রাজশাহী বিভাগে মোট ৮টি জেলা। এসব জেলার প্রত্যেকটিতে বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি নানা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। কোথাও রয়েছে তাদের ঘনবসতি, আবার কোথাওবা তাদের বসবাস ছড়িয়ে-
ছিটিয়ে। রাজশাহী বিভাগে যেসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বাস। করে তাঁরা হলো-সাঁওতাল, পাহাড়িয়া, রাজবংশী, ও রাঁও, মাহাতো, মুন্ডা, ভূঁইমালী, ভূঁইয়া, ভূমিজ, খাড়িয়া, কোডা, মালো, পাহান, রাজোয়াড়, তুড়ি, কোঁচ, মুষহর, হো, মাহলে, বর্মণ, গন্ড প্রভৃতি। এই বিভাগে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর জনসংখ্যা আনুমানিক ছয় লক্ষ। নিচে ওরাঁও জাতিসত্তার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।

ওরাঁও জাতিসত্তা: ওরাঁওরা বহু শতাব্দী ধরে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গে বসবাস করে আসছে। বর্তমানে ওরাঁওরা উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, রংপুর, জয়পুরহাট, নওগাঁ, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও নীলফামারী জেলায় বসবাস করে। এছাড়া সিলেট অঞ্চলের হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলাতেও বেশ কিছু ওরাঁও বাস করে। এখানে তারা মূলত চা বাগানে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ এবং তাদের সাথে অন্যান্য অঞ্চলের ওরাওদের জীবনযাত্রায় বেশ পার্থক্য রয়েছে। গাজীপুর জেলায়ও কিছু সংখ্যক ওরাঁও বাস করে। নওগাঁ ও রংপুর জেলায় তাদের জনসংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।
ওরাঁও জাতিসত্তা মূলত প্রকৃতি পূজারি। তাদের সৃষ্টিকর্তার নাম ধার্মেশ। তিনি প্রধান দেবতা এবং সূর্যে অবস্থান করেন বলে সূর্যকেও তারা তাদের দেবতা মানে। ওরাঁওদের সমাজে প্রায় সারা বছর নানা পূজা পার্বন ও উৎসব পালিত হয়। এ ধরনের কিছু উৎসব হলো- সারহুল, কারাম, খারিয়ানি এবং ফাগুয়া। এদের মধ্যে কারাম হলো সবচেয়ে বড় উৎসব। প্রচলিত বিশ্বাস মতে, একসময় ওরাঁও জাতি শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে গভীর জঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে কারাম বৃক্ষের নিচে আশ্রয় নেয়। এই বৃক্ষ শত্রুর হাত থেকে তাদের রক্ষা করে বলে এর স্মরণে তারা ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে কারাম উৎসবের আয়োজন করে থাকে।
এক সময় বরেন্দ্র অঞ্চল বন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল বলে শিকার ছিল তাদের অন্যতম জীবিকা। নিজ অঞ্চলে বসবাসের এলাকা ও কৃষিজমি কমে যাওয়ায় তারা এখন শহরমুখী হয়ে পড়ছে এবং নানা পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে। নারীরা বিভিন্ন হস্তশিল্প কেন্দ্র ও বেসরকারি সংস্থায়ও সম্পৃক্ত হচ্ছে।
এক সময় বরেন্দ্র অঞ্চল বন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল বলে শিকার ছিল তাদের অন্যতম জীবিকা। নিজ অঞ্চলে বসবাসের এলাকা ও কৃষিজমি কমে যাওয়ায় তারা এখন শহরমুখী হয়ে পড়ছে এবং নানা পেশায় নিয়োজিত হচ্ছে। নারীরা বিভিন্ন হস্তশিল্প কেন্দ্র ও বেসরকারি সংস্থায়ও সম্পৃক্ত হচ্ছে।
ওরাঁওদের মধ্যে দুটি ভাষার প্রচলন রয়েছে। একটির নাম কুঁডুখ, যা দ্রাবিড় পরিবারভুক্ত এবং অপরটির নাম সাদরি। সাদরি ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। তাঁদের জীবন ও সংস্কৃতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে লোকসঙ্গীত, লোকনাট্য, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নৃত্যগীত, বাদ্য-বাজনা প্রভৃতি। নানা ধরনের পিঠাপুলি দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন ওরাঁও সমাজে একটি ঐতিহ্যবাহী রীতি।
ওরাঁও জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিক নানা ঘটনার সাক্ষী ও অংশীদার। ১৯৫০ সালে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে নাচোলে তেভাগা আন্দোলন নামে যে কৃষক আন্দোলন শুরু হয় তাতে তাঁরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শত শত ওরাঁও যুবক অংশ নিয়েছিল। ওরাঁওদের মধ্যে ৫৫টি গোত্রের সন্ধান পাওয়া যায় । একই গোত্রের নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ। তাদের সমাজ পিতৃতান্ত্রিক। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ওরাঁওদের যে গ্রাম সংগঠন আছে তাকে বলা হয় পাঞ্চেস। প্রতিটি গ্রামে একজন সর্দার বা মহাতোষ এবং একজন পুরোহিত বা নাইগাস থাকে। গ্রামের সাত- আটজন বয়স্ক ব্যক্তি দ্বারা তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য পাঞ্চেস গঠিত হয়।
কাজ-১ : রাজশাহী বিভাগে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নামের একটি তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ-২ : ওরাঁও জাতিসত্তার বসবাসের অঞ্চল উল্লেখ কর। |
Read more