প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য বলতে কী বোঝায়? (পাঠ-০১)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রত্নঐতিহ্য - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

451

আমাদের চারপাশে কতো রকমের মানুষ! কতো বিচিত্র তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও জীবনযাত্রা! আমরা নানাভাবে পৃথিবীর মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করি। আচ্ছা, তোমাদের মনে কি কখনো প্রশ্ন জেগেছে যে আজকের পৃথিবীর মানুষকে আমরা যেমনটা দেখি, তারা কি চিরকাল এমনটা ছিল? কেমন ছিল বহু বহু বছর আগের মানুষ? কি করেই বা তারা আজকের অবস্থায় এলো? এইসব কৌতূহল থেকেই আমরা মানুষের অতীত অবস্থা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হই।
অনেক হারানো সূত্র খুঁজে বের করতে হয় আমাদের অতীত সম্পর্কে জানতে। এই সূত্রগুলো প্রায়শই থাকে অনেক অস্পষ্ট। তখন আমাদের চলতে হয় অনুমানের ভিত্তিতে। তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ যে এটা অনেক জটিল ও শ্রমসাধ্য কাজ। তারপরও কিন্তু বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন আমাদের হারানো অতীতের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে। অতীতের মানুষ ও তার সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার জন্য বিজ্ঞানীদের প্রধান দুটি সূত্র হলো (১) আদি মানুষের কঙ্কাল, দেহাবশেষ ও জীবাশ্ম বা ফসিল, এবং (২) আদি মানুষের সংস্কৃতির বস্তুগত বা দৃশ্যমান উপাদানসমূহের অবশিষ্টাংশ। প্রাচীন যুগে মানুষসহ অন্য যেসব প্রাণী বাস করতো তাদের দেহাবশেষের উপর লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মাটি, খনিজ পদার্থ, ধূলিকণা ইত্যাদি জমে জমে তা পাথরের মতো কঠিন রূপ নেয়, যাকে বলা হয় ফসিল বা জীবাশ্ম। আদি মানুষের কঙ্কাল, দেহাবশেষ বা জীবাশ্ম থেকে তাদের দেহাকৃতি, শারীরিক গড়ন, রোগ-বালাই, মৃত্যুর কারণ, খাদ্যাভ্যাস, জিনগত বৈশিষ্ট্য কিংবা তাদের বসবাসের পরিবেশ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
আমাদের অতীত সম্পর্কে জানার দ্বিতীয় সূত্রটি হলো মানব সংস্কৃতির বস্তুগত বা দৃশ্যমান উপাদানসমূহ। প্রাচীন মানুষের ব্যবহৃত তৈজসপত্র, হাতিয়ার এবং অন্যান্য দ্রব্যাদির অনেক কিছুই সময়ের সাথে সহজে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না। পাথর কিংবা বিভিন্ন ধাতু নির্মিত অনেক জিনিসপত্র তো লক্ষ লক্ষ বছরেও অবিকৃত থেকে যায়। মাটির নিচে চাপাপড়া অবস্থায় অথবা প্রাচীন গুহার ভিতর থেকে আদি মানুষের ব্যবহৃত এমন অনেক সাংস্কৃতিক নিদর্শনই খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাচীন গুহাচিত্র থেকে শুরু করে আদি মানুষের ব্যবহৃত সকল জিনিসপত্র থেকেই আমরা তখনকার মানুষের জীবনযাত্রা সম্পর্কে অনুমান করতে পারি। এরপর মানুষ যখন ধীরে ধীরে তাদের ভাষার লিখিত রূপ আবিষ্কার করে এবং বর্ণমালা ব্যবহার শুরু করে তখন থেকে মানুষের ইতিহাসও আমাদের কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে।

