'শীল' নৈতিক জীবন গঠনের দিক নির্দেশনা। শীল পালন বৌদ্ধদের অপরিহার্য নিত্যকর্ম। গৃহে কিংবা বিহারে যে কোনো আচার-অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে শীল গ্রহণ করা হয়। কারণ, শীল সকল কুশলকর্মের উৎস। বৌদ্ধরা বিভিন্ন রকম শীল পালন করেন। যেমন: গৃহীরা পঞ্চশীল ও অষ্টশীল, শ্রমণরা দশশীল এবং ভিক্ষুগণ ২২৭টি শীল পালন করেন। এ অধ্যায়ে আমরা অষ্টশীল সম্পর্কে পড়ব।
এ অধ্যায় শেষে আমরা -
- অষ্টশীল বর্ণনা করতে পারব।
- অষ্টশীল পালনের প্রয়োজনীয়তা ও নিয়মাবলি ব্যাখ্যা করতে পারব।
- অষ্টশীল গ্রহণকারীর করণীয় বর্ণনা করতে পারব।
- বাংলা অর্থসহ অষ্টশীল বলতে পারব।
- অষ্টশীল অনুশীলনের মাধ্যমে অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার উপায়সমূহ চিহ্নিত করতে পারব।
- অষ্টশীল প্রার্থনার প্রক্রিয়া প্রদর্শন করতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মহামায়া অষ্টশীল গ্রহণ করতে চায়। এ কারণে সে অষ্টশীল গ্রহণের নিয়মাবলি সম্পর্কে জানতে চায়। সুদীপ অষ্টশীল গ্রহণের কয়েকটি নিয়ম তাঁকে বলে। সুদীপ অষ্টশীল পালনের সুফল সম্পর্কেও মহামায়াকে ধারণা দেয়।
পূর্বে আমরা পঞ্চশীল সম্পর্কে জেনেছি। আজ অষ্টশীল সম্পর্কে জানব। অষ্টশীল পঞ্চশীলের উচ্চতর স্তর। প্রতিদিন পঞ্চশীল পালন করা যায়। অষ্টশীলও প্রতিদিন পালন করা যায়। তবে, গৃহী বৌদ্ধরা সাধারণত পূর্ণিমা, অমাবস্যা এবং অষ্টমী তিথিতে অষ্টশীল পালন করে। বুদ্ধ ধর্মময় উন্নত জীবন গঠনের জন্য অষ্টশীলের প্রবর্তন করেছেন। অষ্টশীল পালনকারীকে উপবাসব্রত পালন করতে হয়। তাই অষ্টশীলকে উপোসথ শীলও বলা হয়। অষ্টশীল গ্রহণকারীকে উপোসথিক বলে। 'উপোসথ' শব্দটি উপবাস বা উপবাসক শব্দ হতে গৃহীত। কিন্তু বৌদ্ধমতে, উপোসথ অর্থ কেবল উপবাস করা নয়। উপোসথ গ্রহণকারীকে ধ্যান-সমাধি চর্চা করতে হয়। ধর্মালোচনা শ্রবণ করতে হয়। ধর্মীয় বিষয় অধ্যয়ন করতে হয়। কুশল ভাবনায় নিমগ্ন থাকতে হয়। লোভ-দ্বেষ-মোহ ও তৃষ্ণা মুক্ত হয়ে ব্রহ্মচর্য পালন করতে হয়। 'অষ্ট' শব্দের অর্থ আট। আটটি শীল পালন করতে হয় বলে একে অষ্টশীল বলা হয়।
অষ্টশীল গ্রহণের পূর্বে মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয়। ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সম্পন্ন করে পরিষ্কার পোশাক পরিধান করতে হয়। পূজা ও দান সামগ্রী নিয়ে বিহারে যেতে হয়। বুদ্ধবেদিতে শ্রদ্ধাচিত্তে পূজা ও দান সামগ্রী সুন্দরভাবে সাজিয়ে রেখে ভিক্ষুর সামনে বসতে হয়।
অষ্টশীল গ্রহণের নিয়মাবলি
