মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। পরিবার থেকে সমাজ, সেখান থেকে গড়ে ওঠে মানব সভ্যতা। আবার দলবদ্ধ মানুষের সামাজিক জীবনকে যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য গড়ে ওঠে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজব্যবস্থা মূলত আত্মীয়তার সম্পর্কনির্ভর। অর্থাৎ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে সামাজিক কার্যকলাপগুলো পরিচালিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজ ও সাংস্কৃতিক জীবনধারার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে এই অধ্যায়ে আমরা জানতে পারব ।

এ অধ্যায় শেষে আমরা-
- ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজ জীবন বর্ণনা করতে পারব।
- গোত্র বা বংশের ধারণা বর্ণনা করতে পারব।
- মাতৃসূত্রীয় ও পিতৃসূত্রীয় বংশধারার ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব এবং উভয় বংশধারার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারব।
- বিবাহের ও পরিবারের ধারণা, প্রকারভেদ এবং কার্যাবলি বর্ণনা করতে পারব।
- সমাজ জীবনে পরিবারের গুরুত্ব মূল্যায়ন করতে পারব।
- ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং এর প্রকারভেদ বর্ণনা করতে পারব।
- বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উত্তরাধিকারের ধরন চিহ্নিত করতে পারব।
খাদ্য সংগ্রহ ও বন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করে। দলবদ্ধ মানুষের একই সাংস্কৃতিক জীবনচর্চার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সমাজ গড়ে ওঠে। সভ্যতার গোড়ার দিকে মানুষ পশু শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ করে তার খাবার ও অন্যান্য চাহিদা মেটাতো। তারপর একসময় মানুষ পশুপালন ও কৃষিকাজ করতে শেখে। খাদ্য উৎপাদন করতে শেখার ফলে মানুষের যাযাবর জীবনের অবসান হয়। বিভিন্ন জায়গায় তারা স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে এবং দলের আকারও ক্রমশ বড় হতে থাকে।
মানুষ তার নানা প্রয়োজন মেটানোর জন্যই গড়ে তোলে সমাজব্যবস্থা। দলবদ্ধ মানুষের সামাজিক জীবনকে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য গড়ে উঠে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান। যেমন, আমাদের পরিবার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। এ সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠান মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সকল চাহিদা মিটিয়ে থাকে। মানুষের যেকোনো চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানগুলো একে অন্যের কাজে ও দায়িত্ব পালনে সহায়তা করে। আর তাই যেকোনো সমাজের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার সম্পর্ককে বলা হয় সমাজ কাঠামো।
সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে উঠে। যেকোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্দেশ্য হলো নিয়ম-নীতি, দায়িত্ব-কর্তব্য এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে সেই প্রতিষ্ঠানের নতুন সদস্যদের পরিচয় করানো। আমাদের পরিবার হলো একটি অন্যতম সামাজিক প্রতিষ্ঠান। তাই একেবারে ছোটবেলা থেকেই পরিবার আমাদের আচার-আচরণ, দায়িত্ব, নিয়ম-নীতি ও শৃঙ্খলা প্রভৃতি শিখিয়েছে। শুধু তাই নয়, একটি সন্তানকে সামাজিক অর্থে দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে সমাজে চলার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই শিখিয়ে দেয় পরিবার।
সামাজিক প্রতিষ্ঠানের আর একটি উদ্দেশ্য হলো তার উৎপাদন, পুনরুৎপাদন, সরবরাহ ও বিতরণের ব্যবস্থা করা। যেমন: পরিবারের একটি বড় উদ্দেশ্য সন্তান উৎপাদন। একজন মানুষ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে এবং পরবর্তী সময়ে সমাজের নতুন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেয়। মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে সমাজে তার ভূমিকা ও তার ক্রিয়া-কর্মের পরিবর্তন ঘটে। পরিবারের মতো সব সামাজিক প্রতিষ্ঠানেই এক প্রজন্মের মানুষ বয়স্ক হয়ে অবসর নিলে নতুন প্রজন্মের মানুষ তাদের দায়িত্ব বুঝে নেয়। আর এভাবেই যুগ যুগ ধরে সমাজ টিকে আছে। তাই মানব সমাজের নতুন নতুন সদস্যের উৎপাদন ও সরবরাহ করে থাকে পরিবার।
সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো তার সদস্যদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য বণ্টন করে দেয়। যেমন, একটি পরিবারের মা-বাবা ও ভাই-বোন প্রত্যেককেই নির্দিষ্ট কিছু অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়। এইসব দায়িত্ব ও কর্তব্য বা নিজ নিজ কাজের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করার মাধ্যমে পরিবারে আমাদের সবার
মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় থাকে এবং আমরা মিলেমিশে বসবাস করতে পারি। সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠানই পরিবারের মতো একইভাবে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন ও পালনের উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে উঠে। তবে সংস্কৃতিভেদে প্রতিষ্ঠানের গড়ন এবং এর সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, সিলেট অঞ্চলের খাসি ও বান্দরবানের ম্রোদের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এ দুটি সংস্কৃতিতে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ধরনে ভিন্নতা রয়েছে। খাসিদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নির্ভর করে পান চাষকে ঘিরে। অন্যদিকে, ম্রোদের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে জুম চাষকে কেন্দ্র করে। যেহেতু পান ও জুম চাষের পদ্ধতি আলাদা, তাই এ দুটি সমাজের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের দায়িত্বও আলাদা। একইভাবে এ দুটি সংস্কৃতিতে পরিবারসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ধরনেও বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
কাজ- ১ : পরিবারকে কেন একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান বলা হয়? কাজ-২ : সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্যের তালিকা প্রস্তুত কর। |
ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সক্রিয় সম্পর্কের ভিত্তিতে সমাজ সংগঠিত হয়। আর এই সক্রিয় বা ক্রিয়াশীল সম্পর্কের ধরনকে বলে সামাজিক সংগঠন। এর ক্ষুদ্রতম একক হলো সমাজের যেকোনো দুজন ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্ক। যেমন, পিতা ও পুত্রের সম্পর্ক। এই পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ধরন আবার সংস্কৃতিভেদে বিভিন্ন রকম হয়। সাঁওতালদের সংস্কৃতিতে পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় পুত্র। একই- ভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমাদের সংস্কৃতি অনুযায়ী চাকমা রাজার ছেলে হবে পরবর্তী রাজা। সিলেটের খাসি কিংবা ময়মনসিংহের মান্দিদের মাঝে পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ধরন কিন্তু সম্পূর্ণই আলাদা। সেখানে মেয়ে সন্তানরা মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় কিন্তু ছেলে সন্তানরা কোনো সম্পত্তির মালিক হয় না।
একটি ক্ষুদ্র সামাজিক দল হলো সমাজ সংগঠনের দ্বিতীয় স্তর। তিনজন বা এর অধিক ব্যক্তির সম্পর্কের সমন্বয়ে গড়ে উঠে একটি ছোট সামাজিক দল। এ দলের সদস্যরা মিলিত বা যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করে। তাদের মধ্যে সম্পর্কের ধরন ও বন্ধনের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন রকমের সামাজিক দল দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ পরিবার একটি ছোট সামাজিক দল। নারী-পুরুষের বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে উঠে এ পরিবার। পরিবারে সন্তানরা বেড়ে উঠে এবং তার পুরুষ সদস্যরা এক ধরনের দায়িত্ব পালন করে আর মেয়েরা আরেক ধরনের। আবার এ পরিবারে বয়স্ক ও ছোটদের দায়িত্বও আলাদা। তাই বয়স ও নারী- পুরুষ ভেদে পরিবারের সদস্যদের কাজকর্মের মধ্যে এক ধরনের বিভাজন তৈরি হয়। সকল সদস্যের সুষ্ঠু দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে একটি পরিবার সক্রিয় হয়। তবে এ ক্ষেত্রেও সদস্যদের দায়িত্ব ও কাজকর্মের বিভাজনও সংস্কৃতিনির্ভর।
আত্মীয়তার ভিত্তিতে কয়েকটি পরিবার সম্পর্কযুক্ত হয়ে উঠে। কোনো পরিবারের বিপদে-আপদে বা প্রয়োজনে তার অন্য আত্মীয়-স্বজনরা এগিয়ে আসে। এভাবে দেখা যায়, এক পরিবার অন্য পরিবারকে আত্মীয়তার কারণে সাহায্য ও সহযোগিতা করে। আত্মীয়তার সম্পর্ক সে কারণেই আমাদের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ। বলা যায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক হচ্ছে সামাজিক বন্ধনের মূল। আবার আত্মীয়রা সকলে মিলে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামাজিক দল, তথা পরিবারগুলো পারস্পরিক আদান-প্রদানের মাধ্যমে বৃহত্তর সামাজিক দল গড়ে তোলে। আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে কয়েকটি পরিবার মিলে গঠিত হয় একটি গোষ্ঠী। আর কয়েকটি গোষ্ঠীর সক্রিয়ভাবে একত্রে বসবাসের মধ্য দিয়েই সমাজ সংগঠিত হয়।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজব্যবস্থা মূলত আত্মীয়তার সম্পর্কনির্ভর। অর্থাৎ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে সামাজিক কার্যকলাপ পরিচালিত হয়ে থাকে। সমাজে কোন ব্যক্তির অবস্থান কী, কোথায় সে বসবাস করবে, কারা তার বন্ধু-বান্ধব, কাদের সাথে কোন ধরনের সামাজিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে, তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কেমন হবে, পরিবার বা সমাজে তার ভূমিকা কী হবে এসব কিছুই আত্মীয়তার সম্পর্কের দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ সমাজের সকল সম্পর্কই আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে গড়ে উঠে।
সমাজ সংগঠনের ভিত্তি হিসেবে আত্মীয়তার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমে ব্যক্তি, পরিবার এবং সামাজিক দলসমূহের মধ্যে এক ধরনের যোগসূত্র সৃষ্টি হয়। আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমেই উত্তরাধিকারের নিয়ম, বংশধারা গঠন, বিবাহ ব্যবস্থা, পরিবার প্রভৃতি পরিচালিত হয়। আগেই আমরা জেনেছি যে, অনেক সংস্কৃতিতে একজন ছেলে তার পিতার সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়ে থাকে। আবার মান্দি সংস্কৃতিতে একজন মেয়ে সন্তান তার মাতার সম্পত্তি উত্তরাধিকার সূত্রে পায়। তাই মান্দি সমাজে মেয়ে সন্তানরা বিয়ের পর একই গ্রাম বা এলাকায় পাশাপাশি বসবাস করে। তাদের ভাইরা অর্থাৎ পরিবারের ছেলে সন্তানরা বিয়ের পর তার শ্বশুরবাড়ি চলে যায়। অতএব আত্মীয়তার সম্পর্ক ব্যবস্থা বলতে আমরা বুঝি উত্তরাধিকার, বংশধারা, বিবাহ, পরিবার গঠন ও পরিচালনার নিয়মনীতি। তাই বলা যায়, আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমেই মানুষ তাদের নিজ নিজ জীবন পরিচালনা করে থাকে।
কাজ- ১ : সমাজ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরগুলোর নাম লিখ। কাজ- ২ : সামাজিক দল কাকে বলে? সামাজিক দল গঠনের উদ্দেশ্য চিহ্নিত কর। |
আত্মীয়দের মাঝে সম্পর্কই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজের ভিত্তি রচনা করে। আগেই বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজ জীবনে আত্মীয়দের মাঝে সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই নির্ধারিত হয় সকল সামাজিক সম্পর্ক। ফলে আত্মীয়তার সম্পর্ক সামাজিক সৌহার্দ্য রচনা করে। তাই আত্মীয়তার সম্পর্ক বিষয়ে জানা গুরুত্বপূর্ণ।
আত্মীয়দের মাঝে সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই সমাজে মানুষের ভূমিকা এবং দায়িত্ব ঠিক হয়। ধরে নেয়া যাক আত্মীয়তার সম্পর্কে তুমি কারও ভাই। ছোটবেলা থেকেই তুমি পরিবার থেকে শিখেছ একজন বোন বা ভাইয়ের দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার কেমন হবে। তাই তোমাকে কেউ বোন, দিদি, আপু বা ভাই ডাকার সাথে সাথেই তোমার একটি সামাজিক ভূমিকা তৈরি হয়ে যায়। বোন বা ভাই হিসেবে তোমার কাছ থেকে কিছু নির্দিষ্ট আচরণ আশা করা হয়। আবার, স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে ভাই-বোনের আচরণও আলাদা হয়ে থাকে। যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রোদের সমাজে, একজন ছেলে তার চাচাতো বোনকে নিজের বোনের মতো দেখে, কিন্তু মামাতো বোনকে বিয়ের জন্য হবু কনে হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ ম্রোদের সমাজে মামাতো বোনকে বিয়ে করার রীতি প্রচলিত আছে।
সমাজের একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সাথে নানা ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে থাকে। কিন্তু এসব ধরনের সম্পর্কই সামাজিক কিছু নিয়ম-কানুনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে থাকে। ম্রোদের সমাজের উদাহরণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, চাচাতো আর মামাতো ভাই-বোনের মধ্যকার সম্পর্ক সংস্কৃতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। আবার মান্দি কিংবা খাসিদের সংস্কৃতিতে ছেলেরা বিয়ের পর কনেদের বাড়িতে থাকতে যায় এবং সেখানে পরিবার গড়ে তোলে। ম্রোদের সমাজ ও তাদের সমাজে বাবা-ছেলে, বাবা-মেয়ে, বাবা-মা, ভাই-বোন, মা-ছেলে ও মা-মেয়ের সম্পর্কসহ অন্যান্য সকল আত্মীয়তার সম্পর্কের পার্থক্য রয়েছে। ফলে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্কের ভিত্তিতে আচার-ব্যবহার ও দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যেও অনেক পার্থক্য সৃষ্টি হয়। তাহলে বলা যায় যে, মান্দি, খাসি কিংবা ম্রোদের মত অন্যান্য সকল নৃগোষ্ঠীর মধ্যেই সংস্কৃতি পৃথকভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ককে নির্ধারণ করে।
