বৌদ্ধধর্মে বন্দনার গুরুত্ব অপরিসীম। বন্দনার প্রকৃত উদ্দেশ্য শ্রদ্ধা নিবেদন করা, গুণীর গুণরাশির স্তুতি বা প্রশংসা করা। ত্রিরত্ন বন্দনায় বুদ্ধরত্ন, ধর্মরত্ন এবং সংঘরত্ন এই তিনটি রত্নের স্তুতি করা হয়। ত্রিরত্নের গুণরাশি স্মরণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। ত্রিরত্ন বন্দনার বিভিন্ন গাথা আছে। কখনো ছোট গাথায় আবার কখনো বড় গাথায় ত্রিরত্ন বন্দনা করা হয়। এ অধ্যায়ে ছোট গাথায় যে ত্রিরত্ন বন্দনা করা হয় তা পাঠ করব।

বন্দনারত বালক-বালিকা
এ অধ্যায় শেষে আমরা -
- ত্রিরত্ন সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে পারব।
- ত্রিরত্ন বন্দনা পালি ভাষায় আবৃত্তি করতে পারব।
- ত্রিরত্ন বন্দনার বাংলা বলতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন

বৌদ্ধদের প্রাত্যহিক ধর্মীয় কর্মের মধ্যে ত্রিরত্ন বন্দনা অন্যতম। বৌদ্ধদের প্রতিটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ত্রিরত্ন বন্দনা করা হয়। আমরা এখন ত্রিরত্ন কী সে সম্পর্কে ধারণা লাভ করব। বৌদ্ধধর্মে বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘকে অমূল্যরত্ন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিচে ত্রিরত্নের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।
বুদ্ধরত্ন: ত্রিরত্নের মধ্যে প্রথম রত্ন হচ্ছে বুদ্ধরত্ন। 'বুদ্ধ' শব্দের অর্থ মহাজ্ঞানী। বুদ্ধ জ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তাই বুদ্ধকে মহাজ্ঞানী বলা হয়। তিনি জন্ম-জন্মান্তরে দশ পারমী পূর্ণ করেছিলেন। শেষ জীবনে ছয় বছর কঠোর সাধনা করে বুদ্ধ হয়েছেন। শ্রেষ্ঠ বুদ্ধরত্নকে আমরা পবিত্র মনে শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিবেদন করি। তাঁর মহাগুণের প্রশংসা করি। তাঁর মহাজ্ঞানের প্রশংসা করি। যে বন্দনার মাধ্যমে মহামানব বুদ্ধের মহাজ্ঞানের অনন্ত গুণরাশির স্মরণ ও স্তুতি করা হয় এবং তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় তাকে বুদ্ধ বন্দনা বলে।
ধর্মরত্ন: ত্রিরত্নের মধ্যে দ্বিতীয় রত্ন হচ্ছে 'ধর্ম'। 'ধর্ম' শব্দের অর্থ ধারণ করা বোঝায়। এখানে 'ধর্ম' বলতে সদাচার, নৈতিকতা এবং সততাকে বোঝায়। অর্থাৎ যা ধারণ করলে জীবন সুন্দর হয় তাই ধর্ম। বুদ্ধ প্রচারিত বাণী বা মতবাদকে বৌদ্ধধর্ম বলা হয়। যে বন্দনার মাধ্যমে বুদ্ধ প্রচারিত ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও স্তুতি করা হয় তাকে ধর্ম বন্দনা বলে।
সংঘরত্ন: ত্রিরত্নের মধ্যে 'সংঘ' হচ্ছে তৃতীয় রত্ন। 'সংঘ' শব্দের সাধারণ অর্থ বহুজনের সমষ্টি বা সমাবেশ। এখানে 'সংঘ' বলতে বুদ্ধ প্রতিষ্ঠিত মহান ভিক্ষুসংঘকে বোঝানো হয়েছে। ভিক্ষুসংঘ বুদ্ধের নিয়ম-শৃঙ্খলা, আদেশ মেনে লোভ-দ্বেষ-মোহবিহীন, সৎ, নৈতিক ও পবিত্র জীবনযাপন করে। তাঁরা বুদ্ধ শাসনে নিজেদের উৎসর্গ করেন। বৌদ্ধধর্মে ভিক্ষুরা শ্রদ্ধা ও দানের উত্তম পাত্র। যে বন্দনার মাধ্যমে বুদ্ধ প্রতিষ্ঠিত ভিক্ষু সংঘের স্তুতি ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় তাকে সংঘ বন্দনা বলে।
অনুশীলনমূলক কাজ |