মানব সংস্কৃতির দৃশ্যমান বা বস্তুগত উপাদানগুলো থেকে মানুষ সম্পর্কে অধ্যয়ন করে প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রাচীন মানুষের ব্যবহার্য বিভিন্ন বস্তুসামগ্রী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি ছোট্ট পাথরের হাতিয়ার অনেক ধরনের তথ্যের উৎস হতে পারে, কারণ তা মানুষের চিন্তা, শ্রম ও জীবনযাত্রার স্বাক্ষর বহন করে। এ কারণে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা যেকোনো নিদর্শন পেলে বুঝতে চেষ্টা করেন সেটি কোন সময়ের, কীভাবে সেটি তৈরি হলো, কে বা কারা তা বানিয়েছে, কেন বা কি কাজের জন্য বানিয়েছে, কেনইবা এভাবে বানানো হলো। এছাড়া এতে কি উপকরণ ব্যবহার করা হলো, কোথা থেকে কি করে এইসব উপকরণ সংগ্রহ করা হয়েছিল, কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল, কতোটা সময় ও শ্রম লেগেছিল এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকেন। এভাবে তাঁরা ক্রমশ প্রাচীন মানুষের খাদ্যাভ্যাস, প্রযুক্তিজ্ঞান, হাতিয়ার, তৈজসপত্র ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে থাকেন। আর সেই সাথে নানাধরনের যুক্তি-প্রমাণ ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের সমাজ-ব্যবস্থা, বসতি, উৎপাদন পদ্ধতি, ধর্মবিশ্বাস ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা তৈরি করেন। এভাবে প্রাচীন ও বর্তমান মানুষের মধ্যে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা এবং এক অঞ্চলের সাথে অন্য অঞ্চলের সংস্কৃতির সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য নিয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেয় প্রত্নতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান।
প্রত্নতত্ত্বের কর্মপদ্ধতি: সুনির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ধাপে ধাপে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁদের সিদ্ধান্তে পৌঁছান। এবার প্রত্ন নিদর্শনের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের কিছু প্রাথমিক ধারণা নিয়ে আলোচনা করছি।
১। প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট বা স্থান নির্বাচন: প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল স্থান নির্বাচন। যেসব
জায়গার ভূ-প্রকৃতি, তার আশেপাশের পরিবেশ ও ছোট-খাটো নিদর্শন বিশ্লেষণ করে মনে হতে পারে যে এখানে আরো নিদর্শন পাওয়া সম্ভব, সেরকম জায়গাকে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা গবেষণা এলাকা হিসেবে নির্বাচন করেন। একে বলা হয় প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট। অনেক সময় হঠাৎ পাওয়া কোনো নিদর্শন বা নমুনা দেখে মনে হতে পারে যে এখানে অনুসন্ধান করলে বা মাটি খনন করলে আরো অনেক নিদর্শন পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু সবসময় এমনটা ঘটে না। তখন ভালো করে জরিপ করে সাইট নির্বাচন করতে হয়।
২। বিভিন্ন নমুনা ও নিদর্শন সংগ্রহ: এই ধাপে প্রত্নতাত্ত্বিকেরা সাইট থেকে নানা প্রত্ন নিদর্শন, প্রত্ন বস্তু বা প্রত্ন স্থাপনা ইত্যাদির নমুনা সংগ্রহ করেন। এধরনের কাজে প্রত্নতাত্ত্বিক ও তাঁদের সহযোগীদের বড় দল খনন কাজ ও বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করতে থাকেন। এরপর গবেষণাগারে নমুনাগুলো পরীক্ষা করে সেগুলোর বয়স নির্ধারণ করেন।
৩। লিপিবদ্ধকরণ: সংগৃহীত নিদর্শন ও সূত্রগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ লিপিবদ্ধ করা প্রত্নতাত্ত্বিকের খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বিভিন্ন নমুনা ও সূত্র মিলিয়ে তুলনামূলক আলোচনা ও সময়কাল নির্ধারণ করার জন্য এই বিবরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

৪। ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। সব প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত, নমুনা, নিদর্শন ও সূত্র বিশ্লেষণ করে প্রত্নতাত্ত্বিক সিদ্ধান্তে উপনীত হন। এজন্য তারা বিশ্লেষণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করেন: (ক) ঐ নির্দিষ্ট এলাকার প্রাচীন মানুষের জীবনযাত্রা বা সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা, (খ) পৃথিবীর প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা এবং (গ) মানব সংস্কৃতির বিকাশ ও পরিবর্তনের ধারা নির্ধারণ।

কাজ- ১ ঃ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রত্নঐতিহ্য আলোচনার মাধ্যমে আমরা কী কী বিষয়ে ধারণা লাভ করব?
Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...