বিহারে ভিক্ষুকে বন্দনা করে ভিক্ষুর নিকট ত্রিশরণসহ অষ্টশীল প্রার্থনা করতে হয়। ভিক্ষু অষ্টশীল প্রার্থনা অনুমোদন করে ত্রিশরণসহ অষ্টশীল প্রদান করেন। ভিক্ষুর নির্দেশনা মতো অষ্টশীল গ্রহণ করতে হয়। নিজ বাড়িতেও অষ্টশীল গ্রহণ করা যায়। সে ক্ষেত্রে বুদ্ধাসনের সামনে বসে নিজে নিজে অষ্টশীল প্রার্থনাসহ অষ্টশীল গ্রহণ করতে হয়। অষ্টশীল প্রার্থনাটি নিম্নরূপ।
অনুশীলনমূলক কাজ |
ওকাস অহং ভন্তে তিসরণেনসহ অঙ্গসমন্নাগতং উপোসথসীলং ধম্মং যাচামি, অনুগ্গহং কত্বা সীলং দেখ মে ভন্তে। দুতিযম্পি ওকাস অহং ভন্তে তিসরণেনসহ অঙ্গসমন্নাগতং উপোসথসীলং ধম্মং যাচামি, অনুগ্রহং কত্বা সীলং দেখ মে ভন্তে।
ততিযম্পি ওকাস অহং ভন্তে তিসরণেনসহ অঙ্গসমন্নাগতং উপোসথসীলং ধম্মং যাচামি, অনুগ্গহং কত্বা সীলং দেখ মে ভন্তে।
বাংলা অনুবাদ: ভন্তে, অবকাশ পূর্বক সম্মতি প্রদান করুন, আমি ত্রিশরণসহ অষ্টাঙ্গ সংযুক্ত উপোসথ শীল-ধর্ম প্রার্থনা করছি। ভন্তে, অনুগ্রহ করে আমাকে শীল প্রদান করুন।
দ্বিতীয়বার ভন্তে, অবকাশ পূর্বক সম্মতি প্রদান করুন, আমি ত্রিশরণসহ অষ্টাঙ্গ সংযুক্ত উপোসথ শীল-ধর্ম প্রার্থনা করছি। ভন্তে, অনুগ্রহ করে আমাকে শীল প্রদান করুন।
তৃতীয়বার ভন্তে, অবকাশ পূর্বক সম্মতি প্রদান করুন, আমি ত্রিশরণসহ অষ্টাঙ্গ সংযুক্ত উপোসথ শীল-ধর্ম প্রার্থনা করছি। ভন্তে, অনুগ্রহ করে আমাকে শীল প্রদান করুন।
ভিক্ষু: যমহং বদামি তং বদেথ (আমি যা বলছি তা বলুন)
শীল গ্রহণকারী: আম ভন্তে (হ্যাঁ প্রভু বলছি)
ভিক্ষু: নমোত ভগবতো অরহতো সম্মাসম্বুদ্ধস্স (আমি অর্হৎ সম্যক সম্বুদ্ধকে বন্দনা করছি)।
শীল গ্রহণকারী: নমোতস ভগবতো অরহতো সম্মাসমুদ্ধস্স (তিনবার বলবেন)।
তারপর ভিক্ষু ত্রিশরণ প্রদান করে বলবেন: সরণাগমনং সম্পূন্নং (শরণ গ্রহণ সম্পূর্ণ হলো)।
শীল গ্রহণকারী: আম ভন্তে (হ্যাঁ ভন্তে)
তারপর ভিক্ষু অষ্টশীল প্রদান করবেন। শীল গ্রহণকারী তা মুখে মুখে বলবেন।
অষ্টশীল প্রার্থনা শেষ হলে উপস্থিত ভিক্ষু বলবেন, তিসরণেন সদ্ধিং অঙ্গ সমন্নাগতং উপোসথসীলং ধম্মং সাধুকং সুরক্ষিতং কত্বা অল্পমাদেন সম্পাদেথ (ত্রিশরণসহ অষ্টাঙ্গ সমন্বিত উপোসথ শীলধর্ম উত্তমরূপে সযত্নে পালন কর)।
অষ্টশীল গ্রহণকারী বলবেন, আম ভন্তে (হ্যাঁ ভন্তে)
এরপর ভিক্ষু অষ্টশীল পালনকারী কিংবা উপোসথধারীদের মঙ্গল কামনা করে সূত্র পাঠ করবেন। সূত্র পাঠ শেষ হলে তাঁরা তিনবার সাধুবাদ দিবেন। তারপর অষ্টশীল গ্রহণকারী ভিক্ষুকে বন্দনা করে আহার করতে যাবেন। দুপুর বারোটার মধ্যে আহার সম্পন্ন করতে হবে। তারপর পানীয় ছাড়া কিছুই গ্রহণ করা যাবে না। অষ্টশীলের প্রতিটি শীল সযত্নে পালন করতে হবে।
