নৃবিজ্ঞানে সংস্কৃতির ধারণা (পাঠ-০২)

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচিতি - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

318

পৃথিবীর সকল মানুষেরই সংস্কৃতি আছে। সংস্কৃতি হলো মানুষের জ্ঞান, বিশ্বাস, শিল্পকলা, নিয়ম-নীতি, আইন-কানুন, আদর্শ ও মূল্যবোধ, প্রথা ও রীতি, অভ্যাস ও আচরণ ইত্যাদির সমষ্টি। বেঁচে থাকার জন্য আমাদের কাজ করতে হয়, খাদ্য উৎপাদন করতে হয়। শুধু উৎপাদন করলেই হয় না, তাকে সমাজের আইনকানুনও মেনে চলতে হয়। সমাজের নানা প্রথা, বিশ্বাস আর ধর্মও মেনে চলে মানুষ। মানুষের সংস্কৃতি শেখা শুরু হয় পরিবার থেকে। যেমন জন্মের পর সংস্কৃতি শেখার প্রথম পাঠ হলো আমাদের মাতৃভাষা। এরপর ধারাবাহিকভাবে আমরা সংস্কৃতি শিখতে শুরু করি পরিবার ও সমাজের অন্যান্য মানুষের কাছ থেকে। মানুষের সমগ্র জীবনব্যবস্থাই তার সংস্কৃতি। নৃবিজ্ঞানীদের মতে অনেকগুলো উপাদান মিলে সংস্কৃতি গড়ে উঠে, যেমন:

○ জ্ঞান : সকল সংস্কৃতির মানুষই তাদের নিজস্ব জ্ঞানের উপর নির্ভর করে। টিকে থাকার জন্য খাদ্যের উৎস, আহরণের উপায় ও প্রস্তুত করার উপায় এসব বিষয়ে সকল সংস্কৃতির মানুষের নিজস্ব জ্ঞান আছে। জ্ঞান ব্যবহার করে মানুষ আবাসস্থল নির্মাণ করে কিংবা তার চারপাশের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে জীবন ধারণ করে।
○ বিশ্বাস: প্রত্যেক সংস্কৃতিতে মানুষের জন্ম, অস্তিত্ব, তার জগৎ ও মৃত্যুকে ঘিরে নানা রকম বিশ্বাস প্রচলিত আছে। এর সাথে যুক্ত হয় অন্যান্য ধারণা, যেমন: সৃষ্টিকর্তা, প্রাণীদের আত্মা, অতিপ্রাকৃত শক্তিসহ আরও অনেক কিছু। এ ধরনের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান আমাদের সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
○ আদর্শ ও নৈতিকতা: প্রত্যেক মানুষেরই তার সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী নৈতিকতার মান থাকে, যা তাকে ন্যায়-অন্যায়ের বোধ দেয়। এই আদর্শ ও নৈতিকতা মানুষের বিভিন্ন আচরণকে প্রভাবিত করে।
○ নিয়ম-নীতি ও আইন-কানুন: প্রত্যেক সংস্কৃতিই মানুষের সামাজিক জীবনকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন-কানুন তৈরি করে এবং তা প্রয়োগ করে।
○ প্রথা ও রীতি: সকল সংস্কৃতিরই নিজস্ব প্রথা, মূল্যবোধ ও রীতি রয়েছে। নিজ নিজ প্রথা এবং রীতি অনুযায়ী একেক সংস্কৃতির মানুষ একেকভাবে জীবনযাপন করে।
○সামর্থ্য ও দক্ষতা: সামর্থ্য ও দক্ষতার ভিত্তিতে মানুষ অন্যান্য সকল প্রাণী থেকে আলাদা। যেমন, ভাষা ব্যবহারের সামর্থ্য মানুষের অনন্য গুণাবলির অন্যতম। আবার একটি সংস্কৃতিতে সবারই কিছু নির্দিষ্ট দক্ষতা আছে, যেমন: শিকার করার দক্ষতা, গাছ-গাছালি সংগ্রহ করার দক্ষতা, চাষাবাদ করার দক্ষতা অথবা বাসস্থান বানানোর দক্ষতা ইত্যাদি।

○ সমাজ ব্যবস্থা: মানুষ সামাজিক জীব। তাই সমাজবদ্ধ হয়ে আমরা বসবাস ও জীবনধারণ করি। বেঁচে থাকার জন্য মানুষ তার চারপাশের পরিবেশ ও প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। প্রকৃতি থেকেই মানুষ খাদ্যসামগ্রী আহরণ করে। প্রকৃতি থেকেই আসে তার গৃহ নির্মাণের সকল সামগ্রী। আবার জামাকাপড় তৈরির কাঁচামালও পাওয়া যায় প্রকৃতিতেই। সংস্কৃতি আমাদের শেখায় কীভাবে প্রকৃতি থেকে দরকারী কাঁচামাল ও অন্যান্য দ্রব্যাদি সংগ্রহ করতে হয়। যেমন ইনুইটরা বরফের ঘর তৈরি করতে শেখে। উদাহরণস্বরূপ আরও বলা যেতে পারে, প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত খাদ্যশস্য ও শাকসবজি রান্না করে আমাদের খাবারের উপযুক্ত করতে হয়। রান্না করার কৌশল আমরা সংস্কৃতি থেকে পাই। সেইসাথে খাদ্যশস্য ও শাকসবজি উৎপাদনের পদ্ধতিও শিখি সংস্কৃতি থেকে। সংস্কৃতির ভিন্নতার জন্যই একজন সাঁওতাল কিংবা মারমা নৃগোষ্ঠীর কৃষক ও বাঙালি কৃষকের চাষ করার পদ্ধতির মধ্যে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তাই প্রকৃতি ও মানুষের মাঝে সম্পর্ক স্থাপন করে সংস্কৃতি।

কাজ-১ : পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সংস্কৃতি আমাদের কীভাবে সাহায্য করে?
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...