অষ্টশীল পালনের সুফল (পাঠ ৭)

শীল - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

269

অষ্টশীল পালনের সুফল অনেক। অষ্টশীল পালনের সুফলসমূহ নিম্নরূপ:
অষ্টশীল পালনের ফলে

ক. আচার-আচরণ সংযত হয়।
খ. যশ-খ্যাতি ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।
গ. ধন-সম্পদ সুরক্ষিত থাকে।
ঘ. সৎ কাজে উৎসাহ বৃদ্ধি পায়।
ঙ. অভাবগ্রস্ত হয় না।
চ. প্রিয়ভাজন হওয়া যায়।
ছ. সংযম ও সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পায়।
জ. মন থেকে হিংসা বিদ্বেষভাব দূর হয়।
ঝ. নীরোগ ও দীর্ঘজীবি হয়।
ঞ. অশেষ পুণ্য অর্জিত হয়।
ট. নির্বাণের পথে অগ্রসর হওয়া যায়।

এখন আমরা উপোসথ পালনের সুফল সম্পর্কে একটি কাহিনি পড়ব। উপোসথ শীল পালনের সুফল বর্ণনা করতে গিয়ে বুদ্ধ তাঁর পূর্বজীবনের এ ঘটনাটি বলেন।
বোধিসত্ত্ব একবার বারানসিতে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তখন রাজগৃহ নগরীতে এক সৎ ধনী ব্যক্তি বাস করতেন। তিনি প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী হলেও খুব দয়াবান ছিলেন। পরের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে খুবই ব্যথিত করত।

তিনি পরের দুঃখ-কষ্ট দূর করার চেষ্টা করতেন। তা ছাড়া তাঁর পরিবারের সবাই শীল পালন করতেন। উপোসথ দিবসে উপোসথ পালন করতেন। এজন্য তাঁর পরিবার সকলের নিকট 'শুচি পরিবার' নামে পরিচিত ছিল।

বোধিসত্ত্ব তখন পরের কাজ করে জীবনধারণ করতেন। একদিন তিনি কাজের সন্ধানে বের হয়ে সেই ধনী লোকটির বাড়িতে উপস্থিত হন। গৃহকর্তাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে বললেন, আমি কাজের আশায় আপনার কাছে এসেছি। তখন গৃহকর্তা বললেন, আমার ঘরের দাস-দাসীসহ সকলেই শীল পালন করে। উপোসথ শীল রক্ষা করে। তুমিও যদি শীল রক্ষা করো তবে কাজ পাবে।

বোধিসত্ত্বের অন্তরে সুপ্ত ছিল জন্ম-জন্মান্তরের পুণ্যফল। তাঁর অন্তরে ছিল শীলের প্রভাব। তিনি কি এ ধরণের শর্ত গ্রহণ না করে পারেন? শীল পালনের নাম শুনে তিনি মনে আনন্দ লাভ করলেন। তখন বোধিসত্ত্ব বললেন, প্রভু! আমি তাই করব।

তারপর বোধিসত্ত্ব ঐ ধনী লোকের বাড়িতে অত্যন্ত সততার সাথে কাজ করতে থাকেন। তাঁর একমাত্র চিন্তা ছিল প্রভুর মঙ্গল সাধন করা। প্রতিদিনের মতো একদিন তিনি সকালে উঠে কাজে চলে যান। সেদিন ছিল উপোসথ দিবস। কিন্তু বোধিসত্ত্ব তা ভুলে গিয়েছিলেন। এদিকে গৃহকর্তা দাস-দাসীসহ সকলকে নিয়ে উপোসথ শীল গ্রহণ করেন। বিকালে তাঁরা নীরব স্থানে বসে শীলানুস্মৃতি ভাবনা করছিলেন। সন্ধ্যায় বোধিসত্ত্ব কাজ করে বাড়িতে ফিরে এসে দেখেন কোথাও কেউ নেই। সমস্ত বাড়ি নিস্তব্ধ। এদিকে সারাদিন কাজ করতে গিয়ে তিনি কোনো আহার গ্রহণ করতে পারেননি। পেটে ক্ষুধা। একজন দাসী তাঁকে দেখতে পেয়ে খাবার নিয়ে এলো। খেতে বসে বোধিসত্ত্ব চিন্তা করলেন অন্যদিন কত লোক থাকে। আজ আমি ছাড়া আর কেউ নেই। এর কারণ জানতে চাইলে দাসীটি বলল, আজ উপোসথ দিবস। সকলে উপোসথ পালন করছেন। দাসীর মুখে এ ধরনের কথা শুনে তাঁর পেটের ক্ষুধা উধাও হয়ে গেল। তখন তিনি ভাবলেন, আজ আমিও উপোসথব্রত পালন করব। এই বলে তিনি আহার না করে উঠে গেলেন।

তারপর গৃহকর্তার নিকট গিয়ে বোধিসত্ত্ব বললেন, 'প্রভু! আমার ভুল হয়ে গেছে। আজ উপোসথ তা আমি জানতাম না। তাই সকালে উপোসথ গ্রহণ করতে পারিনি। আমি এখন অষ্টশীলসহ উপোসথশীল গ্রহণ করতে চাই। প্রভু, আমি তা পারব কি?' তখন গৃহকর্তা বললেন, অর্ধেক দিন পালন করলে ফলও অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে বোধিসত্ত্ব অষ্টশীল গ্রহণ করে শীলানুস্মৃতি ভাবনা করতে থাকেন। সারাদিন পরিশ্রম করেছেন। তাই বেশিক্ষণ তিনি ভাবনা করতে পারেননি। ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তবু উপোসথ শীল পালনের সংকল্প করলেন।

রাত গভীর হলো। হঠাৎ করে তিনি পেটে বেদনা অনুভব করলেন। ক্রমে তাঁর বেদনা বাড়তে থাকে। সীমাহীন যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করতে থাকেন। তা গৃহকর্তার কানে গেল। তিনি তাঁকে খাবার খেতে বললেন। কিন্তু বোধিসত্ত্ব কোনো খাবার গ্রহণ করলেন না। তিনি গৃহকর্তাকে বললেন, মৃত্যু হলেও আমি আহার গ্রহণ করব না।

বোধিসত্ত্ব আহার গ্রহণ না করে চলে যাচ্ছেন

ভোর বেলা বারানসিরাজ প্রাত-ভ্রমণে বের হলেন। ভ্রমণের একপর্যায়ে সেই ধনী ব্যক্তির বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হন। বোধিসত্ত্ব রাজাকে দেখে চিনতে পারলেন। এ সময় বোধিসত্ত্ব মৃতপ্রায়। এ সময় রাজাকে দেখতে পেয়ে তাঁর অন্তর আনন্দে ভরে গেল। তখন তিনি ভাবলেন, আমি যদি পরজন্মে রাজা হতে পারতাম! এ ধরনের চিন্তা করতে করতে তিনি মারা গেলেন। শীলবান ব্যক্তি মৃত্যুর সময় যেরূপ ইচ্ছা পোষণ করেন, মৃত্যুর পর সে ইচ্ছা পূরণ হয়। অশেষ পুণ্যফলে বোধিসত্ত্ব বারানসি রাজার পুত্র হয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। তখন তাঁর নাম হয় উদয় কুমার। শীল পালনের ফলে বোধিসত্ত্ব রাজপুত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেন।

অনুশীলনমূলক কাজ
অষ্টশীল পালনে বর্ণিত সুফল ছাড়া অনুরূপ আর কী কী সুফল পাওয়া যায়, তার একটি তালিকা প্রস্তুত কর (দলীয় কাজ)।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...