মানুষকে দলবদ্ধভাবে সমাজে বসবাসের প্রেরণা দেয় আত্মীয়তার সম্পর্ক। পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়দের ছেড়ে দূরে কোথাও গেলে বেশি দিন একা থাকতে আমাদের ভাল লাগে না। অর্থাৎ আমাদের বাবা, মা, ভাই-বোনসহ অন্য আত্মীয়দের মাধ্যমেই আমরা আমাদের আপন ঠিকানা গড়ে তুলি এবং আমাদের সমাজের সাথে যুক্ত থাকি। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজে আত্মীয়তার সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত।
আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমে কোনো সমাজের সামাজিক কাঠামো বা সামাজিক সংগঠনগুলো গড়ে উঠে। তাই আত্মীয়তার সম্পর্ক বিষয়ে জানার মাধ্যমে কোনো সমাজের জীবনযাত্রা সম্বন্ধে ধারণা লাভ করা যায়। সমাজ সংগঠনের মূল হচ্ছে সমাজের ব্যক্তিদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক। আর এই পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তি হলো আত্মীয়তার সম্পর্ক। সমাজের সকলেই রক্ত সম্পর্ক অথবা বৈবাহিক সম্পর্ক অথবা কাল্পনিক সম্পর্কের মাধ্যমে একে অন্যের নৈকট্য অনুভব করে থাকে। যেমন: সমাজের সংগঠন হিসেবে পরিবারকে বিশ্লেষণ করতে গেলে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়া কোনোভাবেই বুঝা সম্ভব নয়। আত্মীয়তার সম্পর্কের মাধ্যমেই কোনো সমাজের পরিবার কাঠামো, বিবাহব্যবস্থা, সম্পত্তির মালিকানা এবং উত্তরাধিকার ব্যবস্থা গড়ে উঠে। এর মাধ্যমে বংশবৃদ্ধি তথা, সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা এবং ভাই-বোন সম্পর্ক গড়ে উঠে। আত্মীয়তার সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আত্মীয়তার দলগুলোর মধ্যে বন্ধন তৈরি হয় এবং এর ভিত্তিতে সামাজিক সংহতি ও ঐক্য গড়ে উঠে।
সামাজিক নিয়ন্ত্রণ, নেতৃত্ব এবং সদস্যদের মাঝে বিবাদ মীমাংসার ক্ষেত্রেও আত্মীয়তার সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ জনগোষ্ঠী নিজেদের গোষ্ঠী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়। নিজস্ব গোষ্ঠীর মর্যাদা ও স্বার্থ রক্ষায় তারা তৎপর থাকে। ফলে তারা নিজেদের ঐতিহ্য সংরক্ষণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তাই সামাজিক উন্নতি এবং অগ্রগতি সাধনে আত্মীয়তার সম্পর্কের গুরুত্ব অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ এবং সুদূরপ্রসারী।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজে আত্মীয়তার সম্পর্কই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সংগঠন। আত্মীয়তার দলগুলোর ভিত্তিতে এ ধরনের সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন, নানাবিধ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সংগঠিত ও সক্রিয় হয়। আত্মীয়তার সম্পর্কের এরকম কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হচ্ছে:
১. সমাজে বিবাহব্যবস্থাকে সংগঠিত করে বিভিন্ন বংশ ও গোত্রের মাঝে বন্ধন সৃষ্টি করা। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজে আত্মীয়তার সম্পর্কভিত্তিক কিছু নিয়মের মাধ্যমে বিয়ের পাত্র-পাত্রী বাছাই করা হয়। ফলে সকল সামাজিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এবং সামাজিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য গড়ে উঠে।
২. এর ভিত্তিতে নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও উদ্দেশ্য নিয়ে পরিবার ব্যবস্থা গড়ে উঠে। সমাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য শিশুর জন্মদান ও সংস্কৃতি শিখিয়ে শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে গড়ে তোলে সমাজের নতুন সদস্য হিসেবে।
৩. রাজনৈতিক কার্যক্রম সংগঠিত করার জন্য বিভিন্ন সামাজিক দলের মাঝে বন্ধন তৈরি করে এবং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক দ্বন্দ্ব ও বিরোধ নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৪. সম্পদের উত্তরাধিকার ও উৎপাদন ব্যবস্থাকে সংগঠিত করে সমাজের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখে। বিভিন্ন সম্পদের উপর মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে। অর্থাৎ মানুষের অবর্তমানে তার সম্পত্তি কে কতোটা পাবে এবং কীভাবে, সেই বিষয়টি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৫. পরিবার ও আত্মীয়তার দলগুলো ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার ও নৈতিকতা শিক্ষা দিয়ে শিশুদের গড়ে তোলে।
৬. সমাজ সংগঠনের ক্ষেত্রে একজনের সাথে অন্যজনের আচরণ এবং পারস্পরিক দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার নির্দিষ্ট করে দেয়।
| কাজ- ১ : আত্মীয়তার সম্পর্ক পাঠ করা কেন গুরুত্বপূর্ণ? |
Read more