বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো নানা উৎসব অনুষ্ঠান পালন করে থাকে। বর্ণিল এবং বৈচিত্র্যময় এসব উৎসব তাদের জীবন ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ উৎসবের মধ্য দিয়ে মূলত আনন্দ ও ঐক্যের মেলবন্ধন ঘটে। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় এসব উৎসব পালিত হয়। বিশেষ কিছু দিনে এই উৎসবগুলো আয়োজন করা হয়। এই অধ্যায়ে আমরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কয়েকটি উৎসব সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।

এই অধ্যায় শেষে আমরা-
- দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উৎসবগুলো সম্পর্কে যথাযথ ধারণা লাভ এবং এসব উৎসব পালনের সামাজিক গুরুত্ব মূল্যায়ন করতে পারব।
- উৎসবগুলোর বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোচনা এবং বাংলাদেশের পাহাড় ও সমতলে এসব উৎসব পালনে যে স্বাতন্ত্র্য রয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করতে পারব।
- বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উৎসবের একটি অঞ্চলভিত্তিক ছক তৈরি করতে পারব।
- নিজের এলাকায় উদযাপিত গুরুত্বপূর্ণ উৎসবগুলো সম্পর্কে প্রতিবেদন তৈরি করতে পারব।
- ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উৎসব ও বৈচিত্র্যের বিষয়ে আরও জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী হব।
- এসব উৎসব পালনের মধ্য দিয়ে যে সামাজিক সংহতি ও ঐক্য গড়ে ওঠে তা উপলব্ধি করব।
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা- খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে বসবাসরত ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর জন্য বৈসাবি একটি সর্বজনীন ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব। চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে এই উৎসবের আয়োজন করা হয়। চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং নববর্ষের প্রথম দিনকে ঘিরে বৈসাবি উৎসব পালিত হয়। বৈসাবি আসলে ত্রিপুরাদের 'বৈসু', মারমা ও রাখাইনদের 'সাংগ্রাই', চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের 'বিঝু', অহমিয়াদের 'বিহু' প্রভৃতি উৎসবের সমষ্টি। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মূল উৎসবের নামের প্রথম অক্ষরটি নিয়ে 'বৈসাবি' শব্দটি সৃষ্টি করা হয়েছে। এর পেছনে একটি মহৎ উদ্দেশ্য আছে। সেটি হলো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা। বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকে পাহাড়ি ছাত্র ও যুব সমাজের কিছু অগ্রণী সদস্যের উদ্যোগে এই সমন্বিত উৎসবটি চালু হয়। এর পেছনে যে সামাজিক বাস্তবতা বা প্রেক্ষাপট পাহাড়ি তরুণ-তরুণীদের এ কাজে উদ্বুদ্ধ করেছিল তা জানা থাকা প্রয়োজন ।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগ পর্যন্ত পাহাড়ের পরিস্থিতি ছিল খুব অশান্ত ও সংঘাতপূর্ণ। এ সময় শিক্ষার্থী এবং যুব সমাজের সচেতন ও অগ্রসর অংশটি এগিয়ে আসে। তারা স্কুল-কলেজের ছাত্র- যুবাদের সাথে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত নেয় যে, এরপর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের প্রধান উৎসবটি সবাই মিলে একসাথে উদ্যাপন করা হবে। তারা বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকে এমন একটি নামও এই উৎসবের জন্য ঠিক করে যা 'বৈসাবি' নামে পরিচিত হয়। পার্বত্য তিন জেলার মধ্যে রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের ছাত্রছাত্রীদের উদ্যোগেই সর্বপ্রথম বৈসাবি উৎসবটি পালিত হয়। এর পরবর্তী সময় থেকে চৈত্র সংক্রান্তি উৎসবটি পার্বত্য চট্টগ্রামে 'বৈসাবি' নামে সম্মিলিতভাবে পালিত হয়ে আসছে। অবশ্য একইসাথে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নামেও সেটি পালন করা হয়। সবার কাছে 'বৈসাবি' এখন বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, শান্তি