ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রত্নঐতিহ্য (চতুর্থ অধ্যায়)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

256

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের বিভিন্ন প্রত্নঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারব এ অধ্যায়ে। কুমিল্লার লালমাই পাহাড়, ময়মনসিংহের মধুপুর গড়, সিলেটের জৈন্তাপুর, হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট, চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় কিছু কিছু প্রত্ন নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাচীন মন্দির ও স্থাপত্য নিদর্শন এবং স্থানীয় রাজন্যবর্গের পুরনো রাজবাড়ি, ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্র, অলংকার, প্রাচীন মুদ্রা, আসবাবপত্র, সীলমোহর, পুঁথি প্রভৃতি। এই অধ্যায়ে আমরা বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রত্নঐতিহ্য এবং তাদের সমৃদ্ধ অতীত ও ইতিহাস সম্পর্কে আলোচনা করব।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-

  • অঞ্চল ভিত্তিতে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রত্ন স্থাপনাসমূহের পরিচয় বর্ণনা করতে পারব।
  • তাদের প্রাত্যহিক জীবনে ব্যবহৃত তৈজসপত্র এবং অলংকারাদির বিবরণ দিতে এবং এসব সামগ্রীর বৈচিত্র্যপূর্ণ দিক শনাক্ত করতে সক্ষম হব।
  • ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ধর্মীয় উপাসনালয়ের স্থাপত্যশৈলী বর্ণনা করতে পারব।
  • তাদের প্রত্ন স্থাপনাসমূহের পরিচিতি এবং অবস্থান জানতে আগ্রহী হব।
  • প্রত্ন স্থাপনাসমূহ পরিভ্রমণে উৎসাহী হব।
Content added By

আমাদের চারপাশে কতো রকমের মানুষ! কতো বিচিত্র তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জীবনযাত্রা! আমরা নানাভাবে পৃথিবীর মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করি। আচ্ছা, তোমাদের মনে কি কখনো প্রশ্ন জেগেছে যে আজকের পৃথিবীর মানুষকে আমরা যেমনটা দেখি, তারা কি চিরকাল এমনটা ছিল? কেমন ছিল বহু বহু বছর আগের মানুষ? কি করেই বা তারা আজকের অবস্থায় এলো? এইসব কৌতূহল থেকেই আমরা মানুষের অতীত অবস্থা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হই।
অনেক হারানো সূত্র খুঁজে বের করতে হয় আমাদের অতীত সম্পর্কে জানতে। এই সূত্রগুলো প্রায়শই থাকে অনেক অস্পষ্ট। তখন আমাদের চলতে হয় অনুমানের ভিত্তিতে। তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে এটা অনেক জটিল ও শ্রমসাধ্য কাজ। তারপরও কিন্তু বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন আমাদের হারানো অতীতের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে। অতীতের মানুষ ও তার সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার জন্য বিজ্ঞানীদের প্রধান দুটি সূত্র হলো (১) আদি মানুষের কঙ্কাল, দেহাবশেষ ও জীবাশ্ম বা ফসিল, এবং (২) আদি মানুষের সংস্কৃতির বস্তুগত বা দৃশ্যমান উপাদানসমূহের অবশিষ্টাংশ। প্রাচীন যুগে মানুষসহ অন্য যেসব প্রাণী বাস করতো তাদের দেহাবশেষের উপর লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মাটি, খনিজ পদার্থ, ধূলিকণা ইত্যাদি জমে জমে তা পাথরের মতো কঠিন রূপ নেয়, যাকে বলা হয় ফসিল বা জীবাশ্ম। আদি মানুষের কঙ্কাল, দেহাবশেষ বা জীবাশ্ম থেকে তাদের দেহাকৃতি, শারীরিক গড়ন, রোগ-বালাই, মৃত্যুর কারণ, খাদ্যাভ্যাস, জিনগত বৈশিষ্ট্য কিংবা তাদের বসবাসের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
আমাদের অতীত সম্পর্কে জানার দ্বিতীয় সূত্রটি হলো মানব সংস্কৃতির বস্তুগত বা দৃশ্যমান উপাদানসমূহ। প্রাচীন মানুষের ব্যবহৃত তৈজসপত্র, হাতিয়ার এবং অন্যান্য দ্রব্যাদির অনেক কিছুই সময়ের সাথে সহজে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না। পাথর কিংবা বিভিন্ন ধাতু নির্মিত অনেক জিনিসপত্র তো লক্ষ লক্ষ বছরেও অবিকৃত থেকে যায়। মাটির নিচে চাপাপড়া অবস্থায় অথবা প্রাচীন গুহার ভিতর থেকে আদি মানুষের ব্যবহৃত এমন অনেক সাংস্কৃতিক নিদর্শনই খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাচীন গুহাচিত্র থেকে শুরু করে আদি মানুষের ব্যবহৃত সকল জিনিসপত্র থেকেই আমরা তখনকার মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে অনুমান করতে পারি। এরপর মানুষ যখন ধীরে ধীরে তাদের ভাষার লিখিত রূপ আবিষ্কার করে এবং বর্ণমালা ব্যবহার শুরু করে তখন থেকে মানুষের ইতিহাসও আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে।