এসো, এবার আমরা আত্মীয়তার সম্পর্কের বিভিন্ন ধরন নিয়ে আলোচনা করি। আমরা সবাই সমাজের অন্য সদস্যদের সাথে নানা ধরনের সম্পর্ক সূত্রে আবদ্ধ। আমাদের নিজ নিজ সমাজের সদস্যদের মধ্যে কেউ আমাদের রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়, কেউ বন্ধু, আবার কেউবা প্রতিবেশী। রক্ত সম্পর্কের বাইরেও আমাদের আত্মীয় আছে। আমাদের পরিবারের বা আত্মীয়দের বিয়ের মাধ্যমেও অনেকের সাথে আমাদের নতুন আত্মীয়তার সম্পর্ক হয়। আবার, শুধুমাত্র রক্তের অথবা বৈবাহিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করেই যে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠে, তা নয়, কেউ কেউ আমাদের কাল্পনিক আত্মীয়ও রয়েছে। সুতরাং আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রধানত ৩ প্রকার। যেমন:
১. রক্তের আত্মীয় | রক্ত সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ সম্পর্কগুলোকে রক্তের আত্মীয় বলে। যেমন, একজন ব্যক্তি তার পিতামাতা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন, নাতি-নাতনীর সাথে রক্ত সম্পর্কীয় বন্ধনে আবদ্ধ |
২.বৈবাহিক আত্মীয় | আমাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে যারা সম্পর্কযুক্ত তাদের বলা হয় বৈবাহিক আত্মীয় বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে উভয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠে। যেমন, বাঙালি সমাজে একজন পুরুষের সাথে বিবাহের মাধ্যমে একজন নারী তার স্বামীর পরিবারের অন্যদের সাথে চাচি, মামী, ভাবি ইত্যাদি সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। এ ধরনের আত্মীয়দের কুটুমও বলা হয়ে থাকে। |
৩. কাল্পনিক আত্মীয় | রক্ত বা বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ নয় এমন অনেক ব্যক্তিদের সাথেও আমরা রক্ত বা বৈবাহিক জ্ঞাতিদের মতো আচরণ করি। যেমন, বাবার বন্ধুকে আমরা চাচা ডাকি ,কিংবা মায়ের |
| বান্ধবীকে খালা ডাকি। আবার হয়ত আমাদের থেকে বয়সে বড় কাউকে ভাই বা আপু বা দিদি ডাকি এবং সে অনুযায়ী আচরণ করি। এ ধরনের সম্পর্ককে বলে কাল্পনিক বা পাতানো সম্পর্ক। |
পরবর্তী পাঠগুলোতে আমরা শিখব সংস্কৃতি কীভাবে আত্মীয়তার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলে। এক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞানীরা আত্মীয়তার সম্পর্ক সৃষ্টি ও বিস্তারের ক্ষেত্রে দুটি প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন। যার প্রথমটি হলো বিবাহ প্রথাভিত্তিক এবং দ্বিতীয়টি হলো বংশধারানির্ভর।
কাজ- ১ : আত্মীয়তার সম্পর্কের ধরন উল্লেখ কর। কাজ-২ : রক্তসম্পর্কীয় এবং বৈবাহিক সূত্রে তোমার আত্মীয় কারা? দুটি করে উদাহরণ দাও। তোমার কি কোনো কাল্পনিক আত্মীয় আছে? |
মানুষকে দলবদ্ধভাবে সমাজে বসবাসের প্রেরণা দেয় আত্মীয়তার সম্পর্ক। পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের ছেড়ে দূরে কোথাও গেলে বেশি দিন একা থাকতে আমাদের ভাল লাগে না। অর্থাৎ আমাদের বাবা, মা, ভাই-বোনসহ অন্য আত্মীয়দের মাধ্যমেই আমরা আমাদের আপন ঠিকানা গড়ে তুলি এবং আমাদের সমাজের সাথে যুক্ত থাকি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজে আত্মীয়তার সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত।
আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমে কোনো সমাজের সামাজিক কাঠামো বা সামাজিক সংগঠনগুলো গড়ে উঠে। তাই আত্মীয়তার সম্পর্ক বিষয়ে জানার মাধ্যমে কোনো সমাজের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে ধারণা লাভ করা যায়। সমাজ সংগঠনের মূল হচ্ছে সমাজের ব্যক্তিদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক। আর এই পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হলো আত্মীয়তার সম্পর্ক। সমাজের সকলেই রক্ত সম্পর্ক অথবা বৈবাহিক সম্পর্ক অথবা কাল্পনিক সম্পর্কের মাধ্যমে একে অন্যের নৈকট্য অনুভব করে থাকে। যেমন: সমাজের সংগঠন হিসেবে পরিবারকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়া কোনোভাবেই বুঝা সম্ভব নয়। আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমেই কোনো সমাজের পরিবার কাঠামো, বিবাহব্যবস্থা, সম্পত্তির মালিকানা এবং উত্তরাধিকার ব্যবস্থা গড়ে উঠে। এর মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি তথা, সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা এবং ভাই-বোন সম্পর্ক গড়ে উঠে। আত্মীয়তার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আত্মীয়তার দলগুলোর মধ্যে বন্ধন তৈরি হয় এবং এর ভিত্তিতে সামাজিক সংহতি ও ঐক্য গড়ে উঠে।
সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, নেতৃত্ব এবং সদস্যদের মাঝে বিবাদ মীমাংসার ক্ষেত্রেও আত্মীয়তার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ জনগোষ্ঠী নিজেদের গোষ্ঠী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়। নিজস্ব গোষ্ঠীর মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষায় তারা তৎপর থাকে। ফলে তারা নিজেদের ঐতিহ্য সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাই সামাজিক উন্নতি এবং অগ্রগতি সাধনে আত্মীয়তার সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে আত্মীয়তার সম্পর্কই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংগঠন। আত্মীয়তার দলগুলোর ভিত্তিতে এ ধরনের সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন, নানাবিধ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সংগঠিত ও সক্রিয় হয়। আত্মীয়তার সম্পর্কের এরকম কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হচ্ছে:
১. সমাজে বিবাহব্যবস্থাকে সংগঠিত করে বিভিন্ন বংশ ও গোত্রের মাঝে বন্ধন সৃষ্টি করা। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজে আত্মীয়তার সম্পর্কভিত্তিক কিছু নিয়মের মাধ্যমে বিয়ের পাত্র-পাত্রী বাছাই করা হয়। ফলে সকল সামাজিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এবং সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য গড়ে উঠে।
