চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থাৎ খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলায় ১৪টি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বসবাস করে। জাতিসত্তাগুলো হলো খুমি, চাক্, খ্যাং, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, গুর্খা, ত্রিপুরা, পাংখো, বম্, মারমা, ম্রো, লুসাই, বনযোগী এবং অসমিয়া। আরেকটি নৃগোষ্ঠী রাখাইনদের বড় অংশের বসবাস কক্সবাজার জেলায়। বরগুনা, পটুয়াখালী ও বরিশাল জেলাতেও কিছু রাখাইন বাস করে। ত্রিপুরাদের বসতি আরও বিস্তৃত। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও তাদের বসবাস রয়েছে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, চাঁদপুর, ফরিদপুর, সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলায়। তাছাড়া সংখ্যায় কম হলেও চট্টগ্রাম বিভাগের সমতল জেলাগুলোতে গুর্খা, বাউড়ি প্রভৃতি জাতিসত্তার মানুষ বসবাস করে। চট্টগ্রাম বিভাগে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর জনসংখ্যা প্রায় ১৫ লক্ষ। এদের মধ্যে এখানে চাকমা জাতিসত্তা সম্পর্কে সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করা হলো।
চাকমা জাতিসত্তা: পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর মধ্যে চাকমারা জনসংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের বৃহত্তম। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার জেলাতে তাদের বসবাস রয়েছে। এছাড়া চাকরিসূত্রে চাকমারা ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় বসবাস করছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা, আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ও দিল্লীসহ বিভিন্ন রাজ্যে অনেক চাকমা বসবাস করে।
খাগড়াছড়ি জেলার কিছু অংশ এবং রাঙ্গামাটি জেলা নিয়ে গঠিত হয়েছে চাকমা সার্কেল যার প্রধান হলেন চাকমা চীফ বা চাকমা রাজা। পার্বত্য চট্টগ্রামের আরও দুটি সার্কেলের মতো চাকমা সার্কেলও অনেক মৌজা নিয়ে গঠিত। প্রত্যেক মৌজায় রয়েছে কতগুলো গ্রাম। চাকমা ভাষায় গ্রামকে আদাম বা পাড়া বলা হয়। গ্রাম প্রধানের উপাধি হলো 'কার্বারী'। কয়েকটি 'আদাম' বা গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় এক-একটি মৌজা। মৌজা প্রধান হলেন 'হেডম্যান' যার নেতৃত্বে মৌজার অধিবাসীদের কাছ থেকে সরকার নির্ধারিত খাজনা আদায়, বিভিন্ন সামাজিক বিরোধের বিচারসহ এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম এবং জনগণের ভালমন্দ দেখভালের কাজগুলো পরিচালিত হয়। মৌজা প্রধানের সাথে আলাপ-আলোচনা করে চাকমা রাজা গ্রাম প্রধান বা কার্বারীকে নিয়োগ দেন। আর সাধারণত রাজার সুপারিশ অনুযায়ী মৌজার হেডম্যানকে নিয়োগ দেন সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক।
প্রথাগতভাবে চাকমা রাজা হলেন সমাজপতি এবং সমাজের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। চাকমা রাজা প্রথাগত আইন অনুযায়ী নিজ সার্কেলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাসমূহের সামাজিক বিচারকাজ পরিচালনা করেন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। চাকমা সার্কেলের বর্তমান রাজার নাম ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়। তিনি চাকমা রাজবংশের ৫১তম রাজা।
চাকমা সমাজের চারণ কবি 'গেংহুলি'দের পালাগান থেকে জানা যায় যে, সুদূর অতীতে চাকমারা চম্পকনগর রাজ্যে বসবাস করতো। চাকমা যুবরাজ বিজয়গিরি ২৬ হাজার সৈন্য নিয়ে যুদ্ধাভিযানে বের হয়ে একে একে চট্টগ্রাম, আরাকান, কুকি রাজ্য (লুসাই পাহাড়) প্রভৃতি অঞ্চল জয় করার পর চম্পকনগরে ফিরে না গিয়ে নববিজিত অঞ্চলগুলোর একাংশে নতুন রাজ্য স্থাপন করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। যুবরাজ বিজয়গিরি আনুমানিক ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দে উল্লেখিত রাজ্যগুলো জয় করেন। বর্তমান কালের চাকমারা রাজা বিজয়গিরির সেই আরাকান ও চট্টগ্রাম বিজয়ী ২৬ হাজার সৈন্যের বংশধর বলে অনেকের ধারণা। তবে চাকমারা নিজেদেরকে শাক্যবংশীয় হিসেবে পরিচয় দিতেও গর্ববোধ করে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক মহামানব গৌতম বুদ্ধ শাক্যবংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শাক্য শব্দ থেকে পরে চাকমা শব্দের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেক গবেষক দাবি করেন।
চাকমা সমাজ পিতৃতান্ত্রিক এবং মূলত কৃষিনির্ভর। জুমচাষ এবং কৃষিজমি চাষাবাদ উভয় ক্ষেত্রেই তারা সমান পারদর্শী। চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তাদের প্রায় প্রত্যেকটি গ্রামে বৌদ্ধমন্দির রয়েছে। বৈশাখী
পূর্ণিমাসহ বিভিন্ন পূর্ণিমার দিনে তারা বৌদ্ধমন্দিরে ফুল, খাদ্যদ্রব্যসহ নানা উপাচার দিয়ে এবং প্রদীপ জ্বালিয়ে বুদ্ধকে পূজা করে। চাকমা সমাজের একজন বোধিজ্ঞানপ্রাপ্ত সাধক বনভান্তে (শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির) বৌদ্ধদের কাছে পরম পূজনীয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব। রাঙ্গামাটিতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত চাকমা রাজ বনবিহারে বৌদ্ধ পূর্ণিমা, কঠিন চীবর দান এবং অন্যান্য পূর্ণিমা তিথিতে ভক্ত, অনুসারী এবং ধর্মানুরাগীদের ঢল নামে।

প্রথাগতভাবে রাজার শাসনাধীন হলেও চাকমা জাতিসত্তা নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে চলা রাজনৈতিক সংঘাতের পর ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে 'পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ প্রশাসন এবং উন্নয়ন কর্মকান্ড তদারকির জন্য 'পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ' গঠন করা হয়। পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ ঐতিহাসিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশের সাধারণ সরকারি প্রশাসন, তিন পাহাড়ি রাজা এবং আঞ্চলিক পরিষদের সমন্বিত শাসনাধীনে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। প্রথাগত নেতৃত্বের বাইরে এই জাতীয় এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রভাবও চাকমা সমাজে কম গুরুত্বপূর্ণ নয় ।
কাজ- ১ ঃ চট্টগ্রাম বিভাগে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নামের একটি তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ-২ ঃ চাকমা জাতিসত্তার বসবাসের অঞ্চল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনধারার কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ কর। |
Read more