আত্মীয়তার সম্পর্কের পদসমূহ (পাঠ-০৫)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজ জীবন - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

507

আত্মীয়তার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করেই মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও সামাজিক জীবন গড়ে উঠে। সংস্কৃতিভেদে আত্মীয়দের ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকার প্রচলন আছে। এই ডাকের মাধ্যমে আমরা একজন আত্মীয়কে চিহ্নিত করি এবং তার সাথে নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ক নির্ণয় করে থাকি। সংস্কৃতিভেদে আত্মীয়দের বোঝানোর জন্য কতগুলো নির্দিষ্ট পদ রয়েছে। এগুলোকে আত্মীয়তার সম্পর্কের পদমালা বলা হয়।
আত্মীয়দের মধ্যে যাকে আমরা যে নামে ডাকি তার সাথে আমাদের আচরণও সে রকম হয়। ডাকের ভিত্তিতে কারও সাথে আমাদের সম্পর্ক হয় বন্ধুত্বপূর্ণ বা কারো সাথে ঠাট্টার আবার কাউকে হয়ত আমরা এড়িয়ে চলতে পছন্দ করি। যেমন, বাঙালিদের সংস্কৃতিতে কাউকে দুলাভাই ডাকা হলে তার সাথে সম্পর্কটাও হয় ঠাট্টার। একই সংস্কৃতিতে যখন কাউকে চাচা ডাকা হয়, তখন তার সাথে দুলাভাইয়ের মতো আচরণ করা হয় না। কারণ সম্পর্কের দিক থেকে চাচা হলেন মুরুব্বি এবং চাচার সাথে ভাতিজার সম্পর্কটা ও স্নেহ ও শাসনের। আবার মামার সাথে ভাগিনার সম্পর্কও অনেক মধুর ও বন্ধুত্বপূর্ণ। চাচা ও মামার সাথে আচরণ বাঙালিদের থেকে মান্দিদের মাঝে কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত। মান্দিদের মাঝে চাচার সাথে সম্পর্ক হয় বন্ধুত্বপূর্ণ এবং মামার সাথে সম্পর্ক হয় স্নেহ ও শাসনের। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রোদের সমাজে যেকোনো ছেলে তার শ্বশুর ও শ্বশুর পক্ষের আত্মীয়দের এড়িয়ে চলে। কেননা, এই সমাজে শ্বশুর ও শ্বশুর পক্ষের আত্মীয়দের সবাইকে একসাথে 'তুতমা' বলা হয় এবং 'তুতমা'-দের সামাজিক মর্যাদা জামাই পক্ষের চেয়ে অনেক বেশি। আত্মীয়তার সম্পর্কের এই পদগুলো দিয়ে আসলে আমরা তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক কি সেটা চিহ্নিত করি এবং তাদের সাথে আমাদের আচরণের ধরন কি সেটাও বুঝি। তাই আত্মীয়দের ডাকার জন্য ব্যবহৃত পদ বা নাম থেকে আমাদের আপন ও দূরের সম্পর্ক এবং সেই আত্মীয়ের সামাজিক গুরুত্ব বুঝতে পারি।
আত্মীয়তার পদমালা সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে, যথা: (১) শ্রেণিকৃত এবং (২) বিস্তারিত।

(১) শ্রেণিকৃত পদমালা

এ ব্যবস্থায় একটি পদ বা নাম দিয়ে কয়েক ধরনের আত্মীয়কে বোঝানো হয়। যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রোদের সমাজে 'নায়' পদটি দিয়ে খালাতো, ফুপাতো ও মামাতো ভাইদের বোঝানো হয়ে থাকে। কিন্তু নিজ গোত্রের সদস্য বলে চাচাতো ভাইকে 'ঈ' বা 'নাওপা' নামে ডাকা হয়। সুতরাং, 'নায়' একটি শ্রেণিকৃত পদ। ইংরেজি 'কাজিন' পদটিও একটি শ্রেণিকৃত পদ।

(২) বিস্তারিত পদমালা

এ ধরনের পদমালায় প্রত্যেক আত্মীয়ের জন্য আলাদা আলাদা নাম থাকে। বাঙালি সংস্কৃতিতে মামাতো, চাচাতো, খালাতো, ফুপাতো ভাই বা বোন বলতে আলাদা ও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বোঝানো হয়।

আত্মীয়তার সম্পর্কের পদমালার ভিত্তিতে দেখা যায় আত্মীয়দের কয়েকটা শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। তবে এ শ্রেণিভাগ সংস্কৃতির নিয়ম অনুসারেই করা হয়ে থাকে। তদনুযায়ী আত্মীয়দের নির্দিষ্ট নামে ডাকার জন্য শ্রেণিভাগ করার কয়েকটি সাংস্কৃতিক নিয়ম নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

পূর্বের ও পরের প্রজন্মের ভিত্তিতে

আত্মীয়তার সম্পর্কের পদমালায় পূর্বের প্রজন্মের সাথে পরের প্রজন্মের আত্মীয়দের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করা হয়। যেমন, বাঙালি সমাজে দাদা-দাদি, নানা-নানি, বাবা-মা, চাচা-চাচি, মামা-মামী, খালা-খালু প্রভৃতি পদ দ্বারা যেকোনো ব্যক্তির আগের প্রজন্মের আত্মীয়দের বোঝানো হয়। আবার ভাগনা-ভাগনি, ভাতিজা-ভাতিজি প্রভৃতি পদ দ্বারা বোঝানো হয় ব্যক্তির পরের প্রজন্মের সদস্য।

নিজ প্রজন্মের ভিত্তিতে

বাঙালি সমাজেই আবার ব্যক্তির সমান প্রজন্মের সবাইকে অন্য প্রজন্মের থেকে আলাদা নামে ডাকা হয়। যেমন, চাচাতো ভাইবোন, মামাতো ভাইবোন, ফুপাতো ভাইবোনরা সবাই ব্যক্তির সমান প্রজন্মের।

বয়সের ভিত্তিতে

আত্মীয়দের সাথে আমাদের বয়সের পার্থক্যভেদে আলাদা আলাদা নামে ডাকা হয়। আমার ছোট ভাইকে যেভাবে ডাকি, সেভাবে কিন্তু বড় ভাইকে ডাকি না। ম্রোদের সমাজে নিজ গোত্রের ও নিজ প্রজন্মের সব ছেলেকে ভাইয়ের মত দেখা হয় এবং বয়সে বড় হলে 'ঈ' আর বয়সে ছোট হলে 'নাওপা' ডাকা হয়।

নারী-পুরুষের ভিত্তিতে

আত্মীয়দের মাঝে নারী ও পুরুষদের জন্য রয়েছে আলাদা পদমালা।

রক্তের এবং বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে

বাঙালি সমাজে বাবা, মা, চাচা প্রভৃতি আমাদের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় কিন্তু ভাবি, চাচি, দুলাভাই ইত্যাদি বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়।

বংশধারার ভিত্তিতে

বাবার ও মায়ের দিকের আত্মীয়দের ডাকের জন্যও আলাদা পদমালা ব্যবহার করা হয়। ম্রোদের সমাজে মায়ের ভাইকে 'পু', বাবার বোনের জামাইকে 'ত্রাগ' এবং বাবার ভাইকে 'পা' পদ দ্বারা বোঝানো হয়।

কাজ-১ : আত্মীয়তার পদমালার তালিকা তৈরি কর।

কাজ-২ : আত্মীয়তার পদমালার ভিত্তিতে আত্মীয়দের শ্রেণিবিভাগ ছকে উপস্থাপন কর।

Content added || updated By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...