আত্মীয়দের মাঝে সম্পর্কই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজের ভিত্তি রচনা করে। আগেই বলা হয়েছে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সমাজ জীবনে আত্মীয়দের মাঝে সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই নির্ধারিত হয় সকল সামাজিক সম্পর্ক। ফলে আত্মীয়তার সম্পর্ক সামাজিক সৌহার্দ্য রচনা করে। তাই আত্মীয়তার সম্পর্ক বিষয়ে জানা গুরুত্বপূর্ণ।
আত্মীয়দের মাঝে সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই সমাজে মানুষের ভূমিকা এবং দায়িত্ব ঠিক হয়। ধরে নেয়া যাক আত্মীয়তার সম্পর্কে তুমি কারও ভাই। ছোটবেলা থেকেই তুমি পরিবার থেকে শিখেছ একজন বোন বা ভাইয়ের দায়িত্ব, কর্তব্য ও অধিকার কেমন হবে। তাই তোমাকে কেউ বোন, দিদি, আপু বা ভাই ডাকার সাথে সাথেই তোমার একটি সামাজিক ভূমিকা তৈরি হয়ে যায়। বোন বা ভাই হিসেবে তোমার কাছ থেকে কিছু নির্দিষ্ট আচরণ আশা করা হয়। আবার, স্বাভাবিকভাবেই ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে ভাই-বোনের আচরণও আলাদা হয়ে থাকে। যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রোদের সমাজে, একজন ছেলে তার চাচাতো বোনকে নিজের বোনের মতো দেখে, কিন্তু মামাতো বোনকে বিয়ের জন্য হবু কনে হিসেবে বিবেচনা করে। কারণ ম্রোদের সমাজে মামাতো বোনকে বিয়ে করার রীতি প্রচলিত আছে।
সমাজের একজন মানুষ আরেকজন মানুষের সাথে নানা ধরনের সম্পর্কে জড়িয়ে থাকে। কিন্তু এসব ধরনের সম্পর্কই সামাজিক কিছু নিয়ম-কানুনের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে থাকে। ম্রোদের সমাজের উদাহরণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, চাচাতো আর মামাতো ভাই-বোনের মধ্যকার সম্পর্ক সংস্কৃতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। আবার মান্দি কিংবা খাসিদের সংস্কৃতিতে ছেলেরা বিয়ের পর কনেদের বাড়িতে থাকতে যায় এবং সেখানে পরিবার গড়ে তোলে। ম্রোদের সমাজ ও তাদের সমাজে বাবা-ছেলে, বাবা-মেয়ে, বাবা-মা, ভাই-বোন, মা-ছেলে ও মা-মেয়ের সম্পর্কসহ অন্যান্য সকল আত্মীয়তার সম্পর্কের পার্থক্য রয়েছে। ফলে বিভিন্ন ধরনের সম্পর্কের ভিত্তিতে আচার-ব্যবহার ও দায়িত্ব-কর্তব্যের মধ্যেও অনেক পার্থক্য সৃষ্টি হয়। তাহলে বলা যায় যে, মান্দি, খাসি কিংবা ম্রোদের মত অন্যান্য সকল নৃগোষ্ঠীর মধ্যেই সংস্কৃতি পৃথকভাবে আত্মীয়তার সম্পর্ককে নির্ধারণ করে।
এসো, এবার আমরা আত্মীয়তার সম্পর্কের বিভিন্ন ধরন নিয়ে আলোচনা করি। আমরা সবাই সমাজের অন্য সদস্যদের সাথে নানা ধরনের সম্পর্ক সূত্রে আবদ্ধ। আমাদের নিজ নিজ সমাজের সদস্যদের মধ্যে কেউ আমাদের রক্ত সম্পর্কের আত্মীয়, কেউ বন্ধু, আবার কেউবা প্রতিবেশী। রক্ত সম্পর্কের বাইরেও আমাদের আত্মীয় আছে। আমাদের পরিবারের বা আত্মীয়দের বিয়ের মাধ্যমেও অনেকের সাথে আমাদের নতুন আত্মীয়তার সম্পর্ক হয়। আবার, শুধুমাত্র রক্তের অথবা বৈবাহিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করেই যে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠে, তা নয়, কেউ কেউ আমাদের কাল্পনিক আত্মীয়ও রয়েছে। সুতরাং আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রধানত ৩ প্রকার। যেমন:
১. রক্তের আত্মীয় | রক্ত সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ সম্পর্কগুলোকে রক্তের আত্মীয় বলে। যেমন, একজন ব্যক্তি তার পিতামাতা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন, নাতি-নাতনীর সাথে রক্ত সম্পর্কীয় বন্ধনে আবদ্ধ |
২.বৈবাহিক আত্মীয় | আমাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে যারা সম্পর্কযুক্ত তাদের বলা হয় বৈবাহিক আত্মীয় বিবাহবন্ধনের মাধ্যমে উভয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠে। যেমন, বাঙালি সমাজে একজন পুরুষের সাথে বিবাহের মাধ্যমে একজন নারী তার স্বামীর পরিবারের অন্যদের সাথে চাচি, মামী, ভাবি ইত্যাদি সম্পর্কে আবদ্ধ হয়। এ ধরনের আত্মীয়দের কুটুমও বলা হয়ে থাকে। |
৩. কাল্পনিক আত্মীয় | রক্ত বা বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ নয় এমন অনেক ব্যক্তিদের সাথেও আমরা রক্ত বা বৈবাহিক জ্ঞাতিদের মতো আচরণ করি। যেমন, বাবার বন্ধুকে আমরা চাচা ডাকি ,কিংবা মায়ের |
| বান্ধবীকে খালা ডাকি। আবার হয়ত আমাদের থেকে বয়সে বড় কাউকে ভাই বা আপু বা দিদি ডাকি এবং সে অনুযায়ী আচরণ করি। এ ধরনের সম্পর্ককে বলে কাল্পনিক বা পাতানো সম্পর্ক। |
পরবর্তী পাঠগুলোতে আমরা শিখব সংস্কৃতি কীভাবে আত্মীয়তার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলে। এক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞানীরা আত্মীয়তার সম্পর্ক সৃষ্টি ও বিস্তারের ক্ষেত্রে দুটি প্রক্রিয়ার কথা বলেছেন। যার প্রথমটি হলো বিবাহ প্রথাভিত্তিক এবং দ্বিতীয়টি হলো বংশধারানির্ভর।
কাজ- ১ : আত্মীয়তার সম্পর্কের ধরন উল্লেখ কর। কাজ-২ : রক্তসম্পর্কীয় এবং বৈবাহিক সূত্রে তোমার আত্মীয় কারা? দুটি করে উদাহরণ দাও। তোমার কি কোনো কাল্পনিক আত্মীয় আছে? |
Read more