ঋদ্ধি শব্দের অর্থ হচ্ছে ধ্যান-সাধনার প্রভাবে অলৌকিক ক্ষমতা অর্জন। গৌতম বুদ্ধের শিষ্য ও শিষ্যাদের মধ্যে অনেকে ঋদ্ধিশক্তির অধিকারী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে থেরী উৎপলবর্ণা ছিলেন শ্রেষ্ঠ। তবে এই ঋদ্ধিশক্তি তিনি এক জন্মে লাভ করেননি। এজন্য তাঁকে বহু জন্মে সাধনা করতে হয়েছিল। জানা যায়, পদুমুত্তর বুদ্ধের সময় তিনি হংসবতী নগরের এক সম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি ধর্মপরায়ণা ছিলেন। বড় হয়ে তিনি প্রায়ই পদুমুত্তর বুদ্ধের ধর্মদেশনা শুনতে বিহারে যেতেন। একদিন বিহারে গিয়ে দেখেন পদুমুত্তর বুদ্ধ একজন ভিক্ষুণীকে শ্রেষ্ঠ ঋদ্ধিমতীর স্থান দিয়েছেন। এটি দেখে তাঁর মনের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ ঋদ্ধিমতী হওয়ার ইচ্ছা জাগে। তখন তিনি এক সপ্তাহব্যাপী পদুমুত্তর বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যদের ভক্তি সহকারে মহাপূজা দান করেন। পূজা শেষে তিনি পদুমুত্তর বুদ্ধকে বন্দনা করে শ্রেষ্ঠ ঋদ্ধিমতী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। পদুমুত্তর বুদ্ধ তাঁর ইচ্ছা পূরণ হওয়ার জন্য আশীর্বাদ করেন।
অতঃপর বহু জন্মের পুণ্য সঞ্চয় করে গৌতম বুদ্ধের সময় শ্রাবস্তীর এক শ্রেষ্ঠী পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তখন তাঁর নাম রাখা হয় উৎপলবর্ণা। উৎপল শব্দের অর্থ নীল পদ্ম। তাঁর গায়ের রং ছিল নীল পদ্মের মতো। তাই এরূপ নামকরণ করা হয়েছিল। শুধু রূপেই নয় গুণেও তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। আস্তে আস্তে উৎপলবর্ণা বড় হলেন। তাঁর রূপ ও গুণের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তাঁর রূপে-গুণে আকৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে রাজা, মহারাজা ও শ্রেষ্ঠীগণ তাঁর পিতার নিকট বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। শ্রেষ্ঠী বুঝতে পারলেন মহাবিপদ সন্নিকটে। এক রাজার সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দিলে অন্য রাজা অসন্তুষ্ট ও ক্রুব্ধ হবেন। এতে শত্রুতা বাড়বে। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হবে। অনেক মানুষের মৃত্যু হবে। এই বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়ার জন্য তিনি উপায় খুঁজতে থাকেন। অবশেষে উপায় স্বরূপ তিনি কন্যাকে বললেন, মা, তুমি প্রব্রজ্যা গ্রহণ করতে পারবে কি? তাঁর ছিল অতীত জন্মের সঞ্চিত পুণ্যরাশি। খুশি হয়ে উৎপলবর্ণা পিতাকে প্রব্রজ্যা গ্রহণের সম্মতি প্রদান করেন। পিতাও খুশি হয়ে উৎপলবর্ণাকে ভিক্ষুণীদের কাছে নিয়ে গেলেন। ভিক্ষুণীরা তাঁকে প্রব্রজ্যা দান করলেন। প্রব্রজ্যা গ্রহণের অল্প দিনের মধ্যেই উৎপলবর্ণার ওপর উপোসথ কক্ষের কিছু কাজের ভার অর্পিত হলো। দায়িত্ব হিসেবে তিনি উপোসথ গৃহের বিভিন্ন কর্ম সম্পাদন করতেন। তিনি ধ্যানসাধনায় আত্ম নিয়োগ করেন। সাধনার বলে তিনি প্রথমে পূর্বজন্মের স্মৃতি, পরচিত্ত জ্ঞান, দিব্যচক্ষু, দিব্যশ্রুতি জ্ঞান ও ঋদ্ধিশক্তি লাভ করলেন। পরিশেষে অর্হত্বফল লাভ করলেন।
বুদ্ধ জেতবনে সংঘ সম্মেলনে কর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ উৎপলবর্ণাকে ঋদ্ধিশক্তিতে সর্বশ্রেষ্ঠার আসন দান করেন। অর্হত্ব ফল লাভ করে উৎপলবর্ণা সাধনা ও সিদ্ধির পরম সুখ চিন্তা করে কতগুলো গাথা আবৃত্তি করেন। গাথাগুলোর মধ্যে কয়েকটির বাংলা অনুবাদ নিচে দেওয়া হলো।
১। পূর্বজন্মের স্মৃতি আমার অধিকারে। পরচিত্ত জ্ঞান আমি অর্জন করেছি। দিব্যচক্ষু ও দিব্যশ্রুতি আমার অধিকারে।
২। আমি ঋদ্ধিপ্রাপ্ত। আমি আসবমুক্ত। আমি ষড় অভিজ্ঞতায় পারদর্শিনী। বুদ্ধ শাসনে যুক্ত হওয়ায় আমার ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে।
৩। চিত্ত আমার বশীভূত। আমি ঋদ্ধিপাদে প্রতিষ্ঠিত। ষড় অভিজ্ঞায় পারদর্শীনী। কাম, তৃষ্ণা ও স্কন্ধসমূহ শূলের ন্যায় বিদ্ধ করে। ভোগের আনন্দ আমার কাছে তুচ্ছ। অজ্ঞানের অন্ধকার বিদূরিত করে আমি সর্ববিধ ভোগতৃষ্ণার বিনাশ সাধন করেছি।
অনুশীলনমূলক কাজ |
Read more