অনুশীলনমূলক কাজ |
অষ্টশীল: পালি
পাণাতিপাতা বেরমণী সিক্সাপদং সমাদিযামি।
অদিন্নাদানা বেরমণী সিঙ্গাপদং সমাদিযামি।
অব্রহ্মচরিযা বেরমণী সিদ্ধাপদং সমাদিযামি।
মুসাবাদা বেরমণী সিঙ্গাপদং সমাদিযামি।
সুরা-মেরেষ-মজ্জ পমাদঠানা বেরমণী সিদ্ধাপদং সমাদিযামি।
বিকালভোজনা বেরমণী সিদ্ধাপদং সমাদিযামি।
নচ্চ-গীত-বাদিত-বিসুকদসন-মালা-গন্ধ-বিলেপন-ধারণমন্ডন-বিভূসনটানা বেরমণী সিদ্ধাপদং সমাদিযামি।
উচ্চসযনা-মহাসযনা বেরমণী সিদ্ধাপদং সমাদিযামি।
অষ্টশীল: বাংলা
আমি প্রাণিহত্যা থেকে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
আমি অদত্ত বস্তু গ্রহণ থেকে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
আমি অব্রহ্মচর্য থেকে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
আমি মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
আমি সুরা জাতীয় বা কোনো নেশাদ্রব্য গ্রহণ হতে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
আমি বিকাল ভোজন থেকে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
আমি নাচ-গান-বাদ্য উৎসব দর্শন, সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধন দ্রব্য ধারণ মন্ডন বিভূষণ থেকে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।
আমি উচ্চ শয্যা বা মহাশয্যা থেকে বিরত থাকব, এ শিক্ষাপদ গ্রহণ করছি।

ভিক্ষু হতে অষ্টশীল গ্রহণ করছে
অনুশীলনমূলক কাজ |
সংসারে অবস্থান করে সব সময় অষ্টশীল পালন করা সম্ভব নয়। উপোসথ দিবসে অষ্টশীল গ্রহণকারীদের যথাসম্ভব বিহারে অবস্থান করে ধর্মশ্রবণ, ধর্মালোচনা, সূত্রপাঠ, ধ্যান-সাধনা, অধ্যয়ন প্রভৃতি করা উচিত। তবে একটা বিষয় বলা দরকার যে, সব সময় ভিক্ষু উপস্থিত নাও থাকতে পারেন। সেক্ষেত্রে অষ্টশীল গ্রহণকারীগণ নিজেরা ধর্মালোচনা, সূত্রপাঠ, অধ্যয়ন এবং ধ্যান-সাধনায় মগ্ন থাকতে পারেন। শীলভঙ্গ হয় এমন স্থানে না যাওয়া উচিত।
নিচে অষ্টশীল পালনকারীদের কিছু করণীয় বিষয় তুলে ধরা হলো।
১. কারও অনিষ্ট কামনা করা কিংবা অনিষ্ট করা বা করানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
২. কোনো প্রাণীকে পীড়া দেওয়া এবং পীড়াদানের কারণ হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
৩. কোনো প্রকার অন্যায় করা কিংবা অন্যায়ের কারণ হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
৪. লোভ-দ্বেষ-মোহ মুক্ত থাকতে হবে।
