কলিঙ্গ যুদ্ধে জয়ী হলেও সম্রাট অশোক সুখী হলেন না। রাজ্য জয়ের বিনিময়ে দেখলেন রক্তপাত এবং মৃত্যুর বিভীষিকা। কলিঙ্গ যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ দেখে তিনি দারুণভাবে মর্মাহত হন। অনুতাপ আর অনুশোচনায় ভীষণভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তিনি চিন্তা করতে লাগলেন: আমি কী করেছি? এটি জয় নাকি পরাজয়? একি ন্যায় নাকি অন্যায়? একি বীরত্ব নাকি চরম পরাজয়? নিরপরাধ শিশু এবং নারীদের হত্যা করা কি বীরের কাজ? অন্য রাজ্য ধবংস করে কি নিজ রাজ্যের সমৃদ্ধি করা যায়? কেউ স্বামী, কেউ পিতা, কেউ সন্তান হারিয়ে হাহাকার করছে-এসব মৃত্যু ও ধবংসযজ্ঞ কি জয় নাকি পরাজয়? একদিন তিনি রাজপ্রাসাদের সিংহদ্বারে দাঁড়িয়ে এরূপ চিন্তা করছিলেন এবং পাটলিপুত্রের শোভা দেখছিলেন। মনে ছিল অশান্তি ও ভাবাবেগ। এমন সময় সৌম্য, শান্ত ও সংযত সাত বছরের এক শ্রমণ ধীর গতিতে রাজ অঙ্গন দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকে দেখামাত্রই সম্রাট অশোকের মনে শ্রদ্ধা জেগে উঠে। তাঁর নাম নিগ্রোধ শ্রমণ। তিনি ছিলেন বিন্দুসারের প্রথম পুত্র যুবরাজ সুমনের সন্তান। অর্থাৎ সম্রাট অশোকের ভ্রাতুষ্পুত্র। সম্রাট অশোক নিগ্রোধ শ্রমণকে ডেকে আনবার জন্য এক অমাত্যকে পাঠালেন। শ্রমণ ভিক্ষা পাত্র নিয়ে ধীর গতিতে প্রাসাদে এলেন এবং নিজেকে বুদ্ধের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিলেন। সম্রাট অশোক তাঁর মুখে বুদ্ধের অমৃতময় ধর্মবাণী শুনতে চাইলেন।
নিগ্রোধ শ্রমণ ধম্মপদ গ্রন্থের 'অপ্রমাদ বর্গের' একটি গাথা সম্রাট অশোককে ব্যাখ্যা করে শোনান। গাথাটির মর্মকথা হলো: 'অপ্রমাদ অমৃত লাভের পথ, আর প্রমাদ মৃত্যুর পথ। অপ্রমত্ত ব্যক্তিরা অমরত্ব লাভ করেন, কিন্তু যারা প্রমত্ত তারা বেঁচে থেকেও মৃতবৎ। এই সত্য বিশেষরূপে জেনে যাঁরা অপ্রমত্ত হয়ে আর্যদের পথ অনুসরণ করেন, সেই ধ্যাননিষ্ঠ, সতত উদ্যোগী, দৃঢ়পরাক্রমশীল, বিজ্ঞ ব্যক্তিগণ পরম শান্তিরূপ নির্বাণ লাভ করেন।' বুদ্ধের এই ধর্মবাণী শোনা মাত্রই সম্রাট অশোকের হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে উঠল। এ গাথার মাধ্যমে তিনি বুদ্ধের ধর্মের মর্মবাণী উপলব্ধি করেন। অতঃপর তিনি নিগ্রোধ শ্রমণের কাছেই বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নেন। পরিণত হন বৌদ্ধ উপাসকে। সেদিন থেকেই তাঁর রাজ্য জয়ের পরিবর্তে মানুষের অন্তর জয় করার বাসনা হয়। দিগ্বিজয়ের প্রবল তৃষ্ণা মন থেকে মুছে ফেলেন। রাজ্য জয়ের পরিবর্তে ধর্মবিজয়কে তিনি সাধনা হিসেবে গ্রহণ করেন। প্রজাদের কল্যাণে সর্বদা নিবেদিত থাকতেন। সকলের প্রতি দয়াশীল আচরণ করতেন। সর্বপ্রাণির প্রতি ছিল তাঁর অপরিসীম মমত্ববোধ। তিনি অহিংসা, সত্য, ন্যায়পরায়ণতা, দান, সেবা প্রভৃতি আদর্শকে রাষ্ট্রনীতিতে গ্রহণ করে রাজ্য শাসন করতেন। বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার পর তিনি 'চণ্ডাশোক' থেকে 'ধর্মাশোকে' পরিণত হন। তিনি 'দেবনাম প্রিয়দর্শী' উপাধি লাভ করেন। দেবতাদের প্রিয় ছিলেন এবং সকলকে স্নেহ-মমতার দৃষ্টিতে দেখতেন বলে তিনি এরূপ উপাধি লাভ করেন।
অনুশীলনমূলক কাজ |
Read more