ও ঐক্যের প্রতীক। খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ফুল সংগ্রহ করে নদী ও মন্দিরে গিয়ে পূজা অর্চনা, ঘরদোর সাজানো, ছোট বড় সবার অংশগ্রহণে প্রভাতফেরী, দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবার সাথে কুশল বিনিময়, পানাহার, শিশু ও বয়স্কদের বিশেষ যত্ন নেওয়া, সন্ধ্যায় মন্দিরে গিয়ে মোম ও আগরবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা এবং জগতের সকল মানুষ ও প্রাণীর জন্য মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে বৈসাবি উৎসবটি উদযাপিত হয়। এ উপলক্ষে সাধারণতঃ গ্রামাঞ্চলে নানা ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা এবং শহরাঞ্চলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এমনকি কিছু সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার উদ্যোগে সপ্তাহ বা মাসব্যাপী বৈসাবি মেলাও চলে। সবাই মিলে এই উৎসব উদযাপনের পাশাপাশি উৎসবটি উপলক্ষে পাহাড়িদের বিভিন্ন সংগঠন এবং ছাত্র-ছাত্রী, তরুণ-তরুণীদের উদ্যোগে সমাজ সংস্কৃতির নানা বিষয় নিয়ে সংকলন, প্রকাশনা, গানের সিডি, দেয়াল পত্রিকা প্রভৃতি প্রকাশিত হয়। এছাড়া ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবন ও সংস্কৃতি নিয়ে নাটক, ঐতিহ্যবাহী পালাগানের আসর, আলোচনা সভা, সেমিনার প্রভৃতি এখন এই উৎসবের বাড়তি আকর্ষণ।
কাজ- ১ : বৈসাবি উৎসবটি কারা চালু করে এবং কেন? কাজ- ২ : বৈসাবি উৎসবের কিছু কার্যক্রমের নাম লিখ। |
'বৈসু' ত্রিপুরাদের প্রধান সামাজিক উৎসব। তিন দিন ধরে এই উৎসব পালিত হয়। তবে এই তিন দিনের জন্য 'বৈসু'র রয়েছে তিনটি আলাদা নাম। যেমন- প্রথম দিনের নাম হলো হারি বৈসু, দ্বিতীয় দিনের নাম বৈসুমা এবং তৃতীয় দিনটি উদযাপিত হয় বিসিকাতাল নামে। পুরনো বছরের বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর লক্ষ্যে এই ঐতিহ্যবাহী উৎসব যুগ যুগ ধরে উদযাপিত হয়ে আসছে।
হারি বৈসু: এটি বৈসুর প্রথম দিন এবং মূলত প্রস্তুতি পর্ব। ত্রিপুরা নারীরা ঐদিন বিন্নি চাল গুঁড়ো করে তা দিয়ে সুস্বাদু পিঠা তৈরি করে। 'হারি বৈসু'র দিন ঘরে ঘরে পিঠা বানানোর ধুম পড়ে যায়, যা পরবর্তী দুই দিনেও কমবেশি অব্যাহত থাকে। ঐদিন ত্রিপুরা নারী- পুরুষ মিলে সকাল সকাল বনে গিয়ে কলা পাতা, লাইরু পাতা সংগ্রহ করে আনে। এসব পাতা ব্যবহার করে তারা বৈসুর হরেক রকম পিঠা তৈরি করে।

বাড়িঘর পরিপাটি করে সাজানোর পাশাপাশি 'হারি বৈসু'র দিন ত্রিপুরা নারীরা পরিবারে ব্যবহার্য যাবতীয় কাপড়-চোপড় ধুয়ে পরিষ্কার করে নেয়। গ্রামের সব বয়সের নারী-পুরুষ সেদিন খুব ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে ফুল সংগ্রহে নেমে পড়ে এবং সকাল সকাল নদীতে স্নান সেরে সংগৃহীত ঐসব ফুল নদীতে উৎসর্গ করে। ঘরের কাপড়-চোপড় পরিষ্কার করার মধ্য দিয়ে পুরনো বছরের যাবতীয় বিপদ-আপদ, জঞ্জাল ও দুঃখ-বেদনা ধুয়ে মুছে যাবে বলে ধারণা করা হয়। 'হারি বৈসু'র দিন থেকে 'গরয়া নৃত্য' শুরু হয় এবং একটানা ৫/৭ দিন ধরে এই নৃত্য চলতে থাকে। নৃত্যে অংশগ্রহণকারীদের 'গরয়া চেরক' নামে ডাকা হয়। তারা গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে ঢাক-ঢোল-বাঁশি বাজিয়ে এই নৃত্য পরিবেশন করে।
'হারি বৈসু'র দিনে গৃহকর্তা ঘরের গবাদিপশুগুলোকে পরিচর্যা ও আদরযত্ন করে থাকেন। যেহেতু গবাদিপশু দিয়ে হাল চাষ থেকে শুরু করে পরিবারের অনেক উপকার সাধিত হয়, সেজন্য ঐদিন গবাদিপশুর শিং ও গলায় ফুলের মালা পরিয়ে দিয়ে তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
বৈসুমা: বৈসুমার দিনটি ত্রিপুরাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মহান একটি দিন। কারণ এই দিনে ত্রিপুরা সমাজে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। সবাই একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যায় এবং একে অপরের সমব্যথী হয়। ধনী-গরিব সবাই সামর্থ্য অনুযায়ী নানা ধরনের পিঠা, সরবত, পাঁচন ইত্যাদি অতিথিদের পরিবেশন করে। তবে 'বৈসুমা'র দিনে প্রাণীবধ একেবারেই নিষিদ্ধ। ঐদিন গরয়া নৃত্য পরিবেশন ছাড়াও পালা গান এবং বিভিন্ন খেলাধুলা সারাদিন ধরে চলে।