৫. মান-অভিমান ও ঈর্ষা থেকে মুক্ত থাকতে হবে।
৬. সর্ব প্রকার মিথ্যাচার থেকে বিরত থাকতে হবে।
৭. প্রমাদমূলক বিনোদন থেকে বিরত থাকতে হবে।
৮. ধর্মীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে হবে।
৯. একাগ্রচিত্তে ধর্মদেশনা শুনতে হবে।
১০. কায়মনোবাক্যে সংযত আচরণ করতে হবে।
১১. সকলের প্রতি মৈত্রীপরায়ণ হতে হবে।
১২. ভাবনা অনুশীলন করতে হবে।
অনুশীলনমূলক কাজ |
অষ্টশীলের নির্দেশিত বিধি-বিধান মেনে চললে আদর্শ এবং নৈতিক জীবনযাপন করা যায়। অষ্টশীল পালন না করলে মানুষ অনৈতিক কাজের দিকে ধাবিত হয়। এই অনৈতিক কাজের কারণে মানুষ সীমাহীন দুঃখ ও নরকযন্ত্রণা ভোগ করে। অনৈতিক কাজের কিছু ক্ষতিকর দিক নিচে তুলে ধরা হলো:
ক. প্রাণিহত্যা একটি অনৈতিক কাজ। বৌদ্ধমতে প্রাণিহত্যা করা অনুচিত। হত্যা প্রবণতা মনের মৈত্রীভাব নষ্ট করে। মানুষকে ক্রুদ্ধ ও প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে। ফলে নানা রকম সামাজিক অপরাধ সংঘটিত হয়।
খ. অদত্ত বস্তু গ্রহণ বা নিজের অধিকারে নেওয়া একটি অনৈতিক কাজ এবং সামাজিক অপরাধ। এর জন্য দণ্ডভোগ করতে হয়। পরকালেও শাস্তি পেতে হয়।
গ. অনৈতিক কামাচার একটি সামাজিক অপরাধ। ব্রহ্মচর্য পালনকারীকে সকল প্রকার কামাচার থেকে বিরত থাকতে হয়। অনৈতিক কামাচারে শারীরিক ও মানসিক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। এ কারণে মৃত্যুও হতে পারে।
ঘ. মিথ্যাকথা বলা নৈতিকতার পরিপন্থি। মিথ্যাবাদীকে কেউ বিশ্বাস করে না। মিথ্যাবাদী সমাজে মর্যাদা পায় না। সর্বত্র নিন্দিত হয়।.
ঙ. নেশাদ্রব্য গ্রহণ ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ। নেশা স্বাস্থ্য নষ্ট ও মানসিক বিকারগ্রস্ত করে। নেশায় আসক্তির ফলে ধন-সম্পদ নষ্ট হয়। চরিত্র ও মানবিক মূল্যবোধের অধঃপতন হয়। নেশা সেবনকারীরা নানারকম অপরাধে লিপ্ত হয়। এরা নানারকম ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।
চ. দুপুর বারোটার পর খাবার গ্রহণ করাকে বিকাল ভোজন বলা হয়। খাবারের প্রতি আসক্তি ও অপরিমিত আহার দান, শীল, ধ্যান-সমাধি ইত্যাদি ধর্মচর্চা ব্যাহত করে। ফলে নির্বাণের পথে পরিচালিত হওয়া যায় না।
ছ. নাচ, গান, বাদ্য-বাজনা, সুগন্ধি-প্রসাধন লেপন ইত্যাদিতে অনুরক্তভাব মনের একাগ্রতা নষ্ট করে। ধর্মচর্চা ব্যাহত হয়। ফলে দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ সম্ভব হয় না।
জ. বিলাসবহুল শয্যায় শয়ন ও উপবেশন মানুষকে আরামপ্রিয় ও অলস করে তোলে। মানসিক ও চারিত্রিক দৃঢ়তা নষ্ট হয় বলে অলস ব্যক্তি কখনোই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না।