২. এর ভিত্তিতে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও উদ্দেশ্য নিয়ে পরিবার ব্যবস্থা গড়ে উঠে। সমাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য শিশুর জন্মদান ও সংস্কৃতি শিখিয়ে শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে গড়ে তোলে সমাজের নতুন সদস্য হিসেবে।
৩. রাজনৈতিক কার্যক্রম সংগঠিত করার জন্য বিভিন্ন সামাজিক দলের মাঝে বন্ধন তৈরি করে এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক দ্বন্দ্ব ও বিরোধ নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪. সম্পদের উত্তরাধিকার ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে সংগঠিত করে সমাজের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখে। বিভিন্ন সম্পদের উপর মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে। অর্থাৎ মানুষের অবর্তমানে তার সম্পত্তি কে কতোটা পাবে এবং কীভাবে, সেই বিষয়টি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৫. পরিবার ও আত্মীয়তার দলগুলো ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার ও নৈতিকতা শিক্ষা দিয়ে শিশুদের গড়ে তোলে।
৬. সমাজ সংগঠনের ক্ষেত্রে একজনের সাথে অন্যজনের আচরণ এবং পারস্পরিক দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার নির্দিষ্ট করে দেয়।
| কাজ- ১ : আত্মীয়তার সম্পর্ক পাঠ করা কেন গুরুত্বপূর্ণ? |
আত্মীয়তার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করেই মানুষের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও সামাজিক জীবন গড়ে উঠে। সংস্কৃতিভেদে আত্মীয়দের ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকার প্রচলন আছে। এই ডাকের মাধ্যমে আমরা একজন আত্মীয়কে চিহ্নিত করি এবং তার সাথে নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্ক নির্ণয় করে থাকি। সংস্কৃতিভেদে আত্মীয়দের বোঝানোর জন্য কতগুলো নির্দিষ্ট পদ রয়েছে। এগুলোকে আত্মীয়তার সম্পর্কের পদমালা বলা হয়।
আত্মীয়দের মধ্যে যাকে আমরা যে নামে ডাকি তার সাথে আমাদের আচরণও সে রকম হয়। ডাকের ভিত্তিতে কারও সাথে আমাদের সম্পর্ক হয় বন্ধুত্বপূর্ণ বা কারো সাথে ঠাট্টার আবার কাউকে হয়ত আমরা এড়িয়ে চলতে পছন্দ করি। যেমন, বাঙালিদের সংস্কৃতিতে কাউকে দুলাভাই ডাকা হলে তার সাথে সম্পর্কটাও হয় ঠাট্টার। একই সংস্কৃতিতে যখন কাউকে চাচা ডাকা হয়, তখন তার সাথে দুলাভাইয়ের মতো আচরণ করা হয় না। কারণ সম্পর্কের দিক থেকে চাচা হলেন মুরুব্বি এবং চাচার সাথে ভাতিজার সম্পর্কটা ও স্নেহ ও শাসনের। আবার মামার সাথে ভাগিনার সম্পর্কও অনেক মধুর ও বন্ধুত্বপূর্ণ। চাচা ও মামার সাথে আচরণ বাঙালিদের থেকে মান্দিদের মাঝে কিন্তু সম্পূর্ণ বিপরীত। মান্দিদের মাঝে চাচার সাথে সম্পর্ক হয় বন্ধুত্বপূর্ণ এবং মামার সাথে সম্পর্ক হয় স্নেহ ও শাসনের। আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রোদের সমাজে যেকোনো ছেলে তার শ্বশুর ও শ্বশুর পক্ষের আত্মীয়দের এড়িয়ে চলে। কেননা, এই সমাজে শ্বশুর ও শ্বশুর পক্ষের আত্মীয়দের সবাইকে একসাথে 'তুতমা' বলা হয় এবং 'তুতমা'-দের সামাজিক মর্যাদা জামাই পক্ষের চেয়ে অনেক বেশি। আত্মীয়তার সম্পর্কের এই পদগুলো দিয়ে আসলে আমরা তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক কি সেটা চিহ্নিত করি এবং তাদের সাথে আমাদের আচরণের ধরন কি সেটাও বুঝি। তাই আত্মীয়দের ডাকার জন্য ব্যবহৃত পদ বা নাম থেকে আমাদের আপন ও দূরের সম্পর্ক এবং সেই আত্মীয়ের সামাজিক গুরুত্ব বুঝতে পারি।
আত্মীয়তার পদমালা সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে, যথা: (১) শ্রেণিকৃত এবং (২) বিস্তারিত।
(১) শ্রেণিকৃত পদমালা | এ ব্যবস্থায় একটি পদ বা নাম দিয়ে কয়েক ধরনের আত্মীয়কে বোঝানো হয়। যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রোদের সমাজে 'নায়' পদটি দিয়ে খালাতো, ফুপাতো ও মামাতো ভাইদের বোঝানো হয়ে থাকে। কিন্তু নিজ গোত্রের সদস্য বলে চাচাতো ভাইকে 'ঈ' বা 'নাওপা' নামে ডাকা হয়। সুতরাং, 'নায়' একটি শ্রেণিকৃত পদ। ইংরেজি 'কাজিন' পদটিও একটি শ্রেণিকৃত পদ। |
(২) বিস্তারিত পদমালা | এ ধরনের পদমালায় প্রত্যেক আত্মীয়ের জন্য আলাদা আলাদা নাম থাকে। বাঙালি সংস্কৃতিতে মামাতো, চাচাতো, খালাতো, ফুপাতো ভাই বা বোন বলতে আলাদা ও নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে বোঝানো হয়। |
আত্মীয়তার সম্পর্কের পদমালার ভিত্তিতে দেখা যায় আত্মীয়দের কয়েকটা শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। তবে এ শ্রেণিভাগ সংস্কৃতির নিয়ম অনুসারেই করা হয়ে থাকে। তদনুযায়ী আত্মীয়দের নির্দিষ্ট নামে ডাকার জন্য শ্রেণিভাগ করার কয়েকটি সাংস্কৃতিক নিয়ম নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
পূর্বের ও পরের প্রজন্মের ভিত্তিতে | আত্মীয়তার সম্পর্কের পদমালায় পূর্বের প্রজন্মের সাথে পরের প্রজন্মের আত্মীয়দের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করা হয়। যেমন, বাঙালি সমাজে দাদা-দাদি, নানা-নানি, বাবা-মা, চাচা-চাচি, মামা-মামী, খালা-খালু প্রভৃতি পদ দ্বারা যেকোনো ব্যক্তির আগের প্রজন্মের আত্মীয়দের বোঝানো হয়। আবার ভাগনা-ভাগনি, ভাতিজা-ভাতিজি প্রভৃতি পদ দ্বারা বোঝানো হয় ব্যক্তির পরের প্রজন্মের সদস্য। |
নিজ প্রজন্মের ভিত্তিতে | বাঙালি সমাজেই আবার ব্যক্তির সমান প্রজন্মের সবাইকে অন্য প্রজন্মের থেকে আলাদা নামে ডাকা হয়। যেমন, চাচাতো ভাইবোন, মামাতো ভাইবোন, ফুপাতো ভাইবোনরা সবাই ব্যক্তির সমান প্রজন্মের। |
বয়সের ভিত্তিতে | আত্মীয়দের সাথে আমাদের বয়সের পার্থক্যভেদে আলাদা আলাদা নামে ডাকা হয়। আমার ছোট ভাইকে যেভাবে ডাকি, সেভাবে কিন্তু বড় ভাইকে ডাকি না। ম্রোদের সমাজে নিজ গোত্রের ও নিজ প্রজন্মের সব ছেলেকে ভাইয়ের মত দেখা হয় এবং বয়সে বড় হলে 'ঈ' আর বয়সে ছোট হলে 'নাওপা' ডাকা হয়। |
নারী-পুরুষের ভিত্তিতে | আত্মীয়দের মাঝে নারী ও পুরুষদের জন্য রয়েছে আলাদা পদমালা। |
রক্তের এবং বৈবাহিক সম্পর্কের ভিত্তিতে | বাঙালি সমাজে বাবা, মা, চাচা প্রভৃতি আমাদের রক্তের সম্পর্কের আত্মীয় কিন্তু ভাবি, চাচি, দুলাভাই ইত্যাদি বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়। |
বংশধারার ভিত্তিতে | বাবার ও মায়ের দিকের আত্মীয়দের ডাকের জন্যও আলাদা পদমালা ব্যবহার করা হয়। ম্রোদের সমাজে মায়ের ভাইকে 'পু', বাবার বোনের জামাইকে 'ত্রাগ' এবং বাবার ভাইকে 'পা' পদ দ্বারা বোঝানো হয়। |
কাজ-১ : আত্মীয়তার পদমালার তালিকা তৈরি কর। কাজ-২ : আত্মীয়তার পদমালার ভিত্তিতে আত্মীয়দের শ্রেণিবিভাগ ছকে উপস্থাপন কর। |
