ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের ধর্মীয় উপাসনালয়ের স্থাপত্য ঐতিহ্য (পাঠ-০৭ ও ০৮)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রত্নঐতিহ্য - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

330

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের নান্দনিক ঐতিহ্যের পরিচয় পাওয়া যায় তাদের বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের স্থাপত্যশৈলী থেকে। প্রাচীনকালের রাজা-বাদশা ও সমাজের অভিজাত শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতাতেই ইতিহাসের নানা সময়ে গড়ে উঠেছিল বহু মন্দির, মসজিদ, গির্জা, প্যাগোডা, বিহার এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজেও ধর্মচর্চার বিভিন্ন ধারা, প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা গড়ে উঠেছে প্রাচীনকাল থেকেই। আমরা এখানে তাদের কয়েকটি প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপনা সম্পর্কে আলোকপাত করব।

জৈন্তেশ্বরী মন্দির: ঔপনিবেশিক শাসকদের বিভিন্ন দলিলপত্র, গ্রীক, রোমান এবং চীনা পরিব্রাজকদের নানা বিবরণ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব পাঁচ শতকে খাসি জনগোষ্ঠীর বসবাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে খাসি নৃগোষ্ঠীর আদি পূর্বপূরুষরা অর্থাৎ খাসি-খমুইক ভাষাগোষ্ঠীর মানুষ বাংলাদেশ ও ভারতের উত্তর- পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বসতি স্থাপন করে আনুমানিক আঠার হাজার বছর পূর্বে। তবে শুধুমাত্র খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে আমরা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস লিখিতরূপে পাই। খিস্টীয় পনের শতক থেকে শুরু করে ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীনে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দীর্ঘ শাসনামলে খাসি বা জৈন্তিয়া রাজা-রাণীরা বিভিন্ন সময়ে রাজপ্রাসাদ, স্মৃতিসৌধ, মন্দির প্রভৃতি নির্মাণ করেছিলেন। সিলেটের জৈন্তা রাজপ্রাসাদ এবং জৈন্তেশ্বরী মন্দির হলো খাসি জনগোষ্ঠীর গৌরবময় অতীতের স্মৃতিবাহী তেমনই একটি প্রত্নস্থাপনা।
খ্রিস্টীয় ১৬৮০ সালে জৈন্তা রাজা লক্ষ্মী সিংহ জৈন্তেশ্বরী মন্দির, রাজপ্রাসাদ এবং বিশাল সব প্রস্তরখন্ড দিয়ে বেশ কয়েকটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করেন। সংরক্ষণের অভাবে বর্তমানে রাজবাড়িটি পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও মন্দিরের কিছু অংশ এবং পাথরের কয়েকটি স্তম্ভ এখনও টিকে আছে। মন্দির কমপ্লেক্সের সীমানা প্রাচীরের অবস্থা সামান্য ভাল হলেও তার আদি রূপটি আর অবশিষ্ট নেই। এখন দেয়ালগাত্রে আঁকা বিভিন্ন নকশার মধ্যে রয়েছে ঘোড়া, সিংহ এবং পাখাযুক্ত পরীসহ নানা কাল্পনিক বস্তু ও প্রাণীর ছবি।

মন্দির এলাকার চারপাশজুড়ে ছোট বড় মিলিয়ে কমপক্ষে ৪২টি স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে আছে কয়েকটি স্মৃতিসৌধ এবং এসব স্মৃতিসৌধের ছোট বড় ১৯টি স্তম্ভ বা মেগালিথ। প্রাচীন যুগের প্রকান্ড প্রস্তরখন্ডকে মেগালিথ বলা হয়। মেগালিথের লম্বা বা খাড়া স্তম্ভগুলোকে বলা হয় 'মেনহির', আর টেবিলের মতো আয়তাকার স্তম্ভগুলোর নাম 'ডলমেন'। উভয় ধরনের মেগালিথের সমন্বয়ে জৈন্তাপুরের এই স্মৃতিস্তম্ভগুলো নব্য প্রস্তর যুগে নির্মিত হয়েছিল।

কক্সবাজারের প্রাচীন বৌদ্ধমন্দির রামু কক্সবাজার জেলার একটি উপজেলা এবং প্রাচীন প্রত্নঐতিহ্যের জন্য অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এখানে এক বর্গকিলোমিটারের অধিক পাহাড়ি এলাকাজুড়ে বহু প্রাচীন বৌদ্ধ নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। স্থানীয় মাটি ও পাথরের তৈরি কমপক্ষে ২৫টি প্রাচীন বৌদ্ধ মূর্তি এখানে আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া এখানকার বিভিন্ন মন্দিরে রয়েছে সোনা, ব্রোঞ্জ এবং অন্যান্য ধাতু দিয়ে তৈরি ছোট বড় ও নানা বর্ণের অসংখ্য বুদ্ধমূর্তি।

