সাঁওতাল নৃগোষ্ঠীর সোহরায় উৎসব (পাঠ-০৭)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উৎসব - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

684

ঐতিহাসিককাল থেকে সাঁওতাল সমাজে সোহরায় উৎসবটি পালিত হয়ে আসছে। এটি তাদের সবচাইতে বড় ও ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক উৎসব। বাংলাদেশের সাঁওতালরা যথেষ্ট কষ্টের মধ্যে দিন যাপন করলেও আজও তারা সমান গুরুত্ব দিয়ে সোহরায় উৎসবটি পালন করে। 'হড় হপন'রা (সাঁওতাল) সারা বছর রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, কাদা মাটি মেখে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, গৃহপালিত পশুর সাহায্যে ফসল উৎপাদন করে। এ জন্যই ফসল তোলার পরে গৃহদেবতা, গোত্র দেবতা ও পূর্বপুরুষদের পূজা-অর্চনা, আত্মীয়-স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশী সকলকে নিয়ে আনন্দ উৎসব এবং গৃহপালিত পশুর পরিচর্যা ও বন্দনার মধ্য দিয়ে সোহরায় উৎসব পালিত হয়। সেইসাথে ভালো ফসলের জন্য দেবতাদের আশীর্বাদ কামনা করা হয়। গ্রাম সংগঠনের প্রশাসকগণ ও গ্রামবাসীরা একটি সাধারণ সভার মাধ্যমে এর দিন-তারিখ নির্ধারণ করে। সোহরায় দিনক্ষণ নির্ধারণের পর থেকেই গ্রামবাসীদের মাঝে আনন্দের সাড়া পড়ে যায়। প্রতিটি পরিবার বাড়ির ভেতরে ও বাইরের সব স্থান ধুয়ে মুছে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে এবং লাল মাটি দিয়ে ঘরের দেয়াল ও পিলার রঙিন করে ছবি আঁকে ও উঠানে আল্পনা আঁকে। গৃহকর্তৃগণ হাঁড়িতে পচানি প্রস্তুত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন পোশাক পরিচ্ছদ কেনা হয়। এর সঙ্গে চলে আত্মীয়স্বজনদের নিমন্ত্রণের পালা।
পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন এই উৎসব শুরু হয়ে দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে পালিত হয়। এই উৎসবের স্থায়িত্ব ছয় দিন। উৎসবের প্রথম দিনকে উম বা শুদ্ধিকরণ বলা হয়। উৎসবের সূত্রপাত হয় গডটান্ডিতে (পবিত্র স্থান)। অনুষ্ঠানে নেতৃত্ব দেন নায়কে (গ্রাম পুরোহিত)। গ্রামের পুরুষেরা গডটান্ডিতে এসে মিলিত হয়। গডটান্ডিতে আদি পিতামাতা (পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুঢহি), বারো গোত্রের আদি পুরষ, সিঞ বোঙা (সূর্য দেবতা) ও মারাং বুরুর উদ্দেশে মোরগ-মুরগি, কলা, চিনি, বাতাসা, ধুপ-সিঁদুর দিয়ে পূজা দেয়া হয়। পূজা শেষে তাদের নামে হান্ডি নিবেদন করা হয়। যেহেতু সাঁওতালরা বিশ্বাস করে ডিম থেকে মানবকুলের জন্ম তাই পূজার স্থানে একটি ডিম রাখা হয়।

উৎসবের দ্বিতীয় দিনকে বলা হয় 'বোঙ্গাঃগ্‌' দিন। এইদিনে সিঞ বোঙা (সূর্য দেবতা), মারাং বুরু (মহান দেবতা), গৃহ দেবতা, গোত্র দেবতার নামে গোত্রভেদে শূকর, ভেড়া, ছাগল ও মোরগ বলি দেওয়া হয় এবং পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে সুনুম পিঠা (তেল পিঠা) ও হান্ডি নিবেদন করা হয়। তৃতীয় দিনে গৃহপালিত পশুর যত্ন-পরিচর্যা ও বন্দনা করা হয়। এই তিন দিন বাদ্য-বাজনায় নাচে-গানে আনন্দে গ্রাম ও কুলহি মাতিয়ে রাখার দায়িত্বে থাকেন জগ্‌গ্নানঝহী। তাই গ্রামের যুবকরা মাদল ও নাগরা বাজিয়ে এবং মেয়েরা গান গেয়ে সোহরায়, ডাহার, লাগড়ে, গোলওয়ারী ও দুরূমজাঃ নাচ নাচে। চতুর্থ ও পঞ্চম দিনের নাম যথাক্রমে জালে ও হাকো-কাটকম। বর্তমানে অভাবের কারণে বাংলাদেশে এই দুটি দিবস পালন করা হয় না। ষষ্ঠ দিনের নাম সাকরাত। এই দিবসটি চতুর্থ দিনে পালন করা হয়। এই দিনে পুরুষেরা পারস্পরিক বাড়িতে ভাত খেয়ে গ্রামের আশেপাশে জঙ্গলে শিকার করে ফিরে এবং বিকালে ছেলেরা একটি কলাগাছ তীরবিদ্ধ করে। এটাকে 'বেঝাঃ তুইঞ' বলা হয়। এটা মূলত শত্রু প্রতিরোধ ও নিধনের প্রতীক। এই তীর খেলার পরে বিভিন্ন শারীরিক কসরত ও নানান খেলাধুলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। আয়োজিত এই খেলার শেষে কলাগাছ লক্ষ্যভেদকারী বিজয়ীকে জন্মানবাহী ঘাড়ে করে মানঝহী থানের (গ্রামের পুজার বেদী) সামনে নিয়ে আসেন। সেখানে গ্রামের নারী-পুরুষ পারস্পরিক ডবঃহ্-জোহার (প্রণাম) করে। এ সময় জন্মানঝহী সোহরায়ের সকল আনুষ্ঠানিকতার পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেন এবং আগামী বছরের সোহরায় যেন নতুন আশা-আনন্দ নিয়ে ফিরে আসে সে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

কাজ- ১ : সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সোহরায় উৎসবের বিভিন্ন পর্যায়ের নাম লেখ।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...