মানব সমাজে বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠান। বিবাহের মাধ্যমে পরিবার গঠিত হয়। পরিবারে শিশুরা প্রতিপালিত হয় এবং সমাজ টিকে থাকে। বিভিন্ন সমাজ তার নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করে থাকে। আমাদের নিজ নিজ সমাজে বিবাহ প্রথার যে ধরন আমরা দেখতে পাই, তা সর্বত্র একইভাবে প্রচলিত ভাবার কোনো কারণ নেই। কেননা, সংস্কৃতিভেদে বিবাহের ধরন ও প্রক্রিয়া নানা ধরনের হতে পারে।
বিয়ে হচ্ছে সন্তান জন্মদান ও লালন-পালনের জন্য নারী ও পুরুষের মাঝে এক ধরনের সামাজিক বন্ধন। ধরনে ভিন্নতা থাকলেও সকল সমাজেই বিবাহরীতি বিদ্যমান। বিয়ের বন্ধনের মধ্য দিয়ে একটি পরিবার সুচিত হয়। সেই পরিবারের সকল কাজ সদস্যরা ভাগ করে নেয়। আবার বিয়ের ফলে বর ও কনের পরিবারগুলোর মাধ্যমে দুটি বংশের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বিয়ের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন পরিবার, বংশ, গোত্র ও অন্যান্য আত্মীয়তার দলগুলোর মধ্যে সম্প্রীতি এবং বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এভাবে অনেক সময় সমাজের বিভিন্ন দ্বন্দ্ব, বিরোধ বা সংঘাতের অবসান ঘটে। তাই মানুষের সাথে মানুষের বন্ধন দৃঢ় করতে ও মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে বিয়ের গুরুত্ব আমাদের সমাজ জীবনে অপরিসীম।
বিবাহের প্রকারভেদ: সমাজভেদে বিভিন্ন ধরনের বিবাহের প্রচলন থাকলেও এখানে আমরা গুরুত্বপূর্ণ দুটি দিক থেকে বিবাহের ধরন নিয়ে আলোচনা করব। বিবাহের বর ও কনে নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সমাজে সবচেয়ে প্রচলিত দুটি নিয়ম হলো: (১) বর ও কনের সামাজিক দলের পরিচিতি এবং (২) স্বামী ও স্ত্রীর সংখ্যা।
(১) সামাজিক দলভিত্তিক বিবাহ :
দলের ভিতরে বিবাহ: এ ধরনের বিবাহব্যবস্থায় বর ও কনে নির্বাচন একই সামাজিক দলের মধ্যে হয়ে থাকে। অর্থাৎ একটি বৃহৎ সামাজিক দলের সদস্যরা নিজেদের মাঝে বিয়ে করে। এ প্রথাকে অন্তঃবিবাহও বলা হয়। দলের বাইরে বিবাহ: একই নৃগোষ্ঠীর অন্তর্গত ছোট ছোট সামাজিক দলগুলো সাধারণত নিজ দলের বাইরে বিয়ে করে। অর্থাৎ, যেকোনো দুটি ছোট সামাজিক দলের মধ্য থেকে বর ও কনে নির্বাচন করা হয়। এ ধরনের বিয়েতে বর-কনে ও তাদের দল নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক বিধিনিষেধ মেনে চলা হয়। নিজের দলের বাইরে বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় বলে এ ধরনের বিয়েকে বহিঃর্বিবাহ বলা হয়। যেমন, প্রায় সব সমাজেই একই পরিবারের সদস্যদের মাঝে বিবাহ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সুতরাং বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় দুটি পরিবার কিংবা দুটি বংশের সদস্যদের মাঝে।
(২) স্বামী ও স্ত্রীর সংখ্যাভিত্তিক বিবাহ:
এক বিবাহ: একজন মহিলা এবং একজন পুরুষের মধ্যে যে বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় তাকে বলা হয় এক বিবাহ। বর্তমান সময়ের পৃথিবীতে এ ধরনের বিয়ের প্রচলন সবচেয়ে বেশি।
বহু বিবাহ: এ ধরনের বিবাহব্যবস্থায় একজন পুরুষ একাধিক মহিলাকে অথবা একজন মহিলা একাধিক পুরুষকে বিয়ে করে। এ ধরনের সমাজে একাধিক স্বামী বা স্ত্রী নিয়ে পরিবার গঠিত হয়। যেমন, মুসলিম সমাজে একজন পুরুষ একাধিক মহিলাকে বিয়ে করতে দেখা যায়। আবার নেপাল ও তিব্বতের কিছু নৃগোষ্ঠীর সমাজে একজন মহিলার একাধিক স্বামী থাকে। এসব সমাজে পরিবারের সব ক'জন ভাইয়ের সাথে একজন মহিলার বিয়ে হতে পারে।
কাজ- ১ : আমাদের সমাজ জীবনে বিয়ে কেন গুরুত্বপূর্ণ? কাজ-২ : বিয়ের প্রকারভেদে কী ধরনের ভিন্নতা দেখা যায়? তোমার সমাজে কী ধরনের বিয়ে দেখা যায়? |
সব সমাজেই দেখা যায় বিয়ের পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের বিষয়ে কিছু নিয়ম-কানুন আছে। সব সমাজেই কে কাকে বিয়ে করতে পারবে বা কাদের মধ্যে বিয়ের সম্পর্ক তৈরি হতে পারে না সেসব রীতি-নীতি বিদ্যমান। বিয়ে বিষয়ে এসব রীতি-নীতিগুলো অবশ্যই সংস্কৃতিভেদে নানা রকম হয়। এই বিধিনিষেধ আরোপের পিছনে বড় দুটি উদ্দেশ্য রয়েছে। প্রথমত মানুষ যেন আপন আত্মীয়দের মাঝে বিয়ে না করে। কারণ আপন আত্মীয়দের মাঝে বিয়ে হলে তাদের সন্তানের শারীরিক বা মানসিকভাবে পঙ্গু হবার সম্ভাবনা থাকে। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি হলো মূলত সামাজিক। বিভিন্ন সামাজিক দলের মাঝে বিয়ের মাধ্যমে নতুন আত্মীয়তার বন্ধন সৃষ্টি করা। কারণ এভাবে মানুষের আত্মীয়তার সম্পর্কের-জাল বিস্তৃত হয় এবং বিভিন্ন সামাজিক দলের মাঝে ঐক্য ও বন্ধুত্ব গড়ে উঠে। অবশ্য, প্রথম উদ্দেশ্যটি পালনের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটিও সফল হয়।

মানুষ এল কোথা থেকে? মানবজাতির উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে নানা ধরনের কাহিনী প্রচলিত আছে।
মানুষ ও বিশ্বের উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত এ ধরনের গল্পগুলোকে পুরাণ বলে। সাঁওতালদেরও এমন একটি পুরাণ আছে। এই পুরাণ অনুযায়ী, হাঁস এবং হাঁসী থেকে সাঁওতালদের উৎপত্তি। তাদের আদি পিতা ও মাতা হলেন- পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়হি। তাদের ছিল বারটি ছেলে ও বারটি মেয়ে। প্রথমে এই ভাই- বোনদের মাঝেই বিয়ে হয়েছিল। এভাবে বারটি গোত্রের সৃষ্টি হয়, যাদের নাম- হাঁসদা, মার্ডি, মুরমু, বাসকে, হেমরম, বেসরা, সরেন, চড়ে, কিসকু, পাউরিয়া, টুডু এবং সোয়ালে। এরপর তাদের আদি পিতা- মাতা সবাইকে ডেকে বললেন, 'ভবিষ্যতে তোমরা আর কোনোদিন ভাই-বোনে বিয়ে দিবে না। আমি তোমাদের বারটি গোত্র দিয়েছি। এখন থেকে তোমরা এক গোত্রের সদস্যদের অন্য গোত্রের সদস্যদের সঙ্গে বিয়ে দিবে।' এভাবে সাঁওতালরা নিজের গোত্রের কোনো সদস্যকে এবং অন্য নৃগোষ্ঠীর কাউকে বিয়ে করে না। এই পুরাণ অনুযায়ী, সাঁওতালদের বিবাহের সামাজিক বিধি-নিষেধসমূহ চিত্র ৫.৩-এ উপস্থাপন করা হলো। চিত্র অনুসারে সাঁওতালরা বিয়ের বর ও কনে নির্বাচনে তিনটি মূলনীতি অনুসরণ করে:
১। একেবারে ভেতরের বৃত্তটিতে রয়েছে সাঁওতালদের বারটির মধ্যে যে কোনো একটি গোত্র যারা অবশ্যই দলের বাইরে বিয়ে করবে।
২। দ্বিতীয় বৃত্তটিতে রয়েছে সাঁওতালদের বৃহত্তর সমাজ যা মোট বারটি গোত্র নিয়ে গঠিত। সুতরাং যে কোনো একটি গোত্রের সদস্যদের বাকি এগারটি গোত্রের মধ্যে থেকে বর বা কনে নির্বাচন করতে হবে।
৩। তৃতীয় অর্থাৎ বাইরের বৃত্তটিতে রয়েছে সাঁওতালদের প্রতিবেশী অন্য নৃগোষ্ঠীর মানুষরা। কিন্তু অন্য সংস্কৃতির কাউকে বিয়ে করা যাবে না বলে সাঁওতালরা এমন একটি বৃহৎ সামাজিক দল যারা নিজের দলের ভিতরে বিবাহ সাঁওতালদের মতো অন্য অনেক নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতেও একই গোত্রের, একই বংশের এবং একই পরিবারের সদস্যদের ভিতর বিবাহ নিষিদ্ধ। সংস্কৃতিভেদে বংশ বা গোত্রের বিষয়ে পার্থক্য থাকলেও একই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিবাহ বর্তমান পৃথিবীর প্রায় সব সমাজেই নিষিদ্ধ। অতএব একক পরিবার এমন একটি সামাজিক দল যার সদস্যরা সবসময় দলের বাইরে বিয়ে করে। কেননা, অত্যন্ত আপন আত্মীয়তার বন্ধনে একটি পরিবার গড়ে উঠে। তাই সকল সংস্কৃতির জন্য পরিবার এমন একটি সামাজিক দল যা সবসময় নিজ দলের বাইরে বিবাহ করে।