বিসিকাতাল: 'বৈসু'র এই দিনটি নববর্ষকে স্বাগত জানানোর দিন। শিশু-কিশোর ও যুবক-যুবতীরা নতুন কাপড়-চোপড় পরিধান করে গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে হাঁস-মুরগি এবং অন্যান্য পশু-পাখির জন্য খাবার বিলিয়ে দেয়। ত্রিপুরাদের সামাজিক রীতি অনুসারে তারা বয়স্কদের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। গ্রামের যুবক-যুবতী ও নবদম্পতি নদী কিংবা কুয়ার স্বচ্ছ ও সতেজ পানি তুলে এনে গ্রামের মুরুব্বি বা বয়স্কদের স্নান করায় এবং আশীর্বাদ গ্রহণ করে। এই দিনে পরিবারের সকল সদস্যের মঙ্গলের জন্য পূজা ও উপাসনা করা হয়। গ্রামের প্রত্যেকটি ঘরের দরজা সারা দিন-রাত খোলা থাকে অতিথিদের জন্য। মনে করা হয়ে থাকে যে, এই দিনে কিছু না খেয়ে কেউ ফিরে গেলে তা গৃহস্থের জন্য অমঙ্গল।
| কাজ- ১ : ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর বৈসু উৎসবের তিনটি দিনের কর্মকান্ডের বিবরণ নিচের ছক অনুযায়ী সাজিয়ে লিখ। |
বৈসুর তিন পর্বের নাম | কর্মকাণ্ডের বিবরণ |
হারি বৈসু |
|
বৈসুমা |
|
বিসিকাতাল |
|
মারমা ও রাখাইন সমাজের প্রধান সামাজিক উৎসব হলো সাংগ্রাই (বর্ষবরণ ও বর্ষবিদায়)। চৈত্র মাসের শেষ দু'দিন এবং নতুন বছরের প্রথম দিন (সাধারণত এপ্রিল মাসের ১৩ বা ১৪ তারিখ) এই উৎসব পালিত হয়। মারমা ও রাখাইন সমাজে এই উৎসবের ধর্মীয় গুরুত্বও কম নয়। সাংগ্রাই-এর প্রথম দিনে তরুণ- তরুণীরা সবাই মিলে এলাকার বৌদ্ধ মন্দিরগুলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে তোলে। সমাজের ছোট বড় সবাই মিলে বৌদ্ধ মন্দিরে যায় এবং তারা প্রদীপ জ্বালিয়ে জগতের সকল প্রাণীর মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করে। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য পরম ভক্তি ও যত্নের সাথে সকাল ও দুপুরের ছোয়াইং (খাবার) দান করা হয়। এছাড়া মন্দিরের বুদ্ধমূর্তিগুলোকে শোভাযাত্রা সহকারে নদীতীরে নিয়ে গিয়ে স্নান করানো হয়। এ সময় লোকজন চন্দনের জল ও ডাবের পানি সাথে করে নিয়ে যায়। বুদ্ধমূর্তিগুলোকে বাঁশের তৈরি সুসজ্জিত একটি মঞ্চে রাখা হয়। এরপর ভক্তরা চন্দন ও ডাবের পানি বুদ্ধমূর্তিগুলোর উপর ঢেলে দেয়। ঢেলে দেওয়া এসব পানি লোকজন সংরক্ষণ করে রাখে। এই পানি খেলে রোগ-ব্যাধির নিরাময় ঘটে বলে তাদের বিশ্বাস। স্নানের পর বুদ্ধমূর্তিগুলোকে নতুন চীবর পরিয়ে দিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে পুনরায় মন্দিরে ফিরিয়ে আনা হয়। প্রার্থনার সময় সাধারণত যেসব প্রদীপ জ্বালানো হয় তার বাইরেও অনেকে ঐদিন হাজার বাতি জ্বালিয়ে থাকে। এর পরবর্তী দুই দিনও মহাসমারোহে সাংগ্রাই উৎসবটি পালিত হয়। এই দিনগুলোতে ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন প্রকারের পিঠাসহ বিশেষ উপাদেয় খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়।

বয়োজ্যেষ্ঠদেরকে পূজার মধ্য দিয়ে সমাজের প্রবীণ ব্যক্তিদের সম্মান জানানো হয়। মৈত্রী পানি বর্ষণ সাংগ্রাই উৎসবের একটি বিশেষ অনুষ্ঠান। এজন্য বড় কোনো মাঠে একটি মন্ডপ বানানো হয়। মন্ডপের দুই দিকে দুটি বড় পানিভর্তি নৌকা রাখা হয়। তরুণ ও তরুণীদের আলাদা দু'টি দল দুই নৌকার পাশে অবস্থান নেয়। এরপর তারা পরস্পরের দিকে নৌকায় রাখা পানি ক্রমাগত ছুড়তে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না পানিটা ফুরিয়ে যায়। খালি নৌকাটি পুনরায় পানি দিয়ে ভরানো হয়। একটা দল খেলা শেষ করলে নতুন আরেকটা দল এসে খেলা শুরু করে। ঐতিহ্যবাহী এই জলকেলি ছাড়াও সাংগ্রাই উপলক্ষে মারমা ও রাখাইন সমাজে একসময় নৌকাবাইচ, বলীখেলা প্রভৃতি প্রচলিত ছিল।
| কাজ- ১ : মারমা ও ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর চৈত্র সংক্রান্তি বা বৈসাবি উৎসব পালনের মধ্যে যেসব মিল ও অমিল রয়েছে সেগুলো খুঁজে বের কর এবং নীচের টেবিলে সাজাও। |
ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব - বৈসু | মারমা নৃগোষ্ঠীর চৈত্র সংক্রান্তি উৎসব-সাংগ্রাই | |
মিল |
|
|
অমিল |
|
|
চাকমা সমাজের সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহ্যবাহী সর্বজনীন উৎসব হলো বিজু বা বিঝু উৎসব। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মতো চাকমারাও ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে এই উৎসব পালন করে থাকে।
চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন মিলিয়ে মোট তিন দিন ধরে বিঝু উৎসবটি পালিত হয়। বয়স্করা বলেন, আগে যখন সুদিন ছিল তখন কমপক্ষে সাত দিন ধরে বিঝু উৎসব পালন করা হতো। চাকমাদের বিঝু উৎসবটি তিন পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বটি হচ্ছে 'ফুলবিঝু', দ্বিতীয় পর্বটি 'মূলবিঝু' এবং তৃতীয় পর্বটি 'নুওবঝর' (নতুন বছর) বা 'গোজ্যাপোজ্যা বিঝু' (শুয়ে বসে আরাম আয়েসে কাটানোর দিন)
ফুল বিঝু : এদিন খুব ভোরবেলা শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীরা বন কিংবা বাগান থেকে হরেক রকমের ফুল সংগ্রহ করে আনে। সকালে তারা নদীতে গোসল করতে যায়। সে সময় তারা পাতার নৌকা বা পাত্র তৈরি করে তার উপর ফুল সাজিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। সংগৃহীত ফুল দিয়ে তারা বাড়ির আঙিনা, দরজা প্রভৃতি সাজায়। কিয়াঙ বা বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়েও তারা বুদ্ধের উদ্দেশ্যে ফুল দেয়। ঐদিন (বা তারও আগে) গৃহকর্ত্রীর নেতৃত্বে ঘরের কাপড়-চোপড় ও ঘরদোর পরিষ্কার করা হয়। সন্ধ্যায় ঘরের আঙিনায় বা কিয়াঙে (মন্দির) গিয়ে মোমবাতি জ্বালানো হয়। এ সময় তারা নিজেদের আত্মীয়স্বজনসহ পৃথিবীর সকল প্রাণী ও বিশ্বের শান্তির জন্য প্রার্থনা করে। এদিন সকালবেলা শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহপালিত পশু-পক্ষীদেরকে ধান, চাল, খই প্রভৃতি খাদ্য দিয়ে থাকে।
মূল বিঝু: বিঝুর তিন দিনের মধ্যে এই মূলবিঝুর দিনটি সবচেয়ে উৎসবমুখর, সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত দিন। নৃগোষ্ঠী-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, পরিচিত-অপরিচিত সবার জন্য ঘরের দরজা খোলা থাকে। ঘরে যার যা আছে তা দিয়ে সবাইকে অত্যন্ত যত্ন ও আগ্রহ সহকারে আপ্যায়ন করা হয়। ঐদিন ঐতিহ্যবাহী নানা ধরনের নানা স্বাদের পিঠা, তাজা ফলমূল এবং সেদ্ধ করা মিষ্টি আলু মূলতঃ সকাল বেলার অতিথিদের
জন্য প্রস্তুত করা হয়। বিঝুর দিন একটি বিশেষ ধরনের পাঁচমিশালী উপাদেয় খাবার পরিবেশন করা হয় যার নাম 'পাজন'। পাঁচ অন্ন (পাঁচন) শব্দ থেকেই সম্ভবত 'পাজন' শব্দের উৎপত্তি। এই পাজন তৈরি
হয় কমপক্ষে পাঁচ পদের সবজি দিয়ে। তবে সবাই চেষ্টা করে পাজন-এ সব্জির সংখ্যা বাড়াতে। এটি বিঝু উৎসবের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি উপাদান। বিঝুর দিন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য 'জগরা' পানীয় পরিবেশন করা হয়। 'জগরা' হলো বিন্নি ধানের চাল দিয়ে তৈরি এক ধরনের মিষ্টি জাতীয় পানীয় যা সাধারণত বিঝু উপলক্ষে তৈরি করা হয়। আর 'দচুনি' হলো চাকমাদের একটি ঐতিহ্যবাহী পানীয় যা সচরাচর বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে কিংবা বেড়াতে আসা ঘনিষ্ঠ ও সম্মানিত অতিথিদের আপ্যায়নে একটি অপরিহার্য পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গ্রামাঞ্চলে সান্ন্যাপিধ্যা, বিনিপিধ্যা, বিনি হগা, কলাপিধ্যা, বরাপিধ্যা, চিনি পানাহ্ প্রভৃতি ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলি ও পানীয় পরিবেশনের রেওয়াজ থাকলেও বর্তমানে শহরাঞ্চলে এসব খুব কমই দেখা যায়।

