বরিশাল ও খুলনা বিভাগে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা আনুমানিক আড়াই লক্ষ। বরিশাল বিভাগে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হলো রাখাইন। তাদের বসবাস মূলত পটুয়াখালী, বরিশাল ও বরগুনা জেলায়। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলাতেও রাখাইনদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাস করে। খুলনা বিভাগে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনবসতি দেশের অন্যান্য অংশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম। এই বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো হলো- মুন্ডা, মাহাতো, বুনো, বাগদি, রাজোয়াড়, রাজবংশী প্রভৃতি। মূলত কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট জেলাতেই এসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বসবাস করছে। নিচে মুন্ডা জাতিসত্তার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরা হলো।
মুন্ডা জাতিসত্তা: বাংলাদেশে মুন্ডারা উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনের কাছাকাছি এলাকায় বাস করে। ঝিনাইদহ জেলায় এবং বৃহত্তর সিলেটের চা বাগান এলাকাতে বেশ কিছু মুন্ডা পরিবার আছে। খুলনা জেলার কয়রা ও ডুমুরিয়া উপজেলার কয়েকটি গ্রামে তাদের বসতি রয়েছে। এছাড়া সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, দেবহাটা এবং তালা উপজেলায়ও মুন্ডাদের একটি বড় অংশ বাস করে। ভারতের ঝাড়খন্ড, বিহার, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিশগড় এবং উড়িষ্যা রাজ্যে অধিক সংখ্যক মুন্ডা বাস করে।
মুন্ডা জনগোষ্ঠী প্রধানত কৃষিজীবী। মুন্ডা বিদ্রোহ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে একটি স্মরণীয় বিদ্রোহ। বিরসা মুন্ডার নেতৃত্বে এই বিদ্রোহ শুরু হয়। তিনি ইংরেজদের শাসন এবং দেশীয় শোষকদের বিরুদ্ধে লড়াই করে একটি সমৃদ্ধিশালী সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। দৃঢ় আদর্শের জন্য তাকে মুন্ডারা ভগবান মনে করে। ১৮৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি তাঁর অনুসারীদের নিয়ে ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের সিংভূম, তামার ও বাসিয়ার অঞ্চলে ব্রিটিশ সরকারের অফিস, পুলিশ স্টেশন, মিশন হাউস আক্রমণ করেন এবং অবশেষে গ্রেপ্তার হন। ১৯০০ সালে রাঁচি কারাগারে তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়। শুধুমাত্র তীর- ধনুক নিয়েই তিনি পরাক্রমশালী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

মুন্ডারা ১৩টি 'কিলি' বা গোত্রে বিভক্ত। তাদের নিজস্ব মোড়ল ও রাজা আছে। মোড়ল একটা গোত্রকে আর রাজা কয়েকটি গোত্রকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা সামাজিক ও ধর্মীয় নানা সমস্যায় দিকনির্দেশনা ও সমাধান দিয়ে থাকেন। মুন্ডাদের বাড়িঘর মাটি দিয়ে তৈরি। সমাজে ছেলে সন্তানরাই পিতার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। মুন্ডাদের ধর্মের নাম স্বর্ণা। তাদের বিশ্বাস সিং বোঙ্গা বা সূর্য প্রভু সকল শক্তির উৎস এবং পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা।
মুন্ডাদের ভাষার নাম মুন্ডারি। তবে বর্তমানে তারা ওরাঁওদের সাদরি ভাষাকেও সমানভাবে গ্রহণ করেছে। তাদের নাচের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। তারা ধর্মীয় এবং অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে লাল ও সাদা মাটি দিয়ে চিত্রকর্ম, নানা আল্পনা ও শিল্পকর্ম আঁকে। তাদের বাড়িঘরেও অনুরূপ আল্পনা শোভা পায়।
কাজ- ১ : খুলনা ও বরিশাল বিভাগে বসবাসকারী বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নামের একটি তালিকা প্রস্তুত কর। কাজ-২ : মুন্ডা জাতিসত্তার বসবাসের অঞ্চল, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনধারার কিছু বিবরণ লিপিবদ্ধ কর। |
Read more