প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বসবাস। আদি মানুষের ব্যবহৃত বিভিন্ন দ্রব্যাদি ও নিদর্শন থেকে বাংলাদেশে বসবাসকারী বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়। এ ছাড়াও বর্তমানে নৃবিজ্ঞানীরা মানুষের বংশগতির ধারক জিনলিপির তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষের পূর্বপুরুষদের উৎপত্তি ও আদি যোগসূত্র ব্যাখ্যা করেছেন। প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানের পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা এ অঞ্চলে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের প্রত্ন ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি সম্পর্কে এখানে আলোচনা করব। মানুষের বংশগতির গবেষণা থেকে জানা যায় বর্তমান মানুষের পূর্ব- পুরুষের বসবাস ছিল আফ্রিকা মহাদেশে। প্রায় ৬০ হাজার বছর আগে তারা সেখান থেকে বেরিয়ে আসে। 'আফ্রিকার শিং' বলে পরিচিত বর্তমানের ইথিওপিয়া, সোমালিয়া ও জিবুতি দেশের ভিতর দিয়ে আদিমানুষ প্রথমে দক্ষিণ আরব অঞ্চলে আসে। সেখান থেকে সৌদি আরব ও ইরাক পাড়ি দিয়ে ইরানে প্রবেশ করে। তারপর সমুদ্রের তীর ধরে তাদের পদযাত্রা এগিয়ে চলে পূর্বদিকে। এভাবে পাকিস্তান ও ভারতের উপকূল পার হয়ে বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে আদি মানুষেরা ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে।

বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে বাংলাদেশ ও এর আশেপাশের অঞ্চলে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষদের যাতায়াত ও বসবাসের প্রমাণ খুঁজে পেয়েছেন নৃবিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, ফেনীর ছাগলনাইয়া এবং লালমাই পাহাড়ের চাকলাপুঞ্জি অঞ্চলে উচ্চ পুরোপলীয় যুগের অনেক হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়েছে। এদের বয়স আনুমানিক ১৮ হাজার থেকে ২২ হাজার বছর। পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল ও নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর এলাকায় নবোপলীয় যুগের হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়েছে, যাদের বয়স আনুমানিক পাঁচ হাজার থেকে আট হাজার বছর। এছাড়া আবিস্কৃত হয়েছে তাম্র ও প্রস্তর যুগের বসতি ও মৃৎপাত্র যাদের আনুমানিক বয়স খ্রিস্টপূর্ব সাড়ে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার বছর। বগুড়ার মহাস্থানগড় এবং সাম্প্রতিককালে আবিষ্কৃত উয়ারী-বটেশ্বরের নানা নিদর্শন থেকে বাংলাদেশে নগর সভ্যতা ও বাণিজ্য বিকাশের প্রমাণ পাওয়া যায়। এই বিকাশকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব সাত থেকে খ্রিস্টীয় ছয় শতক। প্রথম খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত সময়ের বিভিন্ন লেখক ও পর্যটকদের বর্ণনায় প্রাচীন বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের এই অঞ্চলে বসবাসের সময়কাল প্রাগৈতিহাসিক পর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত। অতীতে এ দেশে তাদের সমৃদ্ধ জীবনধারা ও সংস্কৃতি ছিল। তার সাক্ষ্য এখনও বহন করে চলেছে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে- ছিটিয়ে থাকা তাদের প্রত্নস্থাপনাসমূহ। সংখ্যায় কম হলেও এসব প্রত্নস্থাপনা তাদের অতীত ইতিহাস, জীবনধারা ও সংস্কৃতিকে জানার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, সিলেট, ময়মনসিংহ প্রভৃতি জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন রয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে রাজপ্রাসাদ, মন্দির, দুর্গ, পরিখা, পুকুর, কূপ, গুহা স্থাপত্য, স্মৃতিস্তম্ভ প্রভৃতি। কুমিল্লা অঞ্চলে ত্রিপুরা রাজাদের খননকৃত বেশ কয়েকটি বড় পুকুর ঐ অঞ্চলে একদা তাদের শাসনব্যবস্থার নীরব সাক্ষী হিসেবে আজও বিরাজ করছে।
টেকনাফে রয়েছে বিখ্যাত মাথিনের কূপ। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় বর্তমানে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে ত্রিপুরা রাজাদের খননকৃত দীঘি, যা থেকে ঐ স্থানের নামকরণ দীঘিনালা হয়েছে। একদা মুঘল সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খান কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত রাখাইন জনগোষ্ঠীর দুর্গ আক্রমণ করেছিলেন বলে জানা যায়। আক্রান্ত রাখাইনরা তখন রামু দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন, যা পরে মুঘলরা দখল করে নেয়। এসব দুর্গের ধ্বংসাবশেষ এখনও রয়ে গেছে।
ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর প্রত্ননিদর্শনসমূহ যথাযথভাবে সংরক্ষণ করার প্রচেষ্টা ছিল সীমিত। ফলে বর্তমানে তাদের বহু প্রত্ননিদর্শন হারিয়ে গেছে। এ ছাড়াও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ কাজ পরিচালিত হয়নি বলে অনেক কিছুই হয়ত অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে। ঔপনিবেশিক শাসনামলের প্রশাসক, পর্যটক, ধর্মযাজক কিংবা স্থানীয় অধিবাসীদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে আমরা তাদের বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শনের পরিচয় পাই। এর পাশাপাশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের প্রত্ননিদর্শন সংরক্ষণে কিছু সরকারি উদ্যোগও রয়েছে। বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরের আগ্রাবাদে অবস্থিত জাতিতাত্ত্বিক জাদুঘর, তিন পার্বত্য জেলায় অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, সমতল অঞ্চলের একাধিক জেলায় অবস্থিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিষয়ক প্রতিষ্ঠান (বিরিশিরি, মণিপুরী ললিতকলা একাডেমি প্রভৃতি) ও বরেন্দ্র জাদুঘর প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান সরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। পরবর্তী পাঠগুলোতে আমরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহের কয়েকটি প্রত্নস্থাপনা সম্পর্কে আলোচনা করব।
| কাজ- ১ : বাংলাদেশের প্রত্নঐতিহ্য সংরক্ষনে ভূমিকা পালনকারী প্রতিষ্ঠান সমূহের নাম লিখ। |
Read more