সংস্কৃতির কিছু কিছু উপাদান আমরা খালি চোখেই দেখতে পারি। আবার সংস্কৃতির অনেক উপাদানই আমরা দেখতে পাই না। যেমন, মানুষের তৈরি ঘরবাড়ি আমরা দেখতে পাই; কিন্তু ঘরবাড়ি তৈরির জ্ঞান ও কৌশল দেখা যায় না। এদিক থেকে বিবেচনা করে সংস্কৃতির উপাদানসমূহকে দুভাগে ভাগ করা যায়। যথা: (১) দৃশ্যমান উপাদানসমূহ এবং (২) অদৃশ্য উপাদানসমূহ। নিচের সারণিতে কিছু উদাহরণের মাধ্যমে সংস্কৃতির দু'ধরনের উপাদানকে ব্যাখ্যা করা হলো।
সংস্কৃতির দৃশ্যমান উপাদানসমূহ | সংস্কৃতির অদৃশ্য উপাদানসমূহ |
বিভিন্ন ধরনের ঘরবাড়ি যেমন, স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা, গীর্জা, মন্দির, অফিস, আদালত ইত্যাদি। | আমাদের সামগ্রিক জ্ঞান-ই হলো আমাদের সংস্কৃতি যা দেখা যায় না। |
বিভিন্ন ধরনের আসবাবপত্র যেমন, চেয়ার, টেবিল, আলমিরা, খাট ইত্যাদি। | মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি আমরা দেখতে পাই না, কিন্তু এগুলো আমাদের আচার-আচরণকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করে। |
বিভিন্ন ধরনের পোশাক যেমন, শার্ট, প্যান্ট, লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, শাড়ি, জুতা ইত্যাদি। | ধর্মীয় বিশ্বাস ও নীতিবোধ। |
বিভিন্ন ধরনের যানবাহন যেমন, গাড়ি, বাস, ট্রাক, ট্রেন, প্লেন ইত্যাদি। | ভাষা, ধ্বনি ও ব্যাকরণ। |
বিভিন্ন ধরনের খাবার ও পানীয় যেমন, রুটি, শরবত কোকাকোলা, পেপসি, বিস্কিট, চকোলেট ইত্যাদি। | শিল্পকলা, সাহিত্য ও সঙ্গীতের মর্মার্থ। |
চাষাবাদের বিভিন্ন উপকরণ যেমন, সার, কীটনাশক, ট্রাক্টর, সেচযন্ত্র, লাঙ্গল, জোয়াল, মই ইত্যাদি। | চিন্তা-চেতনা, বুদ্ধিবৃত্তি, মেধা ও প্রতিভা। |
বিভিন্ন ধরনের বইপত্র যেমন, স্কুলের পড়ার বই, গল্পের বই, কবিতার বই, পেপার, পত্রিকা ইত্যাদি। | আদর্শ ও মূল্যবোধ। |
একইভাবে সংস্কৃতির আরও অনেক দৃশ্যমান উপাদান রয়েছে। | জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখাও আমাদের সংস্কৃতির অদৃশ্য উপাদান। |
মানুষ তার নিজস্ব প্রয়োজনেই সংস্কৃতির দৃশ্যমান উপাদানগুলো সৃষ্টি করেছে। অনেক সময় শত শত বছর ধরেও এসব দৃশ্যমান ও বস্তুগত উপাদানগুলো টিকে থাকতে দেখা যায়। যেমন, আমরা জাদুঘরে গেলে এমন অনেক জিনিস দেখতে পাই, যেগুলো শত শত বছরের পুরনো। সেগুলো দেখে আমরা সে সময়ের মানুষ এবং তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারি।
সংস্কৃতির দৃশ্যমান উপাদানসমূহের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির অদৃশ্য উপাদানসমূহ, যেমন: মানুষের ধ্যান-ধারণা, মনোভাব, মুল্যবোধ ও মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। তাই সংস্কৃতি বলতে একদিকে যেমন বস্তুগত আবিষ্কারকে বোঝায়, তেমনি অন্যদিকে ঐ বস্তুগত আবিষ্কারের পিছনের ক্রিয়াশীল চিন্তা-ভাবনা, কৌশল বা জ্ঞানকেও বোঝায়। সংস্কৃতির এসব উপাদান কোনোভাবেই পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

এবার একটি উদাহরণের মাধ্যমে সংস্কৃতির উপাদানসমূহের সম্পর্ক বোঝার চেষ্টা করি। আমরা সবাই নিশ্চয়ই সমুদ্রে ভেসে থাকা বিশাল বিশাল বরফখন্ডের কথা শুনেছি। এগুলোকে আইসবার্গ বা হিমরাশি বলে। পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি সমুদ্রে এসব হিমরাশি দেখা যায়। মজার বিষয় হল, হিমরাশিগুলোর শুধুমাত্র দশ ভাগের এক অংশ আমরা সমুদ্রের পানির উপরে দেখতে পাই।
বাকি নয় অংশই থাকে পানির নীচে। তাই পানির উপর থেকে দেখে কোনোভাবেই বোঝা যায় না যে, হিমরাশিগুলোর আকার কতো বড়, আর সমুদ্রের কতো গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। আমাদের সংস্কৃতিকে সমুদ্রে ভাসমান এ হিমরাশির সাথে তুলনা করা যেতে পারে। হিমরাশির পানির উপরের দৃশ্যমান অংশের মতো আমাদের সংস্কৃতিরও অনেক উপাদান দৃশ্যমান রয়েছে। আবার হিমরাশির পানির নীচের অদৃশ্য অংশের মতো সংস্কৃতির অদৃশ্য উপাদানগুলো সব সময়ই আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকে যায়। প্রকৃতপক্ষে, এই অদৃশ্য উপাদানগুলোই আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করে থাকে। তাই দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উপাদানসমূহ মিলিয়ে সমগ্র সংস্কৃতিকে আমরা একটা হিমরাশির সাথে তুলনা করতে পারি। পাশের চিত্রে সংস্কৃতির হিমরাশি এবং এর বিভিন্ন উপাদান দেখানো হলো।
| কাজ- ১ ঃ সংস্কৃতির অদৃশ্য উপাদানের ৫টি উদাহরণ দাও। |
Read more