বিভিন্ন সংস্কৃতিতে, বংশ কিংবা গোত্রকে একটি বড় বা বর্ধিত পরিবারের মতো দেখা হয়। অর্থাৎ, একই বংশ বা গোত্রের ছেলে-মেয়েদের ভাই-বোনের সম্পর্ক গুরুত্ব পায়। তাই তাদের মধ্যে বিবাহ হয় না। সাঁওতালদের মতো মান্দিদের মাঝেও গোত্রের বাইরে বিবাহের নিয়ম প্রচলিত আছে। যেহেতু মান্দি সমাজে বংশধারার নিয়মানুযায়ী সন্তানরা মায়ের বংশের সদস্য বলে বিবেচিত হয় তাই দুই বোনের ছেলে- মেয়েরা একই বংশের হবে ও একই গোত্রের হবে। আর তাই মান্দি সমাজে খালাতো ভাই-বোনের বিয়ে নিষিদ্ধ। মান্দি সমাজে নিজ বংশের এবং নিজ গোত্রের কাউকে বিয়ে করা নিষিদ্ধ। কোনো কোনো নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে নিজেদের গোত্রের এবং বংশের সদস্যদের মধ্যে বিয়ের নিয়ম আছে।
বিয়েকে কেন্দ্র করে একটি নিয়মের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সকল সমাজের মাঝে মিল দেখা যায়, কোনো সমাজেই অন্য সমাজের কাউকে বিয়ে করার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয় না। সুতরাং বলা যায় যে, বৃহৎ সামাজিক দল হিসেবে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো নিজ সমাজের ভিতরে বিবাহ করার রীতি অনুসরণ করে। গোত্রের বাইরে বিবাহের মাধ্যমে একই সমাজের বিভিন্ন গোত্রের সদস্যদের মাঝে মৈত্রী বন্ধন ও বন্ধুত্ব সৃষ্টি হয়। আবার নিজ নিজ সমাজের ভিতরে বিবাহের মাধ্যমে এক ধরনের সাংস্কৃতিক সংহতি গড়ে উঠে, যা একটি সমাজকে সুসংবদ্ধ রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কাজ- ১ : বিয়ের ক্ষেত্রে কী ধরনের সামাজিক বিধি-নিষেধ দেখা যায়? কাজ-২ : বিয়ে কীভাবে সামাজিক সংহতি সৃষ্টি করে? |
সংস্কৃতিভেদে বিবাহ-পরবর্তী বসবাসের ধরনেরও ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন, মান্দি ও খাসি সমাজে বিবাহের পর বর কনের বাড়িতে বসবাস করে। কিন্তু চাকমা বা সাঁওতাল সমাজে বরের বাড়িতে কনে বসবাস করে। সুতরাং আমরা দেখতে পাই, বিবাহের পরে স্বামী-স্ত্রীর বসবাসের ধরন বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। এগুলো হচ্ছে:
বাসস্থানের নাম | বসবাসের ধরন | নৃগোষ্ঠীর উদাহরণ |
পিতৃ নিবাস | বিবাহের পরে স্ত্রী স্বামীর বাড়িতে বসবাস করে। | বাঙালি, চাকমা, মারমাসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ নৃগোষ্ঠীর মাঝে এ ব্যবস্থা বিদ্যমান। |
মাতৃ নিবাস | বিবাহের পরে একজন স্বামী তার স্ত্রীর বাড়িতে বসবাস করে এবং সেখানেই পরিবার গড়ে তুলে। | মান্দি ও খাসি। |
দ্বৈত নিবাস | বিবাহের পরে স্ত্রীর অথবা স্বামীর পিতা-মাতার বাড়ির নিকট নবদম্পতি বসবাস করে। | হোপি (আমেরিকান ইন্ডিয়ান একটি নৃগোষ্ঠী)। |
নয়া নিবাস | বিবাহের পরে নবদম্পতি তাদের আত্মীয়-স্বজন হতে আলাদা নিজেদের বাড়িতে বসবাস করে। | আধুনিক ও শিল্পোন্নত সমাজে দেখা যায়। |
মাতুলীয় নিবাস | বিবাহের পরে নবদম্পতি বরের মামার সাথে বসবাস করে। | ট্রব্রিয়ান্ড সমাজে (প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে)। |
বিবাহ-পরবর্তী বাসস্থানের ধরন প্রত্যেকটি সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিবাহ-পরবর্তী বাসস্থান যদি পিতৃ নিবাসীয় হয়, তাহলে বিবাহিত ছেলে তার বাবা-চাচার বংশের আত্মীয়দের সাথে অর্থনৈতিক কাজ যেমন চাষাবাদের কাজ করে। কিন্তু মাতৃ নিবাস হলে বিবাহিত ছেলে তার স্ত্রীর বংশের আত্মীয়দের সাথে চাষাবাদের কাজ করে। বিবাহ-পরবর্তী বাসস্থানের নিয়মের দ্বারা সন্তানেরা কোন ধরনের আত্মীয়দের সাথে ঘনিষ্ঠ হবে এবং কী সামাজিক দায়িত্ব পালন করবে তার অনেকটা নির্ধারিত হয়ে থাকে।
কাজ- ১ : বিবাহ-পরবর্তী বাসস্থান বলতে কী বোঝায়? কাজ-২ : বিবাহ-পরবর্তী বসবাসের ধরনগুলো কী? তোমার সমাজে বিবাহ পরবর্তী বাসস্থান কী ধরনের হয়ে থাকে? |
সামাজিক সংগঠনের সর্বাপেক্ষা গুরত্বপূর্ণ একক হচ্ছে পরিবার। এটি হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে প্রাথমিক সামাজিক সংগঠন। বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে পরিবারের সৃষ্টি। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে সন্তান উংপাদন ও লালন-পালন করা। পরিবারের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি সমাজে পরিচিতি লাভ করে। সাধারণত পরিবার বলতে বোঝায় একটি সামাজিক গোষ্ঠী। এর সদস্যরা একত্রে বসবাস করার মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলে। সাধারণত একটি ছোট পরিবারে স্বামী-স্ত্রী আর তাদের সন্তানেরা বসবাস করে।
আমাদের জীবনে পরিবারের গুরুত্ব অপরিসীম। জন্ম থেকেই একটি শিশুকে খাদ্য, চিকিৎসা, নিরাপদ বাসস্থানসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু দিয়ে ধীরে ধীরে গড়ে তোলে তার পরিবার। সমাজের মূল্যবোধ, রীতিনীতি, আদব-কায়দা সব কিছুই পরিবার আমাদের শিখিয়ে দেয়। প্রথম দুটি পাঠে আমরা আলোচনা করেছি পরিবার কীভাবে সমাজের ভিত্তি রচনা করে। এবারে আমরা দেখব সংস্কৃতিভেদে পরিবারের গঠন কী ধরনের হয়ে থাকে।
পরিবারের প্রকারভেদ: সমাজভেদে পরিবারের ধরন ভিন্ন ভিন্ন হয়। তবে আমরা এখানে দুটি বিশেষ দিক থেকে পরিবারের ধরন নিয়ে আলোচনা করব, যথা: (১) পরিবারের গঠনের ভিত্তিতে ও (২) বংশধারার প্রকারের ভিত্তিতে।
(১) গঠনের ভিত্তিতে পরিবার:
পরিবারের প্রকার | পরিবার গঠনের বৈশিষ্ট্য |
একক পরিবার | এ ধরনের পরিবারে একটি বিবাহিত দম্পতি এবং তাদের সন্তান-সন্ততিরা বসবাস করে। |
বর্ধিত ও যৌথ | একক পরিবার থেকে সদস্য সংখ্যা বেশি থাকে এ ধরনের পরিবারে। বর্ধিত পরিবারে তিন প্রজন্মের মানুষ একত্রে বসবাস করতে পারে। এ ধরনের পরিবারে বাবা-মা ছাড়াও বিবাহিত ভাইরা তাদের স্ত্রী ও সন্তানসহ একত্রে বসবাস করতে পারে। এধরনের পরিবারে অন্যান্য সম্পর্কের আরো আত্মীয়রা বসবাস করতে পারে। বর্ধিত পরিবারে সম্পত্তির মালিকানা একত্রে থাকে এবং আয়-ব্যয় মিলিতভাবে হয়। |
(২) বংশধারার প্রকারভিত্তিক পরিবার: বংশধারার নিয়মের উপর ভিত্তি করে পিতৃসূত্রীয় ও মাতৃসূত্রীয় পরিবার দেখা যায়।
পরিবারের প্রকার | পরিবার গঠনের বৈশিষ্ট্য |
পিতৃসূত্রীয় পরিবার | এ ধরনের পরিবার গড়ে উঠে যখন বিয়ের পর স্ত্রীরা অন্য বাড়ি থেকে তাদের স্বামীর বাড়িতে বসবাস করতে আসে। উপরের চিত্রের পরিবারগুলোর সদস্যরা পিতৃসূত্রীয় বংশধারার ভিত্তিতে গঠিত। কেননা, এখানে বিবাহিত মেয়েরা অন্য বাড়ি থেকে এসেছে। |
