খাদ্য সংগ্রহ ও বন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করে। দলবদ্ধ মানুষের একই সাংস্কৃতিক জীবনচর্চার মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে সমাজ গড়ে ওঠে। সভ্যতার গোড়ার দিকে মানুষ পশু শিকার ও ফলমূল সংগ্রহ করে তার খাবার ও অন্যান্য চাহিদা মেটাতো। তারপর একসময় মানুষ পশুপালন ও কৃষিকাজ করতে শেখে। খাদ্য উৎপাদন করতে শেখার ফলে মানুষের যাযাবর জীবনের অবসান হয়। বিভিন্ন জায়গায় তারা স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে এবং দলের আকারও ক্রমশ বড় হতে থাকে।
মানুষ তার নানা প্রয়োজন মেটানোর জন্যই গড়ে তোলে সমাজব্যবস্থা। দলবদ্ধ মানুষের সামাজিক জীবনকে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনার জন্য গড়ে উঠে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান। যেমন, আমাদের পরিবার, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। এ সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠান মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সকল চাহিদা মিটিয়ে থাকে। মানুষের যেকোনো চাহিদা পূরণের উদ্দেশ্যে সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করে। প্রতিষ্ঠানগুলো একে অন্যের কাজে ও দায়িত্ব পালনে সহায়তা করে। আর তাই যেকোনো সমাজের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার সম্পর্ককে বলা হয় সমাজ কাঠামো।
সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে উঠে। যেকোনো সামাজিক প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্দেশ্য হলো নিয়ম-নীতি, দায়িত্ব-কর্তব্য এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে সেই প্রতিষ্ঠানের নতুন সদস্যদের পরিচয় করানো। আমাদের পরিবার হলো একটি অন্যতম সামাজিক প্রতিষ্ঠান। তাই একেবারে ছোটবেলা থেকেই পরিবার আমাদের আচার-আচরণ, দায়িত্ব, নিয়ম-নীতি ও শৃঙ্খলা প্রভৃতি শিখিয়েছে। শুধু তাই নয়, একটি সন্তানকে সামাজিক অর্থে দায়িত্ববান মানুষ হিসেবে সমাজে চলার জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই শিখিয়ে দেয় পরিবার।
সামাজিক প্রতিষ্ঠানের আর একটি উদ্দেশ্য হলো তার উৎপাদন, পুনরুৎপাদন, সরবরাহ ও বিতরণের ব্যবস্থা করা। যেমন: পরিবারের একটি বড় উদ্দেশ্য সন্তান উৎপাদন। একজন মানুষ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, ধীরে ধীরে বেড়ে উঠে এবং পরবর্তী সময়ে সমাজের নতুন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নেয়। মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে সমাজে তার ভূমিকা ও তার ক্রিয়া-কর্মের পরিবর্তন ঘটে। পরিবারের মতো সব সামাজিক প্রতিষ্ঠানেই এক প্রজন্মের মানুষ বয়স্ক হয়ে অবসর নিলে নতুন প্রজন্মের মানুষ তাদের দায়িত্ব বুঝে নেয়। আর এভাবেই যুগ যুগ ধরে সমাজ টিকে আছে। তাই মানব সমাজের নতুন নতুন সদস্যের উৎপাদন ও সরবরাহ করে থাকে পরিবার।
সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো তার সদস্যদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তব্য বণ্টন করে দেয়। যেমন, একটি পরিবারের মা-বাবা ও ভাই-বোন প্রত্যেককেই নির্দিষ্ট কিছু অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়। এইসব দায়িত্ব ও কর্তব্য বা নিজ নিজ কাজের ভূমিকা সঠিকভাবে পালন করার মাধ্যমে পরিবারে আমাদের সবার
মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় থাকে এবং আমরা মিলেমিশে বসবাস করতে পারি। সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠানই পরিবারের মতো একইভাবে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন ও পালনের উদ্দেশ্য নিয়ে গড়ে উঠে। তবে সংস্কৃতিভেদে প্রতিষ্ঠানের গড়ন এবং এর সদস্যদের দায়িত্ব ও কর্তব্য বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, সিলেট অঞ্চলের খাসি ও বান্দরবানের ম্রোদের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। এ দুটি সংস্কৃতিতে অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ধরনে ভিন্নতা রয়েছে। খাসিদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নির্ভর করে পান চাষকে ঘিরে। অন্যদিকে, ম্রোদের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে জুম চাষকে কেন্দ্র করে। যেহেতু পান ও জুম চাষের পদ্ধতি আলাদা, তাই এ দুটি সমাজের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের দায়িত্বও আলাদা। একইভাবে এ দুটি সংস্কৃতিতে পরিবারসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ধরনেও বিস্তর পার্থক্য রয়েছে।
কাজ- ১ : পরিবারকে কেন একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান বলা হয়? কাজ-২ : সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্যের তালিকা প্রস্তুত কর। |
Read more