মানব সংস্কৃতির দৃশ্যমান বা বস্তুগত উপাদানগুলো থেকে মানুষ সম্পর্কে অধ্যয়ন করে প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রাচীন মানুষের ব্যবহার্য বিভিন্ন বস্তুসামগ্রী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ছোট্ট পাথরের হাতিয়ার অনেক ধরনের তথ্যের উৎস হতে পারে, কারণ তা মানুষের চিন্তা, শ্রম ও জীবনযাত্রার স্বাক্ষর বহন করে। এ কারণে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা যেকোনো নিদর্শন পেলে বুঝতে চেষ্টা করেন সেটি কোন সময়ের, কীভাবে সেটি তৈরি হলো, কে বা কারা তা বানিয়েছে, কেন বা কি কাজের জন্য বানিয়েছে, কেনইবা এভাবে বানানো হলো। এছাড়া এতে কি উপকরণ ব্যবহার করা হলো, কোথা থেকে কি করে এইসব উপকরণ সংগ্রহ করা হয়েছিল, কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল, কতোটা সময় ও শ্রম লেগেছিল এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকেন। এভাবে তাঁরা ক্রমশ প্রাচীন মানুষের খাদ্যাভ্যাস, প্রযুক্তিজ্ঞান, হাতিয়ার, তৈজসপত্র ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে থাকেন। আর সেই সাথে নানাধরনের যুক্তি-প্রমাণ ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের সমাজ-ব্যবস্থা, বসতি, উৎপাদন পদ্ধতি, ধর্মবিশ্বাস ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেন। এভাবে প্রাচীন ও বর্তমান মানুষের মধ্যে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা এবং এক অঞ্চলের সাথে অন্য অঞ্চলের সংস্কৃতির সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য নিয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেয় প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান।
প্রত্নতত্ত্বের কর্মপদ্ধতি: সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ধাপে ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁদের সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এবার প্রত্ন নিদর্শনের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের কিছু প্রাথমিক ধারণা নিয়ে আলোচনা করছি।
১। প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট বা স্থান নির্বাচন: প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল স্থান নির্বাচন। যেসব
জায়গার ভূ-প্রকৃতি, তার আশেপাশের পরিবেশ ও ছোট-খাটো নিদর্শন বিশ্লেষণ করে মনে হতে পারে যে এখানে আরো নিদর্শন পাওয়া সম্ভব, সেরকম জায়গাকে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা গবেষণা এলাকা হিসেবে নির্বাচন করেন। একে বলা হয় প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট। অনেক সময় হঠাৎ পাওয়া কোনো নিদর্শন বা নমুনা দেখে মনে হতে পারে যে এখানে অনুসন্ধান করলে বা মাটি খনন করলে আরো অনেক নিদর্শন পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সবসময় এমনটা ঘটে না। তখন ভালো করে জরিপ করে সাইট নির্বাচন করতে হয়।
২। বিভিন্ন নমুনা ও নিদর্শন সংগ্রহ: এই ধাপে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সাইট থেকে নানা প্রত্ন নিদর্শন, প্রত্ন বস্তু বা প্রত্ন স্থাপনা ইত্যাদির নমুনা সংগ্রহ করেন। এধরনের কাজে প্রত্নতাত্ত্বিক ও তাঁদের সহযোগীদের বড় দল খনন কাজ ও বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করতে থাকেন। এরপর গবেষণাগারে নমুনাগুলো পরীক্ষা করে সেগুলোর বয়স নির্ধারণ করেন।
৩। লিপিবদ্ধকরণ: সংগৃহীত নিদর্শন ও সূত্রগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করা প্রত্নতাত্ত্বিকের খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিভিন্ন নমুনা ও সূত্র মিলিয়ে তুলনামূলক আলোচনা ও সময়কাল নির্ধারণ করার জন্য এই বিবরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

৪। ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সব প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত, নমুনা, নিদর্শন ও সূত্র বিশ্লেষণ করে প্রত্নতাত্ত্বিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এজন্য তারা বিশ্লেষণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করেন: (ক) ঐ নির্দিষ্ট এলাকার প্রাচীন মানুষের জীবনযাত্রা বা সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা, (খ) পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা এবং (গ) মানব সংস্কৃতির বিকাশ ও পরিবর্তনের ধারা নির্ধারণ।

কাজ- ১ ঃ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রত্নঐতিহ্য আলোচনার মাধ্যমে আমরা কী কী বিষয়ে ধারণা লাভ করব?
Content added By

এই পৃথিবীর ইতিহাস কিংবা মানবজাতির উৎপত্তির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে হলে আমাদের অতীতের বিভিন্ন সময়কাল সম্পর্কে কিছু সাধারণ ধারণা প্রয়োজন। এ জন্য বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অতীতের সময়কে কয়েকভাবে ভাগ করা হয়। পৃথিবীর প্রাকৃতিক অবস্থা ও মানব সংস্কৃতির পরিবর্তন নিয়ে আলোচনার সুবিধার্থে অতীতের সময়কে বিভিন্ন সময়কাল, পর্যায় ও যুগে বিভক্ত করা হয়ে থাকে। এর মধ্য দিয়ে আমরা ধারাবাহিকভাবে অতীতের বিভিন্ন পর্যায়ের ভূপ্রাকৃতিক, মানুষের শারীরিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি। এধরনের তিনটি সময়কাল নিম্নের সারণিতে দেওয়া হলো:

মহাজাগতিক সময়কাল : বিশ্বব্রহ্মান্ড বা মহাবিশ্বের উৎপত্তি, সৃষ্টি ও পরিবর্তনের ধারা নিয়ে আলোচনার জন্য মহাজাগতিক সময়কালকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করা হয়।

ভূতাত্ত্বিক সময়কাল : পৃথিবীর উৎপত্তি আজ থেকে প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে। তখন থেকেই আমাদের পৃথিবীর ভূপ্রকৃতি ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বসবাসযোগ্য হয়েছে। ভূপ্রকৃতির পরিবর্তনের ধারা ও প্রাণের উৎপত্তি অধ্যয়নের জন্য ৪৫০ কোটি বছরকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করে ভূতাত্ত্বিক সময়কাল নির্ধারণ করা হয়।

মানব সময়কাল : মানুষের আবির্ভাব, শারীরিক গঠন ও সংস্কৃতির ধারাবাহিক পরিবর্তন সম্পর্কে জানার জন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানে অতীতের সময়কালকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়ে থাকে।