অষ্টশীল পালনের সুফল অনেক। অষ্টশীল পালনের সুফলসমূহ নিম্নরূপ:
অষ্টশীল পালনের ফলে
ক. আচার-আচরণ সংযত হয়।
খ. যশ-খ্যাতি ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।
গ. ধন-সম্পদ সুরক্ষিত থাকে।
ঘ. সৎ কাজে উৎসাহ বৃদ্ধি পায়।
ঙ. অভাবগ্রস্ত হয় না।
চ. প্রিয়ভাজন হওয়া যায়।
ছ. সংযম ও সহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পায়।
জ. মন থেকে হিংসা বিদ্বেষভাব দূর হয়।
ঝ. নীরোগ ও দীর্ঘজীবি হয়।
ঞ. অশেষ পুণ্য অর্জিত হয়।
ট. নির্বাণের পথে অগ্রসর হওয়া যায়।
এখন আমরা উপোসথ পালনের সুফল সম্পর্কে একটি কাহিনি পড়ব। উপোসথ শীল পালনের সুফল বর্ণনা করতে গিয়ে বুদ্ধ তাঁর পূর্বজীবনের এ ঘটনাটি বলেন।
বোধিসত্ত্ব একবার বারানসিতে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তখন রাজগৃহ নগরীতে এক সৎ ধনী ব্যক্তি বাস করতেন। তিনি প্রচুর ধন-সম্পদের অধিকারী হলেও খুব দয়াবান ছিলেন। পরের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে খুবই ব্যথিত করত।
তিনি পরের দুঃখ-কষ্ট দূর করার চেষ্টা করতেন। তা ছাড়া তাঁর পরিবারের সবাই শীল পালন করতেন। উপোসথ দিবসে উপোসথ পালন করতেন। এজন্য তাঁর পরিবার সকলের নিকট 'শুচি পরিবার' নামে পরিচিত ছিল।
বোধিসত্ত্ব তখন পরের কাজ করে জীবনধারণ করতেন। একদিন তিনি কাজের সন্ধানে বের হয়ে সেই ধনী লোকটির বাড়িতে উপস্থিত হন। গৃহকর্তাকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে বললেন, আমি কাজের আশায় আপনার কাছে এসেছি। তখন গৃহকর্তা বললেন, আমার ঘরের দাস-দাসীসহ সকলেই শীল পালন করে। উপোসথ শীল রক্ষা করে। তুমিও যদি শীল রক্ষা করো তবে কাজ পাবে।
বোধিসত্ত্বের অন্তরে সুপ্ত ছিল জন্ম-জন্মান্তরের পুণ্যফল। তাঁর অন্তরে ছিল শীলের প্রভাব। তিনি কি এ ধরণের শর্ত গ্রহণ না করে পারেন? শীল পালনের নাম শুনে তিনি মনে আনন্দ লাভ করলেন। তখন বোধিসত্ত্ব বললেন, প্রভু! আমি তাই করব।
তারপর বোধিসত্ত্ব ঐ ধনী লোকের বাড়িতে অত্যন্ত সততার সাথে কাজ করতে থাকেন। তাঁর একমাত্র চিন্তা ছিল প্রভুর মঙ্গল সাধন করা। প্রতিদিনের মতো একদিন তিনি সকালে উঠে কাজে চলে যান। সেদিন ছিল উপোসথ দিবস। কিন্তু বোধিসত্ত্ব তা ভুলে গিয়েছিলেন। এদিকে গৃহকর্তা দাস-দাসীসহ সকলকে নিয়ে উপোসথ শীল গ্রহণ করেন। বিকালে তাঁরা নীরব স্থানে বসে শীলানুস্মৃতি ভাবনা করছিলেন। সন্ধ্যায় বোধিসত্ত্ব কাজ করে বাড়িতে ফিরে এসে দেখেন কোথাও কেউ নেই। সমস্ত