চাকমাদের একটি ঐতিহ্যবাহী পানীয় যা সচরাচর বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে কিংবা বেড়াতে আসা ঘনিষ্ঠ ও সম্মানিত অতিথিদের আপ্যায়নে একটি অপরিহার্য পানীয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। গ্রামাঞ্চলে সান্ন্যাপিধ্যা, বিনিপিধ্যা, বিনি হগা, কলাপিধ্যা, বরাপিধ্যা, চিনি পানাহ্ প্রভৃতি ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলি ও পানীয় পরিবেশনের রেওয়াজ থাকলেও বর্তমানে শহরাঞ্চলে এসব খুব কমই দেখা যায়।
দুপুরে তরুণ-তরুণীরা নদী বা কুয়ো থেকে কলসি ভরে জল এনে বয়স্কদের গোসল করায়। বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে বুদ্ধের মূর্তিকেও গোসল করানো হয়। এভাবে গোসল করা বা করানোটা হলো পুরনো বছরের সব জঞ্জাল, অশুভ বা বিপদ আপদ থেকে মুক্ত হয়ে পূতপবিত্র হওয়ার প্রতীক। সন্ধ্যায় মোমবাতি জ্বালিয়ে বুদ্ধকে, গঙ্গী-মাকে (নদীকে) পুনরায় পূজা করা হয়। বাসার প্রতিটি কামরায় ও দরজায় মোমবাতি জ্বালানো হয় এবং গোয়ালঘরেও মোমবাতি দেয়া হয়। চাকমাদের বিশ্বাস, এতে পুরনো বছরের সব অজ্ঞানতা, অন্ধকার ও আপদ-বিপদ দূর হয়ে যায় এবং নতুন বছরের দিনগুলো মানুষের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি বয়ে নিয়ে আসে।
নুঅ-বঝর বা গোজ্যাপোজ্যা বিঝু এই দিনটি পালিত হয় মূলতঃ নানা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। ঐদিন অনেকে কিয়াঙে যায় অথবা বাড়িতে কোনো বৌদ্ধ ভিক্ষুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে মঙ্গলসূত্র শ্রবণ করে, যাতে নতুন বছরটি ভালোভাবে কেটে যায়।
| কাজ- ১ : চাকমা নৃগোষ্ঠীর বিঝু উৎসবের তিনটি দিনের কর্মকাণ্ডের বিবরণ সাজিয়ে লিখ। |
ম্রো নৃগোষ্ঠীর ভাষায় 'চিয়া' মানে গরু। আর 'সৎ' মানে বল্লম দিয়ে হত্যা করা। 'পয়' মানে হলো অনুষ্ঠান। তাই 'চিয়াসৎ পয়' একটি গো-হত্যা উৎসব। এটি ম্রো সমাজের সর্ববৃহৎ সামাজিক অনুষ্ঠান। পরিবারের রোগ মুক্তি ও সুখ সমৃদ্ধি কামনায় এবং উচ্চ ফলনের আশায় সৃষ্টিকর্তা 'থুরাই'কে উদ্দেশ্য করে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে এই উৎসব আয়োজিত হয়। জুমচাষের ফসল তোলার পর অবস্থাপন্ন ম্রো পরিবার এই উৎসবের আয়োজন করে।

এই অনুষ্ঠানের জন্য প্রথমে বাঁশের 'ছিট' (এক প্রকার ফুল) তৈরি করে তা দিয়ে গ্রামের মাঝখানে মাচানের মতো একটি পাটাতন তৈরি করা হয়। অনুষ্ঠানের দিন সন্ধ্যায় ঘেরের মধ্যে গরুটি বাঁধা হয়। অনুষ্ঠান আয়োজনের একদিন আগে যুবক-যুবতীরা দলে দলে অরণ্য থেকে কলাপাতা সংগ্রহ করে আনে। ম্রোরা কলাপাতার উপর খাবার সাজিয়ে পরিবেশন করে। অনুষ্ঠান আয়োজনের এক সপ্তাহ আগে থেকে অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য আত্মীয়-স্বজনদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। প্রথম দিনে আমন্ত্রিত অতিথিদের সামাজিকভাবে আপ্যায়ন করতে হয়। কলাপাতায় খাদ্য পরিবেশন করা হয়।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আমন্ত্রিত অতিথি, নিকট আত্মীয় ও গ্রামবাসীরা অনুষ্ঠান আয়োজনকারীকে সম্মান জানিয়ে এক বোতল করে পানীয় উপহার দেয়। ম্রো যুবক যুবতীরা ঐতিহ্যবাহী পোষাকে নিজেদের 'পুং' বাঁশির তালে তালে গরুটিকে ঘিরে নৃত্য পরিবেশন করে। সকালে গৃহকর্তা হাতে ধারালো বল্লম নিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে গরুটিকে হত্যা করে। গরুর মাংস রান্না করার পর সকলে মিলে আহার করে। সন্ধ্যা হলে পুনরায় যুবক-যুবতীরা চত্বরে এসে নৃত্য পরিবেশন করে থাকে। ঘুরে ঘুরে নয় বার নৃত্য পরিবেশন করার পর তারা আয়োজকের গৃহে ফিরে গিয়ে নৃত্যের সমাপ্তি ঘটায়। আমন্ত্রিত অতিথিরা গো মাংস নিয়ে যার যার ঘরে ফিরে যায়।