এই অধ্যায়ে আমরা মানব সময়কাল নিয়ে আলোচনা করব। মানব সময়কালের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে আলোচনার সময় আমরা এ অধ্যায়ের বিভিন্ন পাঠে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের সাংস্কৃতিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারব।

মানব সময়কালের বিভিন্ন পর্যায় ও সংস্কৃতির বিকাশ: প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানে মানবজাতির ঐতিহাসিক সময়কালকে সাধারণত দুটি পর্যায়ে বিভক্ত করা হয়: (১) ঐতিহাসিক পর্যায় বা সময়কাল এবং (২) প্রাগৈতিহাসিক পর্যায় বা সময়কাল। ঐতিহাসিক পর্যায় বা সময়কাল বলতে আমরা যে সময় থেকে মানুষের ভাষার লিখিত রূপ বা পদ্ধতির উদ্ভাবন হয়েছে সেই সময়কালকে বুঝি। বর্ণমালা ও চিত্রলিপির
মাধ্যমে লেখার রীতি আবিষ্কারের ফলে অতীতের বিভিন্ন সময়কালের মানুষ তাদের নিজ নিজ সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে লিখিত বর্ণনা রেখে গেছেন। সে সব ঐতিহাসিক দলিল থেকে আমরা বিভিন্ন অঞ্চল ও সময়কালের মানুষের ইতিহাস সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে পারি। যেমন, গুপ্ত সাম্রাজ্য, পাল সাম্রাজ্য কিংবা মুঘল সাম্রাজ্যের সময়কাল নিয়ে সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দলিল রয়েছে। ফলে এই সাম্রাজ্যগুলোর সময়কালকে আমরা আলাদাভাবে আলোচনা করতে পারি এবং সমসাময়িক কালের অন্যান্য সাম্রাজ্যের সাথে তাদের অবস্থার তুলনা করতে পারি।
ভাষার লিখিত রূপ আবিষ্কারের পূর্বের মানুষদের সম্পর্কে আমাদের ধারণা অনেকটাই অনুমাননির্ভর। প্রাগৈতিহাসিক সময়কাল বলতে সাধারণত লিখিত ভাষা আবিষ্কারের পূর্বের সময়কেই বোঝানো হয়ে থাকে। প্রাগৈতিহাসিক সময়কালের আদি মানুষ সর্বপ্রথম পাথরের ব্যবহার, অর্থাৎ পাথর দিয়ে বিভিন্ন জিনিসপত্র বানানোর কৌশল আবিষ্কার করে। এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন ধাতব পদার্থ যেমন ব্রোঞ্জ, তামা ও লোহার ব্যবহার উদ্ভাবন করে। মানুষের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, দ্রব্যাদি ও প্রযুক্তির ধরনের উপর ভিত্তি করে প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানে প্রাগৈতিহাসিক সময়কালকে তিন পর্যায় বা যুগে ভাগ করা হয়: (১) পাথর যুগ, (২) ব্রোঞ্জ ও তাম্র যুগ এবং (৩) লৌহ যুগ। প্রযুক্তির বিকাশ পৃথিবীর সব অঞ্চলে একই সময়ে বা একই ধারায় হয়নি। তাই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এই তিনটি যুগের সময়কালে পার্থক্য রয়েছে।

(১) পাথর বা প্রস্তর যুগ (Stone Age): প্রাগৈতিহাসিক সময়কালের সবচেয়ে আদি যুগের নাম প্রস্তর যুগ (Stone Age)। এই যুগ তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত। এই পর্যায়গুলোতে সাংস্কৃতিক বিকাশ সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলো।

ক) পুরোপলীয় (Palaeolithic): এ সময়ে মানুষ আগুনের ব্যবহার শেখে। এছাড়াও ছিল পাথর ও হাড়ের তৈরি জিনিসপত্র এবং অন্যান্য দ্রব্যাদি যেমন, ধারালো পাথর, কাটারি, হাত কুঠার, বর্শা ইত্যাদি। এসবের সাহায্যে মানুষ বন-জঙ্গল হতে শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ করে তাদের খাদ্য ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির চাহিদা মেটাত। সাধারণত ২৫ থেকে ১০০ জনের একটি দল যাযাবর জীবনযাপন করত। পরবর্তীতে তারা নদী বা হ্রদের কাছে গুহা বা ছোট কুটির তৈরি করে বসবাস করত।

খ) মধ্যপলীয় (Mesolithic): শিকার করতে বর্শা, তীর-ধনুক এবং মাছ শিকারের জন্য হারপুন, ঝুড়ি বা খাঁচা এবং নৌকার ব্যবহার আবিষ্কার করে মানুষ। শিকার ও সংগ্রহের পাশাপাশি বন্য শস্যের বীজ সংগ্রহ করা এবং বন্য পশু পোষ মানানোর প্রচেষ্টা করে। অতিপ্রাকৃত শক্তি ও মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস করত মানুষ এবং মৃতদেহ সৎকারের আচার অনুষ্ঠান পালন করত।

গ) নব্যপ্রস্তর (Neolithic): পাথরের তৈরি মসৃণ দ্রব্যাদি, হাতিয়ার ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার করা হত কৃষি কাজ এবং আত্মরক্ষার জন্য, যেমন- কাস্তে, বাটালী, নিড়ানী, লাঙ্গল, জোয়াল, মৃৎপাত্র ইত্যাদি। সেইসাথে মানুষ পশু ও মৎস্য শিকার এবং খাদ্য সংগ্রহ করত। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তার জন্য স্থায়ীভাবে গ্রামে বসবাস শুরু করে। মানব সমাজে পূর্বপুরুষ পূজা ও বহু আত্মার ধারণার বিকাশ ঘটে এবং শামান (ধর্মীয় ওঝা) এবং তার সহযোগীদের আবির্ভাব ঘটে।