ত্রিরত্ন বন্দনা করার পূর্বে অবশ্যই আমাদের বেশকিছু নিয়ম পালন করতে হয়। নিয়মগুলো হলো: বন্দনা বিহারে এবং গৃহে বুদ্ধমূর্তির সামনে করা হয়। সকাল-সন্ধ্যা দুই বেলা বন্দনা করা হয়। বন্দনার পূর্বে হাত-মুখ ভালো করে ধুয়ে নিতে হয়। বন্দনায় পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অপরিহার্য। পবিত্র মনে বুদ্ধমূর্তির সামনে হাঁটু ভেঙে বসে প্রথমে ত্রিশরণসহ পঞ্চশীল গ্রহণ করতে হয়। তারপর ত্রিরত্ন বন্দনা করতে হয়। তারপর অন্যান্য বন্দনা করা হয়। বন্দনা শেষ হলে ভিক্ষু এবং অন্য বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করতে হয়।
অনুশীলনমূলক কাজ |
বুদ্ধং বন্দামি
ধম্মং বন্দামি
সংঘং বন্দামি
অহং বন্দামি সব্বদা।
দুতিযম্মি বুদ্ধং বন্দামি
দুতিযম্পি ধম্মং বন্দামি
দুতিযম্পি সংঘং বন্দামি
অহং বন্দামি সব্বদা।
ততিযম্পি বুদ্ধং বন্দামি
ততিযম্পি ধম্মং বন্দামি
ততিযম্পি সংঘং বন্দামি
অহং বন্দামি সব্বদা।
ত্রিরত্ন বন্দনা (বাংলা অনুবাদ):
আমি বুদ্ধকে বন্দনা করছি
আমি ধর্মকে বন্দনা করছি
আমি সংঘকে বন্দনা করছি
আমি সর্বদা বন্দনা করছি।
দ্বিতীয়বার আমি বুদ্ধকে বন্দনা করছি
দ্বিতীয়বার আমি ধর্মকে বন্দনা করছি
দ্বিতীয়বার আমি সংঘকে বন্দনা করছি
সর্বদা আমি বন্দনা করছি।
তৃতীয়বার আমি বুদ্ধকে বন্দনা করছি
তৃতীয়বার আমি ধর্মকে বন্দনা করছি
তৃতীয়বার আমি সংঘকে বন্দনা করছি
আমি সর্বদা বন্দনা করছি।
বুদ্ধ বন্দনা
যো সন্নিসিন্নো বরবোধিমূলে
মারং সসেনং মহতিং বিজেত্বা
সম্বোধিমাগঞ্চি অনন্ত ঞাণো.
লোকুত্তমো তং পণমামি বুদ্ধং।
বাংলা অনুবাদ: যিনি অনন্ত জ্ঞানী শ্রেষ্ঠ সম্যক সম্বুদ্ধ বোধিমূলে বসে সৈন্যসহ মারকে পরাজিত করে সম্বোধি লাভ করেছেন আমি সেই বুদ্ধকে প্রণাম জানাচ্ছি।
ধম্ম বন্দনা
অষ্ঠঙ্গিকো অরিযপথো জনানং
মোঘল্পবেসাযুজুকো'ব মঙ্গো,
ধম্মো অযং সন্তিকরো পণীতো
নীয্যা ণকো তং পণমামি ধম্মং।
বাংলা অনুবাদ: যে ধর্ম আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ (পথ) বিশিষ্ট, সকল লোকের মুক্তির জগতে প্রবেশের সোজা পথ, শান্তিকর, প্রণীত বা শ্রেষ্ঠ এবং যেই ধর্ম নির্বাণে নিয়ে যায়, সে ধর্মকে প্রণাম জানাচ্ছি।
সংঘ বন্দনা
সংঘো বিসুদ্ধো বর দখিণেয্যো
সন্তিন্দ্রিযো সবক্ষমলপ্পহীনো,
গুণেহি নেকেহি সমিদ্ধিপত্তো
অনাসবো তং পণমামি সংঘং।
বাংলা অনুবাদ: যে সংঘ বিশুদ্ধ, উত্তম দানের পাত্র, শান্তন্দ্রিয়, সকল প্রকার পাপমল বিনাশকারী, অনেক গুণে গুণান্বিত সেই অনাসব সংঘকে আমি প্রণাম জানাচ্ছি।
অনুশীলনমূলক কাজ |
শব্দার্থ: ত্রিরত্ন তিনটি রত্ন (বুদ্ধরত্ন, ধর্মরত্ন এবং সংঘরত্ন), ধম্ম ধর্ম, সংঘ সমষ্টি, বিশেষ করে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বোঝায়, অহং আমি, সব্বদা সব সময়, যো যিনি, মারং মার, লোকুত্তমো - শ্রেষ্ঠ, বিজেত্বা জয় করে, সম্বোধিমাগঞ্চি সম্বোধি লাভ করেছেন, অঙ্গিকো আটটি মার্গ, উজু-সহজ ও সরল, বিসুদ্ধো বিশুদ্ধ, মা মার্গ, সন্তিন্দ্রিযো শান্তন্দ্রিয়, সন্তিকরো শান্তিকর, গুণেহি-গুণের অধিকারী, নেকেহি অনেক, অনাসবো অনাসব বা অনাসক্ত ।
শূন্যস্থান পূরণ কর
১. বৌদ্ধদের প্রাত্যহিক ধর্মীয় কর্মের মধ্যে ___ __ বন্দনা অন্যতম।
২. বন্দনার পূর্বে ____ ভালো করে ধুয়ে নিতে হয়।
৩. সংঘো ____ বর দুখিনেয্যো।
৪. যা ধারণ করলে _____ সুন্দর হয় তাই ধর্ম।
৫. তাঁরা বুদ্ধ ____ নিজেদের উৎসর্গ করেন।
সংক্ষিপ্ত-উত্তর প্রশ্ন
১. বন্দনা বলতে কী বুঝায়?
