গৌতম বুদ্ধের জীবন নৈতিক ও মানবিক গুণাবলিতে ভরপুর। তিনি জন্ম-জন্মান্তরে দশ পারমীর চর্চা করে নৈতিক চরিত্রের উৎকর্ষতা সাধনপূর্বক বুদ্ধত্ব লাভ করেছেন। তিনি শুধু নিজেই নৈতিক জীবনযাপন করেননি, তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্য এবং অনুসারীদেরও নৈতিক জীবনযাপনের শিক্ষা দিয়েছেন। নৈতিকতা ছিল তাঁর ধর্মবাণীর মূল ভিত্তি। নিচে গৌতম বুদ্ধের জীবনে নৈতিকতা প্রদর্শনের দুটি ঘটনা এবং নৈতিক উপদেশ সম্পর্কে জানব।
কাহিনি: ১
গৌতম বুদ্ধ জন্ম-জন্মান্তরে নৈতিক জীবনযাপন করেছেন। কোনো বাধা-বিঘ্নই তাঁকে নৈতিকতার আদর্শ হতে চ্যুত করতে পারেনি। বুদ্ধত্ব লাভের পূর্বে তিনি বোধিসত্ত্ব অবস্থায়ও নৈতিক জীবনযাপন করে মানবিক কর্ম সম্পাদন করতেন। এখন এরূপ একটি কাহিনি পাঠ করব।
অতীতে বোধিসত্ত্ব মগধ রাজ্যের মচল গ্রামের এক মহাকুলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নাম ছিল মঘ কুমার। বড় হলে লোকে তাঁকে 'মঘ মানবক' নামে ডাকত। মচল গ্রামে সে সময় ত্রিশ ঘর লোক বাস করত। মঘ মানবক গ্রামবাসীর কল্যাণে সর্বদা নিয়োজিত থাকতেন। সেই গ্রামের যুবকগণ হত্যা, চুরি, মিথ্যাচার, ব্যভিচার, নেশাদ্রব্য সেবন প্রভৃতি অপকর্মে লিপ্ত ছিল। মঘ মানবক তাদের কুশলকর্ম করার জন্য সংগঠিত করেন। এদের নিয়ে তিনি গ্রামের রাস্তাঘাট নির্মাণ, মেরামত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতেন। সেতু নির্মাণ করতেন। রাস্তার খাদে আটকে যাওয়া গাড়ির চাকা ওঠাতে সাহায্য করতেন। পুষ্করিণী খনন, বৃক্ষরোপণ, জমিচাষের জন্য জলাধার ও ধর্মশালা নির্মাণ প্রভৃতি জনহিতকর কাজ করতেন। দানাদি পুণ্যকর্ম সম্পাদন করতেন। যুবকগণ বোধিসত্ত্বের উপদেশমতো সকল প্রকার অকুশলকর্ম পরিত্যাগ করে পঞ্চশীল পালন করতে শুরু করেন। ফলে গ্রামে হত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যাচার, নেশা সেবন ইত্যাদি অপরাধ বন্ধ হয়ে যায়। তখন গ্রামের গ্রামপ্রধান ভাবলেন, 'আগে যুবকেরা নেশা খেয়ে মারামারি, কাটাকাটি করত। এতে নেশাদ্রব্যের ব্যবসা এবং জরিমানা দ্বারা আমার অনেক আয় রোজগার হতো। এখন বোধিসত্ত্বের নৈতিক শিক্ষার কারণে আমার আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেল।' এরূপ ভেবে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্প করলেন।

যুবকগণ সাঁকো মেরামত করছে
একদিন গ্রামপ্রধান রাজার কাছে গেলেন। তিনি বোধিসত্ত্ব ও যুবকদের বিরুদ্ধে রাজার নিকট নালিশ করলেন, 'মহারাজ! গ্রামে একদল ডাকাত জুটেছে; তারা লুটপাট ও নানা উপদ্রব করে বেড়াচ্ছে।' রাজা গ্রামপ্রধানের কথা শুনে তাদের ধরে আনার নির্দেশ দিলেন। রাজার আদেশে প্রহরীগণ বোধিসত্ত্ব ও যুবকদের বন্দি করে আনল। রাজা তাদের কোনো কথা না শুনেই হাতির পায়ের তলায় পিষ্ট করে মারার নির্দেশ দিলেন। প্রহরীরা বন্দীদের রাজপ্রাসাদের সামনে রাস্তায় হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখে হাতি আনতে গেল। তখন বোধিসত্ত্ব তাঁর সঙ্গীদের বলতে লাগলেন, 'ভাইগণ! শীলগুণ স্মরণ করে