(২) ব্রোঞ্জ ও তাম্র যুগ (Bronze Age): এ যুগের শুরুতে তামা নির্মিত এবং পরবর্তীকালে ব্রোঞ্জ নির্মিত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও জিনিসপত্র, তাঁত এবং মাটির চাকা আবিষ্কার করে মানুষ। শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে এবং বিভিন্ন পেশাজীবী দলের উদ্ভব হয়। নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা শুরু করে মানুষ।

(৩) লৌহ যুগ (Iron Age): লোহার তৈরি বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও জিনিসপত্র ব্যবহার শুরু করে মানুষ। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয় এবং রাজধানীর সাথে অন্যান্য শহরের সম্পর্ক স্থাপন করা হয়। বিভিন্ন সাম্রাজ্যের উত্থান হয় এই সময়ে।

কাজ-১ : বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক সময়কালের নাম লিপিবদ্ধ কর।

কাজ-২ : প্রাগৈতিহাসিক সময়কালের বিভিন্ন সংস্কৃতির উপাদানের নাম লিখ।

Content added By

প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বসবাস। আদি মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন দ্রব্যাদি ও নিদর্শন থেকে বাংলাদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়। এ ছাড়াও বর্তমানে নৃবিজ্ঞানীরা মানুষের বংশগতির ধারক জিনলিপির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষের পূর্বপুরুষদের উৎপত্তি ও আদি যোগসূত্র ব্যাখ্যা করেছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানের পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা এ অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রত্ন ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি সম্পর্কে এখানে আলোচনা করব। মানুষের বংশগতির গবেষণা থেকে জানা যায় বর্তমান মানুষের পূর্ব- পুরুষের বসবাস ছিল আফ্রিকা মহাদেশে। প্রায় ৬০ হাজার বছর আগে তারা সেখান থেকে বেরিয়ে আসে। 'আফ্রিকার শিং' বলে পরিচিত বর্তমানের ইথিওপিয়া, সোমালিয়া ও জিবুতি দেশের ভিতর দিয়ে আদিমানুষ প্রথমে দক্ষিণ আরব অঞ্চলে আসে। সেখান থেকে সৌদি আরব ও ইরাক পাড়ি দিয়ে ইরানে প্রবেশ করে। তারপর সমুদ্রের তীর ধরে তাদের পদযাত্রা এগিয়ে চলে পূর্বদিকে। এভাবে পাকিস্তান ও ভারতের উপকূল পার হয়ে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে আদি মানুষেরা ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে।

বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে বাংলাদেশ ও এর আশেপাশের অঞ্চলে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষদের যাতায়াত ও বসবাসের প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন নৃবিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, ফেনীর ছাগলনাইয়া এবং লালমাই পাহাড়ের চাকলাপুঞ্জি অঞ্চলে উচ্চ পুরোপলীয় যুগের অনেক হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়েছে। এদের বয়স আনুমানিক ১৮ হাজার থেকে ২২ হাজার বছর। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল ও নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর এলাকায় নবোপলীয় যুগের হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়েছে, যাদের বয়স আনুমানিক পাঁচ হাজার থেকে আট হাজার বছর। এছাড়া আবিস্কৃত হয়েছে তাম্র ও প্রস্তর যুগের বসতি ও মৃৎপাত্র যাদের আনুমানিক বয়স খ্রিস্টপূর্ব সাড়ে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার বছর। বগুড়ার মহাস্থানগড় এবং সাম্প্রতিককালে আবিষ্কৃত উয়ারী-বটেশ্বরের নানা নিদর্শন থেকে বাংলাদেশে নগর সভ্যতা ও বাণিজ্য বিকাশের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই বিকাশকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব সাত থেকে খ্রিস্টীয় ছয় শতক। প্রথম খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত সময়ের বিভিন্ন লেখক ও পর্যটকদের বর্ণনায় প্রাচীন বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের এই অঞ্চলে বসবাসের সময়কাল প্রাগৈতিহাসিক পর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। অতীতে এ দেশে তাদের সমৃদ্ধ জীবনধারা ও সংস্কৃতি ছিল। তার সাক্ষ্য এখনও বহন করে চলেছে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে- ছিটিয়ে থাকা তাদের প্রত্নস্থাপনাসমূহ। সংখ্যায় কম হলেও এসব প্রত্নস্থাপনা তাদের অতীত ইতিহাস, জীবনধারা ও সংস্কৃতিকে জানার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ প্রভৃতি জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন রয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে রাজপ্রাসাদ, মন্দির, দুর্গ, পরিখা, পুকুর, কূপ, গুহা স্থাপত্য, স্মৃতিস্তম্ভ প্রভৃতি। কুমিল্লা অঞ্চলে ত্রিপুরা রাজাদের খননকৃত বেশ কয়েকটি বড় পুকুর ঐ অঞ্চলে একদা তাদের শাসনব্যবস্থার নীরব সাক্ষী হিসেবে আজও বিরাজ করছে।

টেকনাফে রয়েছে বিখ্যাত মাথিনের কূপ। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে ত্রিপুরা রাজাদের খননকৃত দীঘি, যা থেকে ঐ স্থানের নামকরণ দীঘিনালা হয়েছে। একদা মুঘল সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খান কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত রাখাইন জনগোষ্ঠীর দুর্গ আক্রমণ করেছিলেন বলে জানা যায়। আক্রান্ত রাখাইনরা তখন রামু দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যা পরে মুঘলরা দখল করে নেয়। এসব দুর্গের ধ্বংসাবশেষ এখনও রয়ে গেছে।

ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর প্রত্ননিদর্শনসমূহ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার প্রচেষ্টা ছিল সীমিত। ফলে বর্তমানে তাদের বহু প্রত্ননিদর্শন হারিয়ে গেছে। এ ছাড়াও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ কাজ পরিচালিত হয়নি বলে অনেক কিছুই হয়ত অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক শাসনামলের প্রশাসক, পর্যটক, ধর্মযাজক কিংবা স্থানীয় অধিবাসীদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে আমরা তাদের বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শনের পরিচয় পাই। এর পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের প্রত্ননিদর্শন সংরক্ষণে কিছু সরকারি উদ্যোগও রয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের আগ্রাবাদে অবস্থিত জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর, তিন পার্বত্য জেলায় অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, সমতল অঞ্চলের একাধিক জেলায় অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিষয়ক প্রতিষ্ঠান (বিরিশিরি, মণিপুরী ললিতকলা একাডেমি প্রভৃতি) ও বরেন্দ্র জাদুঘর প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান সরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। পরবর্তী পাঠগুলোতে আমরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের কয়েকটি প্রত্নস্থাপনা সম্পর্কে আলোচনা করব।

কাজ- ১ : বাংলাদেশের প্রত্নঐতিহ্য সংরক্ষনে ভূমিকা পালনকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের নাম লিখ।
Content added By

অতীতেও চাকমা জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসের অনেক নিদর্শন রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে চাকমা রাজবংশের শাসনের নানা মুল্যবান নিদর্শন কালের গর্ভে ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে এই রাজবংশের শাসনামলের কিছু কিছু নিদর্শন আজও খুঁজে পাওয়া যায়। সেসব নিদর্শনের মধ্যে এখানে চাকমা নৃপতিদের দুটি রাজবাড়ির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এর একটি চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে রাঙ্গুনিয়ার রাজানগরে চাকমাদের প্রাচীন রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, বড় একটি দীঘি, চারপাশের পরিখা এবং চাকমা রাণী কালিন্দীর শাসনামলে (১৮৪৪-১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত বৌদ্ধমন্দির রয়েছে।

প্রাসাদটির গোড়াপত্তন বহু আগে হলেও এটির সার্বিক উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় চাকমা রাজা জানবক্স খাঁ'র আমলে (শাসনকাল ১৭৮২-১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ)। এই নৃপতি চাকমা রাজ্যের রাজধানী আলিকদম থেকে রাঙ্গুনিয়ায় স্থানান্তরিত করেন এবং এর নাম রাখেন রাজানগর। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এই রাজবাড়ি এখন প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। ইট-পাথর দিয়ে তৈরি এবং স্থাপত্যশৈলীতে অনন্য এই রাজবাড়ি প্রায় ৫২ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত। এর এক-একটি দেয়াল প্রস্থের দিক থেকে তিন ফুটের মতো চওড়া।

মূল দালান ছাড়াও এই রাজপ্রাসাদে ছিল বিশাল রাজদরবার, হাতি-ঘোড়ার পিলখানা, শান বাঁধানো সাগরদীঘি, রাজকর্মচারীদের জন্য নির্মিত অন্যান্য দালান-কোঠা, রাজ-কাছাড়ি, বৌদ্ধ বিহার, মসজিদ, মন্দির প্রভৃতি। ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও ঐতিহাসিক নানা ঘটনাপ্রবাহের জন্য এই রাজপ্রাসাদ আজও বিখ্যাত হয়ে আছে। রাজা হরিশচন্দ্র রায় ১৮৮৩ সালে রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর হতে চাকমা রাজ্যের রাজধানী রাঙ্গামাটিতে নিয়ে আসেন।

পরবর্তীকালে রাজা ভুবন মোহন রায় রাঙ্গামাটিতে নতুন একটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। দ্বিতলবিশিষ্ট এই সুরম্য রাজপ্রাসাদটি চাকমা স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। রাজপ্রাসাদের চৌহদ্দীর মধ্যে রয়েছে সুসজ্জিত রাজপুরী, রাজ কাছাড়ি, প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির, রাজভান্ডার, রাজ কর্মচারীদের বাসগৃহ প্রভৃতি। রাজা ভুবন মোহন রায় মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পুত্র রাজা নলিনাক্ষ রায় এই প্রাসাদে ১৯৩৫ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত রাজকার্য পরিচালনা করেন।

রাজা নলিনাক্ষ রায় মৃত্যুবরণ করলে তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র ত্রিদিব রায় ১৯৫৩ সালের ২ মার্চ চাকমা জনগোষ্ঠীর ৫০তম রাজা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলে ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকার কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে। ফলে ঐতিহ্যবাহী চাকমা রাজপ্রাসাদ, বৌদ্ধমন্দির এবং রাজপরিবারের নিজস্ব এক হাজার একর ভূ-সম্পত্তিসহ প্রায় ৫৪,০০০ একর কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং লক্ষাধিক মানুষ উদ্বাস্তু হয়। চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পরবর্তীকালে রাঙ্গামাটির রাঙ্গাপানি মৌজায় আরেকটি নতুন রাজবাড়ি নির্মাণ করেন।

কাজ- ১ : উপরের আলোচনা অনুসারে চাকমা রাজবংশের চট্টগ্রাম অঞ্চল শাসনের কিছু নিদর্শনের নাম লিখ।
Content added By

সিলেটের জৈন্তাপুর অঞ্চলে খাসি রাজাদের রাজ্য ছিল। সিলেট বিভাগীয় শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তরে জৈন্তিয়া পাহাড়ের পাদদেশে জৈন্তাপুর অবস্থিত। এর উত্তর ও পূর্ব পার্শ্বে রয়েছে বেশ কয়েকটি উঁচু-নীচু পাহাড়ের সারি এবং উপত্যকা, দক্ষিণ ও পশ্চিম পার্শ্বে আছে অসংখ্য হাওর বাঁওড়ে পরিপূর্ণ সমতল ভূমি। এখানে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে জৈন্তিয়া রাজাদের প্রাচীন রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। এসব ধ্বংসাবশেষের মধ্যে রয়েছে রাজার রাজদরবার, পাথরের তৈরি বিশাল বেদী, জৈন্তেশ্বরী মন্দির, সমাধিক্ষেত্র, স্মৃতিফলক আর প্রাচীন পাথরখন্ড দিয়ে তৈরি বাড়িঘরের বড় বড় স্তম্ভ। খ্রিস্টীয় ১৬৮০ সালে জৈন্তিয়া রাজা লক্ষ্মী সিংহ দ্বারা নির্মিত রাজপ্রাসাদটি বর্তমানে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে বলা যায়।

