বংশ এবং বংশধারা কী? (পাঠ- ১০ এবং ১১)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজ জীবন - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

1.4k

বংশধারা: বংশধারা বলতে বংশের বৃত্তান্ত বা ক্রম বা ধারাকে বোঝানো হয়। এক প্রজন্মের সাথে অন্য প্রজন্মের সম্পর্ক ও সম্পর্কের ধারাবাহিকতাকে বংশধারা বলে। অন্য কথায়, পূর্বপুরুষের সাথে আমাদের সম্পর্কের যোগসূত্র নিরূপণ করাকে বংশধারা বলা হয়। অতএব বলা যায়, একজন মানুষ সাধারণত জন্মসূত্রে একটি বংশধারার সদস্যপদ লাভ করে থাকে।
পূর্বপুরুষের সাথে সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে আমরা আপন ও দূরের আত্মীয় নির্ণয় করি। যেমন, একই বাবার দুই ছেলে হলো আপন ভাই। আবার আপন চাচাতো ভাই-বোনরা সবাই একই দাদার বংশধর। এভাবে আমরা যত পেছনের বা পূর্বের প্রজন্মের সূত্র ধরে গণনা করব আমাদের আত্মীয়দের সংখ্যাও তত বাড়তে থাকবে। শুধুমাত্র আমাদের নিকট বা আপন আত্মীয়দের নিয়ে একটি আত্মীয়তার দল গঠন করা যেতে পারে।
আবার আমাদের নিকট ও দূর সম্পর্কের আত্মীয়দের নিয়ে যদি আরেকটি আত্মীয়তার দল গঠন করা হয় তাহলে কোনটি বড় দল হবে? নিশ্চয়ই দ্বিতীয় দলটির সদস্য অনেক বেশি হবে, তাই না? এই আত্মীয়তার ছোট ও বড় দলগুলোকে আমরা বলি বংশ, গোত্র ইত্যাদি।
আমাদের সমাজ জীবনে বংশধারা অনুযায়ী এ সব আত্মীয়তার দলগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সমাজে সম্পদের উত্তরাধিকার থেকে শুরু করে পরবর্তী গ্রাম বা সমাজপ্রধান কে হবে, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে কার ভূমিকা কী হবে, ইত্যাদি নির্ধারণে বংশধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কার জমি কে পাবে, কতটুকু পাবে সেটিও বংশধারার আইন অনুযায়ী চলে। আবার নানা ধরনের সামাজিক দলের সদস্যপদ ঠিক করা হয় বংশদলের মাধ্যমে। চাষাবাদে বা ঘরবাড়ি তৈরিতে সহযোগিতার দরকার হলে তা বংশদলের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। পারস্পরিক রাজনৈতিক সহযোগিতা অথবা সংঘাতের সময় বংশদলের সাহায্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আবার কে কাকে বিয়ে করতে পারবে আর কে কাকে পারবে না, সেটিও নির্ধারিত হয় বংশধারার মাধ্যমে। এছাড়াও বিয়ের সময় কনে পক্ষ এবং বর পক্ষের মধ্যে সম্পদের আদান-প্রদানের ক্ষেত্রেও বংশধারার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে।
আত্মীয়তার দল- বংশ ও গোত্র বংশ বা কুল বলতে আমাদের সরাসরি রক্তের সম্পর্কের পূর্বপুরুষদের পরিচিতি বোঝায়। অর্থাৎ আমাদের আগের পুরুষদের মধ্যে প্রাচীনতম ব্যক্তি যার পরিচয় এবং সরাসরি সম্পর্ক আমরা জানি, তার বংশধরদের সবাই এক বংশ বা কুলের অন্তর্গত। সাধারণত, পূর্বের আট থেকে দশ পুরুষ হতে এখন পর্যন্ত সম্পর্কিত আত্মীয়রা একই বংশের সদস্য। সমাজে একই বংশের সদস্যদের বিবেচনা করা হয় একটি সক্রিয় সামাজিক দল হিসেবে। কেননা, একই বংশের সদস্যরা আপন আত্মীয় হিসেবে পরস্পরের প্রয়োজনে এগিয়ে আসে, চাষাবাদে সহযোগিতা করে, একসাথে চলাফেরা করে এবং মিলিতভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উদযাপন করে ইত্যাদি।
বহু পুরুষ আগের কারো নাম হয়ত আমরা শুনেছি, কিন্তু তার সাথে সম্পর্কের সরাসরি যোগসূত্র এখন আমরা আর জানি না, এমন সদস্যদের সবাইকে নিয়ে একটি গোত্র গড়ে উঠে। একই গোত্রের সদস্যরা সবাই বিশ্বাস করে যে তারা একই আদি পুরুষের বংশধর, কিন্তু সম্পর্কের সরাসরি যোগসূত্র তারা সবসময় জানে না।
গোত্রের পূর্বতম পুরুষ সাধারণত বিশ্বাস নির্ভর এবং কাল্পনিক কোনো ব্যক্তি। কয়েকটি বংশ মিলেই একটি গোত্র গড়ে উঠে। আর কয়েকটি গোত্র একসঙ্গে একটি নৃগোষ্ঠী গড়ে তোলে।
উদাহরণস্বরূপ, যেমন ধরে নেয়া যাক, বান্দরবানের ম্রো নৃগোষ্ঠীর একজন ছেলের নাম দুরন। তার গোত্রের নাম হলো তাইসাং। দূরনের মতো মেনলুংও আরেকজন তাইসাং। দুরনের দাদার বাবার বাবা হলেন উইলেন, যিনি মেনলুং-এর সম্পর্কে দাদার বাবা হন। সুতরাং, দুরন ও মেনলুং দুইজনই একই বংশের সদস্য। কিন্তু ম্রো নৃগোষ্ঠীদের মধ্যে আরও কয়েক শত মানুষ আছে যারা তাইসাং গোত্রের সদস্য। যারা দূর-দূরান্তের বিভিন্ন ম্রো গ্রামে ছড়িয়ে আছে। দুরন এদের সবাইকে চেনে না, অনেককে কখনো দেখেনি, বা সবার নামও জানে না। তবে সব তাইসাংদের মত দুরনও বিশ্বাস করে তারা সবাই একই পূর্বপুরুষের বংশধর। তাই সকল তাইসাং সদস্যই একই গোত্রের অন্তর্গত।

কাজ- ১ : একটি বংশের সকল সদস্যেদের একটি সামাজিক দল বলার কারণ লিপিবদ্ধ কর।

কাজ- ২ : সমাজ জীবনে বংশধারা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...