মৈত্রী ভাবনা কর। গ্রামপ্রধান, রাজা ও হস্তী কারও প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ো না, সকলেই আমাদের প্রিয়জন।' এদিকে তাঁদের পিষ্ট করার জন্য হাতি আনা হলো। কিন্তু মাহুত বারবার চেষ্টা করেও হাতিকে বন্দিদের কাছে নিয়ে যেতে পারল না। হাতি বন্দিদের দেখামাত্র বিকট শব্দ করতে করতে পালিয়ে গেল। তাদের হত্যা করার জন্য আরও হাতি আনা হলো। সেই হাতিগুলোও একইভাবে পালিয়ে গেল। রাজা ভাবলেন, নিশ্চয়ই বন্দিদের কাছে এমন কোনো ঔষধ আছে যার জন্য হাতিগুলো কাছে যেতে পারছে না। কিন্তু অনুসন্ধান করে তাদের নিকট কোনো ঔষধ পাওয়া গেল না। তখন রাজার মনে হলো তারা মন্ত্র প্রয়োগ করছে। অতঃপর রাজা তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি কোনো মন্ত্র প্রয়োগ করছ? বোধিসত্ত্ব বললেন, হ্যাঁ মহারাজ! আমরা মন্ত্র প্রয়োগ করছি বটে। রাজা মন্ত্র জানতে চাইলে বোধিসত্ত্ব বললেন, 'আমরা অন্য কোনো মন্ত্র জানি না। তবে আমরা প্রাণী হত্যা করি না। চুরি করি না। কুপথে চলি না। মিথ্যা বলি না। সুরাপান করি না। জনহিতকর কাজ করি। সকলের প্রতি মৈত্রী প্রদর্শন করি। যথাসাধ্য দান করি। পুষ্করিণি খনন করি। ধর্মশালা নির্মাণ করি। এরূপ নানা জনহিতকর কাজ করি। অপরের ক্ষতি হয় এরূপ কাজ করি না। অপরকে কষ্ট দিই না। এই আমাদের মন্ত্র। এই আমাদের শক্তি। মৈত্রী ভাবনা আমাদের মূল মন্ত্র।'
এ কথা শুনে রাজা খুবই প্রসন্ন হলেন। তিনি বোধিসত্ত্ব ও যুবকদের নৈতিক ও জনহিতকর কাজের প্রশংসা করে পুরস্কৃত করলেন।
কাহিনি: ২
বুদ্ধত্ব লাভের পর গৌতম বুদ্ধ পঁয়তাল্লিশ বছর সকল প্রাণীর দুঃখমুক্তির জন্য ধর্ম প্রচার করেন। এসময় তিনি ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি সকল প্রাণীর সেবা ও কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। তাঁর শিষ্য-প্রশিষ্য এবং অনুসারীদের নৈতিক ও মানবিক কর্ম সম্পাদনের উপদেশ দিতেন। এখানে আমরা বুদ্ধের জীবনে নৈতিকতা প্রদর্শনের একটি কাহিনি পাঠ করব।

বুদ্ধ চর্মরোগী ভিক্ষুর সেবা করছেন
একটি ছোট বিহারে কয়েকজন ভিক্ষু থাকতেন। সেই বিহারে তিষ্য নামে একজন ভিক্ষু ছিলেন, যাঁর সাথে কারও সদ্ভাব ছিল না। সবাই তাঁকে এডিয়ে চলতেন। একবার তিনি ভীষণ চর্মরোগে আক্রান্ত হন। তাঁর গায়ের ক্ষত থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে লাগল। এরকম যন্ত্রণাকাতর অবস্থায়ও তাঁর সেবায় কেউ এগিয়ে এলো না। হঠাৎ বুদ্ধ এ বিহারে আগমন করলে সেবা-শুশ্রুষাবিহীন মারাত্মক রোগাক্রান্ত এ ভিক্ষুকে দেখেন। বুদ্ধ নিজেই সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সেবায় লেগে যান।