বাড়ি নিস্তব্ধ। এদিকে সারাদিন কাজ করতে গিয়ে তিনি কোনো আহার গ্রহণ করতে পারেননি। পেটে ক্ষুধা। একজন দাসী তাঁকে দেখতে পেয়ে খাবার নিয়ে এলো। খেতে বসে বোধিসত্ত্ব চিন্তা করলেন অন্যদিন কত লোক থাকে। আজ আমি ছাড়া আর কেউ নেই। এর কারণ জানতে চাইলে দাসীটি বলল, আজ উপোসথ দিবস। সকলে উপোসথ পালন করছেন। দাসীর মুখে এ ধরনের কথা শুনে তাঁর পেটের ক্ষুধা উধাও হয়ে গেল। তখন তিনি ভাবলেন, আজ আমিও উপোসথব্রত পালন করব। এই বলে তিনি আহার না করে উঠে গেলেন।
তারপর গৃহকর্তার নিকট গিয়ে বোধিসত্ত্ব বললেন, 'প্রভু! আমার ভুল হয়ে গেছে। আজ উপোসথ তা আমি জানতাম না। তাই সকালে উপোসথ গ্রহণ করতে পারিনি। আমি এখন অষ্টশীলসহ উপোসথশীল গ্রহণ করতে চাই। প্রভু, আমি তা পারব কি?' তখন গৃহকর্তা বললেন, অর্ধেক দিন পালন করলে ফলও অর্ধেক হবে। এ কথা শুনে বোধিসত্ত্ব অষ্টশীল গ্রহণ করে শীলানুস্মৃতি ভাবনা করতে থাকেন। সারাদিন পরিশ্রম করেছেন। তাই বেশিক্ষণ তিনি ভাবনা করতে পারেননি। ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তবু উপোসথ শীল পালনের সংকল্প করলেন।
রাত গভীর হলো। হঠাৎ করে তিনি পেটে বেদনা অনুভব করলেন। ক্রমে তাঁর বেদনা বাড়তে থাকে। সীমাহীন যন্ত্রণায় তিনি ছটফট করতে থাকেন। তা গৃহকর্তার কানে গেল। তিনি তাঁকে খাবার খেতে বললেন। কিন্তু বোধিসত্ত্ব কোনো খাবার গ্রহণ করলেন না। তিনি গৃহকর্তাকে বললেন, মৃত্যু হলেও আমি আহার গ্রহণ করব না।

বোধিসত্ত্ব আহার গ্রহণ না করে চলে যাচ্ছেন
ভোর বেলা বারানসিরাজ প্রাত-ভ্রমণে বের হলেন। ভ্রমণের একপর্যায়ে সেই ধনী ব্যক্তির বাড়ির সামনে এসে উপস্থিত হন। বোধিসত্ত্ব রাজাকে দেখে চিনতে পারলেন। এ সময় বোধিসত্ত্ব মৃতপ্রায়। এ সময় রাজাকে দেখতে পেয়ে তাঁর অন্তর আনন্দে ভরে গেল। তখন তিনি ভাবলেন, আমি যদি পরজন্মে রাজা হতে পারতাম! এ ধরনের চিন্তা করতে করতে তিনি মারা গেলেন। শীলবান ব্যক্তি মৃত্যুর সময় যেরূপ ইচ্ছা পোষণ করেন, মৃত্যুর পর সে ইচ্ছা পূরণ হয়। অশেষ পুণ্যফলে বোধিসত্ত্ব বারানসি রাজার পুত্র হয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। তখন তাঁর নাম হয় উদয় কুমার। শীল পালনের ফলে বোধিসত্ত্ব রাজপুত্র হয়ে জন্মগ্রহণ করেন।
অনুশীলনমূলক কাজ |