২. বুদ্ধরত্ন কী?
৩. সংঘরত্ন কী?
বর্ণনামূলক প্রশ্ন
১. ত্রিরত্ন বন্দনার তাৎপর্য ব্যাখ্যা কর।
২. তুমি কীভাবে ত্রিরত্ন বন্দনা করবে- তা বর্ণনা কর।
৩. বুদ্ধ ও সংঘ বন্দনার বাংলা অনুবাদ লেখ।
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১. কোন বন্দনার মাধ্যমে ত্রিরত্নের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা যায়?
ক. বুদ্ধ বন্দনা
খ. ধর্ম বন্দনা
গ. সংঘ বন্দনা
ঘ. ত্রিরত্ন বন্দনা
২. বুদ্ধকে মহাজ্ঞানী বলার অন্যতম কারণ কোনটি?
ক. দশ পারমী পূর্ণ করায়
খ. মারকে পরাজিত করায়
গ. জ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হওয়ায়
ঘ. পবিত্র জীবন যাপন করায়
নিচের অনুচ্ছেদ পড় এবং ৩ ও ৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দাও -
বিভাস চাকমা সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বিদ্যালয় থেকে ফেরার পথে প্রতিদিন দুপুরে বিহারের সামনে দাঁড়িয়ে সে বন্দনা করত। বন্দনা করার সময় সে হাতমুখ ধৌত কিংবা স্নান করা-এসব নিয়ম-নীতি অনুসরণ করত না। বিভাসের এ বন্দনা লক্ষ করে একদিন বিহারের ভিক্ষু তাকে বন্দনার নিয়ম-নীতি অনুসরণ করে বন্দনা করার পরামর্শ দেন।
৩. বিভাস চাকমার পালিত কর্মে কোন বন্দনার ইঙ্গিত করা হয়েছে?
ক. বুদ্ধরত্ন
গ. ত্রিরত্ন
খ. ধর্মরত্ন
ঘ. পিতৃ-মাতৃ বন্দনা
৪. উক্ত বন্দনার ফলে-
i. পবিত্র জীবনযাপন করা যায়
ii. দুঃখ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়
iii. নির্বাণ সুখ লাভ করা যায়
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i
খ. i ও ii
গ. ii ও iii
ঘ. i, ii ও iii
১। শ্রাবণী বড়ুয়া তাঁর মাতার কাছ থেকে প্রার্থনার নিয়ম-কানুন শিখে তা অনুসরণ করেন। তিনি গৃহে ও বিহারে গিয়ে প্রার্থনা করেন এবং মহাজ্ঞানীর গুণরাশি স্মরণ ও শ্রদ্ধা করেন। তা ছাড়া তিনি শ্রদ্ধাদানের উত্তম পাত্রে সঠিকভাবে পূজা ও অর্চনা করেন।
ক. 'বন্দনা' শব্দের অর্থ কী?
খ. কীভাবে বন্দনা করতে হয়?
গ. শ্রাবণী বড়ুয়া কোন রত্নের গুণটি অনুসরণ করেন? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. শ্রাবণীর অনুসরণীয় নীতির দ্বারা ইহ ও পরজীবনে কী ফল লাভ করতে পারবে বলে মনে কর তা পাঠ্যপুস্তকের আলোকে ব্যাখ্যা কর।
২ । পিম্পু বড়ুয়া বিহারাধ্যক্ষের নিকট পঞ্চশীল গ্রহণ করেন, শীল গ্রহণ শেষে বাড়িতে সন্ধ্যার সময়-
যো সন্নিসিন্নো বরবোধিমূলে
মারং সসেনং মহতিং বিজেত্বা,
সম্বোধিমাগঞ্চি অনন্ত ঞাণো
লোকুত্তমো তং পণমামি বুদ্ধং।
ইত্যাদি নিজের ভাষায় রপ্ত করলেন। পরবর্তীতে অন্য রত্নগুলোর তারতম্য মর্ম উপলব্ধি করে প্রতিদিন শ্রদ্ধাভরে প্রার্থনা করতেন।
ক. ত্রিরত্ন কী?
খ. বন্দনার অন্যতম উদ্দেশ্যটি ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকে পিম্পু বড়ুয়ার সান্ধ্যকালীন প্রার্থনায় যে গুণটি প্রকাশ পায় তা বর্ণনা কর।
ঘ. পিম্পু বড়ুয়ার ধর্মচর্চা ব্যক্তি জীবনে কী প্রভাব ফেলবে তা পাঠ্যপুস্তকের আলোকে ব্যাখ্যা কর।