অপ্রমাদ বর্গের পটভূমি (পাঠ ৪)

সূত্র ও নীতিগাথা - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - সপ্তম শ্রেণি | NCTB BOOK

277

অপ্রমাদ বর্গে ১২টি গাথা আছে। বুদ্ধ গাথাগুলো বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে ভাষণ করেছিলেন। ফলে ধারণা করা যায় যে, অপ্রমাদ বর্গের গাথাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন পটভূমি রয়েছে। এখন অপ্রমাদ বর্গের গাথাগুলোর পটভূমি সম্পর্কে জানব।

জানা যায়, বুদ্ধ অপ্রমাদ বর্গের ১ নং গাথা থেকে ৩ নং গাথা ভাষণ করেছিলেন কৌশাম্বীর অন্তর্গত ঘোষিতারামে অবস্থানকালে। সে সময় মহারাজা উদয়নের প্রধান মহিষী ছিলেন শ্যামাবতী। তিনি ছিলেন বুদ্ধভক্ত। তিনি প্রতিদিন বুদ্ধের ধর্ম শ্রবণের জন্য ঘোষিতারামে যেতেন। রাজার অপর রানি ছিলেন মাগন্ধিয়া। কিন্তু তিনি ছিলেন বুদ্ধ বিদ্বেষী। তিনি রানি শ্যামাবতীর বুদ্ধভক্তি একবারেই সহ্য করতে পারতেন না। তাই তিনি রাজাকে রানি শ্যামাবতীর বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার চেষ্টা করতেন। কিন্তু তাঁর সমস্ত চেষ্টা বিফল হলো। কোনো ক্ষতি করতে না পেরে অবশেষে রানি মাগন্ধিয়া রানি শ্যামাবতীর প্রাসাদে আগুন লাগালেন। পাঁচশ সহচরীসহ রানি শ্যামাবতী আগুনে পুড়ে মারা গেলেন। ষড়যন্ত্র প্রকাশ পেয়ে গেলে রাজা উদয়ন রানি মাগন্ধিয়াকে প্রাণদণ্ডের বিধান দিলেন। এ কাহিনি শুনে বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের উপদেশচ্ছলে প্রথম তিনটি গাথা ভাষণ করেছিলেন।

কুম্ভঘোষক নামে রাজগৃহে এক ধনী গৃহস্থ ছিলেন। পিতৃ-মাতৃহীন কুম্ভঘোষক অনেক সম্পত্তির অধিকারী ছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো বিলাসিতা করতেন না। তিনি সৎভাবে কঠিন পরিশ্রম করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এজন্য রাজা বিম্বিসার তাঁকে শ্রেষ্ঠী উপাধি দিয়ে পুরস্কৃত করেন এবং তাঁর কন্যার সঙ্গে বিবাহ দেন। একদিন রাজা বিম্বিসার কন্যা এবং জামাতাকে বুদ্ধের কাছে নিয়ে গেলেন এবং তাঁদের সব কথা খুলে বলেন। বুদ্ধ তা শুনে পরিশ্রমী আর উদ্যোগী ব্যক্তিদের প্রশংসা করে ৪নং গাথাটি ভাষণ করেন।

রাজগৃহের অধিবাসী মহাপন্থক ভিক্ষুব্রত গ্রহণ করার অল্প সময়ের মধ্যেই অর্হত্ব লাভ করেন। তখন তিনি তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা চুল্লপন্থককে ভিক্ষুব্রতে দীক্ষা প্রদান করেন এবং ভাবলেন সহজে তাঁরও মুক্তি লাভ হবে। চূল্লপন্থক কিন্তু মেধাবী ছিলেন না। দীর্ঘ চার মাস চেষ্টা করেও তিনি একটি গাথা মুখস্থ করতে পারেন নি। ভাইয়ের বুদ্ধির জড়তায় ক্ষুব্ধ হয়ে মহাপ্যক তাঁকে ভিক্ষুসংঘ ছেড়ে চলে যেতে আদেশ দিলেন। ভাইয়ের নির্দেশে তিনি খুব ভোরে যখন বিহার ত্যাগ করে চলে যাচ্ছিলেন তখন বুদ্ধ তাঁকে দেখতে পেলেন। চলে যাবার কারণ শুনে বুদ্ধ তাঁকে একখন্ড কাপড় দিয়ে বললেন, সূর্য উঠলে সূর্যের দিকে তাকিয়ে কাপড়টি নাড়বে। তিনি তা করতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে হাতের ঘাম লেগে কাপড়টি ময়লা হয়ে গেল। চোখের সামনে ক্ষণিকের মধ্যে কাপড়টির অবস্থার পরিবর্তন দেখে তিনি জীবনের অনিত্যতা উপলব্ধি করলেন। তারপর অপ্রমত্ত হয়ে সাধনায় অর্হত্বফল লাভ করেন। বুদ্ধ তাঁর প্রশংসা করে ৫ নং থেকে ৭ নং গাথা ভাষণ করেছিলেন।

