বংশধারার প্রকারভেদ (পাঠ- ১২)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজ জীবন - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

480

বাংলাদেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতিতে প্রধানত দুই ধরনের বংশধারা ব্যবস্থা দেখা যায়। যথা: (১) পিতৃসূত্রীয় বংশধারা এবং (২) মাতৃসূত্রীয় বংশধারা। বাঙালিদের সংস্কৃতিতে দেখা যায় যে, সন্তানরা তাদের বাবার বংশের সদস্য হিসেবে পরিচিত হয়। অন্যদিকে মান্দি সংস্কৃতিতে সন্তানরা পরিচিত হয় মা-র বংশের সদস্য। যেমন, নমিতা চিরান একজন মান্দি মেয়ে। তার মা-র নাম মমতা চিরান ও বাবার নাম লিপ্টন মারাক। নমিতার পদবি চিরান এবং সে তার মা-র বংশ অর্থাৎ চিরান বংশের সদস্য। মান্দি নিয়ম অনুযায়ী ধরে নেওয়া হয় নমিতা চিরান বংশের অন্য সকল সদস্যের সাথে রক্তের সম্পর্কে সম্পর্কিত।

পিতৃসূত্রীয় বংশধারা: আমাদের দেশের অধিকাংশ নৃগোষ্ঠীর বংশধারাই পিতৃসূত্রীয়। সন্তানরা বাবার পরিচয়ে পরিচিত হয় সমাজে, আর বাবা পরিচিত হয় তার বাবার পরিচয়ে। সুতরাং, পিতৃসূত্রীয় বংশধারা বলতে বোঝায়, যখন একজন ব্যক্তিকে তার পিতার বংশের সদস্য বলে চিহ্নিত করা হয়। এ ধরনের সমাজে কারো মা বা নানীর পরিচয় বিশেষ কোনো গুরুত্ব বহন করে না। পিতৃসূত্রীয় বংশধারা অনুযায়ী, একটি গোত্রের সকল সদস্য বিশ্বাস করে, তারা সবাই প্রাচীনকালের কোনো একজন নির্দিষ্ট পুরুষের বংশধর। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই গোত্রের সকলের মাঝে ঐক্য গড়ে উঠে।

পিতৃসূত্রীয় বংশধারার রীতি অনুযায়ী, কারো ফুফাতো বা মামাতো ভাই-বোন তার বংশধারার সদস্য নয়। এদেশে মান্দি ও খাসি ছাড়া অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর, যেমন, বাঙালি, সাঁওতাল, ওরাঁও, চাকমা, মারমা ইত্যাদি সবাই পিতৃসূত্রীয় বংশধারা অনুসরণ করে। এ ধরনের সংস্কৃতিতে, কোনো মহিলার সন্তানরা ঐ মহিলার বাবার বংশধারার সদস্য হয় না।

মাতৃসূত্রীয় বংশধারা: মান্দিদের মধ্যে মাতৃসূত্রীয় বংশধারা দেখতে পাওয়া যায়। এ ধারা অনুযায়ী একজন ব্যক্তি, তার মাতার বংশধারার সদস্য। একই মায়ের বংশধারার সদস্যরা তাদের পূর্বসুরি হিসেবে একজন নারীকে নির্ধারণ করে থাকে। অতএব, নারীর বংশধর নিয়ে গঠিত আত্মীয়তার ধারাকে মাতৃসূত্রীয় বংশধারা বলা হয়। অর্থাৎ এই প্রথা অনুযায়ী সন্তানরা তাদের মা-র গোত্রের সদস্য। তাই একজন পুরুষ তার মা-র গোত্রের অন্তর্ভুক্ত হলেও তার সন্তানরা তার গোত্রভুক্ত নয়।

মাতৃসূত্রীয় রীতিতে মান্দি নৃগোষ্ঠীর কথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনার বিভিন্ন অঞ্চলে এবং মধুপুরের শালবন এলাকায় মূলত মান্দিদের বসতি। তাদের সংস্কৃতিতে সন্তানেরা তার মায়ের বংশধারার সদস্য বলে বিবেচিত হয়। ছেলে সন্তানেরা তাদের বিয়ের পর তাদের স্ত্রীদের বাড়িতে বা এলাকায় গিয়ে বসবাস করে এবং তাদের সন্তানরা তাদের স্ত্রীদের বংশধারার সদস্য হয়। নারী-পুরুষ উভয়েই মান্দি সমাজে অর্থনৈতিক কাজ অর্থাৎ কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করে। যেহেতু মেয়েরা তার মায়ের সম্পত্তিতে অধিকার পায়, তাই তাদের স্বামীরা তাদের বাড়িতে থাকে ও তাদের জমিতে ফসল ফলায়। আর তার ভাইরাও একই নিয়মে বিয়ের পর অন্য এলাকায় বা অন্য বাড়িতে তাদের স্ত্রী-র সাথে বসবাস করে। যদি কোনো কারণে স্ত্রী-র মৃত্যু হয়, তাহলে ভাইটি অনেক ক্ষেত্রে আবার তার মায়ের বাড়িতে ফিরে আসে এবং তার মা বা বোনদের পরিবারে বসবাস করে। সিলেটের খাসিদের মাঝেও বংশধারার একই রীতির প্রচলন আছে।

কাজ- ১ ঃ পিতৃসূত্রীয় ও মাতৃসূত্রীয় বংশধারার পার্থক্যগুলো একটি ছকে সাজাও।
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...