ম্রোদের গো-হত্যা অনুষ্ঠান আয়োজনের পেছনে একটি কিংবদন্তি চালু আছে। সৃষ্টিকর্তা 'থুরাই' ম্রো নৃগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য বর্ণমালা দিয়ে কলার পাতায় লেখা একটি ধর্মগ্রন্থ গরুর মাধ্যমে তাদের কাছে পাঠিয়ে দেন। ঐ ধর্মগ্রন্থে ম্রোদের জন্য চাষাবাদ, ধর্মীয় নিয়ম-কানুন, সমাজ ও সংস্কৃতি বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে উল্লেখ ছিল। তখন সময়টি ছিল গ্রীষ্মকাল। প্রখর রোদে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে একসময় গরুটি প্রকান্ড এক বটগাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়লো। যখন তার ঘুম ভাঙে তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। গরু ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে ঐ সময় গ্রন্থখানা খেয়ে ফেললো। ম্রোদের বিশ্বাস, গরুর এ গ্রন্থ খেয়ে ফেলার কারণে তাদের কোনো বর্ণমালা এবং ধর্মগ্রন্থ নেই। সেজন্য তারা প্রতিবছর গো-হত্যা উৎসবের আয়োজন করে থাকে।
| কাজ- ১ : ম্রো জনগোষ্ঠীর 'চিয়াসৎপয়' উৎসবে প্রতিবছর গো-হত্যা উৎসবের আয়োজন করে থাকে কেন ? |

ঐতিহাসিককাল থেকে সাঁওতাল সমাজে সোহরায় উৎসবটি পালিত হয়ে আসছে। এটি তাদের সবচাইতে বড় ও ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক উৎসব। বাংলাদেশের সাঁওতালরা যথেষ্ট কষ্টের মধ্যে দিন যাপন করলেও আজও তারা সমান গুরুত্ব দিয়ে সোহরায় উৎসবটি পালন করে। 'হড় হপন'রা (সাঁওতাল) সারা বছর রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, কাদা মাটি মেখে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, গৃহপালিত পশুর সাহায্যে ফসল উৎপাদন করে। এ জন্যই ফসল তোলার পরে গৃহদেবতা, গোত্র দেবতা ও পূর্বপুরুষদের পূজা-অর্চনা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী সকলকে নিয়ে আনন্দ উৎসব এবং গৃহপালিত পশুর পরিচর্যা ও বন্দনার মধ্য দিয়ে সোহরায় উৎসব পালিত হয়। সেইসাথে ভালো ফসলের জন্য দেবতাদের আশীর্বাদ কামনা করা হয়। গ্রাম সংগঠনের প্রশাসকগণ ও গ্রামবাসীরা একটি সাধারণ সভার মাধ্যমে এর দিন-তারিখ নির্ধারণ করে। সোহরায় দিনক্ষণ নির্ধারণের পর থেকেই গ্রামবাসীদের মাঝে আনন্দের সাড়া পড়ে যায়। প্রতিটি পরিবার বাড়ির ভেতরে ও বাইরের সব স্থান ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে এবং লাল মাটি দিয়ে ঘরের দেয়াল ও পিলার রঙিন করে ছবি আঁকে ও উঠানে আল্পনা আঁকে। গৃহকর্তৃগণ হাঁড়িতে পচানি প্রস্তুত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক পরিচ্ছদ কেনা হয়। এর সঙ্গে চলে আত্মীয়স্বজনদের নিমন্ত্রণের পালা।
পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন এই উৎসব শুরু হয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে পালিত হয়। এই উৎসবের স্থায়িত্ব ছয় দিন। উৎসবের প্রথম দিনকে উম বা শুদ্ধিকরণ বলা হয়। উৎসবের সূত্রপাত হয় গডটান্ডিতে (পবিত্র স্থান)। অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন নায়কে (গ্রাম পুরোহিত)। গ্রামের পুরুষেরা গডটান্ডিতে এসে মিলিত হয়। গডটান্ডিতে আদি পিতামাতা (পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুঢহি), বারো গোত্রের আদি পুরষ, সিঞ বোঙা (সূর্য দেবতা) ও মারাং বুরুর উদ্দেশে মোরগ-মুরগি, কলা, চিনি, বাতাসা, ধুপ-সিঁদুর দিয়ে পূজা দেয়া হয়। পূজা শেষে তাদের নামে হান্ডি নিবেদন করা হয়। যেহেতু সাঁওতালরা বিশ্বাস করে ডিম থেকে মানবকুলের জন্ম তাই পূজার স্থানে একটি ডিম রাখা হয়।
উৎসবের দ্বিতীয় দিনকে বলা হয় 'বোঙ্গাঃগ্' দিন। এইদিনে সিঞ বোঙা (সূর্য দেবতা), মারাং বুরু (মহান দেবতা), গৃহ দেবতা, গোত্র দেবতার নামে গোত্রভেদে শূকর, ভেড়া, ছাগল ও মোরগ বলি দেওয়া হয় এবং পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে সুনুম পিঠা (তেল পিঠা) ও হান্ডি নিবেদন করা হয়। তৃতীয় দিনে গৃহপালিত পশুর যত্ন-পরিচর্যা ও বন্দনা করা হয়। এই তিন দিন বাদ্য-বাজনায় নাচে-গানে আনন্দে গ্রাম ও কুলহি মাতিয়ে রাখার দায়িত্বে থাকেন জগ্গ্নানঝহী। তাই গ্রামের যুবকরা মাদল ও নাগরা বাজিয়ে এবং মেয়েরা গান গেয়ে সোহরায়, ডাহার, লাগড়ে, গোলওয়ারী ও দুরূমজাঃ নাচ নাচে। চতুর্থ ও পঞ্চম দিনের নাম যথাক্রমে জালে ও হাকো-কাটকম। বর্তমানে অভাবের কারণে বাংলাদেশে এই দুটি দিবস পালন করা হয় না। ষষ্ঠ দিনের নাম সাকরাত। এই দিবসটি চতুর্থ দিনে পালন করা হয়। এই দিনে পুরুষেরা