রামুতে যেসব প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে রাংকূট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহার, রামু শিমা বিহার, লামাপাড়া বিহার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। মন্দিরগুলোর মধ্যে রাংকুট বনাশ্রম বৌদ্ধ বিহারটি সবচেয়ে প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব ৩০৮ সালে এটি নির্মিত হয়। মন্দিরটির কাছাকাছি নীরবে বয়ে চলেছে বাঘখালী নদী।\

আরাকানের রামু রাজবংশের নামানুসারে এলাকাটির নামকরণ রামু হয়েছে। আরাকান রাজ মুলতইং চন্দ্র ৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম অঞ্চল দখল করে নেন। সেই সূত্রে খ্রিস্টীয় ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রাম মুঘল শাসনাধীনে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত কক্সবাজার ও রামু অঞ্চলটি আরাকান রাজ্যের অংশ ছিল।

মোঘলদের সময়ে রামুতে তের ফুট উচ্চতার এক বিশাল বুদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়। এটি ব্রোঞ্জের তৈরি এবং বাংলাদেশে এযাবৎ আবিষ্কৃত বুদ্ধমূর্তিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড়। এই অঞ্চলে আরেকটি প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দিরের নাম হলো রামু শিমা বিহার। প্রায় চারশ' বছর আগে মূল বিহারটি নির্মিত হয়েছিল। এটি নির্মাণে বিশেষ ধরনের কাঠ এবং ঐতিহ্যবাহী বার্মিজ শৈলী ব্যবহৃত হয়েছে। প্রাচীন পুঁথিপত্রসহ বর্মী ভাষায় লেখা ত্রিপিটক, ইতিহাস, সাহিত্য ও দর্শনশাস্ত্রের বহু বই-পুস্তক রয়েছে এই মন্দিরের পাঠাগারে। এর সামান্য দূরত্বে রয়েছে লামাপাড়া বিহার নামে আরেকটি বৌদ্ধ মন্দির। এখানে ধাতুর তৈরি বিশালাকৃতির প্রাচীন ঘণ্টা রয়েছে। ঘণ্টিতে উৎকীর্ণ দুর্বোধ্য লিপি দিয়ে কিছু লেখা রয়েছে যেগুলোর পাঠোদ্ধার করা এখনও সম্ভব হয়নি। ষোড়শ শতাব্দীতে এই মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়।

এছাড়া আছে কক্সবাজারের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধ মন্দির মাহাসিংদ্রোগী ক্যাং যা ১৬৩৮ সালে নির্মিত হয়। যুদ্ধবিগ্রহ এবং মানুষের সীমাহীন লোভ-লালসা দেখে সংসারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ প্রবাসী রাখাইন রাজা উ আগ্‌গা মেধা (যিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী হওয়ার পর এই নাম ধারণ করেন) কক্সবাজারের মাহাসিংদ্রোগী ক্যাংটি নির্মাণ করেন। ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর দ্বারা নির্মিত চিৎমরং নামক প্রাচীন ও দর্শনীয় বৌদ্ধ মঠটির অবস্থান রাঙ্গামাটির কাপ্তাই বাঁধ এলাকা থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। এছাড়া রাঙ্গামাটি শহরে অবস্থিত এবং রাজ বনবিহার বৌদ্ধ মন্দিরটি প্রখ্যাত বৌদ্ধ সাধক 'বনভান্তে'র কল্যাণে ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এছাড়া ত্রিপুরা রাজপরিবারের কোনো কোনো সদস্যের দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বহুকাল আগে নির্মিত হয়েছিল কয়েকটি হিন্দু ধর্মীয় উপাসনালয়। সেগুলোর মধ্যে পানছড়ি উপজেলায় অবস্থিত কালী মন্দির, মাটিরাঙ্গা উপজেলার অযোধ্যা কালী মন্দির, দীঘিনালা উপজেলায় অবস্থিত কামাকুটছড়া শিব মন্দির এবং মাটিরাঙ্গা উপজেলার জুরমরং শিব মন্দিরটি উল্লেখযোগ্য। আনুমানিক দুইশ' থেকে দুইশ' পঞ্চাশ বছর আগে এসব মন্দির নির্মিত হয়েছিল।

কাজ- ১ : ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের কিছু বিখ্যাত ধর্মীয় উপাসনালয়ের নাম লিখ।

কাজ-২ : কক্সবাজার এবং রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত যে কোনো দুটি বিখ্যাত বৌদ্ধ মন্দিরের অবস্থান চিহ্নিত কর।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...