জগত দুঃখময়। তৃষ্ণাই দুঃখের মূল কারণ। নিয়মিত অষ্টশীল পালন তৃষ্ণা দূরীভূত করতে সহায়তা করে। বুদ্ধ দুঃখমুক্তির উপায় স্বরূপ আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। এগুলো হলো: সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। অষ্টশীল পালনের মাধ্যমে দুঃখ নিরোধের উপায় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুসরণ করা যায়। গৃহী জীবন সর্বদা জাগতিক চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত। এখানে শীল, সমাধি, প্রজ্ঞা ও নির্বাণ সম্পর্কে ভাবনার সুযোগ সীমিত। এক্ষেত্রে অষ্টশীল গ্রহণকারী অন্তত একবেলার জন্য হলেও সাংসারিক কর্মকান্ড থেকে মুক্ত হয়ে অনাগারিক জীবনের স্বাদ লাভ করতে পারেন। এভাবে তিনি ক্রমান্বয়ে নির্বাণের পথে নিজেকে পরিচালিত করতে পারেন। আমাদের চারপাশে অনেক অকুশল কর্মকাণ্ড ঘটতে দেখা যায়। বিশেষ করে হত্যা, চুরি, ব্যভিচার এবং নেশা সেবন বর্তমান সমাজে এক বিরাট সমস্যা। নিয়মিত অষ্টশীল পালনে চিত্ত সংযত হয়। এভাবে আমরা আত্মসংযমের মাধ্যমে অকুশলকর্ম থেকে বিরত থাকতে পারি। ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনযাপন করতে পারি। পারিবারিকভাবে অষ্টশীল পালনের অভ্যাস গড়ে তুললে সুখী পারিবারিক জীবন গঠন করা সম্ভব। এসব বিবেচনা করে বলা যায় অষ্টশীল পালনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
অনুশীলনমূলক কাজ |
শূন্যস্থান পূরণ কর
১. গৃহী বৌদ্ধরা সাধারণত পূর্ণিমা, অমাবস্যা এবং অষ্টমী তিথিতে _____ পালন করে।
২. ভিক্ষুকে বন্দনা করে ____ নিকট ত্রিশরণসহ অষ্টশীল প্রার্থনা করতে হয়।
৩. দুপুর _____ মধ্যে আহার সম্পন্ন করতে হবে।
৪. সকলের প্রতি _____ পরায়ণ হতে হবে।
৫. নিয়মিত অষ্টশীল পালন ______ দূরীভূত করতে সহায়তা করে।
মিলকরণ
| বাম | ডান |
| ১. অষ্টশীল গ্রহণের পূর্বে | উপোসথিক বলে |
| ২. তৃষ্ণাই দুঃখের | অভাবগ্রস্ত হয় না |
| ৩. অষ্টশীল গ্রহণকারীকে | আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ |
| ৪. দুঃখ নিরোধের উপায় | মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয় |
| ৫. অষ্টশীল পালনের ফলে | মূল কারণ |
সংক্ষিপ্ত-উত্তর প্রশ্ন
১. গৃহীরা কখন অষ্টশীল পালন করেন?
২. উপোসথ শীল বলতে কী বুঝায়?
৩. অষ্টশীল পালনকারীর পাঁচটি করণীয় বিষয় লেখ।
৪. আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গসমূহের নাম লেখ।
বর্ণনামূলক প্রশ্ন
১. অষ্টশীল গ্রহণের নিয়মাবলি বর্ণনা কর।
২. অষ্টশীল গ্রহণকারীর করণীয় বিষয় সম্পর্কে লেখ।
৩. অষ্টশীল পালনের সুফলসমূহ বর্ণনা কর।
৪. বুদ্ধের পূর্বজীবনে উপোসথ শীল পালনের কাহিনি বর্ণনা কর।
বহুনির্বাচনি প্রশ্ন
১। ভিক্ষুগণ কয়টি শীল পালন করেন?
ক) ২২৫
খ) ২২৬
গ) ২২৭
ঘ) ২২৮
২। কোন শীলকে উপোসথ শীল বলা হয়?
