সংস্কৃতি অধ্যয়নে আমাদের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি (পাঠ- ০৬)

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতি - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

431

সংস্কৃতির বৈচিত্র্য মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সম্পদ। বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলন এবং পারস্পরিক শিক্ষাগ্রহণ ও আদানপ্রদানের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে আজকের সভ্যতা। এক সংস্কৃতির আবিষ্কৃত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর বুকে। যেমন, লোহার ব্যবহার সর্বপ্রথম শুরু হয় ।

তুরস্কে এবং তারপর তা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে বলে মনে করা হয়। এভাবে আদান-প্রদানের মাধ্যমে সমৃদ্ধ হয়েছে সংস্কৃতি আর উপকৃত হয়েছে মানুষ। পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া কোনো মানুষ যেমন একা টিকতে পারে না, তেমনি একটি সংস্কৃতিও একক প্রচেষ্টায় উন্নতি লাভ করতে পারে না। তাই একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সকল সংস্কৃতির মানুষের মিলিত প্রচেষ্টা। শুধুমাত্র সকল সংস্কৃতির মানুষের মাঝে মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক ও সম্প্রীতির ভিত্তিতেই গড়ে উঠে একটি সুন্দর সামাজিক পরিবেশ।
সকল সংস্কৃতিই জ্ঞান আহরণের এক একটি অনন্য উৎস। আর তাই জ্ঞানের আধার হিসাবে যেকোনো সংস্কৃতির মর্যাদাই সমান। ছোট সংস্কৃতি আর বড় সংস্কৃতি বলে কিছু নেই। যেমন, আমাদের দেশে প্রায় দু' হাজার খুমি আর ১৪ কোটিরও বেশি বাঙালি বসবাস করে। এ ক্ষেত্রে জনসংখ্যার বিবেচনায় বাঙালিদের তুলনায় খুমিদের অবস্থান অত্যন্ত ক্ষুদ্র হলেও সাংস্কৃতিক মর্যাদায় খুমি ও বাঙালিরা সমান। কেননা দুইটি সংস্কৃতিরই আলাদা কিন্তু পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র ভাষা, সংগীত, শিল্পকলা, বিশ্বাস, রীতি-নীতি ইত্যাদি উপাদান রয়েছে। তাই আমাদের সবারই পরস্পরের প্রতি এবং অন্যান্য সংস্কৃতির প্রতি আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন।

প্রায়শঃ আমরা নিজের সংস্কৃতির তুলনায় অন্য সংস্কৃতিকে বিচার করার চেষ্টা করি। কিংবা হয়ত নিজস্ব মূল্যবোধের আলোকে ভিন্ন সংস্কৃতির কর্মকান্ড পরিমাপ করি। কেননা শৈশব থেকেই আমাদের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি লালনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমাদের এটা বুঝতে হবে যে, আমাদের মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সংস্কৃতির অন্যান্য উপাদানের সাথে মিলে গঠিত হয়। সুতরাং আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির আলোকে অন্য সংস্কৃতিকে বিবেচনা করা সমীচীন নয়। কারণ, প্রত্যেক সংস্কৃতিই তার নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে অনন্য ও স্বতন্ত্র। তাই যেকোনো সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সঠিকভাবে বোঝার জন্য আমাদের সে সংস্কৃতির নিজস্ব মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা থাকতে হবে। নৃবিজ্ঞানীরা বলেন, প্রত্যেক সংস্কৃতিকে আলাদাভাবে এবং সে সংস্কৃতির সমস্ত দিক বিবেচনা করে বুঝতে হয়। একটি সংস্কৃতির মূল্যবোধ দিয়ে অন্য সংস্কৃতিকে মূল্যায়ন করা যায় না।

কাউকে দাঁতে কালো রং করতে শুনেছ কখনও? তুমি যদি ম্রো নৃগোষ্ঠীর সদস্য হও, শুধু তাহলেই বুঝবে কালো দাঁত কতোটা সুন্দর। অর্থাৎ আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রো সংস্কৃতিতে সুন্দর দাঁত বলতে বুঝায় কালো রঙের দাঁত। কাঁচা বাঁশের রস দিয়ে ম্রো ছেলেমেয়েরা দাঁতের রং কালো করে। যার দাঁত যত কালো সে তত সুন্দর একজন ম্রো মানুষের দৃষ্টিতে। শুধু তাই নয়, অবিবাহিত ম্রো ছেলেরা বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রী ব্যবহার করে। ছেলেরা ঠোঁটে রং দেয়া থেকে শুরু করে চুল বেঁধে, খোঁপা করে সাজগোজ করে। ম্রো সংস্কৃতিতে এটাই ছেলেদের সৌন্দর্য বলে বিবেচিত। সুতরাং, ম্রো নৃগোষ্ঠীর সদস্য ছাড়া অন্য সংস্কৃতির কারও পক্ষে ম্রো ছেলেদের সৌন্দর্য মূল্যায়ন করা খুবই কঠিন। এই সৌন্দর্য বোঝার জন্য প্রথমে ম্রো সংস্কৃতিতে সুন্দর বলতে কী বোঝায়, সেটা আগে বুঝে নিতে হবে।

আবার দেখা যায়, সাঁওতাল সংস্কৃতিতে শুধু পুরুষরা এবং মান্দি বা গারোদের মাঝে শুধু নারীরাই সম্পত্তির মালিক হয়। মান্দি বা গারোদের নিয়ম অনুযায়ী, ছেলেরা বিয়ের পর তাদের নিজেদের বাড়ি ছেড়ে কনের বাড়িতে বসবাস শুরু করে। তাই মান্দি বা গারো সংস্কৃতিতে শুধু মেয়েরাই তাদের মা'র সম্পত্তির মালিক হয়। শুধু তাই নয়, বৃদ্ধ বয়সে পিতা-মাতা তাদের সবচেয়ে ছোট মেয়ের সাথে বসবাস করে বলে ছোট মেয়েরা তার মায়ের বসতবাড়ির ও জমির মালিক হয়। অন্যদিকে, সাঁওতাল সংস্কৃতিতে মেয়েদের সম্পত্তিতে কোনো মালিকানা থাকে না। সুতরাং, সাঁওতাল ও মান্দি (গারো) সংস্কৃতি দুটি ভিন্ন পদ্ধতিতে সম্পত্তির মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের নিজ নিজ সংস্কৃতির সাথে যদি এ দুটি পদ্ধতির ভিন্নতাও থাকে তারপরও গুরুত্ব ও মর্যাদার বিবেচনায় সব কয়টিই সমান মর্যাদার এবং গুরুত্বপূর্ণ। এখানে, কেউ কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, যেকোনো সাংস্কৃতিক নিয়মনীতিই সেই সংস্কৃতির জন্য উপযোগী, কার্যকর এবং ভালো।

কাজ- ১ ঃ অন্যের সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে হবে কেন?
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...