মাতৃসূত্রীয় পরিবার | এ ধরনের পরিবারে বিয়ের পর স্বামীরা তাদের স্ত্রীর বাড়িতে এসে বসবাস করা শুরু করে। তাই এসব পরিবারে মেয়ের মা-বাবা, সন্তান ও তার বোনদের নিয়ে গড়ে উঠে। বিবাহিত ভাইরা আর পরিবারের সদস্য থাকে না। |
বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীদের মাঝে বিভিন্ন ধরনের পরিবারব্যবস্থা লক্ষ্য করা যায়। যেমন, ময়মনসিংহ অঞ্চলে মান্দিদের পরিবার মাতৃসূত্রীয়। মান্দি পরিবারে সন্তানরা মায়ের পরিচয়ে সমাজে পরিচিত হয়। মান্দিদের মতো সিলেটের খাসি সমাজেও পরিবার ব্যবস্থা একই রকম। এসব সমাজে মহিলারা পরিবার প্রধান হয়। অপরদিকে, বাঙালিসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর সমাজে রয়েছে পিতৃতান্ত্রিক পরিবার। এ ধরনের পরিবারে পুরুষদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়।
কাজ- ১ : পরিবারের প্রকারভেদ ছকে উপস্থাপন কর। কাজ- ২ : পরিবার কীভাবে সমাজের ভিত্তি গঠন করে? |
বংশধারা: বংশধারা বলতে বংশের বৃত্তান্ত বা ক্রম বা ধারাকে বোঝানো হয়। এক প্রজন্মের সাথে অন্য প্রজন্মের সম্পর্ক ও সম্পর্কের ধারাবাহিকতাকে বংশধারা বলে। অন্য কথায়, পূর্বপুরুষের সাথে আমাদের সম্পর্কের যোগসূত্র নিরূপণ করাকে বংশধারা বলা হয়। অতএব বলা যায়, একজন মানুষ সাধারণত জন্মসূত্রে একটি বংশধারার সদস্যপদ লাভ করে থাকে।
পূর্বপুরুষের সাথে সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে আমরা আপন ও দূরের আত্মীয় নির্ণয় করি। যেমন, একই বাবার দুই ছেলে হলো আপন ভাই। আবার আপন চাচাতো ভাই-বোনরা সবাই একই দাদার বংশধর। এভাবে আমরা যত পেছনের বা পূর্বের প্রজন্মের সূত্র ধরে গণনা করব আমাদের আত্মীয়দের সংখ্যাও তত বাড়তে থাকবে। শুধুমাত্র আমাদের নিকট বা আপন আত্মীয়দের নিয়ে একটি আত্মীয়তার দল গঠন করা যেতে পারে।
আবার আমাদের নিকট ও দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের নিয়ে যদি আরেকটি আত্মীয়তার দল গঠন করা হয় তাহলে কোনটি বড় দল হবে? নিশ্চয়ই দ্বিতীয় দলটির সদস্য অনেক বেশি হবে, তাই না? এই আত্মীয়তার ছোট ও বড় দলগুলোকে আমরা বলি বংশ, গোত্র ইত্যাদি।
আমাদের সমাজ জীবনে বংশধারা অনুযায়ী এ সব আত্মীয়তার দলগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সমাজে সম্পদের উত্তরাধিকার থেকে শুরু করে পরবর্তী গ্রাম বা সমাজপ্রধান কে হবে, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে কার ভূমিকা কী হবে, ইত্যাদি নির্ধারণে বংশধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কার জমি কে পাবে, কতটুকু পাবে সেটিও বংশধারার আইন অনুযায়ী চলে। আবার নানা ধরনের সামাজিক দলের সদস্যপদ ঠিক করা হয় বংশদলের মাধ্যমে। চাষাবাদে বা ঘরবাড়ি তৈরিতে সহযোগিতার দরকার হলে তা বংশদলের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। পারস্পরিক রাজনৈতিক সহযোগিতা অথবা সংঘাতের সময় বংশদলের সাহায্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার কে কাকে বিয়ে করতে পারবে আর কে কাকে পারবে না, সেটিও নির্ধারিত হয় বংশধারার মাধ্যমে। এছাড়াও বিয়ের সময় কনে পক্ষ এবং বর পক্ষের মধ্যে সম্পদের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও বংশধারার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে।
আত্মীয়তার দল- বংশ ও গোত্র বংশ বা কুল বলতে আমাদের সরাসরি রক্তের সম্পর্কের পূর্বপুরুষদের পরিচিতি বোঝায়। অর্থাৎ আমাদের আগের পুরুষদের মধ্যে প্রাচীনতম ব্যক্তি যার পরিচয় এবং সরাসরি সম্পর্ক আমরা জানি, তার বংশধরদের সবাই এক বংশ বা কুলের অন্তর্গত। সাধারণত, পূর্বের আট থেকে দশ পুরুষ হতে এখন পর্যন্ত সম্পর্কিত আত্মীয়রা একই বংশের সদস্য। সমাজে একই বংশের সদস্যদের বিবেচনা করা হয় একটি সক্রিয় সামাজিক দল হিসেবে। কেননা, একই বংশের সদস্যরা আপন আত্মীয় হিসেবে পরস্পরের প্রয়োজনে এগিয়ে আসে, চাষাবাদে সহযোগিতা করে, একসাথে চলাফেরা করে এবং মিলিতভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উদযাপন করে ইত্যাদি।
বহু পুরুষ আগের কারো নাম হয়ত আমরা শুনেছি, কিন্তু তার সাথে সম্পর্কের সরাসরি যোগসূত্র এখন আমরা আর জানি না, এমন সদস্যদের সবাইকে নিয়ে একটি গোত্র গড়ে উঠে। একই গোত্রের সদস্যরা সবাই বিশ্বাস করে যে তারা একই আদি পুরুষের বংশধর, কিন্তু সম্পর্কের সরাসরি যোগসূত্র তারা সবসময় জানে না।
গোত্রের পূর্বতম পুরুষ সাধারণত বিশ্বাস নির্ভর এবং কাল্পনিক কোনো ব্যক্তি। কয়েকটি বংশ মিলেই একটি গোত্র গড়ে উঠে। আর কয়েকটি গোত্র একসঙ্গে একটি নৃগোষ্ঠী গড়ে তোলে।
উদাহরণস্বরূপ, যেমন ধরে নেয়া যাক, বান্দরবানের ম্রো নৃগোষ্ঠীর একজন ছেলের নাম দুরন। তার গোত্রের নাম হলো তাইসাং। দূরনের মতো মেনলুংও আরেকজন তাইসাং। দুরনের দাদার বাবার বাবা হলেন উইলেন, যিনি মেনলুং-এর সম্পর্কে দাদার বাবা হন। সুতরাং, দুরন ও মেনলুং দুইজনই একই বংশের সদস্য। কিন্তু ম্রো নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে আরও কয়েক শত মানুষ আছে যারা তাইসাং গোত্রের সদস্য। যারা দূর-দূরান্তের বিভিন্ন ম্রো গ্রামে ছড়িয়ে আছে। দুরন এদের সবাইকে চেনে না, অনেককে কখনো দেখেনি, বা সবার নামও জানে না। তবে সব তাইসাংদের মত দুরনও বিশ্বাস করে তারা সবাই একই পূর্বপুরুষের বংশধর। তাই সকল তাইসাং সদস্যই একই গোত্রের অন্তর্গত।
কাজ- ১ : একটি বংশের সকল সদস্যেদের একটি সামাজিক দল বলার কারণ লিপিবদ্ধ কর। কাজ- ২ : সমাজ জীবনে বংশধারা কেন গুরুত্বপূর্ণ? |
বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে প্রধানত দুই ধরনের বংশধারা ব্যবস্থা দেখা যায়। যথা: (১) পিতৃসূত্রীয় বংশধারা এবং (২) মাতৃসূত্রীয় বংশধারা। বাঙালিদের সংস্কৃতিতে দেখা যায় যে, সন্তানরা তাদের বাবার বংশের সদস্য হিসেবে পরিচিত হয়। অন্যদিকে মান্দি সংস্কৃতিতে সন্তানরা পরিচিত হয় মা-র বংশের সদস্য। যেমন, নমিতা চিরান একজন মান্দি মেয়ে। তার মা-র নাম মমতা চিরান ও বাবার নাম লিপ্টন মারাক। নমিতার পদবি চিরান এবং সে তার মা-র বংশ অর্থাৎ চিরান বংশের সদস্য। মান্দি নিয়ম অনুযায়ী ধরে নেওয়া হয় নমিতা চিরান বংশের অন্য সকল সদস্যের সাথে রক্তের সম্পর্কে সম্পর্কিত।
পিতৃসূত্রীয় বংশধারা: আমাদের দেশের অধিকাংশ নৃগোষ্ঠীর বংশধারাই পিতৃসূত্রীয়। সন্তানরা বাবার পরিচয়ে পরিচিত হয় সমাজে, আর বাবা পরিচিত হয় তার বাবার পরিচয়ে। সুতরাং, পিতৃসূত্রীয় বংশধারা বলতে বোঝায়, যখন একজন ব্যক্তিকে তার পিতার বংশের সদস্য বলে চিহ্নিত করা হয়। এ ধরনের সমাজে কারো মা বা নানীর পরিচয় বিশেষ কোনো গুরুত্ব বহন করে না। পিতৃসূত্রীয় বংশধারা অনুযায়ী, একটি গোত্রের সকল সদস্য বিশ্বাস করে, তারা সবাই প্রাচীনকালের কোনো একজন নির্দিষ্ট পুরুষের বংশধর। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই গোত্রের সকলের মাঝে ঐক্য গড়ে উঠে।