খাসিদের জৈন্তাপুর রাজ্যের প্রাচীন নিদর্শন বৃহত্তর
সিলেটের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে পাওয়া গেছে।

এসব নিদর্শনের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য অংশগুলো হলো রাজদরবার, স্মৃতিসৌধ, মন্দির, পাথরে উৎকীর্ণ ঘোষণাপত্র, বিভিন্ন নক্শা যেমন ত্রিশুল, পদ্মফুল, ধর্মচক্র, বাসগৃহ প্রভৃতি। অস্ট্রো-এশিয়াটিক জনধারার খাসি জনগোষ্ঠীর সিলেট অঞ্চলে আগমন ঘটে নব্য প্রস্তর যুগের শেষদিকে। বর্তমান ভারতের খাসিয়া পাহাড়ে খ্রিস্টপূর্ব তের শতকের প্রত্ননিদর্শন পাওয়া গেছে। সেই হিসেবে বাংলাদেশের জৈন্তাপুরে আবিষ্কৃত খাসি প্রত্ননিদর্শনগুলোরও যোগসূত্র আছে বলে অনুমান করা যায়।

কাজ- ১ : জৈন্তাপুর কেন বিখ্যাত বিস্তারিত তুলে ধরো।
Content added By

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের নিত্যব্যবহার্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম থেকে তাদের আদি ঐতিহ্যের পরিচয় পাওয়া যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, বোমাং ও মং সার্কেলের রাজবাড়ীতে বা তাদের পারিবারিক সংগ্রহশালায় শত শত বছরের পুরনো কিছু প্রত্ননিদর্শন ও ছবি আজও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের গৌরবময় অতীতের সাক্ষ্য বহন করছে। পুরনো এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে কামান, বন্দুক, তলোয়ার, বল্লম, শিরস্ত্রাণ, ঢাল, বর্ম, তীর, ধনুক, বর্শা, গোলাবারুদ রাখার পাত্র, কুঠার, ছোরা, কুকরী প্রভৃতি যেগুলো মূলত যুদ্ধবিগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হতো। রাঙ্গামাটির চাকমা রাজবাড়ীর বিচারালয়ের পাশে "ফতে খাঁ” নামের একটি কামান আছে। এছাড়া আছে ছোট আকারের আরও দু'টি কামান 'কুঞ্জধন ও 'কুঞ্জবি'।

বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র ও হাতিয়ার ছাড়াও অনেক প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে রাজাদের ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায়। এর মাঝে রয়েছে প্রাচীন মুদ্রা, পুঁথি, ধর্মগ্রন্থ, সীলমোহর, রাজা বা রাজপুত্রের মুকুট, রাজকীয় পোশাক-পরিচ্ছদ, আকর্ষণীয় বিভিন্ন নকশা আঁকা শতবর্ষের প্রাচীন পালঙ্ক এবং অন্যান্য আসবাবপত্র, স্বর্ণ কিংবা অন্যান্য মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি মোহর, রাজকীয় মেডেল, মানপত্র, গহনা, বাদ্যযন্ত্র, সৌখিন নানা তৈজসপত্র, পাথরে উৎকীর্ণ রাজকীয় নির্দেশ বা ঘোষণা, ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজ প্রভৃতি। এসব প্রত্ননিদর্শন থেকে শত শত বছর আগে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে গারো, খাসি, মণিপুরীসহ সমতল অঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজেও এ ধরনের বেশ কিছু প্রত্ননিদর্শন রয়েছে।

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের বসবাস অঞ্চলে প্রাচীন কালের তৈজসপত্র ও অলংকারের নিদর্শন পাওয়া গেছে। এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য যে, নব্য প্রস্তর যুগের প্রথমদিকে মানুষ তৈজসপত্র হিসেবে যে নারকেল বা লাউয়ের খোল ব্যবহার করতো বাংলাদেশের কোনো কোনো ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সমাজে হাজার বছরের সেই প্রাচীন তৈজসপত্র আজও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রো, খ্যাং, খুমীসহ অনেক জনগোষ্ঠীর সমাজে লাউয়ের খোল দিয়ে তৈরি পাত্র এখনও একটি অপরিহার্য তৈজসপত্র। কাঠ, বাঁশ, বেত, হাতির দাঁত, তামা, পিতল, ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি নিজেদের ঐতিহ্যবাহী ডিজাইনের নানা তৈজসপত্র বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো শত শত বছর ধরে ব্যবহার করে আসছে।

