেকে শ্রাবস্তীর দূরত্ব মাত্র ছয় যোজন। তবুও আপনার দর্শনলাভে বঞ্চিত হয়েছি। খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে বর্ষাবাসব্রত আরম্ভ করেছিলাম। বর্ষাবাসব্রতের তিন মাস শেষ হলো। প্রবারণা সম্পন্ন করে ভেজা কাপড়ে কর্দমাক্ত পথ অতিক্রম করে এখানে এসেছি। খুব ক্লান্তবোধ করছি কিন্তু আপনার সান্নিধ্য পেয়ে এখন আনন্দবোধ করছি। তখন বুদ্ধ এ প্রসঙ্গে ভিক্ষুদের আহ্বান করে ধর্ম-দেশনা করেন। অতঃপর তিনি ভিক্ষুদের নির্দেশ দিলেন, 'ভিক্ষুগণ! এখন থেকে তোমরা কঠিন চীবরে আবৃত হবে। বর্ষাবাসব্রত সমাপ্তকারী ভিক্ষুদের জন্য এটা পরম পুণ্যের কাজ।' তখন থেকে ভিক্ষুদের মধ্যে কঠিন চীবর পরিধান প্রথার সূচনা হয়।

কঠিন চীবর দানের নিয়মাবলি
এখন আমরা কঠিন চীবর দানের নিয়মাবলি জানব। অন্যান্য দান বছরের যেকোনো সময় করা যায়। কিন্তু কঠিন চীবর দান বছরে একবার মাত্র করা হয়। তাও আবার একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। আশ্বিনী পূর্ণিমার পরদিন থেকে কার্তিকী পূর্ণিমার পূর্বদিন পর্যন্ত এই দান অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে হয়। একটি বিহারে একবার মাত্র কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠান করা যায়। যে বিহারে ভিক্ষু বর্ষাবাসব্রত পালন করেন না সে বিহারে কঠিন চীবর দান উদযাপিত হয় না।

'কঠিন' ও 'চীবর' এই দুটি শব্দের পৃথক গুরুত্ব রয়েছে। এখানে চীবর হলো ভিক্ষুদের পরিধেয় কাপড়। ভিক্ষুসংঘ 'কম্মবাচা' পাঠের মাধ্যমে ধর্মীয় রীতিতে চীবরকে কঠিন চীবরে পরিণত করেন। নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে চীবরকে পরিশুদ্ধ করতে হয় বলে একে কঠিন চীবর বলা হয়। সেজন্য উপাসক-উপাসিকারা চীবর দান করলেও তা কঠিনে পরিণত হয় না। কম্মবাচা পাঠ শেষে কঠিন চীবর বিহারাধ্যক্ষ ভিক্ষুকে প্রদান করা হয়। কঠিন চীবর লাভকারী ভিক্ষুকে কমপক্ষে ফাল্গুনী পূর্ণিমা পর্যন্ত কঠিন চীবর নিজের পাশে রাখতে হয়। কোথাও গেলে কঠিন চীবর সঙ্গে নিতে হয়। কঠিন চীবর লাভকারী ভিক্ষু পাঁচটি পাপ থেকে রক্ষা পায় এবং পাঁচটি পুণ্যফল লাভ করেন বলে শাস্ত্রে উল্লেখ আছে। অন্যান্য দানে এরূপ দেখা যায় না। অন্যান্য দান হতে কঠিন চীবর দানের পদ্ধতিও ভিন্ন।

কঠিন চীবর দানের পদ্ধতি

যে দিন কঠিন চীবরদান অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় সেদিনের সূর্য উদয় থেকে পরদিন সূর্যোদয়ের পূর্ব সময় পর্যন্ত কঠিন চীবরদান দেওয়া যায়। এ সময়ের মধ্যে কাপড় বোনা, সেলাই, রং প্রভৃতি কাজ একই দিনে করতে পারলে ভালো। এ নিয়মে তৈরিকৃত চীবর দান করলে অধিকতর কায়িক, বাচনিক এবং মানসিক পুণ্য লাভ হয়। বাজার থেকে ক্রয় করা কাপড় সেলাই করেও দান দেওয়ার বিধান রয়েছে। তবে এরূপ দানের পূর্বে শীলানুস্মৃতি ও মৈত্রী ভাবনায় রত থাকা ভালো। কমপক্ষে পাঁচজন ভিক্ষুর উপস্থিতিতে এ দানকার্য সম্পন্ন করতে হয়।

