সিলেট বিভাগে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ (পাঠ-০৬)

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিচিতি - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

1.4k

সিলেট বিভাগে মোট ৪টি জেলা সুনামগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। এসব জেলায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বহু ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বাস করে। তারা হলো খাড়িয়া, মান্দি, ওরাঁও, ত্রিপুরা, হাজং, খাসি, বিষ্ণুপ্রিয়া, মেইতেই, পাঙ্গান, বাগদি, বানাই, বীন, ভূমিজ, গন্ড, গঞ্জ, গুর্খা, হালাম, মুষহর, মাহাতো, নায়েক, নুনিয়া, পানিখা, পাত্র, শবর, কোচ, ডালু, সাঁওতাল, মুন্ডা, হো, মালো, মিকির, মাহলে, খন্দ প্রভৃতি। তবে সিলেট অঞ্চলে জনসংখ্যার দিক থেকে বাঙালি ছাড়া অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মধ্যে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, মেইতেই মণিপুরী ও খাসি নৃগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠ। সিলেট বিভাগে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মোট জনসংখ্যা প্রায় তিন লক্ষ, যাদের অধিকাংশই চা বাগানে কাজ করে। বাংলাদেশের মণিপুরী জাতিসত্তাসমূহ সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলো।
মণিপুরী জাতিসত্তাসমূহ: মণিপুরী জাতিসত্তাসমূহের বসবাস সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ,
সুনামগঞ্জ ও সিলেট জেলায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর (১৮১৯-১৮২৬) প্রথম দিকে বার্মার সৈন্যরা ভারতের মণিপুর রাজ্য আক্রমণ করলে সেখানকার কিছু জাতিসত্তার মানুষ এসে সিলেট অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে আসার কারণে বাংলাদেশে তারা মণিপুরী নামে পরিচিত। সাধারণভাবে মণিপুরী নামে পরিচিত হলেও এদের মাঝে রয়েছে তিনটি পৃথক ও স্বতন্ত্র জাতিসত্তা। মণিপুরী নামে পরিচিত এই জাতিসত্তা বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ হলো: (১) মেইতেই মণিপুরী, (২) বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী এবং (৩) পাঙ্গান মণিপুরী। এই তিনটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এখানে দেওয়া হলো।

(১) মেইতেই জাতিসত্তা: সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলাতে মেইতেইদের জনসংখ্যা বেশি। মেইতেইদের সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা রয়েছে ভারতের মনিপুর রাজ্যে। তবে এছাড়াও ভারতের ত্রিপুরা, আসাম ও মেঘালয় রাজ্যে, চীনের ইয়ুনান প্রদেশে এবং মিয়ানমারে মেইতেইদের বসবাস রয়েছে। বাংলাদেশের মেইতেই সমাজ এখনও গ্রাম ও কৃষিনির্ভর। মেইতেইদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, দৃশ্যশিল্প, তাঁতবস্ত্র প্রভৃতি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জনে সক্ষম হয়েছে। মেইতেইদের মাতৃভাষা 'মেইতেইলোন' যা টিবেটো-বার্মান শাখার কুকি-চিন ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। মেইতেইদের প্রাচীন ধর্মের নাম 'অপোকপা'। তাদের প্রধান দেব-দেবীরা হলেন সানামাহি, পাখংবা, অপোকপা, শিদাবা। অতি প্রাচীন কাল থেকে মেইতেইদের মাঝে নিজস্ব চিকিৎসা পদ্ধতি প্রচলিত। যারা এই চিকিৎসার কাজটি করেন তারা 'মাইবা' বা 'মাইবী' নামে পরিচিত ছিল।

(২) বিষ্ণুপ্রিয়া জাতিসত্তা বেশিসংখ্যক বিষ্ণুপ্রিয়া বাস করে মৌলভীবাজার জেলায়। এদের আদি নিবাস ভারতের মনিপুর রাজ্যে। বিষ্ণুপ্রিয়াদের কয়েকটি পরিবার মিলে একটি পাড়া গড়ে উঠে। প্রতিটি পাড়া বা গ্রামে রয়েছে এক একটি দেব মন্দির ও মন্ডপ। এসকল মন্দির ও মন্ডপ ঘিরে আবর্তিত হয় পাড়ার যাবতীয় ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকান্ড। প্রতিটি গ্রামে মন্দির পরিচালনা ও দেবতার পূজা-অর্চনার জন্য একটি ব্রাহ্মণ পরিবার থাকে। গ্রামে রয়েছে গ্রাম পঞ্চায়েত, আবার কয়েকটি গ্রামে রয়েছে পরগনা পঞ্চায়েত। পঞ্চায়েত পরিচালনার জন্য ব্রাহ্মণদের মধ্যে থেকে বিজ্ঞজনকে নির্বাচন করা হয়। বিষ্ণুপ্রিয়া সমাজে গ্রাম পঞ্চায়েত ও পরগনা পঞ্চায়েতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

বিষ্ণুপ্রিয়ারা বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী। তাদের প্রধান উৎসব রাসযাত্রা, রথযাত্রা ইত্যাদি। কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথীতে রাসপূর্ণিমা উদযাপন করা হয়। রাসপূর্ণিমায় গোষ্ঠলীলা বা রাখাল রাস ও রাসলীলার আয়োজন করা হয়। সংকীর্তন হলো অন্যতম বৃহত্তর ধর্মীয় উৎসব। বিষ্ণুপ্রিয়াদের মাতৃভাষা ইন্দো-আর্যীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। বিষ্ণুপ্রিয়া লোকেরা পাঁচটি গোত্রে বিভক্ত। একই গোত্রের মধ্যে বিষ্ণুপ্রিয়া সমাজে বিবাহ নিষিদ্ধ।

(৩) পাঙ্গান জাতিসত্তা: সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে (১৬০৬ খৃঃ) হবিগঞ্জের তরফ অঞ্চলের পাঠান শাসক খাজা ওসমানের সৈন্যাধ্যক্ষ মোহাম্মদ সানীর নেতৃত্বে ইসলাম ধর্মের অনুসারী এক দল সৈন্যবাহিনী মণিপুর রাজ্যে অভিযান চালায়। তখনকার মণিপুরের রাজা খাগোম্বার সাথে এক সন্ধির ফলে এই বাহিনী মণিপুরে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। পরবর্তীকালে মোগল শাসক মীর জুমলা আসাম আক্রমণে বিপর্যস্ত হলে ঐ সৈন্যবাহিনীর অনেকে পার্শ্ববর্তী রাজ্য মণিপুরে আশ্রয় নেয়। তারা মণিপুরের স্থানীয় অধিবাসীদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং ইসলাম ধর্ম প্রচার করে। মণিপুরের মুসলমান জনগোষ্ঠীরাই পাঙ্গান নামে পরিচিত।

পাঙ্গানরা 'মেইতেইলোন' ভাষায় কথা বলে যা টিবেটো-বার্মান শাখার কুকি-চিন ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত। এরা সবাই ইসলাম ধর্মের সুন্নী মতাবলম্বী। নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্যেই সাধারণত বিয়ে হয়। বর্তমানে মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ অংশে এদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

কাজ- ১ ঃ সিলেট বিভাগে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নামের একটি তালিকা প্রস্তুত কর।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...