গৃহস্থালির নানা উপকরণ যেমন পোশাক-পরিচ্ছদ, পুঁথিপত্র, গহনা ইত্যাদি সংরক্ষণ, মালামাল বহন করা, কৃষিকাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক আচার অনুষ্ঠান প্রভৃতি কাজে এসব তৈজসপত্র ব্যবহৃত হয়। বুনন ও ব্যবহারের দিক থেকে প্রায় ক্ষেত্রে মিল থাকলেও জাতিগোষ্ঠীভেদে কিছু কিছু তৈজসপত্রে যথেষ্ট অমিলও রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের ব্যবহার্য প্রাচীন কিছু তৈজসপত্র চট্টগ্রামের জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর, স্থানীয় রাজপরিবারের সংগ্রহশালাসহ অন্যান্য কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত সংগ্রহে রয়েছে। এসব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে অলংকারের জন্য কারুকার্য খচিত বাক্স, ফুলদানি, প্রদীপদানি, আতরদানি, কলমদানি, পানদানি, পিতলের হুক্কা, হাতির দাঁত ও কাঠের তৈরি চিরুনি, পিঁড়ি, পিতলের তৈরি হাঁড়ি, থালাবাসন এবং ভোজনের জন্য ব্যবহৃত টেবিলসদৃশ অনুচ্চ কাঠামো (চাকমা ভাষায় ভূজংবেড়), কিরিচ বা তলোয়ারের খাপ, কলম, কালি রাখার পাত্র, আয়না, ঝাড়বাতি, মন্দিরের বড় ঘণ্টা, কোমর তাঁতের নানা সরঞ্জাম, বিভিন্ন নকশা এঁকে তৈরি কাপড়ের ব্যাগ, লন্ঠন, তামাকের পাইপ, পাখা, মসলা ইত্যাদি গুঁড়ো করার জন্য ব্যবহৃত পাটা, বাঁশ ও বেতের তৈরি আসবাবসহ নিত্যব্যবহার্য নানা তৈজসপত্র।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সমাজে মূলত নারীরা অলংকারের প্রধান ব্যবহারকারী হলেও অল্প কিছু জাতিগোষ্ঠীতে নারী-পুরুষ উভয়েই অলংকার ব্যবহার করে থাকে। নারীরা সচরাচর সোনা, রুপা, তামা প্রভৃতি ধাতু এবং হাতির দাঁত ও শঙ্খের তৈরি অলংকার ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে গলার হার তৈরির জন্য মুঘল ও ব্রিটিশ আমলের রুপার মুদ্রা ছিল একটি অপরিহার্য উপাদান। ব্যবহার্য বিভিন্ন অলংকারের মধ্যে ছিল চন্দ্রাহার, খোঁপাবন্ধনী, বাহুবন্ধনী, আংটি, হাত ও পায়ের জন্য চুড়ি, নুপুর, মল, বলয়, কানের দুল, নাকছাবি প্রভৃতি। এসব অলংকার তৈরিতে নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন ডিজাইন ব্যবহৃত হতো। সে কারণে অলংকার তৈরির উপকরণ এক হলেও জাতিগোষ্ঠীর পছন্দ অনুসারে তাদের নকশায় কখনও কখনও পার্থক্য দেখা যায়। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত অলংকারগুলোতে এখনও তাদের নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী নকশার প্রাচীন ধারাটিই লক্ষ্য করা যায়।

কাজ-১ : বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের নিত্যব্যবহার্য পুরনো যেসব যন্ত্রপাতি, অস্ত্রশস্ত্র, তৈজসপত্র, অলংকার এবং অন্যান্য উপকরণ পাওয়া গিয়েছে টেবিলের সাহায্যে তার একটি তালিকা তৈরি কর।

Content added By

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের নান্দনিক ঐতিহ্যের পরিচয় পাওয়া যায় তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের স্থাপত্যশৈলী থেকে। প্রাচীনকালের রাজা-বাদশা ও সমাজের অভিজাত শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতাতেই ইতিহাসের নানা সময়ে গড়ে উঠেছিল বহু মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা, বিহার এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজেও ধর্মচর্চার বিভিন্ন ধারা, প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা গড়ে উঠেছে প্রাচীনকাল থেকেই। আমরা এখানে তাদের কয়েকটি প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা সম্পর্কে আলোকপাত করব।

জৈন্তেশ্বরী মন্দির: ঔপনিবেশিক শাসকদের বিভিন্ন দলিলপত্র, গ্রীক, রোমান এবং চীনা পরিব্রাজকদের নানা বিবরণ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ শতকে খাসি জনগোষ্ঠীর বসবাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে খাসি নৃগোষ্ঠীর আদি পূর্বপূরুষরা অর্থাৎ খাসি-খমুইক ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর- পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বসতি স্থাপন করে আনুমানিক আঠার হাজার বছর পূর্বে। তবে শুধুমাত্র খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে আমরা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস লিখিতরূপে পাই। খিস্টীয় পনের শতক থেকে শুরু করে ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীনে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ শাসনামলে খাসি বা জৈন্তিয়া রাজা-রাণীরা বিভিন্ন সময়ে রাজপ্রাসাদ, স্মৃতিসৌধ, মন্দির প্রভৃতি নির্মাণ করেছিলেন। সিলেটের জৈন্তা রাজপ্রাসাদ এবং জৈন্তেশ্বরী মন্দির হলো খাসি জনগোষ্ঠীর গৌরবময় অতীতের স্মৃতিবাহী তেমনই একটি প্রত্নস্থাপনা।
খ্রিস্টীয় ১৬৮০ সালে জৈন্তা রাজা লক্ষ্মী সিংহ জৈন্তেশ্বরী মন্দির, রাজপ্রাসাদ এবং বিশাল সব প্রস্তরখন্ড দিয়ে বেশ কয়েকটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। সংরক্ষণের অভাবে বর্তমানে রাজবাড়িটি পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও মন্দিরের কিছু অংশ এবং পাথরের কয়েকটি স্তম্ভ এখনও টিকে আছে। মন্দির কমপ্লেক্সের সীমানা প্রাচীরের অবস্থা সামান্য ভাল হলেও তার আদি রূপটি আর অবশিষ্ট নেই। এখন দেয়ালগাত্রে আঁকা বিভিন্ন নকশার মধ্যে রয়েছে ঘোড়া, সিংহ এবং পাখাযুক্ত পরীসহ নানা কাল্পনিক বস্তু ও প্রাণীর ছবি।