পারস্পরিক বাড়িতে ভাত খেয়ে গ্রামের আশেপাশে জঙ্গলে শিকার করে ফিরে এবং বিকালে ছেলেরা একটি কলাগাছ তীরবিদ্ধ করে। এটাকে 'বেঝাঃ তুইঞ' বলা হয়। এটা মূলত শত্রু প্রতিরোধ ও নিধনের প্রতীক। এই তীর খেলার পরে বিভিন্ন শারীরিক কসরত ও নানান খেলাধুলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আয়োজিত এই খেলার শেষে কলাগাছ লক্ষ্যভেদকারী বিজয়ীকে জন্মানবাহী ঘাড়ে করে মানঝহী থানের (গ্রামের পুজার বেদী) সামনে নিয়ে আসেন। সেখানে গ্রামের নারী-পুরুষ পারস্পরিক ডবঃহ্-জোহার (প্রণাম) করে। এ সময় জন্মানঝহী সোহরায়ের সকল আনুষ্ঠানিকতার পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেন এবং আগামী বছরের সোহরায় যেন নতুন আশা-আনন্দ নিয়ে ফিরে আসে সে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
| কাজ- ১ : সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সোহরায় উৎসবের বিভিন্ন পর্যায়ের নাম লেখ। |

কারাম ওরাঁওদের সবচেয়ে বড় উৎসব। ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে সাধারণত এ উৎসব পালন করা হয়। কারাম উৎসব পালনের সঙ্গে ওরাঁওদের একটি কাহিনী। জড়িত আছে। তাদের মতে, কারাম বৃক্ষ রক্ষাকর্তা। ইতিহাসের কোনো এক সময় ওরাঁও নৃগোষ্ঠী অন্যদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে গভীর জঙ্গলে পালিয়ে কারাম। বৃক্ষের নিচে আশ্রয় নিয়েছিল। কারাম বৃক্ষ তাদেরকে। শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করেছিল। এ ঘটনাকে স্মরণ করার জন্য কারাম উৎসবের আয়োজন করা হয়ে থাকে।
এই উৎসব উপলক্ষে কারাম গাছের ডালপালা এনে সেগুলো ঘরের উঠানের মাঝ বরাবর পোঁতা হয়। তারপর কারাম গাছের সেসব ডালপালাকে ঘিরে পূজা-অর্চনা, নাচ-গান এবং কাহিনী ও পালাগান মঞ্চস্থ হয়। কারাম উৎসব চলাকালীন অবিবাহিত যুবক-যুবতীরা উপবাস করে থাকে। নব বিবাহিত বধূরা এ সময় শ্বশুরবাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসে। এ সময় তারা শ্বশুরবাড়ি থেকে ফলমূল, কাপড়সহ নতুন ডালিতে করে উপঢৌকন নিয়ে আসে। এজন্য কারাম উৎসবকে মিলন ও আনন্দের উৎসবও বলা হয়ে থাকে। এ উৎসবের মাধ্যমে বোনেরা ভাইদেরকে স্মরণ করে থাকে। ওরাঁওদের সমাজে একটি প্রবাদ চালু আছে। প্রবাদটি হলো- 'আপন কারাম ভাইকা ধারাম।' উৎসব শেষে কারামের ডালিগুলোকে জলাভূমিতে ডুবিয়ে দেয়া হয়।
| কাজ- ১ : ওরাঁও জনগোষ্ঠীর কারাম উৎসবের বৈশিষ্ট্যগুলো উল্লেখ কর। |

'ওয়ানগালা' মান্দিদের প্রধান সামাজিক ও কৃষি উৎসব। মান্দিদের বিশ্বাস ফসলের ভাল ফলনের জন্য দেবতাদের আশীর্বাদ প্রয়োজন। দেব-দেবীর আশীর্বাদ ও ফসলের প্রতি তাদের সুদৃষ্টি না থাকলে যেমন আশানুরূপ ফসল পাওয়া যায় না তেমনি মানুষের শারীরিক অবস্থাও সবসময় ভাল থাকে না। তাই ওয়ানগালা দেব-দেবীদের সুদৃষ্টি কামনা এবং তাদের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য পালিত প্রধান উৎসব। মিসি সালজং উর্বরতার দেবতা, রক্ষিমেমা ফসলের জননী, সুসিমে শস্য রক্ষাকারী ও ঐশ্বর্যের দেবী। তাই জীবন ধারণের জন্য এসব দেব-দেবীর আশীর্বাদ প্রয়োজন। অক্টোবর মাসের শেষে অথবা নভেম্বর মাসে ওয়ানগালা উৎসব পালিত হয়।

কোনো কোনো সময় এ উৎসব সপ্তাহকাল ধরে চলে। জুমখেতের সমস্ত ফসল তোলা হয়ে গেলে গারোরা গ্রামওয়ারী অথবা কোনো কোনো সময় কয়েকটি গ্রাম মিলে একসাথে এ উৎসব উদযাপন করে থাকে। শীতের আগমনের আগে মান্দি বর্ষ পঞ্জিকার সপ্তম (মতান্তরে দশম) মাস মেজাফাং (অক্টোবরের দ্বিতীয় থেকে নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ) মাসে ওয়ানগালা উৎসব পালিত হয়ে থাকে। ওয়ানগালা শুরু ও শেষ করার সময় সম্পর্কে বলা হয়েছে, 'যখন বনের মেগং নামক পাহাড়ি ফুল ফুটতে শুরু করে তখনই ওয়ানগালা আয়োজনের সময় হয় এবং পূর্ণিমা চাঁদের আলো থাকতে থাকতেই ওয়ানগালা শেষ করতে হয়।' গ্রামে সকলের ফসল ঘরে তোলা হলে নকমা সকলকে ডেকে এনে ভোজে আপ্যায়ন করেন এবং ওয়ানগালার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তুতি শুরু করেন। ওয়ানগালা অনুষ্ঠান মূলত তিনটি পর্বে বিভক্ত। পর্বগুলো হলো- রুগালা, সা.