তিনি সেবক আনন্দকে নিয়ে নিজ হাতে রোগীর ক্ষতস্থান পরিষ্কার করেন। তাঁকে স্নান করান। তারপর গা মুছিয়ে পরিষ্কার বিছানায় শুইয়ে দেন। বুদ্ধ বিহারের ভিক্ষুদের ডেকে রোগাক্রান্ত ভিক্ষুকে সেবা না করার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। বুদ্ধ তাঁদের কাছ থেকে সমস্ত ব্যাপার শুনে খুব অসন্তুষ্ট হন। তিনি তাঁদের আচরণকে অনৈতিক ও অমানবিক বলে তিরস্কার করেন এবং হিংসা-বিদ্বেষ পরিত্যাগ করার উপদেশ দেন। অতঃপর তিনি তাঁদের বললেন, 'দরিদ্রের সহায় হওয়া, অরক্ষিতকে রক্ষা করা, রোগীর সেবা করা, মোহাচ্ছন্নকে মোহমুক্ত করা সকলের নৈতিক কর্তব্য।' তিনি আরও বললেন, 'এ জগতে মাতা-পিতা, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ, আর্তপীড়িত এবং গুরুজনের সেবায় সুখ লাভ করা যায়।'
উপদেশ দানের পর বুদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য নিয়ম প্রবর্তন করলেন: অসুখের সময় শিষ্য গুরুর, গুরু শিষ্যের, সতীর্থ সতীর্থের সেবা করবে।
গৌতম বুদ্ধের নৈতিক উপদেশ
বুদ্ধ ধর্ম-দেশনার সময় অনেক নৈতিক উপদেশ দান করেছেন। এগুলো ত্রিপিটকের গ্রন্থসমূহে সংকলিত আছে। নিচে বুদ্ধের কিছু নৈতিক উপদেশ তুলে ধরা হলো:
১. মৈত্রী দ্বারা ক্রোধকে জয় করবে। অসাধুকে সাধুতা দ্বারা জয় করবে। কৃপণকে দান দ্বারা জয় করবে। আর মিথ্যাবাদীকে সত্য দ্বারা জয় করবে।
২. মা যেমন তার একমাত্র পুত্রকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করে থাকে, সেরূপ সকল প্রাণীর প্রতি অপ্রমেয় মৈত্রীভাব পোষণ করবে।
৩. রাগের সমান অগ্নি নেই। দ্বেষের সমান গ্রাসকারী নেই। মোহের সমান জাল নেই। তৃষ্ণার সমান নদী নেই। তাই রাগ-দ্বেষ-মোহ ও তৃষ্ণা পরিত্যাগ করতে হবে।
৪. দন্ড এবং মৃত্যুকে সকলেই ভয় করে। জীবন সকলেরই প্রিয়। তাই সকলকে নিজের সাথে তুলনা করে আঘাত কিংবা হত্যা করবে না।
৫. পাপী মিত্র ও অধম ব্যক্তির সংসর্গ না করা উচিত। কল্যাণমিত্র এবং সাধু ব্যক্তির সংসর্গ করবে।
৬. আরোগ্য পরম লাভ, সন্তুষ্টি পরম ধন, বিশ্বাস পরম জ্ঞাতি, নির্বাণ পরম সুখ।
৭. বহুসত্য বিষয়ে জ্ঞান লাভ করা, বহুশিল্প শিক্ষা করা, বিনয়ে সুশিক্ষিত হওয়া, মিথ্যা ও বৃথা বাক্য ত্যাগ করে সুভাষিত বাক্য বলাই উত্তম মঙ্গল।
৮. মাতা-পিতার সেবা করা, স্ত্রী-পুত্রের উপকার সাধন করা এবং নিষ্পাপ ব্যবসা বাণিজ্য দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা উত্তম মঙ্গল।
৯. মূর্খের সেবা না করা, পণ্ডিত ব্যক্তির সেবা করা এবং পূজনীয় ব্যক্তির পূজা করা উত্তম মঙ্গল।
১০. দুর্দমনীয়, চঞ্চল, যথেচ্ছ বিচরণশীল চিত্তকে দমন করাই মঙ্গলজনক। সংযত চিত্তই সুখের কারণ।
১১. সঠিকপথে পরিচালিত চিত্ত যতটুকু উপকার করতে পারে মাতা-পিতা বা আত্মীয় স্বজনও তা করতে পারে না।
১২. জ্ঞানী ব্যক্তির জয়, অজ্ঞানী ব্যক্তির পরাজয় ঘটে। ধর্মানুরাগী জয়ী হন কিন্তু ধর্ম হিংসাকারীর পরাজয় ঘটে।
১৩. ক্রোধ সংবরণ কর। অহংকার পরিত্যাগ কর। সকল বন্ধন অতিক্রম কর। নাম-রূপে অনাসক্ত ব্যক্তি দুঃখে পতিত হন না।
১৪. নিজেই নিজের ত্রাণ কর্তা। অন্য কেউ নয়। নিজেকে সুসংযত করতে পারলে মানুষ নিজের মধ্যেই দুর্লভ আশ্রয় লাভ করতে পারে।
১৫. চন্দন, টগর, পদ্ম অথবা চামেলি ফুলের সুগন্ধও চরিত্রবান ব্যক্তির সৌরভকে অতিক্রম করতে পারে না।
১৬. অল্প বুদ্ধিসম্পন্ন মূর্খেরা দুঃখদায়ক পাপ কাজের দ্বারা নিজেকে নিজের শত্রুতে পরিণত করে।
অনুশীলনমূলক কাজ |