কঠিন চীবরদান উপলক্ষে সর্বত্র বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। নানা উৎসবে রূপ নেয়। তবে এ অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধা, ভক্তি ও সংযম চর্চা অপরিহার্য। কর্মসূচিতে এ দানানুষ্ঠান প্রথমে ত্রিশরণ গ্রহণ করে পঞ্চশীল নিতে হয়। তারপর ধর্ম দেশনা হয়। পরে নিচের পালি উৎসর্গ গাথাটি উচ্চারণ করে উপস্থিত ভিক্ষুসংঘকে চীবর দান করতে হয়।

ইমং কঠিন চীবরং ভিষ্ণুসঙ্ঘস্স দেম, কঠিন অথরিতুং।
দুতিযম্পি ইমং কঠিন চীবরং ভিক্ষুসঙ্ঘস্স দেম, কঠিনং অথরিতুং।
ততিযম্পি ইমং কঠিন চীবরং ভিক্ষুসঙ্ঘস্স দেম, কঠিন অথরিতুং।

বাংলা অনুবাদ

কঠিনরূপে (নিয়ম-নীতির ধারায়) অর্থপূর্ণ পরিধেয় করার জন্য এ কঠিন চীবরখানি ভিক্ষুসংঘকে দান করছি।
দ্বিতীয়বারও কঠিনরূপে অর্থপূর্ণ পরিধেয় করার জন্য এ কঠিন চীবরখানি ভিক্ষুসংঘকে দান করছি।
তৃতীয়বারও কঠিনরূপে অর্থপূর্ণ পরিধেয় করার জন্য এ কঠিন চীবরখানি ভিক্ষুসংঘকে দান করছি।
বৌদ্ধধর্মীয় সকল বিষয়ে এভাবে একই কথা তিনবার উচ্চারণের বিধান রয়েছে। এতে মনের সংশয় দূর হয়। করণীয় বিষয়ে একাগ্রতা বাড়ে। অর্থাৎ দান কাজে শ্রদ্ধা ভক্তি ও মনঃসংযোগ সুদৃঢ় করার জন্য এক কথাকে তিনবার উচ্চারণ করতে হয়। উৎসর্গ গাথা পাঠ করার পর ভিক্ষুসংঘের হাতে কঠিন চীবরখানি তুলে দিতে হয়।
ভিক্ষুসংঘ আবার সে চীবর বিনয়সম্মত ও অর্থপূর্ণ করার জন্য সীমাঘরে নিয়ে যান। সেখানে ত্রিপিটক থেকে 'কম্মবাচা' পাঠ করে সংঘের অনুমোদনক্রমে বিহারস্থ উপযুক্ত ভিক্ষুকে দেওয়া হয়। তিনি কঠিন চীবরের পঞ্চফল লাভ করেন। তবে বিনয়ের নিয়ম অনুসারে বিহারের অন্যান্য ভিক্ষুকেও কঠিন চীবর অনুমোদন করতে হয়।

উপাসক-উপাসিকাগণ কঠিন চীবর দান করছেন

আনুষ্ঠানিকতা

শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভারত, বাংলাদেশ প্রভৃতি থেরবাদ বৌদ্ধধর্মের অনুসারীদের দেশে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে কঠিন চীবর দান উদ্যাপন করা হয়। উৎসবের পূর্বদিন বিহারকে অপূর্বরূপে সাজানো হয়। তোরণসজ্জিত করা হয়। প্রত্যেক গৃহে অতিথি আত্মীয়-স্বজনের সমাগম হয়। বিভিন্ন বিহার হতে ভিক্ষুসংঘের আগমন হয়। পুরো এলাকায় উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়। এসময় বিহারের বাইরে নানা দ্রব্যের পসরা সাজিয়ে মেলা বসে। এ মেলাতে ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলেই যোগদান করে।
অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে মর্যাদার সাথে জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। বৌদ্ধ নরনারী ও শিশু-কিশোর যুবক সকলে নানারঙের পোশাক পরিধান করে নানারকম দানীয় দ্রব্য নিয়ে বিহারে আসে। এতে দূর-দূরান্ত থেকেও অনেক ধর্মপ্রাণ উপাসক-উপাসিকা যোগদান করেন। এ উপলক্ষে ধর্মসভা অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘক্ষণ ধর্মালোচনা চলে। শেষে ধর্মীয় কীর্তন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানে বিহার প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকে।