বুদ্ধ যখন শ্রাবস্তীর জেতবনে অবস্থান করছিলেন তখন তাঁর প্রধান শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম মহাকশ্যপ থের পিপ্পলী গুহায় ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। সে সময় তাঁর মানসপটে বুদ্ধের এই বাণী, ফুটে উঠল জীবগণের উৎপত্তি আর বিনাশ দুর্জেয়। মাতৃগর্ভে জন্মলাভ করার পর মাতা-পিতার অজ্ঞাতেই কত জীবের মৃত্যু ঘটছে তা একমাত্র সম্যক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি জানেন। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধ ৮ নং গাথাটি ভাষণ করেছিলেন।

বুদ্ধের উপদেশ শুনে দুই ভিক্ষু ধ্যান সাধনার জন্য বনে গেলেন। তাঁদের মধ্যে একজন প্রমাদ এবং আলস্যের কারণে ধ্যান সাধনায় বেশি দূর অগ্রসর হতে পারলেন না। অন্যজন অপ্রমত্ত থেকে অবিচল নিষ্ঠার সঙ্গে ধ্যান সাধনা করতে লাগলেন এবং অর্হত্ব লাভ করলেন। সাধনা শেষ হলে উভয়ে বুদ্ধের কাছে ফিরে এসে যাঁর যেমন ফল লাভ হয়েছে তা বললেন। তাঁদের কথা শুনে বুদ্ধ ৯ নং গাথাটি ভাষণ করেছিলেন।

বৈশালীর কূটাগারশালায় একদিন বুদ্ধ মহালি লিচ্ছবীকে দেবরাজ ইন্দ্রের পূর্ব জন্মকথা শোনাচ্ছিলেন। পূর্বের এক জন্মে ইন্দ্র তেত্রিশজন যুবক নিয়ে এক স্বেচ্ছাসেবক দল গড়েন। তাঁরা মাতা-পিতা ও গুরুজনের সেবা, নগরে ও গ্রামে আবর্জনা পরিষ্কার, সর্বসাধারণের জন্য রাস্তাঘাট নির্মাণ ইত্যাদি কল্যাণকর্মে রত থাকতেন। মৃত্যুর পর তাঁরা সকলে স্বর্গ লাভ করেন এবং ইন্দ্র দেবরাজ হন। এই কাহিনির সূত্র ধরে বুদ্ধ ১০ নং গাথাটি ভাষণ করেছিলেন।

বুদ্ধ জেতবনে অবস্থানকালে এক ভিক্ষু তাঁর নিকট ধ্যান শিক্ষা করে বনে গিয়ে ধ্যান অভ্যাস করতে লাগলেন। কিন্তু অনেক চেষ্টায়ও ফল লাভ না হওয়ায় তিনি বুদ্ধের নিকট ফিরে যাচ্ছিলেন। পথে এক বিরাট দাবাগ্নি তাঁর গতিরোধ করল। তিনি দেখলেন ভীষণ আগুন তাঁর সমস্ত কিছুকে পুড়িয়ে ধবংস করতে দুর্বার গতিতে এগিয়ে আসছে। এই দৃশ্য তাঁর মনে নতুন উৎসাহ ও প্রেরণা এনে দিল। ঐ আগুনের মতোই তিনি সমস্ত বাধাবিঘ্নকে জয় করে সাধন পথে এগিয়ে যাবার সংকল্প করলেন। তাঁর সংকল্পের কথা জানতে পেরে বুদ্ধ ১১ নং গাথাটি ভাষণ করেছিলেন।

ভিক্ষু তিষ্য শ্রাবস্তীর কাছেই নিগম গ্রামে বাস করতেন। বাইরের জগতের সঙ্গে তাঁর কোনো সংস্রব ছিল না, বললেই হয়। নিজের কয়েকজন আত্মীয়-স্বজনের কাছে ভিক্ষা করে যা পেতেন তাতেই তাঁর প্রয়োজন মিটত। এর বেশি কিছুর আকাঙ্ক্ষা তাঁর ছিল না। তাই অনাথপিণ্ডিকের মতো শ্রেষ্ঠীদের মহাদান বা কোশলরাজ প্রসেনজিতের আরও বড় দান- উৎসবে তিষ্যকে কখনো দেখা যায়নি। এ নিয়ে লোকে তাঁকে নিন্দা করত এবং বলত তিষ্য শুধু তাঁর স্বজনদেরই ভালোবাসেন। বুদ্ধ তিষ্যের এই অল্পে তুষ্টি আর লোভহীনতার কথা শুনে তাঁর অনেক প্রশংসা করে অপ্রমাদ বর্গের ১২ নং গাথাটি ভাষণ করেছিলেন।

অনুশীলনমূলক কাজ
অপ্রমাদ বর্গের ১নং থেকে ৩ নং গাথা বুদ্ধ কাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ করেছিলেন?
এবং কেন করেছিলেন বল।
৫ নং থেকে ৭ নং গাথার পটভূমি বর্ণনা কর।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...