সাৎ স.ওয়া এবং 'দামা গপাতা' বা 'জলওয়াৎতা' বা 'রুস্রতা'। রুগালা'র সারমর্ম হচ্ছে এই দিন রক্ষিমেমা ও রংদিক মিৎদিকে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে উপাসনা করা হয়। এরপর নকমার ঘরের মাঝখানে দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে রক্ষিত নতুন শস্য, শাক-সবজি, কৃষি সরঞ্জাম ও বাদ্যযন্ত্রগুলোর ওপর 'রুগালা' (অল্প পানীয় ঢেলে উৎসর্গ করা) করে দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। এভাবে পর্যায়ক্রমে গ্রামের সবার বাড়িতে এ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করা হয়। দ্বিতীয় দিন হয় 'সা.সাৎ স.ওয়া' (ধুপারতি উৎসর্গ)। মিসি সালজং-এর উদ্দেশ্যে এই নৈবেদ্য উৎসর্গ করা হয়। তৃতীয় দিনের অনুষ্ঠান হলো 'দামা গগাতা' বা 'জলওয়াত্তা' বা 'রুস্রতা'। এই অনুষ্ঠান শেষে ওয়ানগালা উৎসবে ব্যবহৃত দামা, গ্রাম, কাল, রং প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রগুলো নকমার বাড়িতে এনে জমা দেওয়া হয়। তারপর নকমা সমবেত জনতার সামনে সালজং, মিৎদে ও রক্ষিমেমার উদ্দেশ্যে শেষবারের মতো মদিরা ও ধূপ উৎসর্গ করেন এবং প্রার্থনা শেষে তাদের বিদায় জানান। এর মধ্য দিয়েই ওয়ানগালা উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।
কাজ- ১ : মান্দি জনগোষ্ঠীর ওয়ানগালা উৎসবের বিভিন্ন পর্বের নাম লিপিবদ্ধ কর। কাজ-২ : মান্দি সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন দেব-দেবীর নামের একটি তালিকা তৈরি কর। |
সাড সুক মেনসিম হলো খাসি জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহ্যবাহী উৎসব। সাড-সুক-মেনসিম এর অর্থ হলো হৃদয়ের আনন্দ নৃত্য।
এটি মূলত নাচ পর্ব। ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ প্রদানের পর্ব হিসেবে এই উৎসব পালিত হয়। খাদ্যশস্যের অধিক ফলন, সম্পদ, সুস্বাস্থ্য এবং শান্তির জন্য ঈশ্বরের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে এই নাচের উৎসবটি পালন করা হয়। খাসি সমাজের পুরোহিত এ সময় ঈশ্বরের প্রতি প্রার্থনায় সাধারণ জনগণকে নেতৃত্ব দেন। মানুষের কল্যাণের জন্য ঈশ্বরের আশীর্বাদ চেয়ে এই প্রার্থনা করা হয়। সাড-সুক-মেনসিম উৎসবের সময় নারী-পুরুষ উভয়েই বর্ণিল পোশাক পরে গভীর ভক্তি ও একাগ্রতার সাথে নাচতে থাকেন। এ সময় ঢোল (খাসি ভাষায় যার নাম 'কা-বম') এবং বাঁশি ও পাইপ (খাসি ভাষায় যাকে বলা হয় 'তাংমুড়ি') বাজানো হয় যা উৎসবের আমেজকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। প্রতি বছরের এপ্রিল মাসে এই উৎসব পালন করা হয়। এই উৎসবের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি ও উর্বরতার চিরন্তন রূপকে প্রতীকী অর্থে ফুটিয়ে তোলা হয়। নারীরা এখানে বীজ এবং ফসলের বাহক হিসেবে ভূমিকা পালন করে। আর পুরুষেরা নেয় ফসল তোলার ভূমিকা। ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার প্রতিদানস্বরূপ নাচের এই উৎসবটি খাসিদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
ভারতের মেঘালয় রাজ্যে এই উৎসবটি সবচেয়ে ব্যাপক আকারে পালন করা হয়। ঐ রাজ্যে খাসিদের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তবে মেঘালয় ছাড়াও ভারত এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেখানে খাসি জনগোষ্ঠীর মানুষ বাস করে, সেখানেও সাড সুক মেনসিম উৎসব যুগ যুগ ধরে উদযাপিত হয়ে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশে খাসি নৃগোষ্ঠীর অধিকাংশ মানুষ খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করায় খ্রিস্ট-ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানগুলোই এখন তাদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
| কাজ- ১ : খাসি নৃগোষ্ঠীর সাড সুক মেনসিম উৎসব পালনের উদ্দেশ্য কী? বাংলাদেশের বাইরে আর কোথায় এই উৎসবটি পালিত হয়? |
Read more