পিতৃসূত্রীয় বংশধারার রীতি অনুযায়ী, কারো ফুফাতো বা মামাতো ভাই-বোন তার বংশধারার সদস্য নয়। এদেশে মান্দি ও খাসি ছাড়া অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর, যেমন, বাঙালি, সাঁওতাল, ওরাঁও, চাকমা, মারমা ইত্যাদি সবাই পিতৃসূত্রীয় বংশধারা অনুসরণ করে। এ ধরনের সংস্কৃতিতে, কোনো মহিলার সন্তানরা ঐ মহিলার বাবার বংশধারার সদস্য হয় না।
মাতৃসূত্রীয় বংশধারা: মান্দিদের মধ্যে মাতৃসূত্রীয় বংশধারা দেখতে পাওয়া যায়। এ ধারা অনুযায়ী একজন ব্যক্তি, তার মাতার বংশধারার সদস্য। একই মায়ের বংশধারার সদস্যরা তাদের পূর্বসুরি হিসেবে একজন নারীকে নির্ধারণ করে থাকে। অতএব, নারীর বংশধর নিয়ে গঠিত আত্মীয়তার ধারাকে মাতৃসূত্রীয় বংশধারা বলা হয়। অর্থাৎ এই প্রথা অনুযায়ী সন্তানরা তাদের মা-র গোত্রের সদস্য। তাই একজন পুরুষ তার মা-র গোত্রের অন্তর্ভুক্ত হলেও তার সন্তানরা তার গোত্রভুক্ত নয়।
মাতৃসূত্রীয় রীতিতে মান্দি নৃগোষ্ঠীর কথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন অঞ্চলে এবং মধুপুরের শালবন এলাকায় মূলত মান্দিদের বসতি। তাদের সংস্কৃতিতে সন্তানেরা তার মায়ের বংশধারার সদস্য বলে বিবেচিত হয়। ছেলে সন্তানেরা তাদের বিয়ের পর তাদের স্ত্রীদের বাড়িতে বা এলাকায় গিয়ে বসবাস করে এবং তাদের সন্তানরা তাদের স্ত্রীদের বংশধারার সদস্য হয়। নারী-পুরুষ উভয়েই মান্দি সমাজে অর্থনৈতিক কাজ অর্থাৎ কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করে। যেহেতু মেয়েরা তার মায়ের সম্পত্তিতে অধিকার পায়, তাই তাদের স্বামীরা তাদের বাড়িতে থাকে ও তাদের জমিতে ফসল ফলায়। আর তার ভাইরাও একই নিয়মে বিয়ের পর অন্য এলাকায় বা অন্য বাড়িতে তাদের স্ত্রী-র সাথে বসবাস করে। যদি কোনো কারণে স্ত্রী-র মৃত্যু হয়, তাহলে ভাইটি অনেক ক্ষেত্রে আবার তার মায়ের বাড়িতে ফিরে আসে এবং তার মা বা বোনদের পরিবারে বসবাস করে। সিলেটের খাসিদের মাঝেও বংশধারার একই রীতির প্রচলন আছে।
| কাজ- ১ ঃ পিতৃসূত্রীয় ও মাতৃসূত্রীয় বংশধারার পার্থক্যগুলো একটি ছকে সাজাও। |
আমরা যেমন আমাদের পূর্বপুরুষের বংশধর তেমনি আমরা তাদের সামাজিক অবস্থানগত ও মালিকানাধীন বিভিন্ন সম্পদের বৈধ উত্তরাধিকারী। গোত্রের সদস্যপদের মতো বংশধারার প্রথাই নির্ধারণ করে সেই সংস্কৃতিতে উত্তরাধিকারের ধরন কেমন হবে। উত্তরাধিকার বলতে আমরা বুঝি পূর্বপুরুষের সম্পদের উপর আমাদের জন্মগত অধিকার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে একটি পরিবারে যদি কয়েকজন ভাইবোন থাকে তাহলে তাদের বাবা-মার সম্পদে কার অধিকার কতোটুকু হবে? বিভিন্ন সংস্কৃতি এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে।
মানব সভ্যতার শুরুর দিকের সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মালিকানা বা ব্যক্তিগত সম্পদের ধারণা মানুষের ছিল না। নিজের ব্যবহৃত কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছাড়া বাকি সবকিছুই দলের সকলের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কোনো মৃত ব্যক্তির সৎকারের সাথে সাথেই তার ব্যবহৃত জিনিসগুলোও অনেক সময় নষ্ট করে ফেলা হতো। কৃষির আবিষ্কার মানুষের জীবনে অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসে। কৃষিকে ঘিরেই গড়ে উঠে স্থায়ীভাবে বসবাসের সূচনা। ধীরে ধীরে মানুষ তার নিজের প্রয়োজনের বেশি পরিমাণ ফসল উৎপাদন ও পশুপালন করতে শেখে। ব্যক্তিগত পারিবারিক চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদন থেকেই সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানার ধারণা শুরু হয়। এভাবে বিভিন্ন ধরনের সম্পদের উপর ব্যক্তি মালিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে একই সাথে সম্পদের মালিকানা বদল করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে যে কোনো সংস্কৃতির জন্য।
ব্যক্তিগত সম্পদের মালিকানা বদলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো উত্তরাধিকার ব্যবস্থা। সংস্কৃতিতে বংশধারার নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির সম্পদের মালিক হলো তার বংশধর। পিতৃতান্ত্রিক বংশধারায় ছেলে আর মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মেয়ে সন্তানরা পারিবারিক সম্পদের উত্তরাধিকার। কিন্তু এর মাঝেও সংস্কৃতিভেদে কিছু বৈচিত্র্য দেখা যায়। কেননা, কিছু সংস্কৃতিতে সকল উত্তরাধিকারীর মাঝে সম্পদ সমানভাবে বণ্টিত হয় না। সন্তানদের মধ্যে যার দায়িত্ব বেশি তার উত্তরাধিকৃত সম্পত্তির পরিমাণও বেশি হয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের উত্তরাধিকার ব্যবস্থা তাহলে দুভাবে নির্ধারিত হয়:
(১) বংশধারার ভিত্তিতে এবং
(২) দায়িত্বের ভিত্তিতে।
(১) বংশধারার ভিত্তিতে উত্তরাধিকার:
পিতৃসূত্রীয় রীতি | পিতৃসূত্রীয় ব্যবস্থায় বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হলো তার ছেলে সন্তানরা। |
মাতৃসূত্রীয় রীতি | মায়ের ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং মালিকানাধীন সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হলো মেয়ে সন্তানরা। |
উদাহরণস্বরূপ, ওরাঁও সংস্কৃতিতে পিতার সম্পত্তিতে মেয়েদের কোনো মালিকানা বা অধিকার নেই। পিতার মৃত্যুর পর পুত্ররাই সমান হারে ভাগ পায়। তবে সম্পত্তি ভাগাভাগির সময় মেয়েরা একটি করে গাভী পেয়ে থাকে। আবার, খাসি সমাজে মাতৃসূত্রীয় উত্তরাধিকার রীতি দেখা যায়। তাদের সমাজে মেয়েরাই যাবতীয় সম্পত্তির অধিকারী হয়ে থাকে।
(২) দায়িত্ব ও কর্তব্যের ভিত্তিতে উত্তরাধিকার:
বড়দের অধিকার | কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারের বড় সন্তান সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বলে বিবেচিত হয়। কেননা, পরিবারের সবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব থাকে বড় সন্তানের উপর। |
ছোটদের অধিকার | এ নীতি অনুযায়ী পরিবারের ছোট সন্তান সম্পত্তির সিংহভাগের অধিকারী হয়। কেননা, বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা ছোট সন্তানের সাথে বসবাস করে। |
বাংলাদেশের খাসি ও মান্দিদের মধ্যে ছোট সন্তানদের অধিকার-রীতি দেখা যায়। এদের মাঝে সাধারণত বসতবাড়ির মালিক হয় ছোট মেয়ে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা ছোট মেয়ের সাথে থাকে। এমনকি মৃত্যুর পর বাবা-মার সৎকারের দায়িত্ব পালন করে ছোট মেয়ে।
কাজ- ১ : উত্তরাধিকার বলতে কী বোঝায়? সমাজভেদে কতো ধরনের উত্তরাধিকারের নিয়ম দেখা যায়? কাজ-২ : মান্দি, খাসি ও ওরাও সমাজে উত্তরাধিকারের নিয়মগুলো ছকে উপস্থাপন কর। |
Read more