মন্দির এলাকার চারপাশজুড়ে ছোট বড় মিলিয়ে কমপক্ষে ৪২টি স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে আছে কয়েকটি স্মৃতিসৌধ এবং এসব স্মৃতিসৌধের ছোট বড় ১৯টি স্তম্ভ বা মেগালিথ। প্রাচীন যুগের প্রকান্ড প্রস্তরখন্ডকে মেগালিথ বলা হয়। মেগালিথের লম্বা বা খাড়া স্তম্ভগুলোকে বলা হয় 'মেনহির', আর টেবিলের মতো আয়তাকার স্তম্ভগুলোর নাম 'ডলমেন'। উভয় ধরনের মেগালিথের সমন্বয়ে জৈন্তাপুরের এই স্মৃতিস্তম্ভগুলো নব্য প্রস্তর যুগে নির্মিত হয়েছিল।

কক্সবাজারের প্রাচীন বৌদ্ধমন্দির রামু কক্সবাজার জেলার একটি উপজেলা এবং প্রাচীন প্রত্নঐতিহ্যের জন্য অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এখানে এক বর্গকিলোমিটারের অধিক পাহাড়ি এলাকাজুড়ে বহু প্রাচীন বৌদ্ধ নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। স্থানীয় মাটি ও পাথরের তৈরি কমপক্ষে ২৫টি প্রাচীন বৌদ্ধ মূর্তি এখানে আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া এখানকার বিভিন্ন মন্দিরে রয়েছে সোনা, ব্রোঞ্জ এবং অন্যান্য ধাতু দিয়ে তৈরি ছোট বড় ও নানা বর্ণের অসংখ্য বুদ্ধমূর্তি।

রামুতে যেসব প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার, রামু শিমা বিহার, লামাপাড়া বিহার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। মন্দিরগুলোর মধ্যে রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারটি সবচেয়ে প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব ৩০৮ সালে এটি নির্মিত হয়। মন্দিরটির কাছাকাছি নীরবে বয়ে চলেছে বাঘখালী নদী।\

আরাকানের রামু রাজবংশের নামানুসারে এলাকাটির নামকরণ রামু হয়েছে। আরাকান রাজ মুলতইং চন্দ্র ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম অঞ্চল দখল করে নেন। সেই সূত্রে খ্রিস্টীয় ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম মুঘল শাসনাধীনে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কক্সবাজার ও রামু অঞ্চলটি আরাকান রাজ্যের অংশ ছিল।

মোঘলদের সময়ে রামুতে তের ফুট উচ্চতার এক বিশাল বুদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়। এটি ব্রোঞ্জের তৈরি এবং বাংলাদেশে এযাবৎ আবিষ্কৃত বুদ্ধমূর্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়। এই অঞ্চলে আরেকটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরের নাম হলো রামু শিমা বিহার। প্রায় চারশ' বছর আগে মূল বিহারটি নির্মিত হয়েছিল। এটি নির্মাণে বিশেষ ধরনের কাঠ এবং ঐতিহ্যবাহী বার্মিজ শৈলী ব্যবহৃত হয়েছে। প্রাচীন পুঁথিপত্রসহ বর্মী ভাষায় লেখা ত্রিপিটক, ইতিহাস, সাহিত্য ও দর্শনশাস্ত্রের বহু বই-পুস্তক রয়েছে এই মন্দিরের পাঠাগারে। এর সামান্য দূরত্বে রয়েছে লামাপাড়া বিহার নামে আরেকটি বৌদ্ধ মন্দির। এখানে ধাতুর তৈরি বিশালাকৃতির প্রাচীন ঘণ্টা রয়েছে। ঘণ্টিতে উৎকীর্ণ দুর্বোধ্য লিপি দিয়ে কিছু লেখা রয়েছে যেগুলোর পাঠোদ্ধার করা এখনও সম্ভব হয়নি। ষোড়শ শতাব্দীতে এই মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়।

এছাড়া আছে কক্সবাজারের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ মন্দির মাহাসিংদ্রোগী ক্যাং যা ১৬৩৮ সালে নির্মিত হয়। যুদ্ধবিগ্রহ এবং মানুষের সীমাহীন লোভ-লালসা দেখে সংসারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ প্রবাসী রাখাইন রাজা উ আগ্‌গা মেধা (যিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হওয়ার পর এই নাম ধারণ করেন) কক্সবাজারের মাহাসিংদ্রোগী ক্যাংটি নির্মাণ করেন। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর দ্বারা নির্মিত চিৎমরং নামক প্রাচীন ও দর্শনীয় বৌদ্ধ মঠটির অবস্থান রাঙ্গামাটির কাপ্তাই বাঁধ এলাকা থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। এছাড়া রাঙ্গামাটি শহরে অবস্থিত এবং রাজ বনবিহার বৌদ্ধ মন্দিরটি প্রখ্যাত বৌদ্ধ সাধক 'বনভান্তে'র কল্যাণে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এছাড়া ত্রিপুরা রাজপরিবারের কোনো কোনো সদস্যের দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুকাল আগে নির্মিত হয়েছিল কয়েকটি হিন্দু ধর্মীয় উপাসনালয়। সেগুলোর মধ্যে পানছড়ি উপজেলায় অবস্থিত কালী মন্দির, মাটিরাঙ্গা উপজেলার অযোধ্যা কালী মন্দির, দীঘিনালা উপজেলায় অবস্থিত কামাকুটছড়া শিব মন্দির এবং মাটিরাঙ্গা উপজেলার জুরমরং শিব মন্দিরটি উল্লেখযোগ্য। আনুমানিক দুইশ' থেকে দুইশ' পঞ্চাশ বছর আগে এসব মন্দির নির্মিত হয়েছিল।

কাজ- ১ : ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের কিছু বিখ্যাত ধর্মীয় উপাসনালয়ের নাম লিখ।

কাজ-২ : কক্সবাজার এবং রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত যে কোনো দুটি বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দিরের অবস্থান চিহ্নিত কর।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...