বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার-প্রসারে সম্রাট অশোকের অবদান (পাঠ ৩)

বৌদ্ধধর্মে রাজন্যবর্গের অবদান: সম্রাট অশোক - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

1k

বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারে সম্রাট অশোকের অবদান সর্বজন স্বীকৃত। ধর্ম প্রচারক হিসেবে তাঁর খ্যাতি পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছিল। তিনি মৌর্য সম্রাটগণের চিরাচরিত প্রমোদ ভ্রমণ বন্ধ করে দেন। তার পরিবর্তে সর্বপ্রাণীর কল্যাণ কামনায় তিনি বুদ্ধের বাণী প্রচার ও তীর্থ ভ্রমণের জন্য ধর্মযাত্রার ব্যবস্থা করেন। ধর্ম প্রচারের জন্য 'ধর্মমহামাত্র' নামে এক বিশেষ শ্রেণির রাজকর্মচারি নিযুক্ত করেন। তাঁরা নগরে প্রান্তরে সর্বত্র ধর্মনীতি প্রচার করতেন। তিনি প্রজাদের ধর্মশিক্ষার জন্য স্থানে স্থানে, পর্বতগাত্রে, প্রস্তর স্তম্ভে ধর্মবাণীসমূহ খোদিত করান। নিজেও বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দর্শনে যেতেন। কথিত আছে, সম্রাট অশোক বুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ স্মরণীয় করে রাখার জন্য চুরাশি হাজার বিহার, চৈত্য, স্তূপ ও স্তম্ভ নির্মাণ করান। বিহারের জন্য ভূমি দান করেন।

সম্রাট অশোকের সময়ে বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা এবং ভিক্ষু শ্রমণের লাভ-সৎকার বৃদ্ধি পায়। তখন অন্যান্য সম্প্রদায়ের তীর্থিক সন্ন্যাসীগণ ভিক্ষুর ছদ্মবেশ ধারণ করে সংঘে প্রবেশ করে সুযোগ-সুবিধা লাভকরতে থাকেন। তাঁরা বৌদ্ধ বিনয় বিধান মানতেন না। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতেন না। সর্বদা ভোগবিলাসে মত্ত থাকতেন। নিজেদের মতবাদ বুদ্ধবাণী হিসেবে প্রচার করতেন। তাঁদের দাপটে ধর্মপ্রাণ ভিক্ষুগণ কোণঠাসা হয়ে পড়েন। ফলে সংঘে অরাজকতা দেখা দেয়। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ধর্মপ্রাণ ভিক্ষুগণ অবিনয়ী ছদ্মবেশধারী ভিক্ষুদের সঙ্গে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। এ কারণে পাটলীপুত্রে দীর্ঘদিন উপোসথ বন্ধ ছিল। সম্রাট অশোক এ খবর শুনে খুবই অসন্তুষ্ট হন। তিনি ভিক্ষুদের উপোসথ পালন করানোর জন্য অমাত্যকে নির্দেশ দেন। বিনয়ী ভিক্ষুগণ অবিনয়ী ভিক্ষুদের সঙ্গে উপোসথ পালন করতে অস্বীকৃতি জানালে অমাত্য বহু বিনয়ী ভিক্ষুর প্রাণসংহার করেন।

এ খবর শুনে সম্রাট অশোক খুবই মর্মাহত হন। মূর্খ অমাত্যের হত্যাজনিত পাপের জন্য তিনি ভিক্ষুসংঘের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি মোগলীপুত্র তিষ্য থের'র নিকট প্রকৃত বুদ্ধ মতবাদ জ্ঞাত হয়ে অবিনয়ী ছদ্মবেশধারী ভিক্ষুদের সংঘ হতে বহিষ্কার করেন। সংঘ পুনরায় বিশুদ্ধ হয়। সংঘে পুনরায় শান্তি ফিরে আসে। তারপর বিনয়ী ভিক্ষুগণ একত্রিত হয়ে উপোসথ পালন করেন। অতঃপর পুনরায় বুদ্ধের ধর্মবাণী সংগ্রহের জন্য পাটলীপুত্রের অশোকারামে তৃতীয় সঙ্গীতির আহবান করেন। এ সঙ্গীতিতে মোগলীপুত্র তিষ্য থের'র নেতৃত্বে বুদ্ধবাণী সংগৃহীত হয়। মোগলীপুত্র তিষ্য থের ভিন্নমতাবলম্বীদের মতবাদ খন্ডনের নিমিত্তে এই সঙ্গীতিতে 'কথাবন্ধু' নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। বুদ্ধবাণীর সার প্রতিফলিত হওয়ায় গ্রন্থটি ত্রিপিটকের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তৃতীয় সঙ্গীতির পর সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারের জন্য কাশ্মীর, গান্ধার, মহিষমণ্ডল, বনবাস, অপরান্ত, মহারাষ্ট্র, যোন, হিমবন্ত প্রদেশ, সুবর্ণভূমি এবং লঙ্কাদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কায় ধর্মদূত প্রেরণ করেন। তিনি নিজের পুত্র মহেন্দ্রকে ভিক্ষু এবং কন্যা সংঘমিত্রাকে ভিক্ষুণী ধর্মে দীক্ষা দান করেন এবং শ্রীলঙ্কায় ধর্ম প্রচারের জন্য প্রেরণ করেন। তাঁদের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম প্রচার-প্রসার লাভ করে। সম্রাট অশোক শ্রীলঙ্কায় পবিত্র মহাবোধির শাখাও প্রেরণ করেন। এভাবে সম্রাট অশোকের অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষকতায় বৌদ্ধধর্ম ভারতের সীমারেখা অতিক্রম করে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।

অশোক স্তম্ভ

সম্রাট অশোক নিজে যেমন ধর্মপ্রাণ ছিলেন তেমনি প্রজাদেরও ধর্মপ্রাণ হতে নির্দেশ দিতেন। তিনি প্রজাদের ধর্মবোধ জাগ্রত করতে সমগ্র রাজ্যের পর্বত গাত্রে, স্তম্ভে এবং শিলালিপিতে বুদ্ধবাণী লিখে রাখতেন।

ধর্মবাণী প্রচারের মাধ্যমে তিনি মানুষের নৈতিক উৎকর্ষ সাধন করতে চেয়েছিলেন। তাঁর অনুশাসনে উল্লেখ আছে: 'ধর্ম প্রচার অতি শ্রেষ্ঠ কর্ম। দুঃশীলের পক্ষে ধর্মদান ও ধর্মাচরণ অসম্ভব। ধর্মাচরণের শ্রেষ্ঠত্ব ও বৃদ্ধি কাম্য। এ লক্ষ্য প্রসারিত হোক।'

সম্রাট অশোক ছিলেন আদর্শ নরপতি ও মহৎ প্রাণের মানুষ। তিনি নিজের সুখভোগ ত্যাগ করেছিলেন। প্রজাদের কল্যাণ সাধনই ছিল তাঁর ব্রত। অসাধারণ কর্মবীর, শাসনপটু, ধার্মিক ও মানব হিতৈষী নরপতি সম্রাট অশোক ছত্রিশ বছর রাজত্ব করে খ্রিষ্টপূর্ব ২৩২ অব্দে মৃত্যুবরণ করেন। বৌদ্ধধর্মের শ্রেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক এবং দানবীর হিসেবে তিনি বিশ্বের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।

অনুশীলনমূলক কাজ
সংঘ কীভাবে বিশুদ্ধ হয়েছিল?
সম্রাট অশোক যেসব রাজ্যে ধর্মপ্রচারক প্রেরণ করেছিলেন তার একটি তালিকা প্রস্তুত কর।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...