উত্তরাধিকারের ধরন (পাঠ- ১৩ ও ১৪)

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমাজ জীবন - ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি - ষষ্ঠ শ্রেণি | NCTB BOOK

232

আমরা যেমন আমাদের পূর্বপুরুষের বংশধর তেমনি আমরা তাদের সামাজিক অবস্থানগত ও মালিকানাধীন বিভিন্ন সম্পদের বৈধ উত্তরাধিকারী। গোত্রের সদস্যপদের মতো বংশধারার প্রথাই নির্ধারণ করে সেই সংস্কৃতিতে উত্তরাধিকারের ধরন কেমন হবে। উত্তরাধিকার বলতে আমরা বুঝি পূর্বপুরুষের সম্পদের উপর আমাদের জন্মগত অধিকার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে একটি পরিবারে যদি কয়েকজন ভাইবোন থাকে তাহলে তাদের বাবা-মার সম্পদে কার অধিকার কতোটুকু হবে? বিভিন্ন সংস্কৃতি এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে।
মানব সভ্যতার শুরুর দিকের সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মালিকানা বা ব্যক্তিগত সম্পদের ধারণা মানুষের ছিল না। নিজের ব্যবহৃত কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ছাড়া বাকি সবকিছুই দলের সকলের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কোনো মৃত ব্যক্তির সৎকারের সাথে সাথেই তার ব্যবহৃত জিনিসগুলোও অনেক সময় নষ্ট করে ফেলা হতো। কৃষির আবিষ্কার মানুষের জীবনে অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসে। কৃষিকে ঘিরেই গড়ে উঠে স্থায়ীভাবে বসবাসের সূচনা। ধীরে ধীরে মানুষ তার নিজের প্রয়োজনের বেশি পরিমাণ ফসল উৎপাদন ও পশুপালন করতে শেখে। ব্যক্তিগত পারিবারিক চাহিদার অতিরিক্ত উৎপাদন থেকেই সম্পদের ব্যক্তিগত মালিকানার ধারণা শুরু হয়। এভাবে বিভিন্ন ধরনের সম্পদের উপর ব্যক্তি মালিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে একই সাথে সম্পদের মালিকানা বদল করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে যে কোনো সংস্কৃতির জন্য।
ব্যক্তিগত সম্পদের মালিকানা বদলের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো উত্তরাধিকার ব্যবস্থা। সংস্কৃতিতে বংশধারার নিয়ম অনুযায়ী কোনো ব্যক্তির সম্পদের মালিক হলো তার বংশধর। পিতৃতান্ত্রিক বংশধারায় ছেলে আর মাতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মেয়ে সন্তানরা পারিবারিক সম্পদের উত্তরাধিকার। কিন্তু এর মাঝেও সংস্কৃতিভেদে কিছু বৈচিত্র্য দেখা যায়। কেননা, কিছু সংস্কৃতিতে সকল উত্তরাধিকারীর মাঝে সম্পদ সমানভাবে বণ্টিত হয় না। সন্তানদের মধ্যে যার দায়িত্ব বেশি তার উত্তরাধিকৃত সম্পত্তির পরিমাণও বেশি হয়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের উত্তরাধিকার ব্যবস্থা তাহলে দুভাবে নির্ধারিত হয়:
(১) বংশধারার ভিত্তিতে এবং
(২) দায়িত্বের ভিত্তিতে।

(১) বংশধারার ভিত্তিতে উত্তরাধিকার:

পিতৃসূত্রীয় রীতি

পিতৃসূত্রীয় ব্যবস্থায় বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হলো তার ছেলে সন্তানরা।

মাতৃসূত্রীয় রীতি

মায়ের ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং মালিকানাধীন সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হলো মেয়ে সন্তানরা।

উদাহরণস্বরূপ, ওরাঁও সংস্কৃতিতে পিতার সম্পত্তিতে মেয়েদের কোনো মালিকানা বা অধিকার নেই। পিতার মৃত্যুর পর পুত্ররাই সমান হারে ভাগ পায়। তবে সম্পত্তি ভাগাভাগির সময় মেয়েরা একটি করে গাভী পেয়ে থাকে। আবার, খাসি সমাজে মাতৃসূত্রীয় উত্তরাধিকার রীতি দেখা যায়। তাদের সমাজে মেয়েরাই যাবতীয় সম্পত্তির অধিকারী হয়ে থাকে।

(২) দায়িত্ব ও কর্তব্যের ভিত্তিতে উত্তরাধিকার:

বড়দের অধিকার

কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিবারের বড় সন্তান সমস্ত সম্পত্তির উত্তরাধিকারী বলে বিবেচিত হয়। কেননা, পরিবারের সবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব থাকে বড় সন্তানের উপর।

ছোটদের অধিকার

এ নীতি অনুযায়ী পরিবারের ছোট সন্তান সম্পত্তির সিংহভাগের অধিকারী হয়। কেননা, বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা ছোট সন্তানের সাথে বসবাস করে।

বাংলাদেশের খাসি ও মান্দিদের মধ্যে ছোট সন্তানদের অধিকার-রীতি দেখা যায়। এদের মাঝে সাধারণত বসতবাড়ির মালিক হয় ছোট মেয়ে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা ছোট মেয়ের সাথে থাকে। এমনকি মৃত্যুর পর বাবা-মার সৎকারের দায়িত্ব পালন করে ছোট মেয়ে।

কাজ- ১ : উত্তরাধিকার বলতে কী বোঝায়? সমাজভেদে কতো ধরনের উত্তরাধিকারের নিয়ম দেখা যায়?

কাজ-২ : মান্দি, খাসি ও ওরাও সমাজে উত্তরাধিকারের নিয়মগুলো ছকে উপস্থাপন কর।

Content added By
Promotion

Are you sure to start over?

Loading...