কঠিন চীবর দানের সুফল

ভগবান বুদ্ধ পাঁচশ অর্হৎ শিষ্যের উদ্দেশে কঠিন চীবর দানের সুফল বর্ণনা করেছিলেন। স্থান ছিল হিমালয়ের অনবতপ্ত হ্রদ। সেখানে তিনি শিষ্যগণ পরিবৃত হয়ে উপবেশন করেন। মনে হয়েছিল যেন দেবসভা। প্রস্ফুটিত পদ্মের উপর তাঁর আসন দেবলোকের সৌন্দর্যকে হার মানায়। তাঁর শিষ্যদের মধ্যে নাগিত স্থবির কঠিন চীবর দান করে জন্মজন্মান্তরে যে দানফল ভোগ করেছিলেন তা বর্ণনা করেন। নাগিত স্থবির কঠিন চীবর দানের সুফল সম্পর্কে বলেন-

১. ত্রিশ কল্প পূর্বে শিখী বুদ্ধের সময় আমি মনুষ্যলোকে জন্মগ্রহণ করেছিলাম। তখন আমি ভিক্ষুসংঘকে কঠিন চীবর দান করি। সেই দানের ফলে এযাবৎ আমি কোনো দুর্গতি ভোগ করিনি।
২. আমি আঠার কল্পকাল দেবলোকে দিব্যসুখ ভোগ করেছি। চৌত্রিশবার দেবরাজ ইন্দ্র হয়েছি।
৩. সহস্রবার দেবরাজ্যে ব্রহ্ম হয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। ব্রহ্মলোক হতে চ্যুত হলে মনুষ্যলোকে উচ্চবংশে মহা-ধনীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেছি।
৪. রাজচক্রবর্তী-সুখ ভোগ করেছি। যেখানে জন্মেছি সেখানেই সম্পদ লাভ করেছি। কোনোদিন অভাব-অনটন ভোগ করিনি।

নাগিত স্থবিরের পর বুদ্ধ কঠিন চীবর দানের সুফল বর্ণনা করেন, যা নিম্নে তুলে ধরা হলো:

১. কোনো দাতা অন্যান্য দানীয় বস্তু একশত বছর দান করলেও তার ফল একখানি কঠিন চীবর দানের ষোল ভাগের একভাগও হয় না।

২. কোনো দাতা শতবর্ষ পর্যন্ত পাত্র-চীবরাদি ভিক্ষুদের ব্যবহার্য অষ্টপরিষ্কার দান করে, তার ফলও কঠিন চীবর দানের দ্বারা অর্জিত পুণ্যের ষোল ভাগের একভাগ হয় না।

৩. কোনো দায়ক সুমেরু পর্বততুল্য স্তূপ করে ভিক্ষুসংঘকে ত্রিচীবর দান করলেও তার ফল কঠিন চীবর দানের দ্বারা অর্জিত পুণ্যের ষোল ভাগের একভাগ হয় না।

৪. কোনো দাতা স্বর্ণ-রৌপ্য খচিত চুরাশি হাজার বিহার ভিক্ষুসংঘকে দান করলেও তার ফল কঠিন চীবর দানের দ্বারা অর্জিত পুণ্যের ষোল ভাগের একভাগ হয় না।

৫. সর্বজ্ঞবুদ্ধ, প্রত্যেকবুদ্ধ এবং বুদ্ধশিষ্যগণ সকলেই কঠিন চীবর দানের ফলেই অমৃতপদ লাভ করেছেন।

৬. কঠিন চীবর দানের ফলে সকল প্রকার ধনসম্পদ, সুকৃতি এবং স্বর্গ লাভ হয়।
কঠিন চীবর দানের ফল জন্ম-জন্মান্তরে প্রবাহিত হয়। তাই শ্রদ্ধাচিত্তে জীবনে একবার হলেও কঠিন চীবর দান করা সকলের উচিত।

অনুশীলনমূলক কাজ
কঠিন চীবর দানের পটভূমি বর্ণনা কর।
কঠিন চীবর দানের বুদ্ধ বর্ণিত পাঁচটি সুফল লেখ।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...