ক) পঞ্চশীল
খ) অষ্টশীল
গ) দশশীল
ঘ) পাতিমোক্ষশীল
৩। অষ্টশীল প্রার্থনা করা হয়
i. বুদ্ধের বন্দনা ও প্রার্থনা করে
ii. পূজা ও দানীয় সামগ্রী বুদ্ধবেদিতে রেখে
iii. ভিক্ষু বন্দনা করে ত্রিশরণসহ প্রার্থনা করে
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) i
খ) ii
গ) ii ও iii
ঘ) i, ii ও iii
নিচের অনুচ্ছেদটি পড় এবং ৪ ও ৫ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দাও -
প্রদীপ বাবুর পরিবারের সবাই মিলে বিশেষ তিথিতে শীল পালনে রত ছিলেন। ঐ দিনই হঠাৎ ঢাকা থেকে এক অতিথি বেড়াতে আসেন। সবাই শীল পালন নিয়ে রত থাকার কারণে অতিথিকে ঠিকমতো আপ্যায়ন করতে পারেননি। অতিথি বিষয়টা বুঝতে পেরে বিহারে গিয়ে শীল গ্রহণ করলেন এবং ধ্যানাবস্থায় গভীর রাতে পেটের যন্ত্রণায় কাতর হলেও কোনোভাবেই শীলভঙ্গ করলেন না।
৪। অনুচ্ছেদের ঘটনাটি কোন মানবের আচরণে পরিলক্ষিত হয়?
ক) দাস-দাসীর
খ) গৃহকর্তার
গ) বোধিসত্ত্বের
ঘ) ভিক্ষুর
৫। উক্ত শীল গ্রহণে অতিথি রত ছিলেন -
i. শীলানুস্মৃতি ভাবনায়
ii. বিদর্শন ভাবনায়
iii. সমথ ভাবনায়
নিচের কোনটি সঠিক?
ক) i
খ) ii
গ) i ও ii
ঘ) i, ii ও iii
সৃজনশীল প্রশ্ন
১। পুষ্পিতা খীসা ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সম্পন্ন করেন। তিনি পরিষ্কার পোশাক পরিধান করে বিহারে গিয়ে বুদ্ধবেদিতে পূজা ও দান সামগ্রী রেখে শীল গ্রহণ করেন। ভিক্ষুর উপদেশ মতো বুদ্ধের আসনের সামনে বসে প্রার্থনা করেন। তিনি দুপুরের খাবারের পর পানীয় ছাড়া কিছু আহার গ্রহণ করতেন না। এভাবে পুষ্পিতা খীসার লোভ, দ্বেষ, মোহ দূর হয় এবং মনে প্রশান্তি বিরাজ করে।
ক) গৃহীরা কোন শীল পালন করেন?
খ) শীল পালন বৌদ্ধদের অপরিহার্য নিত্যকর্ম কেন?
গ) পুষ্পিতা খীসা যে শীল পালন করেন, তা ব্যাখ্যা কর।
ঘ) উক্ত শীল পালনের দ্বারা পুষ্পিতা খীসার পারিবারিক জীবনে কোন আচরণের প্রতিফলন ঘটবে পাঠ্যপুস্তকের আলোকে মতামত দাও।
২। রাজু ও সাজু ঘনিষ্ঠ বন্ধু। রাজুর পরিবারের সবাই ধর্মীয় কার্যাবলি পালনে সচেতন থাকেন। পক্ষান্তরে সাজুর পরিবার ধর্মের প্রতি তেমন আগ্রহী ছিল না। এতে সাজুর মনে অনুশোচনা বিরাজ করত। একপর্যায়ে সাজু একাকী সারাদিন অনাহারে থেকে ধর্মচর্চা পালন করে। অবশেষে ধর্মীয় স্মৃতি মনে নিয়ে সাজু মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং মৃত্যুর পর সে সদ্গতি প্রাপ্ত হয়।
ক) অদিন্নাদানা শব্দের অর্থ কী?
খ) শীল কীভাবে গ্রহণ করতে হয়? ব্যাখ্যা কর।
গ) সাজুর আচরণে কোন কাহিনির মিল খুঁজে পাওয়া যায়? ব্যাখ্যা কর।
ঘ) রাজু ও সাজু কর্মের দ্বারা কী ফল লাভ করবে পাঠ্যপুস্তকের আলোকে বিশ্লেষণ কর।