আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের ব্যাখ্যা (পাঠ ২)

আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

355

সম্যক দৃষ্টি: সম্যক দৃষ্টির অর্থ হলো সত্য বা অভ্রান্ত দৃষ্টি, যথার্থ জ্ঞান এবং চারি আর্য সত্য সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান বা উপলব্ধি। অবিদ্যার কারণে মানুষ জীব জগৎ সম্পর্কে মিথ্যা দৃষ্টি বা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করে তাতে আবদ্ধ থাকে। সূর্যের আলো যেমন অন্ধকার দূর করে তেমনি সম্যক দৃষ্টি মিথ্যাদৃষ্টি দূর করে। তৃষ্ণার কারণে মানুষ বার বার জন্মগ্রহণ করে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষ নানাবিধ দুঃখ ভোগ করে। কিন্তু সম্যক দৃষ্টি না থাকায় আমরা দুঃখ সত্যকে চিনতে পারিনা। মিথ্যাদৃষ্টি দিয়ে জগৎকে দেখে পরিণামে আরও দুঃখ ডেকে আনি। সম্যক দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি কুশলকর্ম নির্ণয় করতে পারেন। তিনি সর্বদা কুশলকর্ম সম্পাদন করেন এবং অকুশলকর্ম হতে বিরত থাকেন। তিনি জ্ঞানী। জগৎকে তিনি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেন। ভ্রান্ত ধারণা দ্বারা তিনি বিভ্রান্ত হন না।

সম্যক সংকল্প: সম্যক সংকল্পের অর্থ হলো সঠিক বা উত্তম সংকল্প; সঠিক কাজ করার ইচ্ছা। সৎ জীবন যাপনের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়াই সম্যক সংকল্প। এজন্য ভোগবিলাস, লোভ, দ্বেষ, মোহ প্রভৃতি বর্জনের সংকল্প করতে হয়। অপরদিকে, মৈত্রী, করুণা, পরোপকার প্রভৃতি কুশলকর্ম সম্পাদনের সংকল্প করতে হয়। এভাবে অকুশল বর্জন করে কুশলকর্ম সম্পাদনপূর্বক সত্যজ্ঞান অনুসারে জীবনযাপনের দৃঢ় ইচ্ছা বা সংকল্পই হচ্ছে সম্যক সংকল্প। পণ্ডিতগণ সর্বদা সম্যক সংকল্প গ্রহণ করে থাকেন।

সম্যক বাক্য: যথার্থ এবং গ্রহণযোগ্য বাক্যই হচ্ছে সম্যক বাক্য। মিথ্যা, কর্কশ, অসার, পরনিন্দা, সত্য গোপন, বৃথা বাক্য বর্জন করে সংযত, সুমিষ্ট, সুভাষিত সার বাক্যই সম্যক বাক্য। যে বাক্য অপরকে দুঃখ দেয় তা সর্বতোভাবে বর্জন করা উচিত। সত্য, শুভ, প্রীতিপদ ও অর্থপূর্ণ বাক্য ব্যবহার করা উচিত। সম্যক বাক্য দ্বারা মধুর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়।

সম্যক কর্ম: সঠিক এবং কুশলকর্মই হলো সম্যক কর্ম। যে কর্ম নিজের ও অপরের মঙ্গল সাধন করে, ক্ষতি সাধন করে না তা-ই সম্যক কর্ম। প্রাণিহত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যা ভাষণ, নেশাদ্রব্য গ্রহণ প্রভৃতি অকুশলকর্ম বর্জন করে নির্দোষ কর্ম সম্পাদন করাই সম্যক কর্ম। শিক্ষার্থীদের জন্য নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষা অর্জনই সম্যক কর্ম। শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে সুশিক্ষিত হয়ে সৎ কাজ করাই সম্যক কর্ম। সততার সঙ্গে নিজ নিজ কর্তব্য পালন করাই সম্যক কর্ম।

সম্যক জীবিকা: নৈতিকভাবে জীবিকা নির্বাহ করাই হলো সম্যক জীবিকা। বুদ্ধ অস্ত্র, বিষ, প্রাণী, মাংস এবং নেশাদ্রব্য এ পঞ্চ বাণিজ্য পরিত্যাগ করে সৎ বাণিজ্য ও কর্ম দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতে উপদেশ দিয়েছেন। মানুষ ও প্রাণিকুলের জন্য মঙ্গল ও সেবামূলক যে কোনো কাজই সম্যক জীবিকা।

সম্যক ব্যায়াম: সৎ উদ্যম বা প্রচেষ্টাকে সম্যক ব্যায়াম বলা হয়। সম্যক ব্যায়াম চারভাবে অনুশীলন করতে হয়। যথা: ১. উৎপন্ন অসৎকর্ম বিনাশের জন্য প্রচেষ্টা; ২. অনুৎপন্ন অসৎকর্ম উৎপন্ন না হওয়ার প্রচেষ্টা; ৩. অনুৎপন্ন সৎকর্ম উৎপন্নের প্রচেষ্টা এবং ৪. উৎপন্ন সৎকর্ম সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির প্রচেষ্টা। সম্যক উদ্যম বা সৎ ইচ্ছা না থাকলে জগতে কোনো কাজই সফল হয় না। সৎ উদ্যম ছাড়া কল্যাণকর কাজ সংঘটিত হতে পারে না। আমাদের চিত্ত সদা চঞ্চল ও সর্বত্র বিচরণশীল। অস্থির চিত্তকে সংযত রাখা এবং সঠিক পথে পরিচালিত করাই সম্যক ব্যায়াম।

সম্যক স্মৃতি: কুশলকর্মের চিন্তাই সম্যক স্মৃতি। দৈহিক ও মানসিক সকল অবস্থায় সচেতনভাবে পর্যবেক্ষণ করাই সম্যক স্মৃতি। সম্যক স্মৃতি কুশল চেতনাকে সর্বদা জাগ্রত রাখে। চিত্তকে নিয়ন্ত্রণ করে। কুশল ও অকুশল কর্মের পার্থক্য বুঝতে সহায়তা করে। অকুশলকর্ম বর্জন করে কুশলকর্ম করার চিন্তা করাই সম্যক স্মৃতি। স্মৃতিহীন মানুষ মাঝিবিহীন নৌকার মতো।

সম্যক সমাধি: চিত্তের একাগ্রতা সাধনই সম্যক সমাধি। চঞ্চল চিত্তকে সংযত করার প্রচেষ্টাই হচ্ছে সমাধি। চিত্ত সংযত না হলে কোনো কাজ সঠিকভাবে সম্পাদন সম্ভব নয়। তাই সকলের সমাধি চর্চা করা উচিত।

অনুশীলনমূলক কাজ
সম্যক দৃষ্টি বলতে কী বুঝায়?
সম্যক জীবিকার বর্ণনা দাও।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...