অতীতেও চাকমা জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাসের অনেক নিদর্শন রয়েছে। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে চাকমা রাজবংশের শাসনের নানা মুল্যবান নিদর্শন কালের গর্ভে ইতোমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে এই রাজবংশের শাসনামলের কিছু কিছু নিদর্শন আজও খুঁজে পাওয়া যায়। সেসব নিদর্শনের মধ্যে এখানে চাকমা নৃপতিদের দুটি রাজবাড়ির কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। এর একটি চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে রাঙ্গুনিয়ার রাজানগরে চাকমাদের প্রাচীন রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ, বড় একটি দীঘি, চারপাশের পরিখা এবং চাকমা রাণী কালিন্দীর শাসনামলে (১৮৪৪-১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দ) নির্মিত বৌদ্ধমন্দির রয়েছে।

প্রাসাদটির গোড়াপত্তন বহু আগে হলেও এটির সার্বিক উন্নয়ন ও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় চাকমা রাজা জানবক্স খাঁ'র আমলে (শাসনকাল ১৭৮২-১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ)। এই নৃপতি চাকমা রাজ্যের রাজধানী আলিকদম থেকে রাঙ্গুনিয়ায় স্থানান্তরিত করেন এবং এর নাম রাখেন রাজানগর। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে এই রাজবাড়ি এখন প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। ইট-পাথর দিয়ে তৈরি এবং স্থাপত্যশৈলীতে অনন্য এই রাজবাড়ি প্রায় ৫২ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত। এর এক-একটি দেয়াল প্রস্থের দিক থেকে তিন ফুটের মতো চওড়া।
মূল দালান ছাড়াও এই রাজপ্রাসাদে ছিল বিশাল রাজদরবার, হাতি-ঘোড়ার পিলখানা, শান বাঁধানো সাগরদীঘি, রাজকর্মচারীদের জন্য নির্মিত অন্যান্য দালান-কোঠা, রাজ-কাছাড়ি, বৌদ্ধ বিহার, মসজিদ, মন্দির প্রভৃতি। ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও ঐতিহাসিক নানা ঘটনাপ্রবাহের জন্য এই রাজপ্রাসাদ আজও বিখ্যাত হয়ে আছে। রাজা হরিশচন্দ্র রায় ১৮৮৩ সালে রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর হতে চাকমা রাজ্যের রাজধানী রাঙ্গামাটিতে নিয়ে আসেন।

পরবর্তীকালে রাজা ভুবন মোহন রায় রাঙ্গামাটিতে নতুন একটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। দ্বিতলবিশিষ্ট এই সুরম্য রাজপ্রাসাদটি চাকমা স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন। রাজপ্রাসাদের চৌহদ্দীর মধ্যে রয়েছে সুসজ্জিত রাজপুরী, রাজ কাছাড়ি, প্রাচীন বৌদ্ধ মন্দির, রাজভান্ডার, রাজ কর্মচারীদের বাসগৃহ প্রভৃতি। রাজা ভুবন মোহন রায় মৃত্যুবরণ করলে তাঁর পুত্র রাজা নলিনাক্ষ রায় এই প্রাসাদে ১৯৩৫ সাল থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত রাজকার্য পরিচালনা করেন।
রাজা নলিনাক্ষ রায় মৃত্যুবরণ করলে তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র ত্রিদিব রায় ১৯৫৩ সালের ২ মার্চ চাকমা জনগোষ্ঠীর ৫০তম রাজা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলে ১৯৬০ সালে পাকিস্তান সরকার কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করে। ফলে ঐতিহ্যবাহী চাকমা রাজপ্রাসাদ, বৌদ্ধমন্দির এবং রাজপরিবারের নিজস্ব এক হাজার একর ভূ-সম্পত্তিসহ প্রায় ৫৪,০০০ একর কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং লক্ষাধিক মানুষ উদ্বাস্তু হয়। চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পরবর্তীকালে রাঙ্গামাটির রাঙ্গাপানি মৌজায় আরেকটি নতুন রাজবাড়ি নির্মাণ করেন।
| কাজ- ১ : উপরের আলোচনা অনুসারে চাকমা রাজবংশের চট্টগ্রাম অঞ্চল শাসনের কিছু নিদর্শনের নাম লিখ। |
Read more